সুহেল নেই, সুহেল আছে

কোটা সংস্কার আন্দোলনের সংগঠন বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের যুগ্ম আহ্বায়ক এ পি এম সুহেলকে ঢাকার শান্তিনগরে একটি বাসা থেকে ‘ডিবি পরিচয়ে’ তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া যায় গতকাল ভোরেই।

বৃহস্পতিবার ভোর পাঁচটার দিকে চামেলীবাগে ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি লাকি আক্তার ওরফে শাহবাগী লাকীর বাসা থেকে সাদাপোশাকে কয়েকজন ব্যক্তি তাঁকে তুলে নিয়ে গেলেও পুলিশের গোয়েন্দা শাখা ডিবি’র একাধিক সূত্র জানায়, তারা ওই নামে কাউকেই আটক বা গ্রেপ্তার করেনি।

সকাল থেকেই বিভিন্ন ইলেক্ট্রনিক্স ও প্রিন্ট মিডিয়ায় এ খবর ছড়িয়ে পড়লেও তখনও হদিস মেলেনি সুহেলের।

লাকি জানায়, ‘সুহেল আমার ডিপার্টমেন্টের ছোট ভাই। গতকাল রাতে খেলা দেখতে এসেছিল। খেলা দেখা শেষে আমার ছোট ভাইয়ের সঙ্গে এক কক্ষে ঘুমিয়ে পড়ে। ভোর চারটার দিকে দরজায় ধাক্কা শুনে সুহেলই আমার ঘুম ভাঙায়। আমি জানতে চাইলাম—“কে?” তাঁরা পুলিশের লোক বলে জানালেন। বললেন, “দরজা খোলেন।” আমি বললাম, “কেন দরজা খুলব, কী বিষয়?” তখন তাঁরা বলেন, “দরজা না খুললে ভেঙে ভেতরে ঢুকব।” তখন আমি বলি, “ঠিক আছে, বাড়িওয়ালাকে ডেকে আনেন, তাঁর উপস্থিতিতে আমরা দরজা খুলব।” তখন তাঁরা বাড়িওয়ালা চাচাকে নিয়ে এলে সাড়ে চারটার দিকে আমি দরজা খুলি।’

লাকি আরও জানায়, ‘তাঁরা ১০ জনের মতো ছিল। ঘরে ঢুকেই পুরো বাসায় তল্লাশি চালান। এ সময় আমাদের মুঠোফোনগুলো জব্দ করেন। সেগুলো ঘেঁটে দেখেন। ল্যাপটপগুলোও ঘেঁটে দেখেন। তারপর দেড় ঘণ্টা ধরে আলাদা রুমে হাতকড়া পরিয়ে বিভিন্ন বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে সুহেলকে নিয়ে চলে যান। এ সময় সুহেলকে কেন নিয়ে যাচ্ছেন—জানতে চাইলে তাঁরা জানান, কোটা সংস্কার আন্দোলন ইস্যুতে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নিয়ে যাচ্ছেন।’

কিন্তু আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে সকাল থেকেই। কারণ, শুধুমাত্র ডিবি পুলিশ নয়, পুলিশের সবক’টি গোয়েন্দা ইউনিটে খোঁজ নেয়ার চেষ্টা করেন সাংবাদিক ও সুহেলের স্বজনরা। কিন্তু কেউই সুহেল নামের কাউকে গ্রেফতার বা তুলে আনার কথা স্বীকার করেনি।

ডিবির অতিরিক্ত কমিশনার দেবদাস ভট্টাচার্যের কাছে সাংবাদিকরা সুহেল সম্পর্কে  জানতে চাইলে ওই পুলিশ কর্তা বলেন, এই নামে কাউকে ডিবি আটক বা গ্রেপ্তার করেনি।

দুপুরে যোগাযোগ করা হলে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের যুগ্ম কমিশনার আব্দুল বাতেন সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা সুহেল নামে কাউকে গ্রেফতার বা আটক করিনি’।

কিন্তু তুলে নিয়ে যাওয়ার প্রায় ১৫ ঘন্টা পর সন্ধান মেলে সুহেলের। ডিবি পরিচয়ে ধরে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ ওঠার প্রায় ১৫ ঘণ্টা পর পুলিশ তাকে গ্রেফতারের কথা স্বীকার করে। তবে তাকে কোন মামলায় গ্রেফতার করা হয়েছে তা তখনও জানায়নি পুলিশ। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী সুহেলকে আগামীকাল শুক্রবার (১৩ জুলাই) আদালতে পাঠানো হবে বলে পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়। সন্ধ্যায় সুহেলের গ্রেফতারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-কমিশনার (মিডিয়া) মাসুদুর রহমান।

সুহেলসহ এখন পর্যন্ত কোটা সংস্কার আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ১১ জনকে বিভিন্ন মামলায় গ্রেফতার করলো পুলিশ। এর মধ্যে চারজনকে পুলিশ রিমান্ডে নিয়েছে। আন্দোলনের যুগ্ম আহ্বায়ক রাশেদ খানকে দুই দফায় ১৫ দিনের রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ। রাশেদকে ইতোমধ্যে এক ছাত্রলীগ নেতার দায়ের করা তথ্য প্রযুক্তি আইনের মামলা ও ভিসির বাসায় ভাঙচুর মামলাসহ তিনটি মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। এছাড়া কোটা সংস্কার আন্দোলনের আরেক নেতা ফারুক হাসানসহ জসিম উদ্দিন ও মশিউর রহমানকে গত মঙ্গলবার দুই দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। আর তরিকুল আমান উল্লাহ, মাযহারুল, জাকারিয়া, রমজান ওরফে সুমন ও রবিন বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন।

Comments

comments