এক ঘণ্টায় মৃত্যু ৫

দেশে কিডনি রোগের প্রকোপ যেমন ব্যাপকহারে বাড়ছে, অতিরিক্ত চিকিৎসা ব্যয়ের কারণে অধিকাংশ কিডনি বিকল রোগী প্রায় বিনা চিকিৎসায় মৃত্যুবরণ করছেন। দেশে প্রতি ঘণ্টায় পাঁচজন কিডনি রোগে মারা যাচ্ছেন বলে জানিয়েছেন স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা কিডনি অ্যাওয়ারনেস মনিটরিং অ্যান্ড প্রিভেনশন সোসাইটি (ক্যাম্পস)।

সংস্থাটির তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশে ২ কোটিরও বেশি লোক কোনো না কোনো কিডনি রোগে আক্রান্ত। কিডনি বিকল হয়ে গেলে বেঁচে থাকার উপায় কিডনি সংস্থাপন অথবা ডায়ালাইসিস। ব্যয়বহুল হওয়ায় অধিকাংশ কিডনি রোগী এ চিকিৎসা নিতে ব্যর্থ হচ্ছেন। এ ছাড়া রোগী অনুপাতে হাসপাতাল কম হওয়ায় রোগীরা ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। সঠিক চিকিৎসাও পাচ্ছেন না। ফলে কিডনি রোগীর বড় অংশ মারা যাচ্ছেন বিনা চিকিৎসায়।

রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে কিডনি চিকিৎসার জন্য রয়েছে সরকারি হাসপাতাল ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব কিডনি ডিজিজেস অ্যান্ড ইউরোলজি। গতকাল হাসপাতালটিতে সরেজমিন ঘুরে অবকাঠামো ও স্টাফ অনুপাতে বাড়তি রোগীর চাপে তাদের ভোগান্তি চোখে পড়েছে। সিট না পাওয়ায় অনেক রোগীকে বারান্দায় শুয়ে থাকতে দেখা গেছে। রোগীদের অভিযোগ, ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থেকেও ডাক্তার পাচ্ছেন না, দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও সঠিক সময়ে সেবা পাচ্ছেন না। কেউ চার-পাঁচ দিন ঘুরেও সিট পাচ্ছেন না। কেউ সিট পেলেও চার-পাঁচ দিন পর অসুস্থ থাকা সত্ত্বেও সিট ছেড়ে দিতে বাধ্য হচ্ছেন।

পাঁচ দিন থেকে হাসপাতাল ছেড়ে চলে যাচ্ছেন ঝিনাইদহ থেকে আসা কিডনি রোগী শামীম (২৬)। হাসপাতালের গেটে কথা হয় তার সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘ডাক্তার বলেছে কিডনি পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেছে। এখন বাঁচতে হলে নতুন কিডনি লাগাতে হবে, নইলে প্রতি সপ্তাহে ডায়ালাইসিস করাতে হবে।’ শামীম বলেন, আমি আরও থাকতে চেয়েছি। কিন্ত উনারা রাখছেন না।

ফরিদপুর থেকে আবুল মিয়া চার-পাঁচ দিন ধরে ধরনা দিলেও ভর্তি নেয়নি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। পরে প্রভাবশালী এক আত্মীয়র ফোনে গতকাল তাকে ভর্তি নিলেও সময় বেঁধে দিয়েছে পাঁচ দিন। আবুল মিয়ার সঙ্গে থাকা জহির মিয়া জানান, রোগীর খুব খারাপ অবস্থা। এত কম সময়ে রোগী সুস্থ হবে না।

দ্বীপ জেলা ভোলা থেকে সাত বছরের ছেলে শাওনের কিডনি চিকিৎসার জন্য ঢাকায় কিডনি হাসপাতালে এসেছেন পান্না বেগম। তিনি জানান, এক মাস ধরে ঘুরে ছেলেকে ভর্তি করাতে পেরেছেন তিনি। বেশ কয়েকদিন ধরে হাসপাতালে ভর্তি থাকলেও এখনো বুঝতে পারছেন না ছেলের রোগ কোন পর্যায়ে আছে।

নরসিংদী থেকে কিডনির চিকিৎসার জন্য এসেছেন ইসহাক (৩৮)। তিনি দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলেন ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী, বিভিন্ন টেস্টের টাকা জমা দেওয়ার জন্য। তিনি জানান, দুই ঘণ্টা ধরে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকলেও লাইন নড়ছে না। তারা সময় বেঁধে দিয়েছে সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১২টা। এ সময়ের মধ্যে লাইনে অপেক্ষারত সবাই টাকা জমা দিতে পারছে না।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব কিডনি ডিজিজেস অ্যান্ড ইউরোলজির পরিচালক অধ্যাপক ডা. নুরুল হুদা বলেন, ‘কিডনি রোগীর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। খুব আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। আগে ডায়াবেটিস ও হাইপ্রেসারের কারণে ধনীদের কিডনি রোগ হতো। এখন দেখা যাচ্ছে, গ্রামের অনেক দরিদ্র মানুষরাও কিডনি রোগে আক্রান্ত হচ্ছে।’

অভিযোগের সত্যতা স্বীকার করে তিনি বলেন, ‘যে হারে রোগী বাড়ছে, সে হারে অবকাঠামো ও জনবল নেই। বাংলাদেশে দুই কোটি কিডনি রোগীর জন্য হাসপাতাল কিংবা চিকিৎসক খুবই অপ্রতুল।’ ডা. নুরুল হুদা বলেন, ‘রোগীদের তো দীর্ঘ লাইন হবেই। এখানে ১৫০ বেডের বিপরীতে প্রতিদিন সাড়ে ৬০০ রোগী দেখতে হয়। এ সংখ্যা ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। কোনো রোগী ফিরে যাচ্ছে না।’

কিডনি ফাউন্ডেশন হাসপাতাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি অধ্যাপক ডা. হারুন অর রশিদ বলেন, ‘কিডনি রোগ নিয়ে মানুষের মাঝে অসংখ্য ভুল ধারণা রয়েছে। অনেকে মনে করে, কিডনি রোগ মানে কিডনি শেষ। শরীরে একটু পানি এসেছে, ধরে নেয় কিডনি রোগ হয়ে গেছে। তারা খাওয়া-দাওয়া বন্ধ করে দেয়। এমন অনেক ভুল ধারণা প্রচলিত আছে। ভুল ধারণা সাধারণত মানুষের সচেতনতার অভাবে হয়।’

কিডনি রোগ-প্রতিরোধে করণীয় সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘শিশু যেন ফাস্টফুড খাবার না খায়, মোটা যাতে না হয়, সেদিকে মায়েদের খেয়াল রাখতে হবে। শরীরে কোনোভাবে চর্বি বাড়ানো যাবে না। ৪০-৫০ বছরের পর থেকে আপনাকে চিনি খাওয়া ছেড়ে দিতে হবে। লবণ কম খেতে হবে। তেল খাওয়া কমিয়ে আনতে হবে। প্রতিদিন ৩০-৪০ মিনিট হাঁটাহাঁটির অভ্যাস রাখতে হবে। প্রতিদিন ৬-৭ ঘণ্টা ঘুমাতে হবে। ভাত খাওয়া কমিয়ে অন্য খাবারের ওপর নজর দিতে হবে।
ফলমূল শাকসবজি বেশি বেশি খেতে হবে। এতে শরীর সুস্থ থাকবে, স্বাভাবিক থাকবে। ডায়াবেটিস হবে না, হাইপ্রেসার হবে না, কিডনিও ভালো থাকবে।’

বাংলাদেশ রেনাল অ্যাসোসিয়েশনের তথ্যমতে, সারা পৃথিবীতে বর্তমানে ৮৫০ মিলিয়ন মানুষ কিডনি রোগে আক্রান্ত। প্রতিবছর ২ দশমিক ৪ মিলিয়ন মানুষ দীর্ঘমেয়াদি কিডনি রোগে আক্রান্ত ও ১ দশমিক ৭ মিলিয়ন মানুষ কিডনি রোগে মারা যায়। প্রসঙ্গত, আজ ১৪ মার্চ সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও বিশ্ব কিডনি দিবস পালিত হবে। এবারের প্রতিপাদ্য বিষয় ‘সুস্থ কিডনি, সবার জন্য, সর্বত্র’।

Comments

comments