বাংলাদেশের বিশাল বেকারত্ব ও উন্নয়নের গল্পের ফাঁকি

এতো উন্নয়নের বয়ানের ফাঁকিটা বুঝতে জটিল কোন দার্শনিক প্রকল্প নেয়ার প্রয়োজন নেই। একটি দেশের বিপুল জনগোষ্ঠিকে বেকার রেখে উন্নয়নের কোন বয়ানই বিশ্বাসযোগ্য হতে পারে না। এই জনগুরুত্বপূর্ণ দিকটি নিয়ে বিশেষ লেখাটি জবানের পাঠকদের জন্য প্রকাশ করা হল।

জনসংখ্যার ত্রুটিপুর্ণ তথ্য উপস্থাপন অর্থনৈতিক সূচকগুলোর ক্রমবর্ধনশীল অবস্থা দেখাতে বেশ কাজে দেয়। প্রকৃত চিত্রকে আড়াল করে এইসব গবেষণার নামে গালভরা উন্নয়নকে মিডিয়াতে প্রচার করা হয়। আর মোট জনসংখ্যাকে কমিয়ে দেখানোর একটা গুরুতর অভিযোগ রয়েছে এইসব তথাকথিত গবেষণার বিরুদ্ধে। ফলে এই জনসংখ্যার ডেটা ভিত্তিক বিশ্লেষণ দিয়ে প্রকৃত অবস্থা নিরুপণ করা খুবই দুরূহ। উল্লেখ্য আমাদের জনসংখ্যা এখনো সাড়ে ১৫ কোটিরও কম গণনা করা হয় (২০১১ আদশুমারির ত্রুটিপুর্ণ ডেটা, তার উপর সেটা ৮ বছরের পুরনো)।

জিডিপিকে একটা ছোট ডিনোমিনেটর দিয়ে ভাগ করলে ভাগফল বড় আসে, এতে পার ক্যাপিটাল ডেটাগুলো বাস্তবতার চাইতে বেশ বড় দেখায়। বিবিসি বলেছে- বাংলাদেশের জনগণনা ২০১১’র চুড়ান্ত ফলাফলে দেশের জনসংখ্যা ১৫ কোটি ২৫ লাখ ১৮ হাজার, যা আদমশুমারির প্রাথমিক ফলাফল থেকে প্রায় এক কোটি মানুষ বেশি। ৫ম আদমশুমারি ও গৃহগণনা ২০১১’র যে প্রাথমিক ফলাফল প্রকাশ করা হয়েছিল তাতে বলা হয়েছিল, ২০১১ সালের ১৫ মার্চে আদমশুমারির রাতে দেশের মোট জনসংখ্যা ছিল ১৪ কোটি ২৩ লাখ ১৯ হাজার)। স্পষ্টই এই ডেটা ত্রুটিপুর্ণ এবং বাস্তব জনসংখ্যা থেকে বেশ কমিয়ে উপস্থাপিত। এটা গেল একটি দিক। এমন আরও বহু দিক দিয়ে বিশাল জনসংখ্যার এই সংখ্যাতাত্বিক রাজনীতি দিয়ে আসল সমস্যাগুলো আড়াল করা হয়। আজকে উন্নয়নের বয়ানের আড়ালে বেকারত্বের বিভিন্ন দিকগুলো তুলে ধরতে চেষ্টা করব।

প্রবৃদ্ধি বনাম কর্মসংস্থান

ক. থিউরি অনুযায়ী ১% প্রবৃদ্ধি বাংলাদেশে প্রতি বছর ২.৫ থেকে ৩ লক্ষ কর্মসংস্থান সৃষ্টি করার কথা যা মোট প্রায় ২০ লক্ষ, অথচ বাস্তবে আমরা দেখছি উচ্চ প্রবৃদ্ধির বিপরীতে নিন্মগামী কর্মসংস্থানের প্রবণতা। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার সহযোগিতায় এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক প্রণীত ২০১৬ সালে প্রকাশিত ‘এমপ্লয়মেন্ট ডায়াগনস্টিক’ শীর্ষক পর্যালোচনা বলছে, ১৯৯৯-২০০০ অর্থবছর থেকে ২০০৫-২০০৬ অর্থবছর পর্যন্ত সময়ে বাংলাদেশের জিডিপির গড় প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৫ দশমিক ৬৩ শতাংশ। একই সময়ে কর্মসংস্থানের হার ছিল ৩ দশমিক ৩ শতাংশ। ২০০৬-২০০৭ অর্থবছর থেকে ২০১০ পর্যন্ত সময়ে গড় প্রবৃদ্ধি বেড়ে দাঁড়ায় ৬ দশমিক ১১ শতাংশ।

এ সময়ে কর্মসংস্থানের প্রবৃদ্ধি ছিল ৩ দশমিক ৩২ শতাংশ। ২০১০ থেকে ২০১৩ পর্যন্ত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বেড়ে দাঁড়ায় ৬ দশমিক ২ শতাংশ। কিন্তু কর্মসংস্থানের প্রবৃদ্ধি না বেড়ে বরং কমে যায়। এ সময় কর্মসংস্থান প্রবৃদ্ধির হার ছিল ২ দশমিক ৩৯ শতাংশ। ২০১০ সালে অনার্স-মাস্টার্স ডিগ্রীধারীদের মধ্যে বেকারত্বের হার ছিল ৯.৯ শতাংশ, ২০১৩ সালে তা দাঁড়িয়েছে ১৬.৪ শতাংশ। বৃদ্ধির এই হার বজায় থাকলে ২০১৭ সালে তা দাঁড়াচ্ছে ২০+ শতাংশ। শুধু সরকারি ডেটা বলছে ২৬ লক্ষ শিক্ষিত যুবক বেকার যেখানে বেসরকারি সার্ভেগুলো অনুমান করছে এই সংখ্যা ৪০ থেকে ৬০ লাখ।

২০০৬-২০০৭ অর্থবছর থেকে ২০১০ পর্যন্ত সময়ে গড় প্রবৃদ্ধি বেড়ে দাঁড়ায় ৬ দশমিক ১১ শতাংশ। এ সময়ে কর্মসংস্থানের প্রবৃদ্ধি ছিল ৩ দশমিক ৩২ শতাংশ। ২০১০ থেকে ২০১৩ পর্যন্ত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বেড়ে দাঁড়ায় ৬ দশমিক ২ শতাংশ। কিন্তু কর্মসংস্থানের প্রবৃদ্ধি না বেড়ে বরং কমে যায়।

খ. প্রতি বছর ১৫ লাখের উপরে দক্ষ-অদক্ষ কর্মক্ষম লোক শ্রমবাজারে আসেন, এর অর্ধেকেরও কম কাজ পান। বাকিরা থাকে বেকার। যারা কাজ পায়, তারা আসলে তাদের কর্মসম্ভাবনার কতুটুকু কাজে লাগাতে পারে, সে ব্যাপারেও সন্দেহ আছে। একজন ব্যক্তি যদি সপ্তাহে ১ ঘণ্টার জন্য কাজ করে, তাহলেও তাকে কর্মে নিয়োজিত ব্যক্তি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। কর্মসংস্থানের এ ধরনের হিসাব বাস্তবসম্মত নয়। আসলে আমাদের দেশে ‘ছদ্ম বেকারত্বের’ সমস্যাটি অত্যন্ত প্রকট।

গ. বাংলাদেশে দুর্নীতি প্রতিরোধী ব্যবস্থাপনা, সহজ ও স্বচ্ছ লেনদেন প্রক্রিয়া, ওল ইঙ্কলুসিভ পেমেন্ট গেইটওয়ে এবং বিভিন্ন সেকটরে পুর্ণাঙ্গ অটোমেশন বাস্তবায়ন না হওয়াতে দুর্নীতির ব্যপকতা কমে আসছে না (অটমেশনেও দুর্নীতি তাড়িত ম্যানুয়াল ইন্টারভেনশনের ব্যবস্থা রাখা হয়)। এতে অধিক সংখ্যক মানুষ দুর্নীতি কেন্দ্রিক অ-প্রতিষ্ঠানিক শ্রম বাজারে নিজেদের নিয়োজিত করছে (বহু স্তরের প্রশাসনিক তদবির, কৃষির মধ্য স্বত্ত্ব ভোগ, সুদ ব্যবসা, শিক্ষা-স্বাস্থ্য-বিদ্যুৎ-গ্যাস-ট্রান্সপোর্ট সহ বিভিন্ন সেবা খাতের দালালি। অন্যদিকে ব্যাপক পরিমাণ বেকার রাজনৈতিক কর্মী থাকা অপ্রতিষ্ঠানিক কর্মসংস্থানের ‘ছদ্ম বেকারত্ব’র সরাসরি নির্দেশক, এরা একদিকে আন স্কিল্ড ও আনপ্রডাকটিভ অন্যদিকে চাঁদাবাজও বটে)।

ঘ. গ্রামীণ সমাজে কৃষির শ্রম অপ্রতুল, যার কারণে বেশি খরুচেও। অন্যদিকে ব্যাপক পরিমাণ কর্মহীণ যুবক পরিশ্রম বিমূখী আয়ের ধান্ধায় দিনাতিপাত করে যা চাঁদাবাজি, বলপ্রয়োগ এবং বিবাদ নির্ভর আঞ্চলিক সন্ত্রাসকে প্রসারিত করছে। অন্যদিকে উচ্চ সংখ্যক শহুরে বস্তিবাসী টেকসই শিক্ষার আওতার বাইরে থাকায় (আন স্কিল্ড লেবার অথবা নিজ পরিশ্রমে অর্জিত সেমি স্কিল্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল লেবার) মর্মন্তুদ পরিশ্রম সত্ত্বেও শহরে ভালো ভাবে বাঁচার মত জীবিকা নির্বাহ করতে ব্যর্থ। সাধারণের শিক্ষা ব্যবস্থায় গুণগত মান নিশ্চিত না হওয়ায় এবং কর্মমূখী ও ইন্ডাস্ট্রি নির্ভর ওয়ার্ক স্কিল ডেভেলপ না হওয়ায় একদিকে কৃষি ও শিল্পের স্কিল্ড মানব সম্পদ অপ্রতুল অন্যদিকে আনপ্রডাক্টিভ ওয়ার্ক ফোর্স প্রসারিত হচ্ছে, যা বিভিন্ন সামাজিক সমস্যা তৈরি করছে।

ঙ. বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের প্রবৃদ্ধির হার বৈষম্যমূলক। জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন ও গ্রাম ভেদে প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানের হিসেব আলোচিত হয় না। ফলে কর্মসংস্থান তৈরির এলাকা ভিত্তিক উপ-আঞ্চলিক চাহিদা জানে না সরকার ও প্রশাসন, সেবা এবং বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় ফেসিলিটির জনসংখ্যাভিত্তিক বিন্যাস ও প্রসেস ডেভেলপ হয়নি। নেতৃত্বের ও প্রশাসনিক প্রভাবে অঞ্চল নির্ভর প্রকল্প বাস্তবায়ন বাজেট বরাদ্দকে বড়ই বৈষম্যপূর্ণ করে রেখেছে।

একজন ব্যক্তি যদি সপ্তাহে ১ ঘণ্টার জন্য কাজ করে, তাহলেও তাকে কর্মে নিয়োজিত ব্যক্তি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। কর্মসংস্থানের এ ধরনের হিসাব বাস্তবসম্মত নয়। আসলে আমাদের দেশে ‘ছদ্ম বেকারত্বের’ সমস্যাটি অত্যন্ত প্রকট।

প্রবৃদ্ধির তুলনায় কর্মসংস্থানের প্রবৃদ্ধি অনেক কমে যাওয়ার খবর নিঃসন্দেহে অত্যন্ত আশংকাজনক। ইউএনডিপি এই অবস্থাকে ‘কর্মহীন প্রবৃদ্ধি’ বলে উল্লেখ করেছে যা জনগণের ভাগ্য উন্নয়নে অর্থবহ অবদান রাখতে সক্ষম নয়।

শ্রমবাজারের চাহিদার সাথে শিক্ষার আসন বরাদ্দের অসামাঞ্জস্যতা

কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার বিষয় ও আসন বিন্যাস গতানুগতিক। শ্রমবাজারের মোট বাৎসরিক চাহিদা নির্ভর নতুন নতুন বিষয় চালু ও পুরানো বিষয় পরিবর্তনের ধারা প্রতিষ্ঠিত হয়নি। নতুন ও বিষেশায়িত চাহিদার স্কিল সেটগুলোতে পর্যাপ্ত মানবসম্পদের অভাব রয়েছে, আবার সরকার বিসিএস সাধারণ ক্যাডারের নাম করে বিশেষায়িতদের অনুৎপাদনশীল দাপ্তরিক কাজে নিয়োগ দিচ্ছে। কারগরি শিক্ষার সাথে দীর্ঘ মেয়াদী ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যাটাচমেন্ট ও উচ্চমান ট্রেনিং, বাজারের ঝোঁক ও সমস্যার কেস স্ট্যাডি, থিসিস এবং মূল্যায়ন ব্যবস্থার যোগ না থাকায় স্কুল শিক্ষার সাথে কারিগরি শ্রমের বাজার চাহিদার বিস্তর ফারাক তৈরি হয়েছে। বেসরকারি খাতে বেতন কম ও দীর্ঘ শ্রমঘন্টা থাকার কারণেও সরকারি খাতে আগ্রহ বাড়ছে, মেধা ও উৎপাদনশীল খাতের ব্যালান্স নষ্ট হচ্ছে এতে। ফলে কর্ম খালি থাকলেও বাজারে মানসম্পন্ন মানবসম্পদের অভাব প্রকট যোগ্য লোকের অভাবে। অর্থাৎ বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা বাজারের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ ও যোগ্য লোক তৈরির আদলে তৈরি করা হয়নি, যা বিদেশিদের কর্মসংস্থান উন্মুক্ত করছে বেশ ভালোভাবে।

অপরদিকে সেমি স্কিল কাজের (নির্মাণ শ্রম, প্লাম্বিং, কারপেন্টিং, পেইন্টিং, ওয়েল্ডিং, অটোমোবাইল, ইলেক্ট্রিশিয়ান, গৃহ শ্রম ইত্যাদি) শত শত স্বল্প কারিগরি সক্ষমতার কর্মসংস্থানগুলোকে সহজ প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সনদসহ প্রতিষ্ঠানিকিকরণ করা হয়নি বলে এই খাতগুলোতে কাজ করা লোকেরা স্বীকৃতিহীন থাকছেন, আনুষ্ঠানিক নিয়োগ পাচ্ছেন না। ফলে এই খাতগুলো এজেন্টের মাধ্যমে আউটসোর্স হয়ে পড়ায় মূল শ্রমিকরা ঠকছেন। আরেকটি দিক হচ্ছে স্বীকৃতি না থাকায় এই খাতগুলো পেশা হিসেবেও জনপ্রিয় হচ্ছে না। স্বল্প সংখ্যক সেমি স্কিল্ড শ্রমিক দীর্ঘ শ্রম ঘণ্টায় রাত দিন কাজ করছেন এবং এতে ব্যাপক কমিশন হাতিয়ে নিচ্ছে দালাল বা এজেন্ট অথচ এই খাতগুলোকে সনদসহ প্রতিষ্ঠানিক করে এর সাথে মানবিক শ্রম ঘণ্টার বিধান আনা গেলে এখানে প্রচুর লোকের কর্মসংস্থান হতে পারে।

বড় বড় অবকাঠামো প্রকল্প কর্মসংস্থান তৈরিতে ব্যর্থ

বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি মাঝারি ও বড় অবকাঠামো প্রকল্প বৈদেশিক ঋণ নির্ভর। এই ঋণগুলো এমনই শর্তযুক্ত যে এখানে ৭৫ থেকে ৮৫ শতাংশ পর্যন্ত কাঁচামাল ডিজাইন, এমনকি স্কিল্ড, সেমি স্কিল্ড শ্রমিকও ঋণদাতা দেশ থেকে আসতে বাধ্য। ফলে এই প্রকল্পগুলোতে দেশীয়দের কর্মসংস্থানের সুযোগ নেই, সুযোগ রাখা হয়নি ‘টেকনোলজি ট্রান্সফারের’ও। ফলে দেশীয় মানব সম্পদের কারিগরি সক্ষমতা বৃদ্ধির ভবিষ্যৎ দীর্ঘমেয়াদে বড়ই নাজুক অবস্থায় রয়েছে।

শিক্ষা ও সেবা খাতের নিয়োগ জনমিতিক হিসেবে বিন্যস্ত নয়

আমাদের দেশে স্থানীয় সরকারের আকার ও পদ সংখ্যা ঐ এলাকার মোট জনসংখ্যার অনুপাতে বিন্যস্ত নয়। জনসংখ্যা অনুপাতে পুলিশ, আদালত, হাসপাতাল, ডাক্তার, নার্স, পোষ্ট অফিস, কাজী অফিস, পরিচ্ছনতা কর্মী ইত্যাদি নেই। জনসংখ্যা অনুপাতে স্কুল নেই ও নেই শিক্ষকও। আধুনিক শিক্ষা উপকরণহীন শুধু ব্ল্যাক বোর্ড ও টেবিল চেয়ারের ক্লাসে ষাট থেকে শত জন ছাত্র ছাত্রী মানহীন গতানুগতিকভাবে শিক্ষা লাভ করছেন। অথচ স্কুল ও শিক্ষক মাথপিছু জনমিতির হিসেবে করা গেলে শুধু শিক্ষাখাতেই ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ আছে, এমন সুযোগ আছে স্বাস্থ্য ও পরিচ্ছনতা খাতগুলোতেও।

কৃষি কর্মসংস্থান সংকুচিত হচ্ছে

বিভিন্ন কারণে বছরে প্রায় ১ থেকে ১.৫ শতাংশ করে কৃষি জমি কমছে। ফলন চাহিদা নির্ভর এবং সমন্বিত নয়। এই সবকিছুর ফল হল কৃষক পণ্যের উৎপাদন মূল্য পাচ্ছেন না। ফলে কৃষি খাতে কর্মসংস্থান বাড়ছে না এবং কৃষি থেকে উৎসাহ হারাচ্ছেন। কৃষি খাতের গতানুগতিক ভর্তুকির প্রক্রিয়া দুর্নীতি সহায়ক, সার ও ডিজেলের ভর্তুকি কৃষক প্রান্তে পৌঁছে না। তাই বাজেটে চাহিদার সাথে সমন্বিত রেজিস্ট্রেশনভিত্তিক ফলন ব্যবস্থাপনা এবং বাধ্যতামূলকভাবে উৎপাদন মূল্যের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ বাজার মূল্য প্রদানের (পণ্য মূল্যে কৃষক প্রান্তে সরাসরি ইন্টারফেইসের ভর্তুকি) একটা কৌশলগত পদ্ধতি চালুর দরকার ছিল, যা বিশ্বের দেশে দেশে বহু আগেই প্রবর্তিত। ফলন উৎপাদনকে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক বাজার চাহিদা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং আমদানি-রপ্তানির চাহিদার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে তোলা হয়নি। ফলনের সর্ব নিন্ম বাজার মূল্য উৎপাদনের খরচের বিপরীতে নিয়ন্ত্রিত নয়। কৃষিতে পণ্যের উৎপাদন মূল্য ও শ্রম মূল্য না আসায় কর্সংস্থান কমছে। ফলে কৃষি ভিত্তিক অর্থনীতি সার্বিকভাবে বাংলাদেশের কর্মসংস্থান এগিয়ে নিতে পারছে না।

স্থবির শিল্প খাত

রাজনৈতিক আস্থাহীনতা, গুম-খুন, চাঁদা, দীর্ঘ জটিল ব্যবসা শুরুর প্রক্রিয়া, জমি ও ফ্ল্যাটের উচ্চ মূল্য ও ভাড়া এবং উচ্চ সুদের মত কারণে অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগ বাড়ছে না। বহুবিধ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ বাঁধায় উদ্যোক্তা সৃষ্টিতে একেবারেই পিছিয়ে বাংলাদেশ (বিশ্বে ১১৭ তম এবং দক্ষিণ এশিয়ায় সবার পিছনে)। ২০১০ সালে শিল্পখাতে কর্মসংস্থানের অবদান ছিল ২৩.৩ শতাংশ যা ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ২০.৩ শতাংশে নেমে এসেছে)

দেশীয় শিল্পে শ্রমিকের অতি দীর্ঘ দৈনিক শ্রমঘন্টা এবং তথাকথিত ওভার টাইম নতুন নিয়োগে বড় প্রতিবন্ধক। কোম্পানিগুলো (এমনকি দেশি বিদেশি কর্পোরেটগুলোও) অতি কম লোকবলে অতি বৃহৎ ব্যবসা চালায় কেননা সরকার মানবিক শ্রমঘন্টার কোন বিধান করেনি। ফলে রাত দিন বিরতিহীনভাবে কাজ করতে হয় বেসরকারি চাকুরীজীবীদের।

দেশীয় শিল্পে শ্রমিকের অতি দীর্ঘ দৈনিক শ্রমঘন্টা এবং তথাকথিত ওভার টাইম নতুন নিয়োগে বড় প্রতিবন্ধক। কোম্পানিগুলো (এমনকি দেশি বিদেশি কর্পোরেটগুলোও) অতি কম লোকবলে অতি বৃহৎ ব্যবসা চালায় কেননা সরকার মানবিক শ্রমঘন্টার কোন বিধান করেনি। ফলে রাত দিন বিরতিহীনভাবে কাজ করতে হয় বেসরকারি চাকুরীজীবীদের। কোম্পানির বাৎসরিক আয় ব্যয় লভ্যাংশ (ব্যবসার আকার) এর সাথে তার শ্রম শক্তি বিন্যাস ও নিয়োগের অনুপাতিক হারের কোন নির্দেশনা নেই। শুধু দৈনিক শ্রমঘণ্টা সর্বোচ্চ ৮ থেকে ১০ ঘন্টার বাধ্যবাধক বিধান করলে দেশীয় শিল্পে কর্মসংস্থান বাড়বে ১৫ থেকে ২০ শতাংশ,বাড়বে কাজের মান ও সৃজনশীলতা এবং উতপাদনশীলতাও। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে দৈনিক ৮ ঘণ্টা করে সপ্তাহে ৪০ ঘণ্টার কাজ হল স্বাভাবিক ও মানবিক, গবেষণা বলছে এর অতিরিক্ত শ্রম ঘণ্টা সৃজনশীলতা এবং উৎপাদনশীলতা কমিয়ে দেয় এবং শ্রমিকের দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্য হানি ঘটায়।

প্রবৃদ্ধি বনাম দারিদ্র

থিউরি অনুসারে ১ শতাংশ জিডিপি বৃদ্ধিতে দারিদ্র্য ১.৫% কমে, ফলে ৭ শতাংশে ১০.৫% দারিদ্র কমার কথা বছর বছর। আমাদের বিপুল সংখুক জনতা এখনও অতি দারিদ্রসীমার নীচে,সরকারি হিসেবে অতি দারিদ্র ১২.৯%, দারিদ্রের হার ১৮-২২%, এই ডেটা থিউরিটক্যাল ( ৭.১% জিডিপি প্রবৃদ্ধির হিসেবে- ১ শতাংশ জিডিপিতে দারিদ্র্য ১.৫% কমে, বিশ্বব্যাংকের এই ফর্মুলাতে)। কিন্তু বেসরকারি সার্ভে ডেটাগুলো বলছে বাংলাদেশের দারিদ্র ৩২% এর উপরে। বিশ্ব্যব্যাংক বলছে দুই দশকে বাংলাদেশে দুই কোটি মানুষকে দরিদ্র অবস্থা থেকে বের করে আনা সম্ভব হয়েছে। তবে বাংলাদেশে দারিদ্র্যের হার কমলেও গরীব মানুষের জীবন মান, আর্থিক ও স্বাস্থ্য নিরাপত্তা, জন নিরাপত্তা বিষয়ক সামাজিক অবস্থা খুব বেশি বদলায়নি, উন্নতি হয়নি দুর্নীতি প্রতিরোধে।

এনার্জি কঞ্জাম্পশন ও কর্মসংস্থানের পরিমান এত কম হওয়া স্বত্বেও এবং দারিদ্র্যের বেইজ এখনও এত বিশাল থেকেও জিডিপির উচ্চ গ্রোথ কিভাবে আসছে? এর একটা দিক সেবা খাতের দ্রুত বিকাশ। শিল্পের বিকাশ না হলেও ১৬ কোটির বেশি মানুষের দেশে শুধু সেবাখাতের উচ্চ বিকাশেই ৪-৫% গ্রোথ সম্ভব। কিছু কিছু সেবা খাতের গ্রোথ দুই অংকে বাড়ছে, যেমন স্বাস্থ্যখাত যদিও এই গ্রোথ নির্দেশ করেছে দেশের মানুষের স্বাস্থ্য বিল, হাসপাতাল বাড়ছে, আদতে স্বাস্থ্য সেবার মান বাড়ছে না কিন্তু রোগীর ও মৃত্যুর মিছিল বাড়ছে। অন্য দিকটি হলো ক্রমাগত হারে সরকারের আয়কর ও শুল্ক বৃদ্ধি, সেবা ও পণ্যের দাম বাড়ানো, এনার্জির দাম বাড়ানো, আয়কর কেন্দ্রিক রাজস্বের খাত ও পরিমানের অতি স্ফীতি, কঠিন শর্তযুক্ত কিন্তু অনুৎপাদশীল তথাপি বল্গাহীন পরিমানে বৈদেশিক ঋণ আনার অতি উচ্চ প্রবাহ ‘কর্মহীন জিডিপি’তে অবদান রাখছে। বহু অভ্যন্তরীণ খাত মনিটরিং এবং করের আওতায় আসায় এই অভ্যন্তরীণ উৎপাদনগুলো আমাদের ইকনোমিক স্ট্যাটিস্টিক্স এ যুক্ত হচ্ছে।

আমরা বলছি অনুৎপাদনশীল ও কর্মহীন জিডিপির এইসব ইঙ্কন্সিস্টেন্ট এলিমেন্ট ম্যাক্রো ও মাইক্রো অর্থনীতির বহুবিধ সক্ষমতার ব্যালান্স ও ইলাস্টিসিটিকে নষ্ট করছে। আমাদের মনে রাখতে হবে ইলাস্টিসিটি কখনও আনলিমিটেড ও অ্যাবস্যুলুট হয় না। কর্মহীন প্রবৃদ্ধি অর্জনের পরিবর্তে ভারসাম্যপূর্ণ (শিক্ষা, ভালো চাকরি, খাদ্য নিরাপত্তা, পরিবেশ সুরক্ষা, স্বচ্ছতা ও সুস্বাস্থ্য, মাথাপিছু বৈদেশিক ঋণ ইত্যাদির বিপরীতে) টেকসই উন্নয়ন ও প্রবৃদ্ধির ব্যাপারে রাষ্ট্রকে উদ্যোগী হতে হবে। জিডিপি’র উচ্চ প্রবৃদ্ধির সর্বোচ্চ চূড়ায় অবস্থান করে দুর্নীতি, অব্যস্থাপনা, লূটপাট এবং অদূরদর্শী খরচের লাগাম টেনে ধরে সরকারকে তার আর্থিক সক্ষমতাকে সমন্বিত ও টেকসইভাবে কাজে লাগাতে হবে। ফলে প্রকৃত অবস্থার জন্য চাই জনগণের প্রতি আস্থাশীল ক্ষমতা কাঠামো। এই মিথ্যা উন্নয়নের বয়ান বেকারত্ব ও দারিদ্রতা বাড়াবে বই কমাবে না।

Comments

comments