জাহালমদের জীবনের কি কোনো মূল্য নেই?

বাম থেকে শেখ আবেদ আলী,বাদল ফরাজি,জাহালম,বাবুল আক্তার।

জাহালম বিনা দোষে তিন বছর কারাভোগ করেছেন। এ তাঁর চরম দুর্ভাগ্য। বাস্তবে জাহালমের মতো এমন আরও অনেকে আছেন, যাঁরা তাঁর চেয়েও অনেক বেশি বছর কারাগারে আটকে ছিলেন। অনেকে বিনা দোষে বছরের পর বছর জেল খেটেছেন বা খাটছেন। এই জেল খাটার মেয়াদ কারও কারও ক্ষেত্রে দুই যুগ পার হয়েছে। কেউ মারা গেছেন জেলখানাতেই। কেউ কেউ জেল থেকে বের হয়ে দেখেছেন, অপেক্ষায় থাকা প্রিয়তমা স্ত্রী অথবা মা-বাবা আর নেই। সেদিক থেকে বিবেচনা করলে মনে হতে পারে, সদ্য কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়া জাহালম কি তবে ভাগ্যবান?

মৃত্যুদণ্ডের পরোয়ানা মাথায় নিয়ে ১৩ বছর কারাগারে থাকা বৃদ্ধ শেখ আবেদ আলী (৬৫) ২০১৮ সালের ৭ অক্টোবর সকালে মারা যান খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্রিজন সেলে। অথচ ওই দিন বিকেলেই সাতক্ষীরার আবেদ আলীর খালাসের রায়ের কপি কারাগারে পৌঁছেছিল। ওই দিন আবেদ আলীর মেয়ে নাজমা সুলতানা বাবাকে বাড়ি নেওয়ার জন্য ইজিবাইক ভাড়া করে রেখেছিলেন। পরে বাবার ঠান্ডা নিথর মরদেহ নিয়ে বাড়ি ফেরেন মেয়ে।

পুলিশের অভিযোগ ছিল, আবেদ আলী ২০০৩ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি ইটাগাছা পুলিশ ফাঁড়ির দুই সদস্যকে ছুরিকাঘাতে হত্যার সঙ্গে জড়িত। ওই মামলায় ২০০৬ সালে আবেদ আলীসহ তিনজনের মৃত্যুদণ্ডের রায় দেন নিম্ন আদালত। এই রায়ের পর আপিল করলে ২০১১ সালের ১১ ডিসেম্বর হাইকোর্ট নিম্ন আদালতের রায় বাতিল করে আবেদ আলীকে খালাস দেন। কিন্তু চার বছর ধরে চলে রাষ্ট্রপক্ষের আপিল শুনানি। এরপর গত বছরের ১১ এপ্রিল আপিল বিভাগ খালাসের রায় বহাল রাখেন। তবে আবেদ আলীর দুর্ভাগ্য, মামলা থেকে রেহাই পেলেও রায়ের কপি জেলা কারাগারে পৌঁছায়নি। এই রায়ের পরও তাঁকে ছয় মাসের বেশি সময় কনডেম সেলে কাটাতে হয়েছিল। এরপর জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সহায়তায় পরিবার যখন সেই রায়ের কপি নিয়ে খুলনা মেডিকেল কলেজের প্রিজন সেলে যান, ততক্ষণে তিনি ক্যানসারের সঙ্গে যুদ্ধে হেরে না–ফেরার দেশে চলে গেছেন।

বাড়ি ফেরা পর্যন্ত বেঁচে থাকতে চেয়েছিলেন আবেদ আলী। তা হয়নি। তবে মৃত আবেদ আলীর এতটুকুই পাওয়া, তাঁর কবরকে সাতক্ষীরার কুকরালির বাসিন্দারা অন্ততপক্ষে খুনির কবর বলছে না। শেখ আবিদ আলীর স্ত্রী আম্বিয়া খাতুন খুনির স্ত্রী উপাধি পাওয়া থেকে রেহাই পেয়েছেন।

২০১৭ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি। গণমাধ্যমে অনেক শিরোনামের মধ্যে একটি শিরোনাম ছিল ‘অবশেষে ২৫ বছর পর মুক্তি পেলেন তিনি’। এই তিনি হলেন, বাবুল মিয়া, যাঁর বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুর উপজেলার দরিয়াদৌলত ইউনিয়নের বাখরনগরে। এই বাবুল মিয়াও বিনা বিচারে ২৫ বছর কারাগারে ছিলেন। অথচ তাঁর বিরুদ্ধে যে মামলা হয়েছিল, সেই মামলায় তিনি দোষী সাব্যস্ত হলে সর্বোচ্চ শাস্তি হতো ১০ বছরের কারাদণ্ড।

১৯৯২ সালে গ্রেপ্তারের সময় বাবুল মিয়া ছিলেন ১৮ বছরের টগবগে তরুণ। আর মুক্তির সময় বয়স এসে ঠেকে ৪৩-এ। কারাগারে থাকা অবস্থায়ই ১৯৯৫ সালে তাঁর বাবা বিমানবাহিনীর সদস্য আনোয়ার হোসেন ও মা নিলুফা বেগম সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান। বাবুল মিয়ার সাত ভাই ও দুই বোন জন্মভিটা ছাড়েন বা ছাড়তে বাধ্য হন।

কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার পর বাবুল মিয়া গণমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন, ১৯৯২ সালের ২১ আগস্ট রাত আটটায় ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে ফেরার পথে তাঁদের বাসে ডাকাতি হয়। চালকের সহকারী সন্দেহে ডাকাতি মামলায় তাঁকে ফাঁসানো হয়। পুলিশও তদন্ত করে তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেয়। ১৯৯৩ সালের ৪ জুলাই ওই মামলার বিচারকাজ শুরু হয়। এই ২৫ বছরে মামলার ১১ সাক্ষীর মধ্যে আদালতে মাত্র চারজন সাক্ষ্য দেন। মামলার বাদী ও তদন্ত কর্মকর্তা কখনোই আদালতে হাজির হননি। সে সময় সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক গণমাধ্যমে বলেছিলেন, ২৫ বছর জেলে রাখায় বাবুলের প্রতি যে অবহেলা হয়েছে, তার জন্য রাষ্ট্রের উচিত বাবুলের প্রতিটি নষ্ট বছরের জন্য দুই লাখ করে মোট ৫০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়া। জাহালমের বেলায়ও ক্ষতিপূরণের দাবি তোলা হচ্ছে।

পুরান ঢাকার সিপন এক হত্যা মামলায় বিনা বিচারে জেল খাটেন টানা ১৬ বছর। ২০১৭ সালের মে মাসে তাঁর মুক্তি মেলে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, ১৯৯৪ সালের অক্টোবর মাসে পুরান ঢাকার সূত্রাপুরে দুই মহল্লার মারামারিতে মাহতাব নামের এক ব্যক্তি নিহত হন। পরে এই হত্যার জেরেই সিপনসহ কয়েকজনকে আসামি করে একটি মামলা হয়। ২০০০ সালের ৭ নভেম্বর সিপন গ্রেপ্তার হন। এক যুগেরও বেশি সময় ধরে ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক, সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুতকারী পুলিশ কর্মকর্তাসহ ১৮ জন সাক্ষীকে সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য ৯০ বার সমন ও জামিন–অযোগ্য গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়। কিন্তু তাঁরা কেউই আদালতে হাজির হননি। আর তাঁদের এই গাফিলতির কারণেই বিচারিক আদালতে মামলাটি নিষ্পত্তি হতে সময় লেগেছে প্রায় ২৪ বছর। আর অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় ১৬ বছর পর সিপন খালাস পান।

২০১৬ সালের ১২ জুলাই। গণমাধ্যমের আরেকটি শিরোনাম ছিল ‘বিনা অপরাধে ৯ বছর জেলে থাকার পর মুক্ত ফরিদ’। বাট্টি ফরিদ নামে পরিচিত ৩০ বছর বয়সী এই মানুষটি দিনমজুরের কাজ করতেন। মা-বাবা ছাড়া বেড়ে ওঠা ফরিদ থাকতেন রাজধানীর খিলগাঁওয়ের বস্তিতে। পুলিশ সন্দেহভাজন হিসেবে ২০০৭ সালের ২০ এপ্রিল খিলগাঁও রেললাইন থেকে আটক করে তাঁকে। পরে একটি ডাকাতি মামলায় সন্দেহভাজন গ্রেপ্তার দেখিয়ে তাঁকে কোর্টে চালান করে। কিন্তু আদালতে ফরিদের পক্ষে কোনো আইনজীবী না থাকায় ওই দিন তাঁর জামিনের আবেদন করা হয়নি। আর এখান থেকেই শুরু হয় তাঁর কারাবাস। পরে মানবাধিকার সংগঠন লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স টু হেল্পলেস প্রিজনার্স অ্যান্ড পারসন্সের (এলএএইচপি) সহায়তায় কাশিমপুর কারাগার থেকে মুক্তি মেলে তাঁর।

মুক্তির পর ফরিদ জানিয়েছিলেন, বাবাকে তিনি দেখেননি। বাড়ি বলতে কিছু নেই। আট বছর বয়সে মা আরেকটি বিয়ে করে আলাদা হয়ে যান। মা কোথায় আছেন বা বেঁচে আছেন কি না, তা তিনি জানেন না। আর ঘটনার দিন কোনো কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই পুলিশ তাঁকে ধরে নিয়ে যায়। আদালতে নেওয়ার পরই ছাড়া পাওয়ার আশ্বাস দিয়েছিল পুলিশ। ১২ জুলাই এলএএইচপির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, শুধু ফরিদ নয়, এমন অনেকেই বিনা বিচারে দীর্ঘ সময় কারাভোগ করে মুক্ত হয়েছেন। ওই প্রতিবেদনেই সাত বছর বিনা বিচারে কারাভোগ করে ২০১৫ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি মুক্তি পাওয়া আলমগীর হোসেনের নাম প্রকাশ করা হয়। আলমগীর ২০০৮ সালের ২৯ নভেম্বর গ্রেপ্তার হয়ে কোনো ওকালতনামা জমা না পড়ায় বিনা বিচারে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দিজীবন কাটান। এই ব্যাপারে তখনকার ও এখনকার আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের বক্তব্য ছিল, বিনা বিচারে কাউকে আটক রাখা মানবাধিকারের লঙ্ঘন। আইনি জটিলতার কারণে যাঁরা বিনা বিচারে কারাভোগ করছেন, তাঁদের মুক্ত করতে তাঁর মন্ত্রণালয় কাজ করছে।

বিনা বিচারে জেল খেটে মুক্তি পাওয়া আরেকটি নাম গাজীপুরের বাবুল আক্তার। টানা ১৭ বছর কারাবাসের পর তিনি অনেকটা স্মৃতিশক্তি হারিয়ে ফেলেছিলেন। খালাস পাওয়ার পর নিজ বাড়িতেও ফিরে যাননি। পরে গণমাধ্যমের কল্যাণে ২০১৬ সালের নভেম্বর মাসে নিজ পরিবারের ফিরে যান। বাড়ি ফিরলেও তিনি তাঁর স্ত্রীকে ফিরে পাননি।

জাহালমের বেলায় আসামির সঙ্গে চেহারার মিল পাওয়ায় বিপত্তি ঘটেছিল। বর্তমানে বিনা দোষে কারাগারে থাকা আলোচিত নাম বাদল ফরাজির বেলায় আসামির সঙ্গে নামের মিল থাকায় বিপত্তি ঘটায় এক খুনের মামলায় ১১ বছর ধরে তিনি কারাগারে। বাংলাদেশের এই নাগরিক পর্যটক হিসেবে ২০০৮ সালের ১৩ জুলাই ভারতে বেড়াতে গিয়ে গ্রেপ্তার হন। এরপর দিল্লির নিম্ন ও উচ্চ আদালত তাঁকে ওই মামলায় দোষী প্রমাণিত করে যাবজ্জীবন দেন। পরে বন্দিবিনিময় চুক্তির আওতায় গত বছরের ৬ জুলাই তাঁকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনা হয়। কিন্তু এখনো তিনি কারাগারে। অথচ ভারতসহ সবাই জানে, এই বাদল সেই বাদল নন, যিনি দিল্লির অমর কলোনির এক বৃদ্ধকে খুনের সঙ্গে জড়িত। বাদল সিং নামের প্রকৃত খুনিকে ধরতে গিয়ে বিএসএফ ভুলে বাংলাদেশের পর্যটক বাদল ফরাজিকে গ্রেপ্তার করে। আর ইংরেজি বা হিন্দি ভাষা জানা না থাকায় তিনি তাঁর কথা তখন কাউকে বোঝাতেও পারেননি।

বাগেরহাটের ১৮ বছর বয়সী সেই বাদল এখন ২৯ বছরের যুবক। মা শেফালি বেগম ছেলের মুক্তির জন্য টানা রোজা রেখে চলছেন। আইনের মারপ্যাঁচে তাঁর জীবন কাটে দাগি আসামিদের সঙ্গে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলছেন, তাঁরা আইন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করবেন—কীভাবে বাদল ফরাজিকে মুক্ত করা যায়।

আইন-আদালতের ব্যাপারে আমরা সাধারণ মানুষ অনেকেই অজ্ঞ। তবে এই বাদল, জাহালম, বাবুল আক্তার, বাবুল মিয়া, সিপন ও ফরিদদের জীবনের কি কোনো মূল্য নেই? কেউ কেউ কারাগারে বসেই কিশোর থেকে যুবক হচ্ছেন, আর এই ব্যক্তিদের পরিবারের কী অবস্থা, তা কি একবারও কেউ চিন্তা করেছেন?

Comments

comments