রাশেদ তো আপনার সন্তানের মতোই

আমার ছেলে রাশেদ রাজনীতির সঙ্গে জড়িত না। সে কোনো অপরাধ করেনি। ওর আব্বু সারা জীবন রাজমিস্ত্রীর কাজ করে ওকে পড়ালেখা করিয়েছে। ওতো শুধু চাকরিই চেয়েছিল। প্রধানমন্ত্রীর সন্তানের মতো সে। দয়া করে আপনি আমার সন্তানকে মুক্ত করে দিন।

গতকাল জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়া আয়োজিত এক মানববন্ধনে নিজের ছেলেকে ফিরে পাওয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রীর কাছে অশ্রুসিক্ত হয়ে এই আকুতি জানান কোটা সংস্কার আন্দোলনরত বাংলাদেশ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের যুগ্ম আহ্বায়ক রাশেদ খানের পিতা-মাতা।

মানববন্ধনে রাশেদের মা সালেহা বেগম বলেন, আমার ছেলে তো কারো ক্ষতি করেনি। কোন অন্যায় করেনি সে। তাহলে কেন তাকে পুলিশ ধরে নিয়ে গেল। তিনি বলেন, অনেক বড় বড় দুর্ধর্ষ আসামিকেও রিমান্ডে নেয়া হয় না। কিন্তু আমার ছেলেকে জিজ্ঞাসার নামে ১৫টা দিন রিমান্ডে নেয়া হয়েছে। অশ্রুসিক্ত চোখে প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে গাগলপ্রায় মা বলেন, আপনিও তো মা। আপনারও তো সন্তান আছে। রাশেদতো আপনার সন্তানেরই মতো। সে তো একজন সাধারণ ছাত্র। তাহলে কেন সে আজ কারাগারে মরবে। তাকে মুক্ত করতে একমাত্র আপনিই পারেন। দয়া করে আপনি আমার ছেলেকে মুক্ত করে দিন। আমার সন্তানকে আমার বুকে ফিরিয়ে দিন। আমি আমার সন্তানকে ফেরত চায়।

এ সময় রাশেদের পিতা নবাই বিশ্বাস বলেন, আমার ছেলে কোনো রাজনীতির সঙ্গে জড়িত নয়। আমার সকল জমি-জমা বিক্রি করে ওকে আমি ঢাকায় পড়ালেখা করিয়েছি। তবুও আজ আমার ছেলে সেই রাজনীতির শিকারে পরিণত হয়েছে। সে তো খারাপ কিছু করেনি। সে তো শুধু চাকরির জন্যই আন্দোলনে নেমেছিল। কিন্তু আজ তাকে পুলিশ ধরে নিয়ে গেল। আমি সারা জীবন রাজমিস্ত্রীর কাজ করে সংসার চালালেও আমাকে ও আমার সন্তানকে এখন জামায়াত-শিবির ও জঙ্গি বলা হচ্ছে। তিনি বলেন, আমি বা আমার সন্তান কেন, আমাদের পরিবারের কেউ-ই কোনোদিন কোনো রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলাম না, নেই। প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে তিনি বলেন, আমি একজন সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ। আপনিই আমাদের ভরসা। আপনিই পারেন আমার ছেলেকে ফিরিয়ে দিতে। আপনি আমার ছেলে রাশেদসহ কোটা সংস্কার আন্দোলনে গ্রেপ্তার হওয়া সকলকেই মুক্ত করে দিন।

ঘুষ-দুর্নীতি বন্ধ ও কোটা সংস্কার আন্দোলনে আটককৃতদের মুক্তির দাবিতে আয়োজিত মানববন্ধনে জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার সভাপতি আ.স.ম শফিউল্লাহ বলেন, আমি এই কোটা প্রক্রিয়ার ঘোর বিরোধিতা করছি। তিনি বলেন, আমরা মুক্তিযুদ্ধ করেছিলাম দেশের মানুষকে মুক্ত করার উদ্দেশে। কিন্তু দেশের মানুষ আজও পুরোপুরি স্বাধীন না। তিনি বলেন, সংবিধানে স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে, দেশের প্রতিটি নাগরিকই সমান অধিকার পাবে। তাহলে এখানে কোটার প্রয়োজনটা কোথায়। যুদ্ধের সময় থেকে এখন দেশে মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা কয়েকগুণ বেড়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমার এলাকাসহ বিভিন্ন স্থানে দেখেছি মুক্তিযুদ্ধের সময় যাদের বয়স মাত্র ১০-১২ বছর ছিল তারা আজ মুক্তিযোদ্ধার ভাতা পাচ্ছেন। প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের নাম লিস্টে না থাকলেও টাকা হাতাতে অনেকেই আজ মুক্তিযোদ্ধা হয়েছেন। আর এজন্যই আজ রাজমিস্ত্রীর কাজ করার পরও রাশেদের পিতাকে জঙ্গি বলা হচ্ছে।

মানববন্ধনে মূল বক্তা হিসেবে মুক্তিযোদ্ধা মো. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, বঙ্গবন্ধুর তৈরি করা সেই সংবিধানের প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত কোথাও কোনো কোটার কথা লেখা নেই। লেখা আছে, যোগ্যতার প্রাধান্য সবার আগে। তাই কোটা আন্দোলনের প্রথমদিকে একটু রাগ করে হলেও নিজের পিতার প্রতি সম্মান দেখিয়ে প্রধানমন্ত্রী কোটা পদ্ধতি বাতিলের ঘোষণা দেন। কিন্তু তারপর থেকেই এই আন্দোলন নিয়ে শুরু হয়েছে অপরাজনীতি।

প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, এইসব কোটা পদ্ধতি বাদ দিয়ে আন্দোলন ও এই রাজনীতির অবসান ঘটান। আর সম্মান যদি দিতে হয় আহত ও যুদ্ধে শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি সম্মান দেখান। আর সেই সম্মান হবে, তাদের সন্তানদের উচ্চশিক্ষিত করা। মানববন্ধন শেষে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য আরোপিত ৩০ শতাংশ কোটা কমিয়ে ৫ শতাংশে আনতে হবে, জেলা কোটা ১০ শতাংশকে কমিয়ে ৫ শতাংশে, নারী কোটা ১০ শতাংশ থেকে ৫ শতাংশে, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী ১০ শতাংশ কোটাকে ৫ শতাংশে এবং প্রতিবন্ধীদের জন্য ১ শতাংশ কোটা আছে তা বহাল রেখে মোট ২১ শতাংশ কোটা ব্যবস্থা চালু করার দাবি জানানো হয়। বক্তারা বলেন, আমাদের পার্শ্ববর্তী ভারত এতো বড় রাষ্ট্র হওয়া সত্ত্বে¡ও সেখানে ২২ শতাংশ কোটা বহাল রয়েছে। তাই আমাদের দেশে কোটা ২১ শতাংশ হলেও তা হবে অনেক।

 

 

সুত্র: মানবজমিন

Comments

comments