কোটা সংস্কার আন্দোলন ও জঙ্গিপনার হিসেব-নিকেষ

হাসান রূহী

জঙ্গিবাদ কিংবা জঙ্গিপনা নিয়ে বিশ্বব্যাপি মানুষের উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা, দুশ্চিন্তা কিংবা বিশ্লেষণের কোন অভাব নেই। অনেকেই বুঝতে পারেন এর নেপথ্যে কারা কাজ করে। কারা এর সুবিধাভোগী। আর কারাইবা বেছে নেয় এই উগ্রপন্থা। তবে সবসময় এগুলো আবার এক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখারও সুযোগ নেই। তবে এই ব্যাপারটা নিশ্চিত যে, জঙ্গিবাদের তকমা একবার যার দিকে ছোড়া হয়েছে তার আর নিস্তার নেই।

আর এই সুযোগটাই সব সময় গ্রহণ করেছে মোড়ল তথা ক্ষমতাসীনরা। নিজেদের মোড়লগীরি টিকিয়ে রাখতে উদীয়মান কোন নতুন পক্ষকে জঙ্গি বলে আখ্যা দিতে পারলেই যেন কেল্লা ফতে! আর এই বস্তাপঁচা রাজনীতি আন্তর্জাতিক পর্যায় থেকে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত এসে পৌঁছেছে। কিন্তু বস্তাপঁচা ব্যাপার হলেও এখান থেকে মুক্তি না মেলার কারণ হলো, এই রাজনীতির ধারক সবসময় ক্ষমতাসীনরা। ফলে দুর্গন্ধ ছড়ালেও এখান থেকে মুক্তি মেলে না কারও। যতক্ষণ না ক্ষমতাসীনদের খায়েশ পূর্ণ হয়।

আন্তর্জাতিক প্রসঙ্গ নিয়ে সংক্ষেপে মূল্যায়ন না করলেই নয়। সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর জঙ্গিগোষ্ঠী আইএস এর বিরুদ্ধে ইউরোপ আমেরিকা আন্তর্জাতিক মিডিয়াগুলোকে ব্যবহার করে কতইনা গলা ফাটিয়েছে। সিনেমা নির্মাণ করেছে। মুসলমানদের বিশ্বের সবচেয় ভয়ঙ্কর জাতি বলে প্রমাণ করার চেষ্টা করেছে। কিন্তু অবশেষে যা জানা গেল তা হলো- আইএস জঙ্গিদের পৃষ্ঠপোষক ছিল খোদ মার্কিন-ইসারাঈল গোয়েন্দা সংস্থাগুলো! এমনকি আইএস জঙ্গিদের কাছ থেকে যেসব অস্ত্র-গোলাবারুদ আর রসদের দেখা মিলেছে সেগুলো সবকিছুই এসেছে সুদূর মার্কিন মুলুক থেকে!

এবার আসুন দেশে ফিরে আসা যাক। ২০০৯ থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকার যে জুজুর ভয় দেখিয়ে দেশ ও দেশের বাইরের মানুষদের বোকা বানানোর চেষ্টা করেছে তা হচ্ছে জঙ্গিবাদ। এদেশের ধর্মপ্রাণ মানুষদের ঈমানী চেতনায় বারবার আঘাতও হেনেছে। আবার পেছন থেকে জঙ্গিবাদকে উস্কে দিয়ে জঙ্গিবাদ দমনের নামে মূলত ধর্মপ্রাণ মানুষদের ও ধর্মীয় রাজনীতির সাথে সংশ্লিষ্টদের উপর দমন পীড়ন চালিয়েছে। তাদের কাছে থাকা কুরআন, হাদীস ও ইসলামী সাহিত্যকে জেহাদী বই বলে প্রচার করেছে। তাদের সভা-সমাবেশ এমনকি ঘরোয়া বৈঠককে গোপন বৈঠক বলে চালিয়ে দিয়েছে। ঘরে থাকা আটা-ময়দাকে গানপাউডার আর ফল কাটার ছুরিকে দেশীয় অস্ত্র বলে প্রচার করেছে। আর এভাবেই একটু একটু করে দেশের তৃতীয় বৃহত্তম রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলামীকে অনেকটা নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গিগোষ্ঠীর কাতারে নিয়ে গেছে। এরপর এই একই অস্ত্র ব্যবহার শুরু হয় বিএনপিকে নিয়েও। ইদানিং দেখা যাচ্ছে গোপন বৈঠকের অজুহাত দেখিয়ে বিএনপির নেতা-কর্মীদেরও গ্রেফতার করা হচ্ছে।

এবার কোটা সংস্কার আন্দোলনের দিকে নজর দেয়া যাক। দেশের ইতিহাসে এই প্রথম দল-মত নির্বিশেষে সব শ্রেণির তরুণ সমাজ, বিশেষত শিক্ষার্থীরা সরকারি চাকুরিতে কোটা বৈষম্য দূর করার দাবিতে আন্দোলন শুরু করে। তারা শান্তিপূর্ণভাবে বিভিন্ন কর্মসূচি পালনের মাধ্যমে সরকারের কাছে তাদের দাবি উপস্থাপন করে। কিন্তু সরকারের টনক নড়ে তখন, যখন কিনা তারা বাধ্য হয়ে সড়ক অবরোধ, ক্লাস-পরীক্ষা বর্জনের মত কর্মসূচি দেয়। কিন্তু দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠের শিক্ষার্থীদের সাথে সরকারের আচরণ শুরু থেকেই ছিল উস্কানিমূলক। তাদের শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে বেশ কয়েক বার টিয়ারশেল, লাঠিচার্জ, রবার বুলেটসহ দলীয় গুন্ডাবাহিনী ব্যবহার করে বিভিন্নভাবে হামলা করে আন্দোলনরত তরুণদের উত্তেজিত করার চেষ্টা করে সরকার। কিন্তু কোন উস্কানীর ফাঁদেই পা দেয়নি কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীরা।

অবশেষে তাদের আন্দোলন দমাতে না পেরে ভয়াবহ এক ফাঁদ পাতে আওয়ামী সরকার। পুলিশ বাহিনী দিয়ে একদিকে হামলা করে আন্দোলনকারীদের ওপর। অন্যদিকে ছাত্রলীগ-যুবলীগ সন্ত্রাসীদের ব্যবহার করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির বাড়িতে নজিরবিহীন ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটায়। পুলিশের সহযোগিতায় নিশ্চিহ্ন করা হয় সিসিক্যামেরা ও তার ফুটেজ। করা হয় ৪-৫ টি মামলা। আন্দোলনকারীরা তখনই বুঝেছিলেন যে, তাদের শায়েস্তা করতেই এই মামলাগুলো কাজে লাগানো হবে। হলোও তাই। শেষ দফায় ছাত্রলীগকে ব্যবহার করে বর্বর হামলা চালানো হয় কোটা সংস্কার আন্দোলনের শীর্ষ নেতাদের ওপর। গুরুতর আহত হয় অন্যতম শীর্ষ নেতা নুরুল হক নূর। বিতর্কিত সাদা পোষাকের পুলিশ দিয়ে তুলে নিয়ে যাওয়া হয় আরেক শীর্ষ নেতা রাশেদ খানকে। শহীদ মিনার চত্বরে আরেক শীর্ষ নেতা ফারুককে বেদম পিটিয়ে অজ্ঞান অবস্থায় গুম করে রেখে একদিন পরে পুলিশের মোটরসাইকেল পোড়ানোর মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়। ঢাবি ও রাবিসহ দেশের বেশ কিছু স্থানে বর্বরোচিত হামলা চালানো হয় কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের ওপর। হাতুড়ি দিয়ে ভেঙে দেয়া হয় আন্দোলনকারীদের পা ও মেরুদণ্ড।

এরপরই এলো সেই জঙ্গি তত্ত্ব। আক্রান্তদের পাশে না দাঁড়িয়ে আক্রমণকারীদের নির্লজ্জ পক্ষ নেন ঢাবি ও রাবির ভিসি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি আখতারুজ্জামান বলেছেন, তিনি আন্দোলনকারীদের মধ্যে জঙ্গিদের ছায়া দেখেছেন। জঙ্গি নেতা ওসামা বিন লাদেন ও মোল্লা ওমর যেমন গুপ্ত স্থান থেকে ভিডিও বার্তা পাঠিয়েছেন, কোটা সংস্কার আন্দোলনের নেতারাও না কি সেভাবে ভিডিও বার্তা পাঠিয়ে আন্দোলনকারীদের উসকে দিচ্ছেন।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আবদুস সোবহানের মন্তব্যটি আরও নিষ্ঠুর। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে যখন তরিকুল ইসলাম নামে এক শিক্ষার্থী হাতুড়িলীগের হাতুড়ির আঘাতে পা ভেঙে যাওয়ার যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছিল, তখন তিনি তাঁর চিকিৎসার ব্যবস্থা না করে আন্দোলনকারীদের ‘বাম ঘরানার শিবির’ বলে হাস্যকর ও কুরুচীপূর্ণ মন্তব্য করলেন।

সাধারণ শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলনকে জঙ্গিবাদের সাথে তুলনা করে সরকার ও প্রশাসন কতটুকু ফায়দা লুটতে পারবে তা দেখতে একটু অপেক্ষা করতে হবে। তবে এই আন্দোলনের মাধ্যমে জাতি যে হড় হড় ইকবাল ও আখতারুজ্জামানদের মত জ্ঞানপাপীদের আসল চেহারা দেখতে পেরেছে এটাই আপাতত অনেক বড় সফলতা। পুলিশ ও আদালতের চাপিয়ে দেয়া রিমান্ড ও জেল শেষে রাশেদ ফারুকরা ফিরে আসুক সাধারণ শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ের মঞ্চে। নুর, তরিকুল, জসিমসহ হামলার শিকার নাম না জানা তরুণেরা সুস্থ হয়ে ফিরে আসুক তরুণদের নেতৃত্ব দিয়ে। জঙ্গিবাদের জুজুর বিরুদ্ধে ওদের এই জাগরণটা বেশ উপযোগী হয়ে উঠেছে।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট

Comments

comments