কোটা সংস্কার: জুলুমের অবসান চাই

আন্দোলনকারীদের সংবাদ সম্মেলনে হামলা চালায় ছাত্রলীগ। আহত হয় কোটা সংস্কার আন্দোলনের যুগ্ম আহ্বায়ক নুরুল হক নূরসহ বেশ কয়েকজন ছাত্রনেতা।

আবরার শাহরিয়ার

সরকারি চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে কোটা পদ্ধতি চালুর নেপথ্যে যুক্তি অবশ্যই রয়েছে। কোটা প্রথা চালু হয়েছে পাকিস্তান পর্বে। তার বিস্তার ঘটেছে স্বাধীন বাংলাদেশে। অনগ্রসর অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের চাকরির ক্ষেত্রে ঠাঁই দিতে এই পদ্ধতি চালু হয়েছিল অনেক আগেই। তাতে মেধার প্রাধান্য হয়ত ততটা থাকত না। যুক্তি ছিল, রাষ্ট্র পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে বঞ্চিত করতে পারে না।

চাকরিপ্রার্থীরা কোটা সংস্কারের জন্য যে পাঁচ দফা দাবিতে আন্দোলন করছেন, সেই দাবিগুলো ন্যায্য। বর্তমানে বাংলাদেশের বিভিন্ন সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে ৫৬ শতাংশ কোটা রয়েছে। এর মধ্যে মুক্তিযোদ্ধা কোটা ৩০ শতাংশ, জেলাভিত্তিক কোটা ১০ শতাংশ, নারীদের জন্য ১০ শতাংশ এবং ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জন্য ৫ শতাংশ। তবে নিয়ম অনুসারে এসব কোটায় যোগ্য প্রার্থী না পাওয়া গেলে ১ শতাংশ প্রতিবন্ধীদের জন্য বরাদ্দ রয়েছে। অর্থাৎ মেধার ভিত্তিতে চাকরির সুযোগ রয়েছে মাত্র ৪৪ শতাংশ চাকরিপ্রার্থীর। তাদের অসন্তোষের কারণটি বোধগম্য। মেধার চেয়ে কোটা বেশি হওয়ায় মেধাবী চাকরিপ্রার্থীদের একটি অংশ সরকারি চাকরি থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এ ক্ষেত্রে পরিবর্তনের দাবি অন্যায্য নয়।

তর্ক বিতর্ক আন্দোলনে রূপ নেয় গত ফেব্রুয়ারি মাসে। নানা নাটকীয়তার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংসদ অধিবেশনে ঘোষণা করেন ‘কোনো কোটাই থাকবে না’। কিন্ত প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার পরও কোটা বাতিল বা সংস্কারে সরকারের সক্রিয় কোনো কার্যক্রমের দেখা না পেয়ে পরবর্তী করণীয় জানাতে গত শনিবার একটি সংবাদ সম্মেলনের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন কোটা সংস্কার আন্দোলনের নেতারা। সে সময় ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা সেখানে উপস্থিত হয়ে তাদের বেদম মারধর করেন। এরপর সোমবারও শহিদ মিনার এলাকায় ছাত্রলীগের হামলার শিকার হন আন্দোলনকারীরা।

হামলার জন্য যাদের দায়ী করা হয়, তাদের একজন ঢাবি বঙ্গবন্ধু হলের ছাত্রলীগ নেতা আল আমিন রহমান। মঙ্গলবার তিনি জানান, ছাত্রলীগ হামলা করেনি, জামায়াত-শিবির, ছাত্রদলকে প্রতিহত করেছে। ক্যাম্পাসের শৃঙ্খলা রক্ষা করেছে।

আন্দোলন করছিল সাধারণ শিক্ষার্থীরা। কিন্তু হঠাৎ করেই তারা কিভাবে জামায়াত-শিবির হয়ে গেলো? এর সঠিক উত্তর পাওয়া দুষ্কর।

আন্দোলনকারী এক শিক্ষার্থীকে ফুটপাথে ফেলে লাথি দিচ্ছে ছাত্রলীগ সন্ত্রাসীরা

যাইহোক, এরপর শুরু হয়ে যায় প্রশাসনের নতুন নাটক। কোটা সংস্কার আন্দোলনের নেতা ফারুক হাসানকে গুম করে ধামাচাপা দিতে না পেরে দু’দিন পরে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-কমিশনার মাসুদুর রহমান দায় স্বীকার করে বলেন, ফারুক হাসানকে শাহবাগ থানা পুলিশ মঙ্গলবার গ্রেপ্তার করে। রহস্যজনক এক মামলায় সহপাঠী তরিকুল ইসলাম এবং জসিমউদ্দিন সহ তাকে কারাগারে প্রেরণ করা হয়।

যখন নুরু-তরিকুলরা আহত অবস্থায় হাসপাতালের বিছানায় পড়ে আছে। তখনো শেষ হয়নি নরখাদকদের উন্মাদনা। মরিয়ম মান্নান ফারা সহ কয়েকজন ছাত্রীর ওপর হামলা করে হায়নার দল। রাশেদকে উঠিয়ে নিয়ে আসা হয় তার বাসা থেকে। এ যেন বাকশালের প্রতিচ্ছবি।

সাধারণ শিক্ষার্থীদের উপর পশুসুলভ আচরণ দেখে উদ্বিগ্ন অভিবাবকরা প্রতিবাদ সমাবেশের ডাক দেয়। সে সমাবেশে ছাত্রলীগ হামলা না করলেও সরকারি পেটোয়া বাহিনী সে জায়গা পূরণ করেছে দক্ষতার সাথেই। পুলিশ অধ্যাপক ফাহমিদুল হক ও রেহনুমা আহমেদের সঙ্গে যে আচরণ করেছে তাকে বর্বর ছাড়া আর কিছু বলা যায় না।
সরকারের এ স্বৈরাচারী কর্মকান্ড কাঁদিয়ে তুলেছে স্বৈরাচার এরশাদকেও। তিনি আজ বলেছেন-‘চাকরিতে কোটা সংস্কার আন্দোলনে ছাত্রদের ওপর যে জুলুম-নির্যাতন চলছে তা মেনে নেয়া যায় না। শুধু ছাত্র নয়, হামলা ও গ্রেফতার করা হচ্ছে অভিভাবকদের ওপরও। মতপ্রকাশের অধিকার সবারই আছে, দাবি আদায়ের জন্য কথা বলার অধিকার সবারই আছে। কোনো নাগরিক অধিকারের দাবি তুলতে পারবে না, এটা হতে পারে না।’

স্বৈরাচার এরশাদের বোধোদয় হলেও বর্তমান সরকারের বোধোদয় হতে কত সময় লাগবে তা নিরুপন করা মুশকিল। তবে যাইহোক, জুলুমের অবসান হোক এটাই এই মুহুর্তে সবার চাওয়া।

লেখক: আবরার শাহরিয়ার, সাংবাদিক।

Comments

comments