যৌতুক ফেরত দেওয়ার গল্প

কবীর উদ্দিন সরকার হারুন

‘জন্মের পর থেকে সংসারে অভাব-অনটন ছাড়া আর কিছুই দেখিনি। সংসারের ৭ ভাইবোনের অন্ন জোগাতে দিশেহারা কৃষক বাবা, জীবনের এই টানাপড়েনের মধ্যে কোনোভাবে আমি এসএসসি পাস করি। তার পর আর্থিক সংকটের কারণে থেমে যায় লেখাপড়া।

পরবর্তী সময়ে অভিভাবকের সিদ্ধান্তেই ২৫ হাজার টাকা যৌতুক নিয়ে বিয়ে করতে রাজি হই। ওই সময় যৌতুক নেওয়া সামাজিক রীতিনীতি ছিল। বিয়ের কয়েক দিন পর আমার শ্বশুর-শাশুড়ি যৌতুকের সেই ২৫ হাজার টাকা যখন আমার হাতে তুলে দেন, তখন আমি মা-বাবার সমতুল্য শ্বশুর-শাশুড়ির অশ্রুসজল চোখে-মুখে কষ্টের ছাপ দেখতে পাই। তখন থেকে আমার মনের ভেতর একটা অপরাধবোধ কাজ করতে শুরু করে। দাম্পত্য জীবনের ১৪টি বছর আমি প্রতিনিয়ত এক সীমাহীন আত্মযন্ত্রণায় পার করেছি।

বিয়ের ১৪ বছর পর প্রতিষ্ঠিত হয়ে যৌতুকের সেই ২৫ হাজার টাকা আমি আমার শ্বশুর-শাশুড়ির হাতে তুলে দিতে পেরে এই যৌতুক নামক অভিশাপ থেকে মুক্ত হতে পেরেছি।’

এভাবেই কথাগুলো বলছিলেন পল্লী চিকিৎসক মো. খোরশেদ আলম। যৌতুক দেওয়া ও নেওয়া দুটিই অপরাধ এবং যৌতুক একটি সামাজিক ব্যাধি- এ মর্ম বুঝতে পেরে যৌতুকের ২৫ হাজার টাকা ফেরত দিলেন ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলার শিবগঞ্জ বাজারের পল্লী চিকিৎসক মো. খোরশেদ আলম।

পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, উপজেলার ২নং পুটিজানা ইউনিয়নের বৈলাজান গ্রামের রওশন আলী মণ্ডলের ছেলে মো. খোরশেদ আলম ২০০৪ সালে ময়মনসিংহ সদর উপজেলার রহমতপুর গ্রামের মো. খলিলুর রহমানের দ্বিতীয় মেয়ে মোছা. তাহমিনা আক্তার লাকীকে বিয়ে করেন। বিয়ের সময় তার শ্বশুর তাকে যৌতুক হিসেবে ২৫ হাজার টাকা দিয়েছিলেন। ১৪ বছর পর ৩ সন্তানের জনক খোরশেদ যৌতুকের সম্পূর্ণ টাকা ফেরত দিয়ে সমাজে বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করায় উপজেলায় ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেন তিনি।

এ বিষয়ে খোরশেদ আরও বলেন, আমি যখন বিয়ে করি তখন বেকার ছিলাম। বিয়েতে যৌতুক নেওয়া সামাজিক প্রথা ছিল সে সময়। বিয়ের পর শ্বশুর এবং শাশুড়ি এসে ২৫ হাজার যৌতুকের টাকা দেন আমাকে। সেই যৌতুকের টাকা থেকে আমি পল্লী চিকিৎসকের প্রশিক্ষণ নিয়েছি এবং বাকি টাকা দিয়ে শিবগঞ্জ বাজারে দোকানঘর ভাড়া নিয়ে ওষুধের ব্যবসা শুরু করি।

পল্লী চিকিৎসকের প্রশিক্ষণ চলাকালে এলাকার সাধারণ মানুষ জানতে শুরু করল আমি ডাক্তারি প্রশিক্ষণ নিচ্ছি। গোটা এলাকায় আমার চিকিৎসাসেবায় হিড়িক পড়ে এবং ওষুধের দোকানে বেচাকেনা বেড়ে যেতে লাগল। এখন আমি স্বাবলম্বী। আমারও দুই মেয়ে, এক ছেলে। তাদের লেখাপড়া করাতে পারছি, সংসারে আমার আর কোনো অভাব নেই। তাই যৌতুক বাবদ আমার শ্বশুর যে টাকা দিয়েছেন তা ফেরত দিয়ে মাফ-মুক্তি চেয়েছি, তারাও আমাকে ক্ষমা করেছেন এবং দোয়া করেছেন।

ফুলবাড়িয়া উপজেলার একমাত্র নারী চেয়ারম্যান সালীনা চৌধুরী সুষমা এ বিষয়ে বলেন, অসাধারণ ব্যক্তিত্ব দেখিয়েছে এই ছেলেটি। ওর প্রতি শ্রদ্ধা জানাই, পাশাপাশি যারা যৌতুক নেয় তারা যেন এ দৃষ্টান্ত দেখে যৌতুককে না বলে সমাজকে যৌতুকের অভিশাপ থেকে মুক্ত করে।

খোরশেদ আলমের স্ত্রী তাহমিনা আক্তার লাকী বলেন, আমার স্বামী বাবার দেওয়া যৌতুকের টাকা ফেরত দেওয়ায় আমি খুব খুশি। আমার একটি মেয়ে আছে, তার বিয়েতে যেন যৌতুক দিতে না হয়। যৌতুক দেওয়া এবং নেওয়া অপরাধ।

Comments

comments