জামায়াত যেসব আসনে প্রতিদ্বন্দ্বীতা করছে… (তৃতীয় কিস্তি)

এগার.
ঝিনাইদহ-৩
কোর্ট চাঁদপুর ও মহেশপুর উপজেলা নিয়ে এই সংসদীয় আসনে জামায়াত প্রার্থী জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি অধ্যাপক মতিয়ার রহমান। এই আসনে বর্তমানে মোট ভোটার ৩,৬০,৮৭৯ জন।

২০০৮ সালের নির্বাচনে এখানে আওয়ামী লীগ প্রার্থী শফিকুল আজম খান ১,১৮,৩৬১ ভোট পেয়ে বিজয়ী হোন। জামায়াত প্রার্থী মতিউর রহমান ভোট পান ৮১,৭৩৯। এই আসনে ২০০৮ সালে বিএনপি, আওয়ামী লীগ ও জামায়াত ত্রিমুখী লড়াই হয়। এখানে বিএনপি প্রার্থী শহিদুল ইসলাম মাস্টার জামায়াত প্রার্থী অধ্যাপক মতিয়ার রহমানের চেয়ে অনেক কম ভোট পেয়ে তৃতীয় স্থান লাভ করে। জামায়াত ও বিএনপির যৌথ ভোট আওয়ামী লীগের চেয়ে অনেক বেশি।

কোর্টচাঁদপুর ও মহেশখালিতে জামায়াতের সাম্প্রতিক প্রভাব বুঝতে হলে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের দিকে নজর দিতে হবে। উভয় উপজেলায় জামায়াত এখন আওয়ামী লীগ ও বিএনপির চেয়ে অনেক এগিয়ে।

কোর্টচাঁদপুর উপজেলায় ২০১৪ সালের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে জামায়াত বিএনপি ও আওয়ামী লীগ উভয় দলের প্রার্থীকে পরাজিত করে উপজেলা চেয়ারম্যান, ভাইস-চেয়ারম্যান ও মহিলা ভাইস-চেয়ারম্যান পদে ফুল প্যানেলে বিজয় লাভ করে। উপজেলা চেয়ারম্যান পদে নির্বাচিত হয়েছিলেন তৎকালীন কোর্টচাঁদপুর থানা জামায়তের আমির মাওলানা তাজুল ইসলাম। উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান ও মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান পদে নির্বাচিত হয়েছিলেন যথাক্রমে জামায়াতের মোয়াবিয়া হোসাইন এবং নাজমা খাতুন।

অন্যদিকে ২০১৪ সালে মহেশপুর উপজেলাতেও চেয়ারম্যান পদে বিএনপি ও আওয়ামী লীগ উভয় দলের প্রার্থীকে পরাজিত করে বিজয়ী হোন জামায়াতের থানা আমির মাওলানা আব্দুল হাই। এই উপজেলায় ভাইস চেয়ারম্যান বিএনপির এ.এম. আব্দুল আহাদ এবং মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান মোছাঃ হাসিনা খাতুন জামায়াত সমর্থিত।

বলা হয়, এই আসন বিএনপি ও জামায়াতে দূর্গ। ২০০৮ সালের আগে এই আসনে বিএনপি-জামায়াতে ধারাবাহিক আধিপত্য বজায় ছিল।

বারো.
যশোর-২
চৌগাছা ও ঝিকরগাছা উপজেলা নিয়ে গঠিত এই সংসদীয় আসনে জামায়াতের প্রার্থী সাবেক এমপি মুহাদ্দিস আবু সাঈদ মুহাম্মাদ শাহাদাত হুসাইন। এই আসনে বর্তমানে মোট ভোটার ৪,০৫,৭৩৩ জন।

একজন ইউনিয়ন চেয়ারম্যান থেকে সংসদ সদস্য পদে বিজয়ী মুহাদ্দিস আবু সাঈদ মুহাম্মাদ শাহাদাত হুসাইন গণমানুষের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয়। ২০০১-২০০৬ সালে সংসদ সদস্য থাকা অবস্থায় সরকরি খরচে জাতিসংঘের অধিবেশনে গিয়েছিলেন। সেখান থেকে ফিরে তিনি প্রয়োজনীয় খরচের পর বেচে যাওয়া টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত দিয়ে তুমুল আলোড়ন তুলেছিলেন।

২০০৮ সালের সংসদ নির্বাচনে তিনি ১,৩৩,২৪৪ ভোট পেয়েও আওয়ামী লীগের মোস্তফা ফারুক মোহাম্মদ (১,৫৪,৮৭৫) এর কাছে ২১,৪৩১ ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হোন।

২০০১ সালের নির্বাচনে মুহাদ্দিস আবু সাঈদ ১,৩৭,৭১৭ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছিলেন। আওয়ামী লীগ প্রার্থী রফিকুল ইসলাম পেয়েছিলেন ১,২০,৮৯৯ ভোট।

তের.
বাগেরহাট-৩
জেলার রামপাল ও মোংলা উপজেলা নিয়ে গঠিত এই সংসদীয় আসনে জামায়াত প্রার্থী অ্যাডভোকেট শেখ আবদুল ওয়াদুদ। বর্তমানে এই সংসদীয় আসনে মোট ভোটার ২,২৬,২১৭ জন।

১৯৯১ সাল থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত প্রতিটি নির্বাচনে জামায়াত এখানে দ্বিতীয় স্থানে ছিল। ১৯৯১ সালে জামায়াত প্রার্থী গাজি আবু বকর সিদ্দিক ১১ হাজার ভোটের ব্যবধানে, ১৯৯৬ সালে ১৮ হাজার ভোটের ব্যবধানে এবং ২০০১ সালে ০৭ হাজার ভোটের ব্যবধানে বর্তমান খুলনা সিটি মেয়র তালুকদার আব্দুল খালেকের কাছে পরাজিত হোন। ২০০৮ সালে অ্যাডভোকেট শেখ আবদুল ওয়াদুদ আওয়ামী লীগ প্রার্থী হাবিবুন নাহার ( তালুকদার আব্দুল খালেকের স্ত্রী) ৩১ হাজার ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হোন।

চৌদ্দ.
বাগেরহাট-৪
মোড়েলগঞ্জ ও শরণখোলা উপজেলার সমন্বয়ে গঠিত এই সংসদীয় আসনে জামায়াত প্রার্থী অধ্যাপক আবদুল আলীম। এই আসনে মোট ভোটার ৩,০০,৫২২ জন।

২০০৮ সালে এখানে জামায়াত প্রার্থী অধ্যাপক শহিদুল ইসলাম ৭৮,৩২৭ পেয়ে আওয়ামী লীগ প্রার্থী মোজাম্মেল হোসেনের (১,১৬,৪৫৪) কাছে পরাজিত হোন।

২০০১ সালে জামায়াত প্রার্থী মুফতি আবদুল সাত্তার আকন ৮৩,৯৫০ ভোট পেয়ে আওয়ামী লীগ প্রার্থী ,মোজাম্মেল হোসেনকে (৮১,৯৭৯) পরাজিত করে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হোন।

১৯৯১ সালে মুফতি আবদুল সাত্তার আকন এককভাবে দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে এককভাবে ৫৫,১২৪ ভোট পেয়ে আওয়ামী লীগ প্রার্থী শেখ আবদুল আজিজকে (৫০,৪৬৭) পরাজিত করেন। \

পনেরো.
খুলনা-৫
ডুমুরিয়া ও ফুলতলা উপজেলা নিয়ে গঠিত এই সংসদীয় আসনে জামায়াত প্রার্থী কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির মজলুম জননেতা অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার। এই আসনে এখন মোট ভোটার ৩,৪৪,৪৮০ জন।

২০০৮ সালের নির্বাচনে অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার ১,০৫,৩১২ ভোট পেয়েও আওয়ামী লীগ প্রার্থী নারায়ণ চন্দ্র চন্দের (১,৪৪,৬০০) কাছে পরাজিত হোন।

২০০১ সালে তিনি ১,০৫,৭৪০ ভোট পেয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হোন। সে নির্বাচনে নারায়ণ চন্দ্র চন্দ পায় ১,০১,১৯২১ ভোট।

কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির হিসেবে এলাকায় তুমুল জনপ্রিয়। হিন্দু অধ্যুষিত এই এলাকায় হিন্দু ভাইদের সাথে তার সম্পর্ক বেশ ঘনিষ্ট।

২০১৪ সালে ডুমুরিয়া উপজেলা চেয়ারম্যান পদে নির্বাচিত হোন ২০ দল সমর্থিত প্রার্থী উপজেলা বিএনপি সভাপতি খান আলী মুনসুর। উপজেলা ভাইস-চেয়ারম্যান নির্বাচিত হোন ২০ দল সমর্থিত জামায়াত নেতা সিরাজুল ইসলাম এবং মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হোন ২০ দল সমর্থিত বিএনপি নেত্রী শিরিনা দোলত।

ফুলতলা উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান পদে নির্বাচিত হোন ২০ দল সমর্থিত উপজেলা জামায়াত আমীর অধ্যক্ষ গাউসুল আজম হাদী এবং মহিলা ভাইস-চেয়ারম্যান পদে নির্বাচিত হোন জামায়াত শামসুন নাহার কুমকুম।

ষোলো.
খুলনা-৬
খুলনা জেলার কয়রা ও পাইকগাছা উপজেলা নিয়ে গঠিত এই সংসদীয় আসনে জামায়াত প্রার্থী খুলনা মহানগরী জামায়াতের আমির কারাবন্দী মজলুম জননেতা মাওলানা আবুল কালাম আজাদ।

২০০৮ সালের নির্বাচনে এখানে জামায়াত প্রার্থী শাহ মোহাম্মাদ রুহুল কুদ্দুস ১,১৬,১৬১ ভোট পেয়েও পরাজিত হোন আওয়ামী লীগ প্রার্থী সোহরাব আলী সানার (১,৩১,১২১) কাছে।

২০০১ সালে এখানে শাহ মোহাম্মাদ রুহুল কুদ্দুস ১,২৭,৮৭৪ ভোট পেয়ে আওয়ামী লীগ প্রার্থী শেখ মো. নূরুল হক (৮৯,৩১২ ভোট) কে ৩৮,৫৬২ ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করেন।

১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগের শেখ মো. নূরুল হকের কাছে পরাজিত হলেও ১৯৯১ সালে শাহ মোহাম্মাদ রুহুল কুদ্দুস বিজয়ী হয়েছিলেন।

কয়রা উপজেলায় ২০১৪ সালের উপজেলা নির্বাচনে উপজেলা চেয়ারম্যান পদে বিজয়ী হোন ২০ দল সমর্থিত তৎকালীন জেলা আমির আবুল খায়ের মোহাম্মাদ তমিজউদ্দীন। ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হোন ২০ দল সমর্থিত বিএনপির উপজেলা সাধারণ সম্পাদক এ্যাড. আব্দুর রশিদ এবং মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান পদে ২০ দল সমর্থিত জামায়াতে ইসলামীর খালেদা আক্তার।

অন্যদিকে, পাইকগাছা উপজেলা চেয়ারম্যান ২০ দল সমর্থিত বিএনপি নেতা স. ম. বাবর আলী, ভাইস-চেয়ারম্যান জামায়াতের থানা আমির শেখ কামাল হোসেন এবং মহিলা ভাইচ চেয়ারম্যান জামায়াতের
শাহানারা খাতুন।

সতেরো.
সাতক্ষীরা-২
সাতক্ষীরা সদর আসন নিয়ে গঠিত এই সংসদীয় আসনে জামায়াতের প্রার্থী সাবেক জেলা আমির কারাবন্দী মজলুম নেতা মুহাদ্দিস আবদুল খালেক। সকল শ্রেণী-পেশার মানুষের কাছে জনপ্রিয় এই বর্ষিয়ান আলেমে দ্বীন ২০০১ সালেও সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলেন। এই আসনে মোট ভোটার ৩,৫৬,২৬৮ জন। একাদশ সংসদ নির্বাচনে এই আসনে ইভিএম-এ ভোট গ্রহণ করা হবে।

২০০৮ সালে এই আসনে জামায়াত প্রার্থী মাওলানা আবদুল খালেক মণ্ডল ১,১৪,৫৫৮ ভোট পেয়ে পরাজিত হয়েছিলেন। মহাজোটের প্রার্থী জাতীয় পার্টির এম এ জব্বার পেয়েছিলেন ১,৩৩,৪২২ ভোট।

২০০১ সালে নির্বাচনে আবদুল খালেক মন্ডল ১,২৪,২০৬ ভোট পেয়ে আওয়ামী লীগ প্রার্থী নজরুল ইসলাম (৬৯,৮৬১১) কে ৫৪৩৪৫ ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করেন।

১৯৯৬ সালে এই নির্বাচনে কাজি শামসুর রহমান জাতীয় পার্টির প্রার্থী সৈয়দা রাজিয়া ফয়েজকে পরাজিত করেন। ১৯৯৬ জামায়াত মাত্র তিনটি আসনে বিজয়ী হয়। এই তিন আসনের মধ্যে সাতক্ষীরা ০২ আসনটিও ছিল।

১৯৯১ সালে জামায়াত প্রার্থী কাজি শামসুর রহমান আওয়ামী লীগ প্রার্থী এএফএম এন্তাজ আলীকে ১৫ হাজার ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করেন।

আঠারো.
সাতক্ষীরা-৪
শ্যামনগর উপজেলা এবং কালিগঞ্জ উপজেলা (চম্পাফুল, তাড়াশিমলা, তারালী ও নলতা ইউনিয়ন ব্যতিত) নিয়ে সাতক্ষীরা-০৪ সংসদীয় আসনে জামায়াত প্রার্থী গাজী নজরুল ইসলাম।

২০০৮ সালের নির্বাচনে এখানে জামায়াত প্রার্থী গাজী নজরুল ইসলাম ১,১৭,৮০৫ ভোট পেয়ে মহাজোটের জাতীয় পার্টির প্রার্থী এইচ এম গোলাম রেজার (১,৫১,১৪৬) কাছে পরাজিত হোন।

২০০১ সালে গাজী নজরুল ইসলাম এই আসনে ভোট ৮৪,৬১৩ পেয়ে আওয়ামী লীগ প্রার্থী প্রিন্সিপাল আব্দুল হক (৫৬,৫৬৪) কে ২৮,০৪৯ ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হয়েছিলেন।

১৯৯১ সালে এই আসনে জামায়াত প্রার্থী গাজী নজরুল ইসলাম ৪৫,৭৭৬ ভোট পেয়ে আওয়ামী লীগ প্রার্থী ফজলুল হককে (৩৭,৩০৩) পরাজিত করেছিলেন।

Comments

comments