সংশয়ই সত্যি হলো!

দীর্ঘ ২৮ বছরের বহুল কাঙ্ক্ষিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ও হল সংসদ নির্বাচনে ভোট সুষ্ঠু না হওয়ার আশঙ্কা বাস্তবে রূপ নিল। সিংহভাগ ছাত্র সংগঠনের দাবি উপেক্ষা করে হলে ভোটকেন্দ্র করাই কাল হলো বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের। বাংলাদেশ-কুয়েত মৈত্রী হল, রোকেয়া হল, সলিমুল্লাহ মুসলিম হল, মুহসীন হলসহ অধিকাংশ হলেই অনিয়মের অভিযোগ মিলেছে। যার ফলশ্রুতিতেই ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার নির্ধারিত সময়ের ঘণ্টা দেড়েক আগেই ‘ঘৃণা’র সঙ্গে ভোট প্রত্যাখ্যান করেছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন ছাত্রলীগ ছাড়া সব প্যানেল।

সকাল ৮টায় ভোটগ্রহণ শুরু হলেও হলগুলোতে তার আগে থেকেই ভোটারের লম্বা লাইন দেখা যায়। দিনের শুরুতেই সলিমুল্লাহ মুসলিম হলে গিয়ে দেখা মেলে গেট পেরিয়ে রাস্তা অবধি এ লাইনের। ভোট দিয়ে বের হওয়া শিক্ষার্থীদের উৎফুল্ল দেখা যায়। তবে ছাত্রলীগ নেতারা ‘ফাউ’ দাঁড়িয়ে লম্বা লাইন তৈরি করে রেখেছে বলে অভিযোগ করেন এক স্বতন্ত্র প্রার্থী। হল থেকে বের হয়ে তিনি বলেন, ‘ভাই, ছাত্রলীগ ফাউ জ্যাম লাগায়ে রাখছে। প্রশাসনের কেউ এসে বললে অল্প সময় অন্যদের ভোট দিতে সুযোগ দিচ্ছে, এরপরই আবার তারা নিজেরা এমনিতেই দাঁড়ায়ে থাকতেছে।’ ঘণ্টা না পেরুতেই খবর আসে বাংলাদেশ-কুয়েত মৈত্রী হলে বস্তাভর্তি সিল মারা ব্যালট। সরজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সিল মারা ব্যালট নিয়ে বিক্ষোভ করছে সাধারণ শিক্ষার্থীরা। শিক্ষার্থীদের উদ্ধার করা ব্যালটে ছাত্রলীগের প্যানেলের প্রার্থীদের নামে সিল মারা দেখা যায়। বিক্ষোভরত শিক্ষার্থীরা ‘ভোট চুরির জবাব চাই’ স্লোগান দিয়ে পুনরায় নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবি জানান। বিক্ষোভের মধ্যেই খবর আসে মুহসীন হলে ভোট দিতে পারছে না সাধারণ শিক্ষার্থীরা।

সীল মারা ব্যালট পেপার

বাংলাদেশ-কুয়েত মৈত্রী হল ছেড়ে মুহসীন হলে গিয়ে দেখা মেলে দীর্ঘলাইনের। ভিড় ঠেলে মূল ভোটকেন্দ্রের সামনে গিয়ে ১৫ মিনিট দাঁড়ানোর পরও ভোট দিতে প্রবেশ করা ভোটারদের বের হওয়ার দৃশ্য দেখা যায়নি। এর মধ্যেই নিজ প্যানেলের প্রার্থীদের নিয়ে এ হলে আসেন প্রগতিশীল ছাত্রঐক্যের ভিপি প্রার্থী লিটন নন্দী। ভেতরের ভোটার কারা দেখতে চাইলে হট্টগোল শুরু করে গেটে দাঁড়ানো শিক্ষার্থীরা। তাদের সবার গলায় ছাত্রলীগের প্যানেলের কার্ড ঝুলিয়ে রাখতে দেখা যায়। হলের পেছন দিক দিয়ে প্রগতিশীল ছাত্রঐক্যের প্রার্থীরা ভেতরে ঢুকলে শুরু হয় চরম হট্টগোল। এ সময় ছাত্রলীগ নেতাদের তোপের মুখে পড়েন লিটন নন্দীরা। পরে দায়িত্বরত শিক্ষকদের হস্তক্ষেপে স্থান ত্যাগ করেন প্রার্থীরা।

বেলা সোয়া ১১টার দিকে হল প্রাধ্যক্ষকে সরিয়ে পুনরায় ভোট শুরু হয় বন্ধ হয়ে থাকা বাংলাদেশ-কুয়েত মৈত্রী হলে। এরপর একে একে বিভিন্ন হলের অনিয়মের অভিযোগ আসতে থাকে। রোকেয়া হলে তিন বাক্স ব্যালট আলাদা করে রাখার অভিযোগ আসে। তবে তখন পর্যন্ত এর সত্যতা মেলেনি।

এরপরে সূর্যসেন হলেও দেখা মেলে একই দৃশ্যের। লম্বা লাইন থাকলেও শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করেন কৃত্রিম এ ভোটার লাইন সৃষ্টি করা হয়েছে। সুফিয়া কামাল হলে গিয়েও দেখা যায় মূল রাস্তায় দীর্ঘলাইন। লাইনে অপেক্ষমাণ এক শিক্ষার্থী জানান, প্রায় দেড় ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকেও তিনি হলের গেটে প্রবেশ করতে পারেননি। এর মধ্যে এ হলে আসেন ছাত্রদল মনোনীত প্রার্থীরা। ছাত্রদলের ভিপি প্রার্থী মোস্তাফিজুর রহমান এ প্রতিবেদকের কাছে অভিযোগ করেন, ভেতরে ভোটগ্রহণ বন্ধ রেখে এ কৃত্রিম ভোটারদের লাইন তৈরি করে রাখা হয়েছে। এ অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে ভোটকেন্দ্রের ভেতরে ঢুকতে চাইলে মেয়েদের নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে ঢুকতে দিতে রাজি হননি দায়িত্বপ্রাপ্তরা।

এর মধ্যেই খবর আসে রোকেয়া হলে তিন বাক্স ভর্তি ব্যালট উদ্ধারের। সরজমিনে গিয়ে দেখা মেলে ছাত্রলীগের ভিপি প্রার্থী রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন, জিএস প্রার্থী গোলাম রাব্বানীসহ প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী অধিকাংশ ভিপি-জিএস প্রার্থীর। রোকেয়া হলের ছাত্রীরা অভিযোগ করেন, হলে মোট ৯টি বাক্সে ভোটগ্রহণ হওয়ার কথা থাকলেও ভোট গ্রহণ শুরু হওয়ার সময় ছয়টি ব্যালট বাক্স দেখানো হয়। এ নিয়ে সন্দেহের মধ্যেই তারা দেখতে পান পাশের একটি কক্ষে ওই তিনটি ব্যালট বাক্স রাখা হয়েছে। এসময় হলের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিয়ে ওই কক্ষে যান তিন ভিপি প্রার্থী লিটন নন্দী, নুরুল হক নুরু, অরণি সেমন্তি খানসহ অন্য প্রার্থীরা। সেখানেই কথা কাটাকাটির মধ্যে ছাত্রলীগের নারী কর্মীদের হাতে আহত হন বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের ভিপি প্রার্থী নুরু এবং স্বতন্ত্র জোটের ভিপি প্রার্থী অরণি সেমন্তি খান। হামলায় তাৎক্ষণিক জ্ঞান হারালে নুরুকে সরিয়ে নিয়ে চিকিৎসা দেন অন্যরা।

এর মধ্যেই বেলা ৩টা পর্যন্ত রোকেয়া হলে ভোট স্থগিতের ঘোষণা দেন চিফ রিটার্নিং কর্মকর্তা এস এম মাহফুজুর রহমান। তবে এ ঘোষণার মধ্যেই শিক্ষার্থীরা মিছিলসহকারে হল থেকে বেরিয়ে আসেন। তারা ‘ভুয়া, ভুয়া’ বলে স্লোগান দিতে থাকেন। এর পরই মধুর ক্যান্টিনে নির্বাচন বয়কট এবং ছাত্র ধর্মঘটের ঘোষণা আসে প্রগতিশীল ছাত্রঐক্য, সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ, স্বাধিকার স্বতন্ত্র পরিষদ, স্বতন্ত্র পরিষদ এবং ছাত্র ফেডারেশনের। এর পরই নির্বাচন বয়কটের ঘোষণা আসে ছাত্রদলের পক্ষ থেকে। একে একে ছাত্রলীগ ছাড়া সব সংগঠন এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীরাই ভোট বর্জনের ঘোষণা দেন।

মধুর ক্যান্টিনের সংবাদ সম্মেলন শেষে চার প্যানেল এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীরা একত্রে বিক্ষোভ শুরু করেন। রাজু ভাস্কর্য থেকে শুরু করে ভিসি চত্বর হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে ভিসির বাসভবনের সামনে অবস্থান নেন তারা। এসময় ছাত্রদল নেতারাও সেখানে উপস্থিত হয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন।

মূলত এ সময় থেকেই ফাঁকা হতে থাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস। সকাল থেকে হলের বাইরে থাকা শিক্ষার্থীরা আসা শুরু করলেও নির্বাচন বয়কটের ঘোষণায় ভোট না দিয়েই ক্যাম্পাস ছাড়েন অনেকেই। মিরপুর ১০ নম্বর থেকে আসা এক নারী শিক্ষার্থী খোলা কাগজকে বলেন, ‘এই পরিস্থিতিতে ক্যাম্পাসে থাকা নিরাপদ মনে করছি না। এর জন্যই ভোট না দিয়েই চলে যাচ্ছি।’

Comments

comments