খেলাপি ঋণ ১৯৬০৮ কোটি টাকা বেড়েছে

  • দুর্নীতির মাধ্যমে দেয়া ঋণ খেলাপি হচ্ছে -খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ
  • এটা ব্যাংকিং খাতের জন্য অ্যালার্মিং -সৈয়দ মাহবুবুর রহমান
  • এক বছরের ব্যবধানে দেশে খেলাপি ঋণ বাড়ে ১৯ হাজার ৬০৮ কোটি টাকা-বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন

ঋণ দিয়ে বিপাকে পড়ে গেছে ব্যাংকগুলো। বড় ঋণগুলো আদায় হচ্ছে না। অনেকে আদালতের স্থগিতাদেশ নিয়ে ঋণখেলাপি থেকে নিজেকে বিরত রাখার সুযোগ পাচ্ছেন।

এতে গ্রাহক সুবিধাজনক অবস্থানে থাকলেও ব্যাংকগুলোর খারাপ সম্পদের পরিমাণ প্রতিনিয়ত বাড়ছে। বেড়ে যাচ্ছে খেলাপি ঋণ। ২০১৮ সালের ডিসেম্বর শেষে দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ৯৩ হাজার ৯১১ কোটি ৪০ লাখ টাকা। যা ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে ছিল ৭৪ হাজার ৩০৩ কোটি ১১ লাখ টাকা।

সে হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে দেশে খেলাপি ঋণ বাড়ে ১৯ হাজার ৬০৮ কোটি টাকা। তবে গত সেপ্টেম্বরে প্রান্তিকের তুলনায় খেলাপি ঋণ কিছুটা কমেছে। এটি হল বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত তথ্য।

এর বাইরে ঋণ অবলোপন, বারবার ঋণ পুনঃতফসিল এবং ঋণ পুনর্গঠনের হিসাব মেলালে প্রকৃত খেলাপি ঋণ আরও অনেক বেশি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিভিন্ন সময় দুর্নীতির মাধ্যমে দেয়া ঋণ এখন খেলাপি হচ্ছে। এ ছাড়া পুনর্গঠিত ঋণের একটি অংশ খেলাপি হয়ে পড়েছে। ফলে ধীরে ধীরে খেলাপি ঋণ বাড়ছে। দুর্নীতি বন্ধ করতে হলে সবার আগে সরকারের সদিচ্ছা প্রয়োজন। তা না হলে এটি বন্ধ হবে না।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ যুগান্তরকে বলেন, গত ৭-৮ বছর ধরে সরকারি ব্যাংকগুলোতে দুর্নীতির মাধ্যমে খারাপ ঋণ দেয়া হয়েছে।

এতদিন এসব ঋণকে বারবার রিসিডিউল করে গোপন রাখা হয়েছে। এখন আর পারছে না, তাই খেলাপি হিসাবে প্রকাশ করছে। শুধু সরকারি ব্যাংক নয়, বেসরকারি কিছু কিছু ব্যাংকেও একইভাবে ঋণ দেয়া হয়েছে। ফলে বাড়ছে খেলাপি ঋণ। মূলত সরকারের সদিচ্ছা ছাড়া এ দুর্নীতি বন্ধ হবে না। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকও বেশির ভাগ ক্ষেত্রে নীরব। কেন এমন হচ্ছে বুঝতে পারছি না।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ডিসেম্বর শেষে দেশের ব্যাংক খাতের ঋণ বিতরণ করা হয় ৯ লাখ ১১ হাজার ৪৩০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ১০ দশমিক ৩০ শতাংশই খেলাপি।

প্রতিবেদনে দেখা যায়, ডিসেম্বর শেষে সরকারি খাতের ৬ ব্যাংকের ১ লাখ ৬২ হাজার ৫২১ কোটি টাকা ঋণের ৪৮ হাজার ৬৯৬ কোটি টাকা খেলাপি। গড়ে ব্যাংকগুলোর ২৯ দশমিক ৯৬ শতাংশ ঋণই খেলাপি হয়ে গেছে।

বেসরকারি খাতের দেশি ব্যাংকগুলোর ঋণের পরিমাণ ৬ লাখ ৮৮ হাজার ৯৩৮ কোটি টাকা এবং এর ৩৮ হাজার ১৪০ কোটি টাকা খেলাপি। যা মোট ঋণের ৫ দশমিক ৫৪ শতাংশ। ব্যাংক-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বেসরকারি ব্যাংকগুলোর পরিচালকরা নিজেদের মধ্যে ঋণ আদান-প্রদান করছেন। যে উদ্দেশ্যে এসব ঋণ নেয়া হচ্ছে, তার যথাযথ ব্যবহার হচ্ছে না। ঋণের অর্থ পাচারও হচ্ছে।

এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছেন ব্যাংকের কিছু জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাও। ফলে খেলাপি ঋণের ভয়াবহতা প্রকাশ পাচ্ছে। অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান সৈয়দ মাহবুবুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, বড় যেসব ঋণ পুনর্গঠন করা হয়েছিল, তার কয়েকটি খেলাপি হয়ে পড়েছে। এ কারণে খেলাপি কিছুটা বেড়েছে। আদালতের আদেশে অনেকে খেলাপি থেকে বিরত থাকছেন, কিন্তু ব্যাংকের খারাপ সম্পদের পরিমাণ তো বাড়ছেই।

এটা ব্যাংকিং খাতের জন্য অ্যালার্মিং। বিদেশি ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ ডিসেম্বর শেষে হয়েছে ২ হাজার ২৮৮ কোটি টাকা। ব্যাংকগুলোর ৬ দশমিক ৪৭ শতাংশ ঋণ খেলাপি। এসব ব্যাংক ঋণ দেয় ৩৫ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা। বিশেষায়িত বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক ও রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৪ হাজার ৭৮৮ কোটি টাকা। ব্যাংকগুলোর ১৯ দশমিক ৪৬ শতাংশ ঋণই খেলাপি। এসব ব্যাংক ঋণ দিয়েছিল ২৪ হাজার ৬০২ কোটি টাকা।

Comments

comments