ফিলিস্তিনি শিশু হত্যার কথা ভুলে গেছে বিশ্ব

রামোনা ওয়াদি

ডিফেন্স ফর চিলড্রেন ইন্টারন্যাশনাল ফিলিস্তিন (ডিসিআইপি) ফিলিস্তিনি শিশুদের একটি বিবর্ণ চিত্র তুলে ধরেছে, যাতে প্রকাশ পেয়েছে, ২০১৮ সালে অন্তত ৫৬টি ফিলিস্তিনি শিশু ইসরাইল কর্তৃক হত্যার শিকার হয়েছে।

যেসব ব্যক্তি এসব শিশুর হত্যার কিছু ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছেন, তারা জোর দিয়ে বলেছেন, টার্গেট করা শিশুগুলো ছিল নিরস্ত্র এবং তারা ইসরাইল রাষ্ট্র বা এর নাগরিকদের জন্য কোনো ধরনের হুমকিও তৈরি করছিল না।

ইসরাইল অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরাইলি সৈন্যদের চোরাগোপ্তা হামলা, ড্রোন হামলা এবং অন্যান্য নিরাপত্তা বাহিনীর হামলায় এই শিশুরা নিহত হয়েছে। হত্যার শিকার ৫টি শিশুর বয়স ছিল ১২ বছরের নিচে। গাজায় ৪৯ শিশুকে হত্যা করে ইসরাইল, যারা ‘গ্রেট মার্চ অব রিটার্ন’ বা দেশে ফেরার প্রতিবাদ কার্যক্রমে অংশ নিয়েছিল।

ডিসিআইপি কর্তৃক নথিভুক্ত ৭৩ শতাংশ হত্যার ঘটনায় দেখা গেছে, ইসরাইল জীবনঘাতী গোলাবারুদ ব্যবহার করেছে। এ ছাড়া সংস্থাটি ‘১৪০টি ঘটনা রেকর্ড করেছে, যেখানে ফিলিস্তিনি শিশুদের ফিলিস্তিনি বাহিনীই জেল বা আটকাদেশ দিয়েছে।’ ইসরাইলি বাহিনী অধিকৃত পশ্চিমতীরে ১২০ ফিলিস্তিনি শিশুকে গ্রেফতার করেছে। ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ বা ইসরাইলি বাহিনী- যারাই শিশুদের আটক করুক না কেন, সেই শিশুরা সামরিক বাহিনীর সদস্যদের হাতে হয়রানির শিকার হয়েছে।

এসব কৌশল থেকে দেখা যাচ্ছে, ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ইসরাইলের ঔপনিবেশিক সহযোগিতা ফিলিস্তিনি সমাজের খুবই অরক্ষিত একটি অংশকে টার্গেট বানাচ্ছে। এর চেয়েও বড় কথা, গ্রেট মার্চ অব রিটার্নে ইসরাইলি চোরাগোপ্তা হামলাকারী কর্তৃক ফিলিস্তিনি শিশু হত্যা বা জখম করার মাধ্যমে এমন একটি প্রজন্মকে পঙ্গু করে দেয়া হচ্ছে, যারা উপনিবেশবিরোধী সংগ্রাম চালু রাখতে পারে।

যখন ইসরাইল, এমনকি ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ ফিলিস্তিনি শিশুদের ওপর নিপীড়ন চালায়, তখন আন্তর্জাতিক আইনের উদ্ধৃতি টানা অনর্থক। আন্তর্জাতিক আইন তখনই প্রাসঙ্গিক যখন এটি ব্যবহার করা হয় সহিংসতা চলার সময়। ফিলিস্তিনিরা জাতিসংঘের এমন একটি সদস্যরাষ্ট্রের মোকাবেলা করছে, যে কিনা আন্তর্জাতিক আইন অবমাননা করে। আন্তর্জাতিক আইন তখনই প্রাসঙ্গিক হয়, যখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় দমন-পীড়নকে মৌন সম্মতি দেয়, এমনকি যখন তারা দুষ্কর্মে সহযোগিতা করে, তখনও এর প্রাসঙ্গিকতা সামনে আসে।

ডিসিআইপির গবেষণা এই সত্যই প্রতিষ্ঠা করছে যে, ২০১৮ সালে প্রতি সপ্তাহে ইসরাইল একজনের বেশি শিশুকে হত্যা করেছে। এর আগের এক দুঃখজনক সরকারি পরিসংখ্যানে দেখা গিয়েছিল, ২০০০ থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে ১৪ বছর গড়ে প্রতি তিন দিনে একটি ফিলিস্তিনি শিশুকে হত্যা করেছে ইসরাইল। গত বছরজুড়ে ইসরাইলের গণহত্যামূলক মানসিকতা ও পদক্ষেপ আলোচনায় ছিল, যার বেশিরভাগই পরিত্যক্ত হয়ে গেছে হলোকাস্ট শব্দটির রেফারেন্সের ক্ষেত্রে একচেটিয়া সুবিধার কারণে।

যদিও জাতিসংঘের গণহত্যার অপরাধ প্রতিরোধ ও এর সাজা বিষয়ক কনভেনশনের আর্টিকল-২ অনুযায়ী ‘পুরোপুরি বা আংশিকভাবে কোনো জাতি, নৃতাত্ত্বিক, গোত্রগত বা ধর্মীয় গ্রুপকে ধ্বংস করে দেয়ার উদ্দেশ্যে নেয়া কার্যক্রমকে’ গণহত্যা হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। ফিলিস্তিনি জনগণের বিরুদ্ধে ইসরাইল যা করছে, তা ‘পুরোপুরি অথবা আংশিক’ গণহত্যা ছাড়া আর কী হতে পারে?

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সাড়া প্রদানের বিষয়টি এত বেশি ভবিষ্যদ্বাণীযোগ্য যে, আন্তর্জাতিক আইন কর্তৃক বেঁধে দেয়া সীমার বাইরে যাওয়ার কৌশল খুঁজতে কোনো প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়তে হয় না ইসরাইলকে; বরং দেশটি মনে হয় দায়মুক্তির অনুমোদন দিয়ে কাজ করে থাকে। অনেক বেশি হারে ফিলিস্তিনি শিশু হত্যা এবং প্রায় প্রাকৃতিক রুটিন অনুযায়ী তাদের আটক করার বিষয়টি মানবাধিকার লঙ্ঘনের রাডারকে ফাঁকি দিয়ে বাইরে থেকে যায়। যেহেতু আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় নিজেদের প্রতিষ্ঠিত ফ্রেমওয়ার্কের ভেতরে ইসরাইলের আইন ভঙের ক্ষেত্রে কোনো জবাব চাইতে পারে না; সেহেতু ইসরাইল মানবাধিকার লঙ্ঘন ও মানবাধিকারের মাঝে এক ধরনের ফাঁক-বন্ধন তৈরিতে সফল।
বস্তুত, বর্তমানে ইসরাইলের আন্তর্জাতিক আইন ভঙের বিষয়ে কথা বলার অর্থ একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দায়িত্বহীনতার বিষয়েও কথা বলা। এমনকি এ ক্ষেত্রে কারও বিষয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয় না এবং কাউকে জবাবদিহিতার আওতায় আনার উদ্যোগও নেয়া হয় না। পরিণামে নিয়মিতভাবে ইসরাইলের আইন ভঙের কারণে আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী কী করা উচিত তার কোনো উদ্ধৃতি দিতেও যে কেউ অনীহ।

আর দায়বদ্ধতা? সে তো বহুকাল ধরে অপরাধের দৃশ্যপট থেকে উধাও হয়েছে। যদি ইসরাইল ফিলিস্তিনি শিশুদের হত্যা করতে চায় (বা নারী, এমনকি পুরুষদেরও) তাহলে দেশটি হত্যা করবেই; কারণ যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সুচিন্তিতভাবে নীরবে সে তা বাস্তবায়ন করবে।

ইতিমধ্যে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ইসরাইলি আইন ভঙ্গকে গণহত্যা বলার বিষয়টি এড়িয়ে যাবে। বিপরীতে তারা একে ‘অভিযুক্ত যুদ্ধাপরাধ’ বলতে স্বচ্ছন্দবোধ করবে, যার অপরাধীদের কখনও ন্যায়বিচারের আওতায় আনা হবে না। গত বছরসহ বছরের পর বছর ইসরাইল কর্তৃক ফিলিস্তিনি শিশু হত্যা বিশ্ব ভুলে গেছে।

মিডলইস্ট মনিটর থেকে অনুবাদ : সাইফুল ইসলাম

রামোনা ওয়াদি : মিডলইস্ট মনিটরের স্টাফ রাইটার

Comments

comments