মাদকসেবনের দায়ে গ্রেফতার হয়েছিলেন ছাত্রলীগ সভাপতি শোভন!

অনেক জল্পনা-কল্পনা, আলোচনা-সমালোচনার পর সম্মেলনের আড়াই মাস অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে গত ৩১ জুলাই ঘোষণা করা হয় ছাত্রলীগের কমিটি। গত ১১ ও ১২ মে ছাত্রলীগের জাতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হলেও মূলত তা ছিল অনেকটা লোক দেখানো। কারণ, সম্মেলনের মূল উদ্দেশ্যই উপেক্ষিত হওয়ার দৃষ্টান্ত স্থাপন করা হয়। সংগঠনের কাউন্সিলরদের প্রত্যক্ষ ভোটাধিকার হরণ করে দলীয় নেত্রী শেখ হাসিনার একক সিদ্ধান্তের ওপরই ছেড়ে দেয়া হয় সাম্ভাব্য নতুন কমিটি।

গত মে মাসের ১১ ও ১২ তারিখে ছাত্রলীগের ২৯তম জাতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। দ্বিতীয় অধিবেশনের পর কমিটি ঘোষণার নিয়ম থাকলেও শীর্ষ পদের নেতৃত্ব বাছাইয়ে সময় নেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা।

ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদপ্রত্যাশী ৩২৩ জনের জীবনবৃত্তান্ত বিভিন্ন মাধ্যমে যাচাই-বাছাইয়ের পর এসব নেতার অনেককেই গণভবনে ডাকেন শেখ হাসিনা।

সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক হিসেবে ৯-১০ জনের একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা থেকে বিভিন্ন দিক ও বিষয় বিবেচনা করেই ঘোষণা করা হয় সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের নাম। নেতৃত্ব নির্বাচনে পারিবারিক ব্যাকগ্রাউন্ড, সাংগঠনিক প্রজ্ঞা, মেধা ও যোগ্যতা এবং গঠনতান্ত্রিক বাধ্যবাধকতাকে প্রাধান্য দেয়ার কথা থাকলেও সভাপতি হিসেবে যার নাম ঘোষণা করা হয় তা দেখে চমকে গেছেন ছাত্রলীগের সিনিয়র অনেক নেতাই।

নব মনোনীত ছাত্রলীগ সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভনের পিতার পারিবারিক ব্যাকগ্রাউন্ড আওয়ামী লীগ হলেও ব্যক্তিগত জীবনে সে মাদকাসক্ত বলেই দলে পরিচিতি রয়েছে। এমনকি ২০১৭ সালের ৭ জুলাই সোহরাওয়ার্দী উদ্যান থেকে মাদক সেবনরত অবস্থায় তাকে আটক করেছিল শাহবাগ থানা পুলিশ।

জানা যায়, সেসময় সন্ধ্যার পর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও আটককৃত ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা সেখানে প্রবেশ করে মাদক সেবন করছিলেন। খবর পেয়ে পুলিশ সেখানে গিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মহসিন হল শাখা ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক রেজোয়ানুল হক চৌধুরী ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি গোলাম রাব্বীসহ ২৬ জনকে হাতেনাতে ধরে ফেলে। শোভনসহ ২৬ জন ছাত্রলীগের নেতা-কর্মী গ্রেফতারের খবর দৈনিক কালেরকণ্ঠসহ বেশ কয়েকটি পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। যদিও সাম্প্রতিক সময়ে কালেরকণ্ঠ তাদের ওয়েবসাইট থেকে এই খবরটি সরিয়ে দিয়েছে। এছাড়াও ইতোপূর্বে বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে বিভিন্ন সময় মদ-গাঁজা ও ইয়াবা সেবন নিয়ে বিতর্কের জন্ম দেয় শোভন।

অথচ সেই বিতর্কিত ছাত্রলীগ নেতা রেজোয়ানুল হক চৌধুরী শোভনকেই গত ৩১ জুলাই ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি ঘোষণা করা হয়েছে। অবশ্য এরপর থেকেই নড়েচড়ে বসতে শুরু করেছেন ছাত্রলীগের সিনিয়র নেতৃবৃন্দ।

বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, ছাত্রলীগ সভাপতি শোভন বিবাহিত। অথচ বিবাহিত কাউকে ছাত্রলীগের দায়িত্বশীল করা গঠনতন্ত্র বিরোধী। ছাত্রলীগের গঠনতন্ত্রের ৫(গ) ধারায় বলা হয়েছে, বিবাহিত, ব্যবসায়ী ও চাকরিতে নিয়োজিত কোনো ছাত্র ও ছাত্রী ছাত্রলীগের কর্মকর্তা হতে পারবে না।

বিশ্বস্ত ঐ সূত্রের তথ্য অনুযায়ী ছাত্রলীগ সভাপতি শোভনের স্ত্রীর নাম তহুরা সাবিহা বিথি। যিনি কুড়িগ্রামের শিলখুড়ি সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চাকুরী করেন। তার শ্বশুরের নাম আব্দুস সামাদ, পেশা-ব্যবসা, গ্রাম-লক্ষির মোড় বঙ্গসোনাহাট, ইউনিয়ন-সোনাহাট, উপজেলা- ভুরুঙ্গামারী, জেলা- কুড়িগ্রাম।

এছাড়া বিভিন্ন গণমাধ্যমে শোভনের পিতার পারিবারিক পরিচিতি তুলে ধরা হলেও সুকৌশলে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে তার মায়ের পারিবারিক পরিচিতি। সংবাদ মাধ্যমে তার পিতার পারিবারিক পরিচিতিতে শোভনের দাদা মুক্তিযোদ্ধা শামসুল হক চৌধুরীর রাজনৈতিক জীবন তুলে আনা হলেও আলোচনায় আসেনি তার নানার রাজনৈতিক পরিচিতি।

অভিযোগ রয়েছে, শোভনের নানা গিয়াস মেম্বার মমিনগন্জ নাগেশ্বরী ৭১ পিস কমিটির সদস্য ছিল। চিহ্নিত রাজাকার হিসাবে মুক্তিযাদ্ধা সংসদ কর্তৃক রাজাকারের তালিকায় তার নাম রয়েছে।

অভিযোগকারীরা বলছেন, শোভনের আপন চাচা নিখিল চৌধুরী জেএমবির সামরিক কমান্ডার মতিন মেহেদী’র সহচর। সেই মামলায়, মতিন মেহেদী, নিখিল চৌধুরী সহ ১১ জন গ্রেফতার হয়ে দীর্ঘ দিন জেলে ছিলো।

এত এত গুরুতর অসঙ্গতি থাকার পরেও কিভাবে ছাত্রলীগের শীর্ষ নেতৃত্বে এই মাদকাসক্ত নেতা উঠে আসলো তা অনেকের কাছেই এখন আশ্চর্যের বিষয়। বিশেষত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা অনেকটাই হতবাক। অথচ এই কমিটি করতে রাষ্ট্রীয় বেশ কয়েকটি গোয়েন্দা সংস্থার সহযোগিতা নেয়া হয়েছে বলে জানা যায়।

অবশ্য এর বিরূপ প্রতিক্রিয়া এরই মধ্যে লক্ষ্য করা যাচ্ছে। গতকাল ১৪ আগস্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের আয়োজিত শোক দিবসের আলোচনা শেষে নিজ দলের কর্মীদের হাতেই গণধোলাইয়ের শিকার হন নব মনোনীত ছাত্রলীগ সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন। সভাপতি হিসেবে দায়িত্বগ্রহণের ১৪ দিনের মাথায় নিজ ক্যাম্পাসে গণরোষের শিকার হওয়াকে ভালো কোন ইঙ্গিত মনে করছেন না রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

তথ্যসূত্র:

  1. দৈনিক কালেরকণ্ঠ
  2. দৈনিক আমাদের সময়
  3. বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
  4. আরটিভি অনলাইন
  5. জাগোনিউজ২৪.কম

Comments

comments