খুলনার স্টাইলের নির্বাচনের পূর্বাভাস রাজশাহীতেও

রাজশাহীতে বিরোধীদলের নেতা-কর্মীদের ধরপাকড়, বাড়ি বাড়ি অভিযান এবং নাশকতা পরিকল্পনার অভিযোগে ও বিস্ফোরক আইনে নতুন মামলা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।  বিরোধীরা বলছে যে সিটি করপোরেশন নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর নতুন তিনটি মামলা দেওয়া হয়েছে।  এসব মামলায় মোট আসামি ১,১৭৮ জন।  এ পর্যন্ত আটক করা হয়েছে ২৯ জনকে।  এসব ঘটনাকে খুলনা নির্বাচনের মত একটি নির্বাচনের পূর্বাভাস হিসেবে দেখছে বিরোধীদল।

বিএনপির মেয়র প্রার্থী মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল সাংবাদিকদের জানান, সরকার খুলনা ও গাজীপুরের মতো নির্বাচনী এজেন্টদের তাড়িয়ে দেওয়া বা ভোটের আগেই এলাকাছাড়া করার পাঁয়তারা করছে।  সে জন্য তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তাঁর প্রত্যেক নির্বাচনী এজেন্টের নাম-পরিচয় ও ছবি স্থানীয় পত্রিকায় ছেপে দেবেন।  নির্বাচন কমিশন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকেও সেই তালিকা দেবেন।  তিনি বলেন যে এখন পর্যন্ত সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি হয়নি।  যেভাবে ভীতিকর পরিবেশ তৈরির চেষ্টা চলছে, তা খুলনা স্টাইলের নির্বাচনের পূর্বাভাস বলে তাঁর মনে হচ্ছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নগরীর তিনটি থানায় বিরোধীদলের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে তিনটি নতুন মামলা করেছে পুলিশ।  এসব মামলায় গ্রেপ্তার আছেন ৬ জন, আসামি ১৭৬।

জানা যায়, নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকে রাজশাহী মহানগর এলাকায় কোন প্রকার নাশকতা, বিস্ফোরক দ্রব্য বিস্ফোরণ এর ঘটনা ঘটেনি।  প্রশাসনের সাজানো মামলায় নির্বাচনী কাজে নিয়োজিত গুরুত্বপূর্ণ নেতা-কর্মীদের আসামি করা হয়েছে।  আবার অজ্ঞাতনামা আসামিও রয়েছে, যাতে যে কাউকে ধরে এসব মামলায় কারাগারে পাঠানো যায়।

সর্বশেষ মামলা দেওয়া হয়েছে গত বৃহস্পতিবার রাজপাড়া থানায়।  ১৬ জনের নাম আসামির তালিকায় রেখে পুলিশের উপপরিদর্শক টি এম সেলিম রেজা বাদী হয়ে এ মামলা করেন। এই মামলায় তিনজন জামায়াত কর্মীকে আটক করে পুলিশ।  তাঁরা হলেন- রাজপাড়া থানার তেরখাদিয়া এলাকার নূরুল ইসলাম (৩৫), তেরখাদিয়া স্টেডিয়ামপাড়া এলাকার সাজ্জাদুল হক (৬৫) ও নতুন বিলসিমলা এলাকার দিলদার আলী ওরফে জনি (৩২)।

বিরোধীদল বলছে, এজাহারভুক্ত আসামিদের বেশির ভাগই তাদের নেতা-কর্মী।  এর মধ্যে ৫ নম্বর আসামি শফিকুল ইসলাম রাজপাড়া বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন।  সংবাদ সম্মেলন করে তিনি বিএনপি ত্যাগ করেছিলেন।  তাঁকেও আসামি করা হয়েছে।  শফিকুল ইসলাম বলেন যে প্রায় পাঁচ বছর আগে তিনি বিএনপি ছেড়েছেন।  মামলার কথা শুনে তিনি অবাক হয়েছেন।

এর আগে ৮ ও ৯ জুলাই নগরের কাশিয়াডাঙ্গা থানায় দুটি মামলা করে পুলিশ।  এমামলায় ১ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক নূরুল ইসলাম ও ২ নম্বর ওয়ার্ড স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সভাপতি আমিনুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করা হয়।  পরে এই দুজনসহ আরও দেড় শ অজ্ঞাতনামা আসামির বিরুদ্ধে নাশকতার পরিকল্পনা ও বিস্ফোরক দ্রব্য বহনের অভিযোগে দুটি মামলা দিয়ে আদালতে সোপর্দ করা হয়।

 

আমিনুল ইসলামের স্ত্রী তামান্না শিরিন সাংবাদিকদের বলেন, আমিনুলকে ৭ জুলাই রাত সাড়ে ১১টার দিকে বাসার ফটক থেকে আটক করে পুলিশ। পরদিন তাঁকে সাজানো মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়। আমিনুল একজন ক্রীড়াবিদ। তিনি ভারোত্তোলনের জন্য স্বর্ণপদক পেয়েছেন।

এরপর ৯ জুলাই বোয়ালিয়া থানা পুলিশ ১৩ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি শফিকুল ইসলামকে নাটকীয় ভাবে গ্রেপ্তার করে। তাঁকেসহ বিএনপির আটজনকে আসামি করে মামলা দেয় পুলিশ।

বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও রাজশাহীর সাবেক মেয়র মিজানুর রহমান মিনু অভিযোগ করেন, তাঁদের এ পর্যন্ত ২৯ নেতা-কর্মীকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে। শত শত নেতা-কর্মীর বাড়িতে অভিযান চালানো হয়েছে।

বিএনপির ২৯ জনকে আটকের অভিযোগ সম্পর্কে মহানগর পুলিশের মুখপাত্র জ্যেষ্ঠ সহকারী কমিশনার ইফতে খায়ের আলম বলেন, পুলিশের নিয়মিত মাদকবিরোধী ও নাশকতাবিরোধী অভিযানে কেউ আটক হতে পারে। এর মধ্যে রাজনৈতিক কারণে কোনো আটক বা অভিযান নেই।

পুলিশের অভিযানের বাইরেও রাজশাহীতে পোস্টার ছিঁড়ে ফেলা ও প্রচারে বাধা দেওয়ার ঘটনা ঘটছে। এ ছাড়া সব জায়গায় সরকারি দলের প্রার্থীর পোস্টার-ফেস্টুনে ছেয়ে যাওয়ায় অন্যদের জন্য কোনো খালি জায়গা নেই বলে অভিযোগ করেছেন বিরোধীদল সহ অন্য দলের প্রার্থীরাও।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ তোফায়েল আহমেদ সাংবাদিকদের বলেন, নির্বাচন সামনে রেখে বিএনপি নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় প্রশাসনের হস্তক্ষেপের শামিল।  নির্বাচন কমিশনের উচিত বিষয়টিকে গুরুত্বের সাথে দেখা।  কেননা এ ধরনের তৎপরতার মধ্য দিয়ে নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করা হচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে হবে।  এখন বল নির্বাচন কমিশনের কোর্টে, দেখা যাক তারা কী করে।

 

 

সুত্র:প্রথম আলো

Comments

comments