মেলার প্রথম দিন: স্টল সাজাতেই ব্যস্ত প্রকাশকেরা

বিকেল সোয়া ৫টায় মেলার প্রবেশ পথের সামনে ভিড়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মেলা উদ্বোধন করে যাওয়ার পরপরই দেখা যায়, অসংখ্য মানুষ দাঁড়িয়ে আছেন মেলায় প্রবেশ করার জন্য। সেখানেই কথা হলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মাহবুব আলমের সঙ্গে। তিনি জানালেন, ‘আজকে মেলার প্রথম দিন, শুধুই ঘুরতে আসা। মেলার পরিবেশ দেখতে আসা।’

শুক্রবার বিকেলে অমর একুশে গ্রন্থমেলা উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এরপরই খুলে দেয়া হয় মেলার প্রবেশদ্বার। পুরো ফেব্রুয়ারি মাসব্যাপী চলবে বইপ্রেমীদের এই মহোৎসব। ১ থেকে ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ছুটির দিন ব্যতীত প্রতিদিন বিকেল ৩টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত খোলা থাকবে মেলা। ছুটির দিন বেলা ১১ টা থেকে রাত ৯টা এবং ২১ শে ফেব্রুয়ারি সকাল ৮টা থেকে রাত সাড়ে ৮টা পর্যন্ত মেলা চলবে। শিশুদের জন্য রয়েছে শিশু চত্বর। মেলার উদ্বোধনী আয়োজনে সঞ্চালক রামেন্দু মজুমদার জানান, এবার নিয়ে ১৬ বার অমর একুশে গ্রন্থমেলা উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

বইমেলার প্রথম দিন ঘুরে দেখা গেছে, বই সাজাতেই ব্যস্ত প্রকাশনা সংস্থাগুলো। কোনো কোনো প্রকাশনার স্টলের নির্মাণকাজও বাকি রয়ে গেছে। যারা স্টল নির্মাণের কাজ শেষ করেছেন, তারা ব্যস্ত রয়েছেন নান্দনিকভাবে বই সাজাতে।

আগামী প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী ওসমান গণি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মেলার প্রথম দিন উদ্বোধনের আয়োজন শেষ হতেই বিকেল গড়িয়ে যায়। এরপর বই সাজানো, আর স্টলের খুঁটিনাটি বিষয় নিয়েই কেটে যায় প্রথম দিন।’

মেলার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের অংশে গিয়ে অনন্যা প্রকাশনীর সামনে কিছু তরুণ-তরুণীর ভিড় দেখে এগিয়ে গিয়ে দেখা যায়, তারা বই দেখছেন। প্রকাশনীটির বিক্রয়কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রথম দিন তেমন বই কিনছেন না কেউ। অনেকেই এসেছেন ঘুরে দেখতে।

বাংলাদেশ জ্ঞান ও সৃজনশীল প্রকাশনা সমিতির সভাপতি ফরিদ আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মাসব্যাপী বইমেলা পৃথিবীর কোথাও হয় না। এটা বাংলাদেশের একটি গৌরবোজ্জ্বল দিক। তবে এই মেলাটা শুধুমাত্র দেশীয় লেখকদের বই নিয়ে হয়। এ জন্য প্রধানমন্ত্রীকে আমরা বলেছি, ‘বছরে অন্তত একটি আন্তর্জাতিক বইমেলার আয়োজন করতে তিনি যেন নির্দেশনা দেন। সেখানে যেন ইউরোপ, এশিয়ার প্রকাশনাগুলো অংশ নেয়। এতে আমাদের প্রকাশনা শিল্প সমৃদ্ধ হবে।’

বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক হাবীবুল্লাহ সিরাজী বলেন, ‘এবারের মেলায় বাংলা একাডেমি প্রকাশ করছে নতুন ও পুনর্মুদ্রিত ১০২টি নতুন বই। মেলায় এবারই প্রথম ‘লেখক বলছি’ নামের নতুন একটি মঞ্চ করা হয়েছে। সেখানে তরুণ লেখকরা কথা বলবেন তাদের প্রকাশিত বই নিয়ে।’

এদিকে মেলার উদ্বোধন অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে পাকিস্তানি আমলের গোয়েন্দা প্রতিবেদনের ভিত্তিতে সংকলিত ও হাক্কানী পাবলিশার্স প্রকাশিত ‘সিক্রেট ডকুমেন্টস অব ইনটেলিজেন্স ব্রাঞ্চ অন ফাদার অফ দা নেশন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান’শীর্ষক বইয়ের দ্বিতীয় খণ্ডের মোড়ক এ অনুষ্ঠানে উন্মোচন করেন প্রধানমন্ত্রী।

অনুষ্ঠানে মোহসেন আল-আরিশি আরবিতে লেখা শেখ হাসিনার জীবনীগ্রন্থ প্রধানমন্ত্রীর হাতে তুলে দেন এবং বাংলা একাডেমি প্রকাশিত মোহসেন আল-আরিশি রচিত বইয়ের অনুবাদ- ‘শেখ হাসিনা: যে রূপকথা শুধু রূপকথা নয়’ প্রধানমন্ত্রীর হাতে তুলে দেন বাংলা একাডেমির সভাপতি ও মহাপরিচালক।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘এখন এক ধরনের বন্দী জীবনযাপন করি। বইমেলায় আসতে ভীষণ ইচ্ছা করে। কিন্তু আমি আসলে অন্যদের কষ্ট হয়। এ জন্য আসা হয় না। তবে মনটা পরে থাকে বইমেলায়।’

মেলার উদ্বোধনী আয়োজনে এসেছিলেন ভারতের প্রখ্যাত কবি শঙ্খ ঘোষ। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ আমার জন্মভূমি। পনেরো বছর বয়সে এ দেশ ছেড়ে গেলেও বাকি বাহাত্তর বছর ধরে এ অনন্য দেশের স্মৃতিই বহন করে চলেছি। ১৯১৩ সালে রবীন্দ্রনাথের গীতাঞ্জলি কাব্যের নোবেলপ্রাপ্তি, ১৯৫২-তে ভাষা আন্দোলন, ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ এবং ১৯৯৯-এ একুশে ফেব্রুয়ারির আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা হিসেবে স্বীকৃতি লাভ বাংলাভাষী মানুষের স্বপ্নকে দিয়েছে বিশ্বজনীনতা।’

অপর সম্মানিত অতিথি মিশরের লেখক-সাংবাদিক ও গবেষক মোহসেন আল-আরিশি বলেন, ‘এ গ্রন্থমেলা উগ্রতা এবং অন্ধতার বিরুদ্ধে বাংলাদেশের মানুষের লড়াইয়ের প্রতীক। যে লড়াইয়ের প্রতীক বঙ্গবন্ধু এবং শেখ হাসিনাও। ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকে সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত নির্মাণে শেখ হাসিনা যেভাবে লড়াই করছেন, তার সে লড়াইয়ে সারা বিশ্বের গ্রন্থপ্রেমী সকল উদার মানুষের সমর্থন রয়েছে। ’

উদ্বোধনী আয়োজনের শুরুতেই শিল্পী রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা’র নেতৃত্বে সাংস্কৃতিক সংগঠন সুরের ধারা-এর শিল্পীদের সমবেত কণ্ঠে জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় মূল অনুষ্ঠান। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার ২০১৮ প্রদান করা হয়। বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার ২০১৮ পুরস্কারপ্রাপ্তরা হলেন কবিতা- কাজী রোজী, কথাসাহিত্য- মোহিত কামাল, গবেষণা- সৈয়দ মোহাম্মদ শাহেদ, মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক গবেষণা- আফসান চৌধুরী। অনুষ্ঠানে পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখকদের হাতে দুইলক্ষ টাকার চেক, ক্রেস্ট ও সম্মাননাপত্র তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। উদ্বোধন শেষে প্রধানমন্ত্রী গ্রন্থমেলা পরিদর্শন করেন। অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন রামেন্দু মজুমদার, নুরুন্নাহার খানম ও শাহাদাৎ হোসেন নিপু।

Comments

comments