জামায়াতের আসনগুলোতে টার্গেট করে গ্রেফতার-হামলা চলছে

সারা দেশে জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীদের ব্যাপক ধরপাকড় চালাচ্ছে পুলিশ। বিশেষ করে যেসব আসনে জামায়াতের প্রার্থী রয়েছে সেসব এলাকায় টার্গেট করে বিএনপি-জামায়াত নেতাকর্মীদের গ্রেফতার করা হচ্ছে। জেলা-উপজেলা আমির থেকে শুরু করে বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের গ্রেফতার করা হচ্ছে।

সর্বশেষ সাতক্ষীরা-৪ আসনের ২০ দলীয় জোট প্রার্থী ও জামায়াত নেতা গাজী নজরুল ইসলামকে পুলিশ আটক করেছে। এ ছাড়া নেতাদের বাড়িঘরে হামলা, নির্বাচনী পোস্টার ছিঁড়ে ফেলা ও হুমকি-ধমকির ঘটনা ঘটছে। নির্বাচনকে সামনে রেখে পুলিশ ও সরকারদলীয় ক্যাডাররা এ ধরনের তৎপরতা চালাচ্ছে বলে জানা গেছে। এতে নির্বাচনের পরিবেশ বিঘ্ন ঘটছে এবং একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন হওয়া নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে।

জানা যায়, সাতীরা-৪ আসনে ধানের শীষের প্রার্থী জামায়াত নেতা গাজী নজরুল ইসলাম ও উপজেলা চেয়ারম্যান মাওলানা আব্দুল বারীসহ চারজনকে ১৬ ডিসেম্বর আটক করে পুলিশ। তাদের নিজ বাড়ি থেকে আটক করা হয়। শ্যামনগর থানার অফিসার ইনচার্জ আবুল কালাম গণমাধ্যমকে জানান, গাজী নজরুল ইসমাইলপুর এলাকার নিজ বাড়িতে জামায়াত নেতাদের সাথে বৈঠক করছেন এই গোপন সংবাদের ভিত্তিতে পুলিশ সেখানে অভিযান চালায়। পরে সেখান থেকে গাজী নজরুল, উপজেলা জামায়াতের আমির মাওলানা আব্দুল বারী ও শ্যামনগর উপজেলা জামায়াতের অফিস সেক্রেটারি শেখ আব্দুল বারীসহ তিনজনকে গ্রেফতার করে। বাকিরা পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে পালিয়ে যায়। এর আগে সকালে উপজেলার পদ্মপুকুর ইউনিয়ন জামায়াতের আমির আবদুর রবকে আটক করা হয়।

এ ছাড়া ১৫ ডিসেম্বর সন্ধ্যা থেকে ১৬ ডিসেম্বর দুপুর পর্যন্ত ওই জেলার বিভিন্ন থানায় অভিযান চালিয়ে পুলিশ ৬২ জনকে গ্রেফতার করে। এর আগেও এ জেলার নেতাকর্মীদের আটক করে পুলিশ।

একইভাবে ১৪ ডিসেম্বর ঠাকুরগাঁও-২ আসনে এক জামায়াত নেতাকে আটক করে পুলিশ। আটক অধ্যাপক মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম জেলা জামায়াতের মজলিসে শূরার অন্যতম সদস্য এবং বালিয়াডাঙ্গা উপজেলার আমির। তাকে বালিয়াডাঙ্গার নিজ বাসা থেকে ১৪ ডিসেম্বর বেলা ৪টার দিকে আটক করে পুলিশ।

গত ১৩ ডিসেম্বর দুপুরে দিনাজপুর-৬ আসনে বিএনপি ও জামায়াতের পাঁচ নেতাকর্মীকে আটক করে পুলিশ। দিওড় ইউনিয়ন বিএনপির সিনিয়র সহসভাপতি আলহাজ মো: মোশারফ হোসেন ও মুকুন্দপুর ইউনিয়ন বিএনপির নেতা মো: গোলাপ হোসেনকে তাদের নিজ বাসা থেকে বিনা ওয়ারেন্টে আটক করে এবং ঘোড়াঘাট উপজেলার পৌর সভাপতি আ: মান্নান সরকারকে বিকেলে নির্বাচনী গণসংযোগকালে ঘোড়াঘাট থানা পুলিশ আটক করে। এ ছাড়াও ১৪ ডিসেম্বর আরো দুই জামায়াত নেতাকে আটক করে পুলিশ। আটকেরা হলো- বিরামপুর পলিপ্রয়াগপুর ইউনিয়ন জামায়াতের সভাপতি মাওলানা মো: আবদুল খালেক ছাদেকী ও নাবাবঞ্জ উপজেলার বিনোদনগর ইউনিয়নের সেক্রেটারি মো: সেলিম রেজা। তাদের একজনকে জুমার নামাজ পড়ার পর বাসায় ফেরার পথে এবং অন্যজনকে স্ত্রীর অসুস্থতায় হাসপাতালে থাকা অবস্থায় বিরামপুর থানা পুলিশ গ্রেফতার করে। এ ছাড়াও প্রতি রাতে দিনাজপুর-৬ আসনের নবাবগঞ্জ, বিরামপুর, হাকিমপুর ও ঘোড়াঘাট উপজেলায় পুলিশ বিএনপি ও জামায়াতের নেতাকর্মীদের বাসাবাড়িতে গ্রেফতার অভিযান ও তল্লাশি অব্যাহত রেখেছে।

রংপুর-৫ আসনে ১৪ ডিসেম্বর রাতে দুইজন জামায়াত নেতাকর্মীকে আটক করে পুলিশ। আটককেরা হলো- মিঠাপুকুর উপজেলার লতিবপুরের মো: মেছের আলী ও ভাংনী গ্রামের মো: শাখাওয়াত হোসেন। এ ছাড়াও আওয়ামী ক্যাডাররা ধানের শীষের পোস্টার ছিঁড়ে আগুন লাগিয়ে পুড়িয়ে ফেলে বলে জানা যায়।

সিরাজগঞ্জ-৪ আসনের ১১জন বিএনপি ও জামায়াত নেতাকর্মীকে আটক করে পুলিশ। আটকদের মধ্যে অন্যতম হলো- পুর্ণিমাগাতী ইউনিয়নের বিএনপি সেক্রেটারি আবদুল মান্নান ও শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশন জেলা সাংগঠনিক সম্পাদক মো: সোলায়মান হোসেন। ১৪ ডিসেম্বর রাতে পোস্টার লাগানোর সময় আরো ৯ জন জামায়াত নেতাকর্মীকে আটক করে পুলিশ। আটকেরা হলো- ১.আতিকুর ইসলাম ২. মো: রাসেল, ৩. মো: নাইম, ৪. মো: আলতাব হোসেন, ৫. মুনজিল, ৬. ডা: লিটন, ৭. ডা: নাসির, ৮. মো: আজিজ ও ৯. মো: জাফর। তাদের প্রত্যেককে অলিপুরে পোস্টার লাগানোর সময় গ্রেফতার করা হয়। এ ছাড়াও বড়হার ইউনিয়নের ভুতগাছা গ্রামে ধানের শীষের সমর্থকেরা পোস্টার সাটানোর সময় উল্লাপাড়া থানা পুলিশের অফিসার ইনচার্জ দেওয়ান কৌশিক আহমেদ বাধা দেন এবং ধানের শীষ প্রতীকের ১০ বান্ডিল (আনুমানিক ১০ হাজার) পোস্টার এবং দড়ি ও মই ছিনিয়ে নিয়ে যায়। এলাকায় আওয়ামী লীগ সমর্থকেরাও ধানের শীষের পোস্টার ছিঁড়ে ফেলছে বলে জানা যায়।

পাবনা-৫ আসনে ধানের শীষের সমর্থকদের ওপর নির্যাতন অব্যাহত রয়েছে। গত ১৩ ডিসেম্বর দুপুরে পোস্টার লাগানোর সময় একজনকে আওয়ামী সন্ত্রাসীরা ইট ও লাঠিসোটা দিয়ে আঘাত করে আহত করেছে বলে জানা যায়।

যশোর-২ আসনের ১৩ ডিসেম্বর একজনকে আটক করে এবং আওয়ামী লীগ সন্ত্রাসীরা জামায়াত কর্মীদের ওপর অহেতুক হামলা করে। এতে অনেকে গুরুতর আহত হন। আহতরা হলেন- জামায়াত কর্মী শাহিন, পাচপোতা গ্রামের মো: সবুজ মিয়া, মো: মাসুদ, ইসলামপুরের সাইফুল, হেদায়াত, চাপাতলার আশিক। এ ছাড়াও ১৪ ডিসেম্বর সকালে শুকুরখোলা গ্রামের আবদুর রহমানকে তার নিজ বাসা থেকে বিনা ওয়ারেন্টে আটক করে পুলিশ।

বাগেরহাট-৪ আসনে গত ১৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত বিএনপি ও জামায়াতের প্রায় ১৫ নেতাকর্মীকে আটক করে পুলিশ। আটককেরা হলো- মো: মাকছুদুর রহমান, মো: নুরুজ্জামান, মোরেলগঞ্জর মো: আমীর হোসেন, ওবাইদুল, মো: ফিরোজ, শরণখোলার মাওলানা রফিকুল ইসলাম কবীর, আবু সালেহ মৃধা, আবদুস সবুর, সরোয়ার হোসেন বাদল ও ইসমাইল হোসেন। গত ৭ ডিসেম্বর শ্রমিক কল্যাণ জেলা সভাপতি জাকির হোসেন, ৬ ডিসেম্বর বাগেরহাট জেলা আমির মাওলানা রেজাউল করীম, ২ ডিসেম্বর বাড়িপাড়া কচুয়া গ্রামের বদিউজ্জামান, ও বাগেরহাট সদরের বনি আমীনকে আটক করে পুলিশ। এ ছাড়াও জাফর নামে এক কর্মীকে রামদা দিয়ে আঘাত করে আহত করেছে স্থানীয় আওয়ামী লীগ।

খুলনা-৫ আসনের অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ারের নির্বাচনী প্রচারণারত অবস্থায় ১৫ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় খুলনা জেলা উত্তরের আমির মাওলানা এমরান হুসাইনকে গ্রেফতার করে পুলিশ।
সাতক্ষীরা-২ আসনের সদর উপজেলার জামায়াতের তিনজন নেতাকর্মীকে আটক করেছে পুলিশ। আটকেরা হলো- মুকুন্দপুর আখড়াখোলার মাওলানা মো: রফিকুল ইসলাম, কামার বায়সার মাস্টার আবদুস সামাদ, হরিশপুর দাখিল মাদরাসার সুপার মাওলানা কাওছার আলী। তাদের প্রত্যেক কে নিজ বাসা হতে সদর থানা পুলিশ গ্রেফতার করেছে বলে জানা যায়।

কুমিল্লা-১১ আসনে গ্রেফতার ও আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড অব্যাহত রয়েছে। তারই অংশ হিসেবে যুবলীগ ও ছাত্রলীগ কর্মীরা চৌদ্দগ্রাম উপজেলার ২০ দলীয় জোট নেতা শাহ মো: মিজানুর রহমানের বাড়িতে ব্যাপক তল্লাশি চালায় এবং তার বাড়িতে বলে আসে মিজানুর রহমান যেন ৩০ তারিখের আগে বাড়িতে না আসে। এ ছাড়াও মুন্সিরহাট ইউনিয়নের লনিশ্বর গ্রামের ধানের শীষের কর্মী আবু মুসার বাড়িতে পুলিশ ছাত্রলীগ ও যুবলীগ হামলা ও ভাঙচুর করে। এবং আওয়ামী সন্ত্রাসীরা ১৪ ডিসেম্বর ৩০টি মোটরসাইকেল নিয়ে ডা: সৈয়দ আব্দুল্লাহ মো: তাহেরের গ্রামের বাড়িতে হামলা ও বেশ কয়েকটি ককটেল নিক্ষেপ করেছে বলে জানা যায়। চৌদ্দগ্রাম উপজেলার পৌরসভার নোয়াপাড়া গ্রামের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ইকবাল হোসেন কাজলসহ ২০ দলীয় জোটের সমর্থকদের বাড়িতে বাড়িতে রাতে পুলিশ ব্যাপক তল্লাশির নামে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে আতঙ্ক সৃষ্টি করে। ভোটের আগে যেন বাড়িতে না আসে হুমকি দিয়ে আসে। এ ছাড়াও প্রতিটি আসনে বিএনপি ও জামায়াত সমর্থকদের গ্রেফতারসহ বাড়ি বাড়ি তল্লাশি, নতুন মামলা, পোস্টার ছিঁড়ে ফেলা, হামলা ও হুমকি অব্যাহত রয়েছে বলে জানা যায়।

Comments

comments