জনপ্রশাসনে বঞ্চনা ক্ষোভ হতাশা

প্রশাসনে অতিরিক্ত সচিব পদে আরেক দফায় পদোন্নতি হয়ে গেলো। এর ধারাবাহিকতায় যুগ্মসচিব এবং উপসচিব পদেও পদোন্নতি হতে যাচ্ছে। কিন্তু এর সঙ্গে বাড়ছে বঞ্চিতদের ক্ষোভ ও হতাশার মাত্রা। বাড়ছে কর্তাব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযোগের তীর এবং অস্থিরতা।

সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, জনপ্রশাসনের পদোন্নতিতে স্বেচ্ছাচারিতা ও অনিয়মের কারণে ঘুষের অভিযোগ এখন ব্যাপকতা পাচ্ছে। দেখা যাচ্ছে, সৎ ও নিষ্ঠাবানরা পদোন্নতি থেকে বারে বারে বাদ পড়ছেন। অন্যদিকে ঘুষখোর ও দুর্নীতিবাজরা পদোন্নতি পাচ্ছেন। এমনকি সরকারের ক্রাইটেরিয়ায় ভিন্ন মতাবলম্বী হিসেবে বিবেচিত কর্মকর্তারাও পদোন্নতি পেয়ে তর তর করে উপরে উঠে যাচ্ছেন।

এ প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে সরকার সমর্থিত শীর্ষ পর্যায়ের একজন সরকারি কর্মকর্তা দুঃখপ্রকাশ করে বলেন, মন্ত্রিপরিষদ সচিব গত ফেব্রুয়ারিতে এক সেমিনারে বক্তব্য রাখতে গিয়ে পদোন্নতির অনৈতিকতা সম্পর্কে যে কথাটি বলেছিলেন সেটিই যেন সত্যে পরিণত হতে যাচ্ছে। গত ২৫ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর এনইসি সম্মেলন কক্ষে অথনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের এক সেমিনারে মন্ত্রিপরিষদ সচিব শফিউল আলম বলেছেন, “কিছু জায়গায় ঘুষ দিয়ে পদোন্নতি পাওয়া একটি সংস্কৃতি হয়ে দাঁড়িয়েছে। কেউ যদি বলেন, ‘আমি ঘুষ দিব না। আমি ইমানদারির সঙ্গে কাজ করি, আমানতদারির সঙ্গে কাজ করি, সততার সঙ্গে কাজ করি, আমি কেন ঘুষ দিব?’ ওই সিস্টেমে যদি উনি সাসটেইন করতে চান তাহলে তিনি পারবেন না। তাহলে তিনি সাইড এফেক্টের শিকার হবেন।”

মন্ত্রিপরিষদ সচিব শফিউল আলমের ওই বক্তব্যটি নিয়ে ব্যাপক তোলপাড় বয়ে গিয়েছিল। তবে তিনি বক্তব্যটি শেষ পর্যন্ত প্রত্যাহারও করে নেননি। কিন্তু, জনপ্রশাসনে পদোন্নতির ক্ষেত্রে তার সেই বক্তব্যটিই যে হুবহু মিলে যাচ্ছে, এটি এখন অনেকে বলছেন। যদিও এ পদোন্নতিগুলো হচ্ছে তারই নেতৃত্বে।

অতিরিক্ত সচিব পদে পদোন্নতির এই প্রক্রিয়াটি চলছিল বেশ কিছুদিন ধরেই। বলা হচ্ছিল, শোকের মাস আগস্টে পদোন্নতির আদেশ জারি করা হবে না। সেপ্টেম্বরের প্রথমদিকে প্রজ্ঞাপন জারি হবে। কিন্তু, পদোন্নতি প্রত্যাশী প্রভাবশালীদের তর আর সইছিল না। তাদের চাপে অবশেষে আগস্টেই পদোন্নতির প্রজ্ঞাপন জারি করতে হলো। গত ২৯ আগস্ট আলাদা দুটি প্রজ্ঞাপনে ১৫৪ জন ও ৬ জন, মোট ১৬০ জনের প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। বিদেশে দূতাবাসে কর্মরত আছেন ৬ জন, তাই তাদের প্রজ্ঞাপন আলাদাভাবে জারি করতে হয়েছে। এছাড়া একই সার-সংক্ষেপে লিয়েনে থাকা আরো ৩ জনের পদোন্নতি অনুমোদন করেছেন প্রধানমন্ত্রী। লিয়েন শেষে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে যোগ দিলে তাদের পদোন্নতির আদেশ জারি হবে।

এই ১৬৩ জনের পদোন্নতির বিপরীতে বঞ্চিত হয়েছেন দুই শতাধিক কর্মকর্তা। যাদের সবাই যোগ্য। তবে কর্তৃপক্ষের দাবি, তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা বিচারাধীন অথবা চাকরির গোপন প্রতিবেদনে বিরূপ মন্তব্য থাকায় পদোন্নতি দেয়া সম্ভব হয়নি। জানা গেছে, বঞ্চিতদের অনেকেই বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময় মন্ত্রীদের একান্ত সচিব (পিএস), প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, বিভাগীয় কমিশনার অথবা জেলা প্রশাসকসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে কর্মরত ছিলেন। এটিই তাদের অপরাধ।

কিন্তু দেখা যাচ্ছে, এই ক্রাইটেরিয়াও অনেক ক্ষেত্রে প্রতিপালিত হয়নি। বিএনপি আমলে মন্ত্রীদের পিএস, জেলা প্রশাসকসহ গুরুত্বপূর্ণ পদে কাজ করেছেন এমনও অনেকে ইতিপূর্বে পদোন্নতি পেয়েছেন। বিএনপি আমলে গুরুত্বপূর্ণ জেলায় ডিসি পদে কাজ করেছেন এমন কেউ কেউ ইতিপূর্বে বর্তমান সরকারের আমলে সচিবও হয়েছেন। সর্বশেষ এই পদোন্নতিতে দেখা যাচ্ছে, এমন কর্মকর্তাও পদোন্নতি পেয়েছেন যিনি সরকারি সফরে বিদেশ গিয়ে চুরির দায়ে বিভাগীয় মামলায় অভিযুক্ত হয়েছিলেন। অন্যদিকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী কর্মকর্তারাও অনেকে পদোন্নতি পাননি।

যদিও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (এপিডি) শেখ ইউসুফ হারুন এই পদোন্নতি প্রসঙ্গে গণমাধ্যমকে বলেছেন, এবার যোগ্য কোনো কর্মকর্তাকে বঞ্চিত করা হয়নি। যাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা, এসিআর খারাপ, বেঞ্চমার্ক কম ছিল, তারা বাদ পড়েছেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, শেখ ইউসুফ হারুনের বক্তব্য মোটেই সঠিক নয়। কারণ খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, যারা বঞ্চিত হয়েছেন এদের অধিকাংশের চাকরি জীবনে কোনো খুঁত নেই। এসিআর, বেঞ্চমার্ক সবই ভালো। শুধুমাত্র গোপন গোয়েন্দা রিপোর্টের দোহাই দিয়ে তাদেরকে পদোন্নতি বঞ্চিত করা হয়েছে। বাস্তবে ওই গোয়েন্দা রিপোর্টও অধিকাংশ ক্ষেত্রে সঠিক নয়, অর্থাৎ ভুয়া। ভিন্ন মতাবলম্বী বা বিরোধী দলের সমর্থক বলে আখ্যায়িত করা হলেও বাস্তবে তা অনেক ক্ষেত্রেই সত্য নয়। বস্তুত, অর্থ লেনদেন করতে পারেননি বলেই এরা পদোন্নতি পাননি। মন্ত্রিপরিষদ সচিব শফিউল আলমের ভাষায়, এরা ঘুষ না দিয়ে সাসটেইন করতে চান। আর সেই কারণেই সাইড এফেক্টের শিকার হচ্ছেন।

পদোন্নতি বঞ্চিত একজন কর্মকর্তা ক্ষোভ প্রকাশ করে এ প্রতিবেদককে বলেন, তদবির ও টাকা-পয়সার জোরে সরকারবিরোধী মতাদর্শের কর্মকর্তারাও পদোন্নতি বাগিয়ে নিয়েছেন। চুরির দায়ে বিভাগীয় মামলা হয়েছে- এমন কর্মকর্তাও এবার পদোন্নতি পেয়েছেন। অথচ আমার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই। বছরের পর বছর সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দক্ষতা ও সততার সঙ্গে পালন করে আসছি।

এই কর্মকর্তা জানান, অতিরিক্ত সচিব পদে পদোন্নতি পাইয়ে দেয়ার জন্য তার কাছে একাধিকবার দালাল এসেছিল। ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত চাওয়া হয়েছিল। এমনকি একজন সুন্দরী মহিলা দালালও এসেছিল। কিন্তু তিনি ওই দালালদের পাত্তা দেননি। তাই তার পদোন্নতিও হয়নি। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, জনপ্রশাসনের পদোন্নতিতে ‘ঘুষ’ এখন ওপেন সিক্রেট। যেভাবে ‘ঘুষ সংস্কৃতি’ চালু হয়েছে তাতে কারো পক্ষেই আর সৎভাবে সাসটেইন করা সম্ভব হবে না।

Comments

comments