শিক্ষার্থীদের উপর ছাত্রলীগের বর্বরোচিত হামলা, ১২টি ছাত্র সংগঠনের নিন্দা

ছাত্রসমাজের উপর পুলিশ ও ছাত্রলীগের যৌথ হামলা এবং নির্বিচারে গ্রেপ্তারে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ১২টি ছাত্রসংগঠনের নেতৃবৃন্দ।

এক যৌথ বিবৃতিতে ছাত্র নেতৃবৃন্দ বলেন, গত ২৯ জুলাই রোববার রাজধানী ঢাকার কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের সামনে বিমানবন্দর সড়কের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় অনিয়ন্ত্রিত বাস বাসচাপায় মৃত্যু হয় শহীদ রমিজউদ্দীন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্র আবদুল করিম এবং একাদশ শ্রেণির ছাত্রী দিয়া খানমের। শিক্ষার্থীদের এই মর্মান্তিক মৃত্যুতে দেশবাসী যখন শোকে কাতর তখন সাংবাদিকদের সামনে নিহত দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যুতে নৌ-পরিবহন মন্ত্রী হাসি তামাশা করে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে ছিলেন। লজ্জাজনক ভাবে বেপরোয়া খুনিদের আড়াল করতে তিনি ভারতের সড়ক দূর্ঘটনার কথা টেনে এনে বিকৃত মানসিকতার পরিচয় দিয়েছেন। তার এ ঘৃন্য আচরণ নতুন নয়। সড়ক পরিবহন শ্রমিক ও মালিকদের সকল অন্যায় নির্মমতার পক্ষে সাফাই গেয়েছেন নৌ-মন্ত্রী। নৌ-মন্ত্রীর এমন দায়িত্বহীন, তামাশা ও বিদ্রুপপূর্ণ আচরণে ফুসে উঠেছে সর্বস্তরের মানুষ। মন্ত্রীকে বহাল রেখে সরকারের দাবী মেনে নেয়ার প্রতারণা শিক্ষার্থীরা মেনে নেয়নি। শান্তিপূর্ণভাবে নিরাপদ সড়কের জন্য আন্দোলন করছিল ছাত্র-ছাত্রীরা।

কিন্তু যৌক্তিক আন্দোলন দমাতে সরকার সন্ত্রাসের পথ বেছে নিয়েছে। আন্দোলন শুরু হওয়ার পর যাত্রাবাড়ী, মিরপুর, আসাদগেট, ফেনী, সুনামগঞ্জ, নারায়নগঞ্জসহ বিভিন্ন স্থানে পুলিশ ও ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা প্রকাশ্যে হামলা চালিয়েছে। তারই ধারাবাহিকতায় গত ৪ আগষ্ট সম্পূর্ণ বিনা উস্কানিতে ধানমন্ডি আওয়ামী লীগের অফিস থেকে ছাত্রলীগের সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা হেলমেট পড়ে আগ্নেয়াস্ত্র, রামদা ও অন্যান্য অস্ত্র দিয়ে বর্বর হামলা চালিয়ে কোমলমতি ছাত্র-ছাত্রীদের রক্তাক্ত ও জখম করেছে। আজও ইষ্ট ওয়েষ্ট ইউনিভার্সিটিতে পুলিশ ও ছাত্রলীগ নির্বিচারে তাদের উপর গুলি, টিয়ারসেল নিক্ষেপ ও লাঠিচার্জ করেছে। এসময় ক্যাম্পাসের ভিতেরও নিরীহ ছাত্রদের উপর তান্ডব চালিয়েছে পুলিশ ও আওয়ামী সন্ত্রাসীরা। বাসা বাড়ীতে আশ্রয় নেয়া শিক্ষার্থীদের ধরে এনে বেধড়ক পিটিয়েছে পুলিশ। বসুন্ধরা এলাকায় নর্থসাউথ বিশ্ববিদ্যালয়, আহছানউল্লাহ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের উপর আজ একই কায়দায় হামলা চালিয়েছে পুলিশ ও আওয়ামী সন্ত্রাসীরা। অন্যায়ভাবে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বহু ছাত্রকে। ন্যায্য দাবী চাইতে গিয়ে বার বার রক্তাক্ত হচ্ছে শিক্ষার্থীরা। অনেক শিক্ষার্থী গুরুতর আহত হয়েছে। আমরা পুলিশ ও ছাত্রলীগের কাপুরুষোচিত বর্বরতার তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি।

এর আগে কোটা সংস্কারের যৌক্তিক আন্দোলনেও প্রধানমন্ত্রী মহান সংসদে দাঁড়িয়ে কোটা বাতিলের ঘোষণা দিয়ে পরে নিজের ওয়াদা নিজেই ভঙ্গ করেছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার বাস্তবায়নের দাবীতে শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে পুলিশ ছাত্রলীগকে লেলিয়ে দিয়েছিল সরকার। যারা ছাত্রদের হাতুরি পেটা ও প্রকাশ্য ছাত্রীদের শ্লীলতাহানী করেছিল। ছাত্রীদেরকে গভীর রাতে হল থেকে বের করে দিয়েছিল। কোটা সংস্কারের আন্দোলনের নেতাদের নির্মম নির্যাতন ও গ্রেপ্তার করেছিল। এখানেও সরকার শিক্ষার্থীদের দমনে আত্মঘাতি পথে অগ্রসর হচ্ছে। আজ যেই সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮ মন্ত্রিসভায় চুড়ান্ত অনুমোদন হয়েছে তা ছাত্রদের দাবীর সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ শাস্তির দাবী থাকলেও তা উপেক্ষা করা হয়েছে।

নেতৃবৃন্দ বলেন, আজকের শিক্ষার্থীরা আগামী দিনের দেশ গড়ার কারিগর। তাদের সার্বিক নিরাপত্তা ও সুবিধা দেয়ার কথা সরকারেই। কিন্তু জীবনের নিরাপত্তা চাইতে গিয়ে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা সরকারের ইন্ধনে যে বর্বরতার শিকার হচ্ছে তা অকল্পণীয়। শিক্ষার্থীদের উপর প্রতিটি আঘাত প্রতিটি মানুষের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হচ্ছে। এমন বর্বরতা অব্যাহত রাখলে ছাত্রজনতার ক্ষোভের বিষ্ফোরণ ঘটতে পারে। কোমলমতি শিক্ষার্থীরা জাতিকে দেখিয়ে দিয়েছে যে সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে কিভাবে অনিয়ম দুর্নীতির প্রসার হয়েছে। রাষ্ট্রের বড় বড় কর্তা ব্যক্তিরাই কিভাবে আইন লঙ্ঘন করে চলেছেন। কোমলমতি শিক্ষার্থীদের পাশে দেশের আপামর ছাত্রসমাজ দাঁড়িয়েছে। যেখানে পুরো ছাত্র সমাজ তাদের পাশে দাঁড়িয়েছে সেখানে তাদের পেছনে সন্ত্রাসী ছাত্রলীগকে লেলিয়ে দেয়া হয়েছে। পুলিশ দিয়ে গুলি, টিয়ারসেল, লাঠিচার্জ ও গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। যা গভীর উদ্বেগের বিষয়।

শত নির্যাতন ও রক্তাক্ত হওয়ার পরও শিক্ষার্থীরা আন্দোলন অব্যাহত রেখেছে। পূর্ণাঙ্গ দাবী আদায় না করে তারা ঘরে ফিরে যাবেনা। ছাত্র সমাজসহ সর্বস্তরের জনগণ তাদের পাশে আছে। সুতরাং শিক্ষার্থীদের দাবী নিয়ে সরকার যদি তাদের হঠকারী সিদ্ধান্তে অটল থাকে তাহলে তা আত্মঘাতি হবে। অবিলম্বে নৌমন্ত্রী শাহজাহান খানের পদত্যাগ, নিরাপদ সড়ক ও ঘাতক চালকদের দ্রুত বিচার ও ফাঁসিসহ সকল দাবী কার্যকর করতে হবে। শিক্ষার্থীদের উপর হামলাকারী ছাত্রলীগ যুবলীগ সন্ত্রাসীদের বিচারের আওতায় আনতে হবে। আগামী দেশ গড়ার কারিগর শিক্ষার্থীদের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ও সুবিধা নিশ্চিত করতে কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

বিবৃতি প্রদানকারী ছাত্র নেতৃবৃন্দ হচ্ছেন, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি ইয়াছিন আরাফাত, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্র মজলিসের কেন্দ্রীয় সভাপতি ইলিয়াস আহমেদ, জাতীয় ছাত্রসমাজ (কাজী জাফর) আহবায়ক মামুনুল হাসিব ভূইয়্যা, ছাত্র জমিয়ত সভাপতি তোফায়েল গাজ্জালি, জাগপা ছাত্রলীগ সভাপতি রুবেল হোসেন, ছাত্র কল্যাণ পার্টি সভাপতি শেখ তামিম, জমিয়তে তালাবায়ে আরাবিয়া সভাপতি আব্দুর রহমান, বাংলাদেশ ছাত্র মিশন (ইরান) সভাপতি সালমান খান বাদশা,বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্র আন্দোলন সভাপতি সৈয়দ মো. মহসিন, বাংলাদেশ ছাত্র মিশন (মেহেদী) সভাপতি মোঃ কামরুজ্জামান সুরুজ, বাংলাদশ জাতীয় ছাত্রদল সভাপতি শাওন সাদেকী, ন্যাশনাল ছাত্র পার্টি সভাপতি সোহেল রানা।

Comments

comments