জামায়াত যেসব আসনে প্রতিদ্বন্দ্বীতা করছে… (সর্বশেষ কিস্তি)

উনিশ.
পিরোজপুর-১
পিরোজপুর সদর, নেছারাবাদ ও নাজিরপুর উপজেলা নিয়ে গঠিত এই সংসদীয় আসনে জামায়াত প্রার্থী আলহাজ্ব শামীম সাঈদী। তিনি বিশ্ববরেণ্য আলেমে দ্বীন প্রখ্যাত মুফাসসির আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী সাহেবের দ্বিতীয় সন্তান। এই আসনে এখন মোট ভোটার ৪,১৮,৯৭৪ জন।

জামায়াত সমর্থক ছাড়াও পুরো পিরোজপুরবাসীর কাছে এক আবেগের নাম আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী। ১৯৯৬ সালে জামায়াতের নির্বাচনী মাঠে কঠিন সময়েও এই আসনে আল্লামা সাঈদী বিজয় লাভ করেন। বলা হয়, সংগঠন ছাপিয়ে আকাশ্চুম্বী ব্যক্তি জনপ্রিয়তায় এই আসনে সাঈদী সাহেব অনন্য মাত্রায় উঠে আছেন।

২০০৮ সালের নির্বাচনে আল্লামা সাঈদী ৯৪,৯৩৭ ভোট পেয়ে আওয়ামী লীগ প্রার্থী একেএমএ আউয়ালের কাছে (১,০২,০৮৬) মাত্র ৭১৪৯ ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হন।

২০০১ সালের নির্বাচনে জামায়াত নেতা সাঈদী সাহেব ১,১০,১০৮ ভোট পেয়ে আওয়ামী লীগ প্রার্থী শুধাংশ শেখর হালদার (৭৬,৭৩১)-কে ৩৩,৩৭৭ ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করেন।

১৯৯৬ সালে তিনি (৫৫,৭১৭) ভোট পেয়ে আওয়ামী লীগ প্রার্থী শুধাংশ শেখর হালদার (৫৫,৪৩৭)-কে ২৮০ ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করেন।

ঐতিহাসিকভাবে এই আসনের সাধারণ ভোটারবৃন্দ আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে প্রাণ দিয়ে ভালোবাসেন। মিথ্যা মামলায় কারাবন্দী সাঈদী সাহেবের সুযোগ্য সন্তান হিসেবে শামীম সাঈদী রেকর্ড পরিমাণ ভোটে বিজয়ী হবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বিশ.
কুমিল্লা-১১
চৌদ্দগ্রাম উপজেলা নিয়ে গঠিত এই সংসদীয় আসনে জামায়াত প্রার্থী ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি, জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মো. তাহের। এই আসনে মোট ভোটার ৩,২৮,১৬০ জন।

কুমিল্লা জেলার জামায়াত অধ্যুষিত এলাকা বলে সর্বজনবিদিত আসন কুমিল্লা-১১। এখানে রেলমন্ত্রী মুজিবুল হক এবং জামায়াত নেতা ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মো. তাহেরের দ্বৈরথ লড়াই বেশ পুরোনো।

২০০৮ সালের নির্বাচনে এখানে ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মো. তাহের ৭৭,৯২৪ ভোট পেয়ে আওয়ামী লীগ প্রার্থী মুজিবুল হক (১,০১,২০১) এর কাছে ২৩,২৭৭ ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হোন।

২০০১ সালের নির্বাচনে ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মো. তাহের ১,০৮,৪০৭ ভোট পেয়ে আওয়ামী লীগ প্রার্থী মুজিবুল হক (৫৪,১৭২) কে ৫৪,২৩৫ ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করেন।

১৯৯৬ সালে ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মো. তাহের আওয়ামী লীগ প্রার্থী মুজিবুল হকের কাছে এবং ১৯৯১ সালে জাতীয় পার্টি প্রার্থী মরহুম কাজী জাফর আহমদের কাছে সামান্য ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হয়ে দ্বিতীয় স্থানে ছিলেন।

একুশ.
চট্টগ্রাম-১৫
লোহাগড়া উপজেলা এবং সাতকানিয়া উপজেলা (কেউচিয়া, কালিয়াইশ, বাজালিয়া, ধর্মপুর, পূরানগড় ও খাগরিয়া ইউনিয়ন ব্যতিত) এলাকা নিয়ে এই সংসদীয় আসনে জামায়াত প্রার্থী কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির আ ন ম শামসুল ইসলাম। এই আসনে মোট ভোটার ৩,৮৮,১৩৭ জন।

সারা দেশব্যাপী জামায়াতের দূর্গখ্যাত এই আসনে বরাবরই ভোটের মাঠে জামায়াত শক্তিশালী। বিএনপির ঘাঁটি বগুড়া, আওয়ামী লীগের ঘাঁটি গোপালগঞ্জ যেমন, ঠিক তেমন জামায়াতের ঘাঁটি হিসেবে সাতকানিয়া লোহাগাড়াকে বিবেচনা করা হয়। এই আসনের তুমুল জনপ্রিয় নেতা শাহাজাহান চৌধুরী এবং বর্তমান প্রার্থী আ ন ম শামসুল ইসলাম উভয়ে এখন কারাগারে।

২০০৮ সালের নির্বাচনে জামায়াত যে দু’টি আসনে বিজয়ী হয়, তার একটি এই আসন। আ ন ম শামসুল ইসলাম ১,২০,৩৩৯ ভোট পেয়ে এলডিপি চেয়ারম্যান ড. কর্নেল (অব.) অলি আহম্মেদ (৬৩,৪১২) কে ৫৬,৯২৭ ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করেন। আওয়ামী লীগ প্রার্থী একেএম সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী ৪৯,৪৭২ ভোট পেয়ে তৃতীয় স্থানে ছিল।

২০০১ সালের নির্বাচনে এখানে বিএনপি, জামায়াত ও আওয়ামী লীগের ত্রিমুখী লড়াই হয়। তৎকালীন বিএনপি নেতা কর্নেল (অব.) অলি আহম্মেদ একইসাথে দু’টি আসনে (চন্দনাইশ এবং লোহাগড়া-সাতকানিয়া) প্রার্থী হোন। চন্দনাইশ আসনে বিপুল ভোটে কর্নেল অলি জিতলেও লোহাগড়া-সাতকানিয়া আসনে জামায়াত নেতা শাহাজাহান চৌধুরীর কাছে বিপুল ভোটে পরাজয় বরণ করেন। শাহাজাহান চৌধুরী দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে পান ১,০৫,৭৭৩ এবং কর্নেল অলি আহম্মেদ ধানের শীষ প্রতীকে পান ৬৪,১৮৪ ভোট। ভোটের ব্যবধান ছিল ৪১,৫৮৯।

১৯৯৬ সালে কর্নেল অলির কাছে ৩৫ হাজার ভোটের ব্যবধানে হারলেও ১৯৯১ সালে শাহাজাহান চৌধুরী আওয়ামী লীগ প্রার্থী আকতারুজ্জামান চৌধুরী বাবুকে ২২ হাজার ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করেন।

সাতকানিয়া ও লোহাগাড়া উভয় উপজেলাতে জামায়াত পূর্ণ প্যানেলে ২০১৪ সালের উপজেলা নির্বাচনে বিপুল ভোটের ব্যবধানে জয়লাভ করে।

সাতকানিয়া উপজেলার বর্তমান জামায়াত সমর্থিত চেয়ারম্যান, ভাইস-চেয়ারম্যান ও মহিলা ভাইস-চেয়ারম্যান যথাক্রমে মো. জসিম উদ্দিন, মো. ইব্রাহিম চৌধুরী ও মিসেস দুরদানা ইয়াসমিন।

অন্যদিকে লোহাগাড়া উপজেলার বর্তমান জামায়াত সমর্থিত চেয়ারম্যান, ভাইস-চেয়ারম্যান ও মহিলা ভাইস-চেয়ারম্যান যথাক্রমে এডভোকেট ফরিদ উদ্দীন খান, অধ্যাপক নুরুল আবছার ও গুলশান আরা বেগম।

চরম প্রতিকূল পরিবেশেও এই দুই উপজেলায় জামায়াত সমর্থিত প্রার্থীরাই বিপুল ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হয়েছেন।

বাইশ.
চট্টগ্রাম-১৬
বাঁশখালী উপজেলা নিয়ে গঠিত এই সংসদীয় আসনে জামায়াত প্রার্থী উপজেলার সদ্য পদত্যাগী চেয়ারম্যান মাওলানা জহিরুল ইসলাম। এই আসনে মোট ভোটার ৩,০৩,০৭২ ভোট।

এখানে আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জামায়াত ত্রিমুখী লড়াই হবে। জামায়াত এককভাবে এই আসনে আপেল প্রতীক নিয়ে লড়াই করছে।

এই আসনের জনগণ তরুণ জামায়াত নেতা মাওলানা জহিরুল ইসলামকে নিয়ে দারুণ আশাবাদী। অত্যন্ত সফল এই উপজেলা চেয়ারম্যান সমগ্র বাঁশখালীতে তুমুল জনপ্রিয়।

২০১৪ সালের উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে জামায়াত প্রার্থী জহিরুল ইসলাম ৬৬ হাজার ৩৪২ ভোট পেয়ে চেয়ারম্যান হন। আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী খোরশেদ আলম পেয়েছিলেন ৫২ হাজার ৮৯০ ভোট। আর বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী আলমগীর কবির চৌধুরী পেয়েছিলেন ২১ হাজার ৩৬৫ ভোট। বিএনপির আরেক প্রার্থী লিয়াকত আলী পেয়েছিলেন ১৮ হাজার ১৩৭ ভোট।

অধ্যক্ষ জহিরুল ইসলাম বাঁশখালী উপজেলার সর্বজন শ্রদ্ধেয় পীর মাওলানা মোহাম্মদ ইসহাক সাহেবের ছেলে। এই হিসেবে তিনি সর্বজনের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা পান। এখানে বিএনপির প্রার্থী জাফরুল ইসলাম চৌধুরী।

তেইশ.
কক্সবাজার-২
কুতুবদিয়া এবং মহেশখালী উপজেলা নিয়ে এই সংসদীয় আসনে জামায়াত প্রার্থী কেন্দ্রীয় সহকারি সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ। এই আসনে মোট ভোটার ২,৯৬,০৯৬ জন।

২০০৮ সালের নির্বাচনে জামায়াত যে দু’টি আসনে বিজয়ী হয়, তার একটি এই আসন। হামিদুর রহমান আযাদ ২০০৮ সালে ১,০৩,৯৭১ ভোট পেয়ে আওয়ামী লীগ প্রার্থী আনসারুল করিমকে (৮৬,৯৪৪) পরাজিত করেন।

২০০১ সালে এখানে জামায়াতের প্রার্থী ছিল না। বিএনপি ২০০১ ও ১৯৯৬ সালে বিপুল ভোটে জয়লাভ করে। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি আইনি জটিলতার কারণে জোটের প্রার্থী হিসেবে আপেল প্রতীকে লড়াই করবেন।

চব্বিশ.
ঢাকা-১৫
ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের ওয়ার্ড- ০৪, ১৩, ১৪ ও ১৬ নিয়ে এই সংসদীয় আসনে জামায়াতের প্রার্থী সেক্রেটারি জেনারেল ডা. শফিকুর রহমান।

এই আসনে তিনি ২০ দলের ধানের শীষের প্রার্থী। ইতোপূর্বে তিনি রাজধানী ঢাকায় এই আসনে প্রতিদ্বন্দ্বীতা করেননি। এই ওয়ার্ডে জামায়াতের নির্বাচিত মহিলা কাউন্সিলর কাওছার জাহান।

২০ দলের শীর্ষনেতা হিসেবে তিনি ভোটের মাঠে সচেতন নাগরিকদের কাছে গ্রহণযোগ্য প্রার্থী হিসেবে ভোট পাবেন বলে আশা করা হচ্ছে।

  • একনজরে নির্বাচনে জামায়াত:

১৯৭৯ সালে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে জামায়াত ইসলামিক ডেমোক্র্যাটিক লীগের ব্যানার নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ৬ জন সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।

৭ মে, ১৯৮৬ সালের নির্বাচনে জামায়াত আন্দোলনের অংশ হিসেবে স্বৈরশাসক এরশাদের শাসনামলে ৩য় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৭৬টি আসনে অংশগ্রহণ করে ১০টি আসনে বিজয় লাভ করে। ৭৬ আসনে প্রাপ্ত ভোট ১৩১৪০৫৭। যা মোট ভোটের ৪.৬০%। অংশ নেওয়া আসনে গড়ে ভোট পেয়েছে ১৭ হাজার ২৯০ ভোট। এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রতি আসনে গড়ে ভোট পায় ২৯ হাজার ১৪৯ ভোট।

০৩ মার্চ, ১৯৮৮ সালের ৪র্থ নির্বাচনে জামায়াত সকল বিরোধীদলের সাথে নির্বাচন বর্জন করে।

২৭ ফেব্রুয়ারি, ১৯৯১ সালের ৫ম সংসদ নির্বাচনে জামায়াত ২২২ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বীতা করে ১৮ আসনে বিজয়ী হয়। মোট প্রাপ্ত ভোট ৪১১৭৭৩৭, যা মোট ভোটের ১২.২০%। অংশ নেওয়া আসনে গড়ে প্রাপ্ত ভোট ১৮ হাজার ৫৪৮ ভোট। এই নির্বাচনে বিজয়ী বিএনপি গড়ে প্রতি আসনে ভোট পায় ৩৫ হাজার ২৫ ভোট। আওয়ামী লীগ প্রতি আসনে গড়ে ভোট পায় ৩৮ হাজার ৮০০ ভোট (২৬৪ আসনে আওয়ামী লীগ নির্বাচন করেছিল)। জামায়াত ২২২ আসনের মধ্যে ৭৬ আসনে দ্বিতীয় স্থান লাভ করে।

৬ষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচন জামায়াত বর্জন করে।

১২ জুন, ১৯৯৬ সালের ৭ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াত ৩০০ আসনে প্রার্থী দিয়ে ৩টি আসনে বিজয়ী হয়। মোট প্রাপ্ত ভোট- ৩৬৫৩০১৩, যা মোট ভোটের ৮.৬৩%। গড়ে প্রতি আসনে ১২ হাজার ১৭৬ ভোট। বিজয়ী আওয়ামী লীগ গড়ে প্রতি আসনে পেয়েছিল ৫২ হাজার এবং বিএনপি পেয়েছিল গড়ে ৪৭ হাজার ৫০০ ভোট।

১ অক্টোবর, ২০০১ সালের ৮ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াত ৪ দলীয় জোটের শরিক হিসেবে ৩২টি আসনে নির্বাচন করে ১৭ আসনে বিজয় লাভ করে। প্রাপ্ত ভোট ২৩৮৫৩৬১, যা মোট ভোটের ৪.২৮%। গড়ে প্রতি আসনে ৭৪ হাজার ৫৪২ ভোট। এই নির্বাচনে বিএনপি প্রতি আসনে গড়ে পায় ৮৮ হাজার ৭৪৮ ভোট এবং আওয়ামী লীগ পায় গড়ে ৭৪ হাজার ৩৬৭

২৯ ডিসেম্বর, ২০০৮ সালের ৯ম সংসদ নির্বাচনে জামায়াত ৪ দলীয় জোটের শরিক হিসেবে মোট ৩৯ আসনে নির্বাচন করে ২ আসনে বিজয়ী হয়। মোট প্রাপ্ত ভোট ৩১৮৬৩৮৪, যা গড়ে ৪.৬%। প্রতি আসনে গড়ে ভোট পায় ৮১ হাজার ৭০২ ভোট। এই নির্বাচনে বিএনপি গড়ে প্রতি আসনে পায় ১ লাখ ১২ হাজার এবং বিএনপি প্রতি আসনে গড়ে পায় ৯০ হাজার ভোট।

৫ জানুয়ারি, ২০১৪ সালের ১০ম জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এই নির্বাচন নিয়ে আলাপ না করি, বহুত ফায়দা।

আরও জানতে পড়ুন:

জামায়াত যেসব আসনে প্রতিদ্বন্দ্বীতা করছে… (প্রথম কিস্তি)

জামায়াত যেসব আসনে প্রতিদ্বন্দ্বীতা করছে…(দ্বিতীয় কিস্তি)

জামায়াত যেসব আসনে প্রতিদ্বন্দ্বীতা করছে… (তৃতীয় কিস্তি)

Comments

comments