পুলিশে নিয়োগ পাওয়া ছাত্রলীগ নেতারাই উস্কানীদাতা!

আসন্ন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন জমা দিতে উৎসবমুখর পরিবেশে নয়াপল্টনে জড়ো হয়েছিলেন বিএনপির নেতা-কর্মীরা। কিন্তু সে উৎসবমুখর পরিবেশের চিত্র হঠাৎ করেই বদলে যায়। সহিংস হয়ে ওঠেন শান্তিপূর্ণ অবস্থানে থাকা নেতা-কর্মীরা। ঘটনার ব্যাখ্যায় বিএনপির শীর্ষ নেতারা দাবি করেছেন- তাদের অন্যতম শীর্ষ ও প্রভাবশালী নেতা মির্জা আব্বাস তার মনোনয়ন জমা দিতে নেতা-কর্মী সহ নয়াপল্টনে আসলে অতি উৎসাহী কিছু পুলিশ সদস্য বিনা কারণে তাদের সরিয়ে দিতে ও বাধা দিতে চেষ্টা করে। আর সেখান থেকেই পুলিশের সাথে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে নেতা-কর্মীরা।

কিন্তু প্রশ্ন হলো আগে দুই দিন ধরে মনোনয়ন সংগ্রহের এই কার্যক্রম একইভাবে পরিচালিত হলেও পুলিশ বিএনপির নেতা-কর্মীদের বাধা দিতে আসেনি। নেতা-কর্মীরাও কোন প্রকার উগ্র মনোভাব প্রদর্শন করেনি। তাহলে হঠাৎ করেই কেন পুলিশ সেদিন বাধা দিতে এল?

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন এর পেছনে মূলত দু’টি কারণ রয়েছে। প্রথমত: নির্বাচন কমিশনের পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ। ও দ্বিতীয়ত: জনসমাবেশকে সহিংসতায় রূপ দিতে পুলিশের অতি উৎসাহী মনোভাব।

১৩ নভেম্বর নির্বাচন কমিশন থেকে হঠাৎ করেই একটি নির্দেশনা দেয়া হয়। ইসির নির্দেশনা সম্বলিত এই চিঠিতে দাবি করা হয় ‘বিভিন্ন প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে দেখা যায়, নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার পর বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের দলীয় কার্যালয়ের সম্মুখে সম্ভাব্য প্রার্থীদের দলীয় মনোনয়ন ফরম গ্রহণ বা জমাদানের সময় মিছিল ও শোডাউন (মহড়া) করা হচ্ছে। যা সংসদ নির্বাচনে রাজনৈতিক দল প্রার্থী আচরণ বিবিমালা ২০০৮ এর ৮ ধারার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।’

উক্ত চিঠিতে আচরণ বিধিমালার ৮ বিধির ‘খ’ উপবিধির উল্লেখ করে আরও বলা হয়- ‘মনোনয়ন পত্র দাখিলের সময় রাজনৈতিক দল, মনোনয়ন প্রার্থী বা স্বতন্ত্র প্রার্থী কিংবা তাদের পক্ষে অন্য কেউ কোন প্রকার মিছিল বা শোডাউন করতে পারবে না।’

কিন্তু কৌশলে ইসির এ পক্ষপাতদুষ্ট নির্দেশনা সবারই নজর কেড়েছে। ৯ নভেম্বর থেকে শুরু করে ১২ নভেম্বর পর্যন্ত একই ভাবে রাজধানীর ধানমন্ডিস্থ আওয়ামী লীগ কার্যালয়ের সামনে মিছিল, শোডাউন করেছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। কিন্তু সেসময় নীরব ভূমিকা পালন করেছে ইসি। হঠাৎ করেই ১৩ নভেম্বর ইসির এই নির্দেশনায় অবাক হয়েছেন অনেকেই। এবং ১৩ নভেম্বরেই অনেকে ধারণা করেছিলেন যে, ইসির এই নির্দেশনা পেয়ে আগের মতই উদ্ধত আচরণ করতে পারে পুলিশ। আর পরেরদিন ১৪ নভেম্বরে সে ধারণা সত্যে রূপ নেয়।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের উল্লেখিত দ্বিতীয় কারণটি হচ্ছে পুলিশের অতি উৎসাহী মনোভাব। বিরোধী পক্ষ থেকে বরাবরই প্রশাসনে নির্লজ্জ দলীয়করণের অভিযোগ করা হচ্ছিল বিগত প্রায় দশ বছর ধরেই। আর তারই প্রমাণ মিললো ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক গোলাম রব্বানীর একটি ফেসবুক পোস্ট থেকে। বিএনপির নেতা-কর্মীদের প্রতিরোধে আহত বেশ কয়েকজন পুলিশের পদস্থ কর্মকর্তাকে দেখতে গিয়ে গোলাম রব্বানী লিখেছেন- ‘হামলায় আহত পুলিশের মতিঝিল জোনের সহকারী কমিশনার মিশু ভাই (সাবেক সভাপতি, বুয়েট শাখা ছাত্রলীগ) এবং সহকারী পুলিশ কমিশনার (পেট্রোল) ইলিয়াস ভাই (সাবেক সহ-সভাপতি, সার্জেন্ট জহুরুল হক হল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়) কে দেখতে গিয়েছিলাম রাজারবাগ কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতালে। ছাত্রলীগের গর্ব, সাহসী দুই ভাইসহ আহত সকলের দ্রুত সুস্থতা কামনা করছি।’

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন নানা বিতর্কিত কর্মকান্ড, সন্ত্রাস ও নৈরাজ্যে অভিযুক্ত ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের জনগণের নিরাপত্তা রক্ষাকারী পুলিশ বাহিনীতে গণ নিয়োগ ও রাজনৈতিক কর্মসূচিতে তাদের দায়িত্বপালনের সুযোগ দেয়ার কারণে বিরোধী মত দমনে তাদের অতি উৎসাহী মনোভাব থাকাই স্বাভাবিক। জাতীয় নির্বাচনের মত গুরুত্বপূর্ণ কাজে পুলিশের পোষাকে নিরাপত্তায় নিয়োজিত এসব দলীয় পদস্থ নেতৃবৃন্দ যদি পুলিশ ও নির্বাচন কমিশনের চেয়ে তাদের দলীয় নির্দেশনায় মনোযোগী হয়, তবে এমন সহিংসতার ঘটনা আরও ঘটতে পারে। যাতে নির্বাচনের পরিবেশ বিনষ্ট হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে।

Comments

comments