ঠাকুরগাঁও ২: দবিরুলের দুর্নীতিতে ক্ষুব্ধ ভোটাররা, আব্দুল হাকিমের গণজোয়ার

ঠাকুরগাঁও: আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও ২ আসনটি নানা কারনে আলোচনায় উঠে এসেছে। ঠাকুরগাঁও জেলার বালিয়াডাঙ্গী, হরিপুর উপজেলা নিয়ে এই আসন গঠিত। সাথে রয়েছে রানীশংকৈল উপজেলার ২ টি ইউনিয়ন (ধর্মগড় ও কাশিপুর)।

আসনটিতে মোট ভোটার ২ লাখ ৭৩ হাজার ৪১৪ জন। এরমধ্যে পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৩৯ হাজার ২১ জন এবং নারী ভোটার ১ লাখ ৩৪ হাজার ৩৯৩ জন। সর্বশেষ নির্বাচনে এই আসনে ভোট কেন্দ্র ছিল ৯১ টি।

ঠাকুরগাঁও ২ আসনে আওয়ামী লীগের পক্ষে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন বর্তমান এমপি দবিরুল ইসলাম। তবে দবিরুল ইসলামের মনোনয়নে খুশি নয় এই আসনের স্থানীয় আওয়ামী নেতা-কর্মীরাই। তার দুর্নীতি, পরিবারতন্ত্র, সরকারি বরাদ্দ আত্মসাত, কৃষি ভর্তুকি তসরুফ, নিয়োগের নামে বাণিজ্য, বার্ধক্য, হিন্দু সম্প্রদায়ের জমি দখল, চাঁদাবাজি, নির্বাচনী এলাকায় নানা ধরনের অপকর্ম বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন কারণে দবিরুল ইসলামের বিকল্প প্রার্থী চাচ্ছিলেন স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা কর্মীরা।

ফলে এবারের নির্বাচনে অংশ নেওয়ার জন্য সম্ভাব্য কয়েকজন প্রার্থী কাজ করে আসছিলেন। তাদের মধ্যে অন্যতম কয়েকজন হলেন জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মোস্তাক আহমেদ টুলু, যিনি ডাকসুর সাবেক সদস্য। বালিয়াডাঙ্গী উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান প্রবীর কুমার রায়, যিনি গেজেটভুক্ত একজন মুক্তিযোদ্ধা এবং তার বাবা মুক্তিযুদ্ধে একজন বীর শহীদ। হরিপুর উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান, বঙ্গবন্ধু প্রজন্মলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক অধ্যক্ষ একেএম শামীম ফেরদৌস টগর।

অপরদিকে ২০ দলীয় জোটের পক্ষে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ঠাকুরগাঁও জেলা জামায়াতের আমির মাওলানা আব্দুল হাকিম । অবকাঠামো উন্নয়ন ও নাগরিক সুবিধা নিশ্চিতে দীর্ঘদিন ধরে এ এলাকায় জামায়াতে ইসলামীর কাজ চলছে। এই আসনে মাওলানা আব্দুল হাকিম বহু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন। হরিপুর ও বালিয়াডাঙ্গীর প্রত্যন্ত এলাকায় বহু মসজিদ, মাদ্রাসা ও অযুখানা নির্মান করেছেন। এমপি না হলেও বিগত জোট সরকারের সময় তার হাতেই মূলত এ আসনের প্রকৃত উন্নয়নের ছোয়া লাগে। বিভিন্ন স্কুল কলেজেস এমপিওভূক্ত করানো, উপজেলায় এ্যাম্বুলেন্স আনা, রাস্তাঘাট নির্মানসহ বিগত জোট সরকারের সময় পুরো এলাকা জুড়েই তিনি বহু সমাজ সেবামূলক কাজ করেছেন।

স্থানীয় বিএনপি-জামায়াতের নেতারা বলছেন, জোট যাকেই মনোনয়ন দিবে আমরা তার জন্যই কাজ করব। এই আসনে বিএনপি-জামায়াতসহ ২০ দলীয় জোটের শক্ত সাংগঠনিক অবস্থান রয়েছে। ফলে বিজয় নিশ্চিত করতে আগে থেকেই মাঠ গোছানো আছে।

স্থানীয় বিএমপি নেতা এ টি এম মাহবুবুর রহমান বলেন, এলাকাটিতে সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজদের দৌরাত্ম্য চলছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরে নেতা বলেন, প্রতিটা কাজের জন্যে দবিরুল ইসলামকে পরোক্ষ্যভাবে কমিশন দিতে হয়। এ জন্য এলাকার টেকসই উন্নয়নে একজন সৎ, যোগ্য ও নিষ্ঠাবান জনপ্রতিনিধি প্রয়োজন।

মাওলানা আব্দুল হাকিম জেল থেকে বার্তা প্রেরণ করেছেন, জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হলে এলাকার সার্বিক উন্নয়ন করা হবে। নাগরিক হিসেবে ধর্মীয় পার্থক্য কারো অধিকার খর্ব করে না, একই সাথে কোনো ধর্মের অনুসারীদের হস্তক্ষেপ কিংবা কোনো জোর-জুলুম করার অধিকার কোনো ধর্ম দেয়নি। এ জন্য সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও অন্যান্য ধর্মাবলম্বীর অধিকার নিশ্চিত করতে আমরা বদ্ধপরিকর। তিনি জনগণকে ধৈর্য ধারণের আহবান জানান।

ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি তৈমুর রহমান বলেন, ঠাকুরগাঁওয়ে যদি সুষ্ঠু একটা নির্বাচন দেয়া হয় তাহলে জেয়ার তিনটি আসনেই ২o দল ও ঐক্যফ্রন্টের সমর্থিত প্রার্থী অনেক ভোটে জয়ী হবে। এখানে দলের পক্ষ থেকে যাকে মনোনয়ন দেওয়া হবে তার পক্ষে কাজ করব আমরা। এবং দলের মহাসচিবের পক্ষ থেকে সবাইকে এরকম নির্দেশনাই দেয়া আছে।

দীর্ঘদিন থেকে দবিরুল ইসলাম এ আসনের এমপি হওয়ায় এলাকার উন্নয়নের কথা না ভেবে গড়ে তুলেছেন পারিবারতন্ত্র। দবিরুলের ভাই মোহাম্মদ আলী উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি। আরেক ভাই সফিকুল ইসলাম বালিয়াডাঙ্গী উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান, ছেলে মাজহারুল ইসলাম সুজন জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক। এ নিয়ে এলাকার স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের মাঝে রয়েছে প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য চাপা ক্ষোভ। এমপি দবিরুলের নানা অপকর্মের কারনে দল ও এলাকার মানুষ তার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। জেলা আওয়ামী লীগের সাথেও তার সম্পর্ক ভাল না। সাবেক পানিসম্পদ মন্ত্রী রমেশ চন্দ্র সেনের সাথে রয়েছে তার প্রকাশ্য দ্বন্দ্ব। ঠাকুরগাঁও জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি হলেও জেলায় সময় না দিয়ে তিনি বালিয়াডাঙ্গী নিয়ে পড়ে থাকেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। দীর্ঘকাল ক্ষমতায় থাকলেও তিনি ব্যক্তিগত কারণে উপলেলায় পৌরসভা গড়ে তুলেননি। যার ফলে বালিয়াডাঙ্গী, হরিপুর ও রানিশংকৈল উপজেলার শহর এলাকার মানুষজন সাধারণ নাগরিক সুযোগ সুবিধা থেকেও বঞ্চিত। উন্নয়নের ক্ষেত্রে বিমাতাসূলভ আচরণের কারণে হরিপুর ও রানিশংকৈল এলাকার মানুষও দবিরুলের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন।

বিভিন্ন জাতীয় ও স্থানীয় পত্রিকায় ও টেলিভিশনে এমপি দবিরুলের দুর্নীতির খবর প্রকাশিত হওয়ায় দবিরুল নমিনেশন পাবেন কিনা তা নিয়েও ছিল অনিশ্চয়তা। তাই এবারে দবিরুল তার পরিবারের ৫ সদস্যকে দিয়ে আওয়ামী লীগের নমিনেশন কেনায়। নিজ ছেলে মাজহারুল ইসলাম সুজনকে দিয়েই দিয়ে নিজের পরিবারতন্ত্র টিকিয়ে রাখতে চায়। এটিকে স্থানীয় আওয়ামী লীগের ত্যাগী নেতারা মোটেই ভাল ভাবে নিচ্ছে না। তাদের মাঝে রয়েছে চাপা ক্ষোভ।

সারা দেশে হিন্দু সম্প্রদায় নৌকায় ভোট দিলেও এ এলাকার হিন্দু ভাইয়েরা বলছেন ভিন্ন কথা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সতন্ত্র ধর্মের একজন জানান, বালিয়াডাঙ্গীর পাড়িয়া ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী রামনগর টি এস্টেট একশ’ একরেরও বেশি জমিতে বিস্তৃত। যার বেশির ভাগ সংখ্যালঘুদের বলে জানান স্থানীয় বাসিন্দারা। দবিরুল ইসলাম এসব জমি অল্প টাকায় জোর করে দখল করেছেন।

মাওলানা আবুল হাকিম জনগণের সুখে-দুঃখে পাশে দাড়িয়েছেন। বিগত বছরগুলোতে ঝড়-বৃষ্টি, শীত কিংবা প্রচন্ড গরম সবসময় আব্দুল হাকিম সাহেব ছুটে এসেছেন মানুষের ডাকে। অন্যদিকে মাওলানা আব্দুল হাকিম জেলে থাকায় এলাকার জনমানুষের কাছে মুখে মুখে ছড়িয়েছে যে এমপি দবিরুলই এর জন্য দায়ী। ইতিমধ্যেই মাওলানা আব্দুল হাকিম উত্তর বঙ্গের মজলুম জননেতা হিসেবেও ঘোষিত হয়েছেন। মাওলানা আব্দুল হাকিমের অনুপস্থিতিতে তার পক্ষে গণসংযোগ চালাচ্ছেন জামায়াত নেতা-কর্মীরা। এ সম্পর্কে বালিয়াডাঙ্গী উপজেলা আমীর অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম বলেন, আব্দুল হাকিম ভাইয়ের অনুপস্থিতিতে আমরা সকলে এক এক জন আব্দুল হাকিম হয়ে জনগণের মাঝে কাজ করছি, তাদের পাশে গিয়ে দাঁড়াচ্ছি। পরিবারের সদস্যরাও যাচ্ছেন জনে জনে। স্বজনদের কান্না ভোটারদের হৃদয়কে নাড়া দিচ্ছে।

এবারে ধানের শীষে নির্বাচন হওয়ায় বিএমপির নেতাকর্মীরাও অনেক উজ্জীবিত। স্থানীয় বিএনপি নেতা কর্মীরা এ নির্বাচনকে শৈরাচারের পতন ও খালেদা জিয়াকে মুক্ত করার নির্বাচন হিসাবে দেখছেন। মাওলানা আব্দুল হাকিমের সৎ ব্যক্তি ইমেজ কাজে লাগিয়ে দীর্ঘকাল আওয়ামী লীগের কব্জায় থাকা এ আসনটি উদ্ধারে ২০ দলীয় জোট বদ্ধ পরিকর।

Comments

comments