অবৈধ ডিটিএইচে ‘ভারতে পাচার’ বছরে ১০ লাখ ডলার

দেশে ক্যাবল সংযোগ ছাড়াই স্যাটেলাইট টেলিভিশন দেখার উন্নত প্রযুক্তি ডাইরেক্ট টু হোম বা ডিটিএইচ। কিন্তু বর্তমানে দেশব্যাপী ডিটিএইচের অবৈধ ব্যবহার বেড়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশে বিশেষত দুইটি প্রতিষ্ঠান সরকারের থেকে এই সেবা দেয়ার লাইসেন্স পেলেও বাজারে তাদের পণ্য পর্যাপ্ত নেই বললেই চলে। ফলে ভারতের এক ডজনেরও বেশি কোম্পানির পণ্য ছেয়ে গেছে বাংলাদেশে।

এ খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ভারতীয় এজেন্টরা বাংলাদেশে অবৈধ ডিটিএইচ সেবা ছড়িয়ে দেয়ার মাধ্যমে বড় অংকের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। তারা বাংলাদেশ সরকার থেকে কৌশলে রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে টাকা নিয়ে যাচ্ছে। আর তাদের সঙ্গে বাংলাদেশের কিছু অসাধু ব্যবসায়ী অবৈধভাবে মুনাফা নিতে তাদের সঙ্গে হাত মিলাচ্ছে।

ক্যাবল অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (কোয়াব) বলছে, অবৈধ এই সেবার মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে বছরে প্রায় ১০ লাখ ডলার দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে।

ভারতের রিলায়েন্স, টাটা স্কাই, ডিশ টিভি, এয়ারটেল ডিজিটাল, সান ডাইরেক্ট ডিজিটালসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের ডিটিএইচ যন্ত্র বাংলাদেশে পাওয়া যায়। রাজধানীর স্টেডিয়াম মার্কেট ছাড়াও বড় বড় শহরগুলোতে এই যন্ত্রগুলো প্রকাশ্যে বিক্রি হচ্ছে। যা আবার সাশ্রয়ী দামে পাওয়া যায়।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অবৈধ ব্যবসায়ীরা চোরাইপথে এই ডিটিএইচ সামগ্রী দেশে আনছে। এগুলোর মাধ্যমে দেশি চ্যানেল দেখা না যাওয়ায় দেশীয় চ্যানেলগুলো দর্শক হারাচ্ছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

দেড় বছর ধরে যাত্রাবাড়ীতে বসবাস করছেন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে প্রযুক্তিকর্মী শোহান (ছদ্মনাম)। তিনি স্টেডিয়াম মার্কেট থেকে প্রায় এক বছর আগে একটি ডিটিএইচ যন্ত্র কেনেন। এখন তিনি সেটাই ব্যবহার করছেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি আরটিভি অনলাইনকে জানান, ডিটিএইচ প্রযুক্তিতে ছবি ও শব্দ সাধারণ ক্যাবল সংযোগের চেয়ে দ্রুত আসে। সরাসরি স্যাটেলাইট থেকে ডাউনলিংকের মাধ্যমে এই সেবা পাওয়া যায়। তাছাড়া ডিশ ক্যাবলের ঝুট-ঝামেলা থাকে না।

দেড় বছর আগে বাংলাদেশে দুটি কোম্পানিকে ডিটিএইচ ব্যবসায় লাইসেন্স দেয়া হয়। এর মধ্যে একটি হলো বেক্সিমকো এবং অপরটি হলো বায়ার মিডিয়া লিমিটেড। এই ডিটিএইচ সেবা নেয়ার জন্য একজন গ্রাহকের খরচ ধরা হয় প্রায় ছয় হাজার টাকা। বেক্সিমকোর রিয়েল ভিউর মাসিক সাবস্ক্রিপশন ফি ৩০০ টাকা। সহজে বিল পরিশোধের জন্য স্ক্র্যাচ কার্ড, মোবাইল পেমেন্ট (বিকাশ, ডিবিবিএল মোবাইল ব্যাংকিং, আইএফআইসি মোবাইল ব্যাংকিং, শিওরক্যাশ, ইউক্যাশ) সুবিধা রয়েছে। কিন্তু এই কোম্পানির পণ্য বাজারে নেই বললেই চলে। তাছাড়া সেবা নিয়ে অভিযোগ আছে।

শোহান বলছিলেন, রিয়েল ভিউয়ে অনেক চ্যানেল দেখা যায় না। তাছাড়া খরচও বেশি পরে। স্টার গ্রুপের কোনো চ্যানেলই দেখা যায় না। ৩০০ টাকা মাসে দিয়েও যদি চ্যানেল না দেখা যায়, তবে আর লাভ কই? এটা বাজারে পর্যাপ্ত না। ওরা হয়তো বাংলাদেশের স্যাটেলাইটের জন্য অপেক্ষা করছে।

কোয়াবের সদস্য ও আইডিয়াল ক্যাবল টিভি নেটওয়ার্কের মালিক সৈয়দ হাবীব আলী বলেন, সরকার দুইটি প্রতিষ্ঠানকে লাইসেন্স দিয়েছে; যার মধ্যে এখন একটি চালু আছে। আর আরেকটি বন্ধ আছে। বাকি ডিটিএইচগুলো সব ইন্ডিয়া থেকে আসে। এই টাকাটা হুণ্ডিসহ বিভিন্ন উপায়ে ভারতে যায়। এটা পুরোপুরি অবৈধ।

“এটা একজন ব্যক্তি নিজে ব্যবহারের জন্য বাসায় কিনে থাকেন। কিন্তু আপনি এই একটা মাধ্যম দিয়ে পুরো এলাকার লোককে দেখিয়ে দিচ্ছেন তাও আবার মাসে ৫০০/৬০০ টাকায়। অথচ বৈধ ব্যবসায় অপারেটররা হাজার হাজার টাকা খরচ করছে। ফলে দেশে যারা ডিশ চ্যানেলের ডিস্ট্রিবিউটর; যারা টাকা খরচ করে সরকারের কাছ থেকে চ্যানেল কিনছে তারা ব্যবসায় ধরা খাচ্ছে। তাদের জন্য এটা অনেক ক্ষতিকর।”

তিনি বলেন, রাজধানীর স্টেডিয়াম মার্কেটে কিছু দোকান আছে; তারা বিক্রি করে আবার রিনিউয়াল করে। আবার সীমান্ত এলাকায় কিছু ব্যবসায়ী এটা করে থাকে। তারা ইন্ডিয়ান ডিটিএইচ আনে এবং রিনিউয়াল করে। অনলাইনের মাধ্যমে ভারতের এজেন্টদের কাছে টাকা পাঠায়। ইন্ডিয়ান এজেন্টরাই অবৈধভাবে বাংলাদেশে এই ব্যবসা পেতেছে।
এই ক্যাবল মালিক বলেন, আমরা সব সময় এটার বিরুদ্ধে। এ নিয়ে আমরা বহুবার প্রেস কনফারেন্স করেছি। আমরা তো বৈধ ব্যবসা করি। আমরা চাই সবাই বৈধ ব্যবসা করুক।

একই কথা বলেন, কোয়াবের সমন্বয় কমিটির যুগ্ম সম্পাদক সৈয়দ মোশাররফ আলী চঞ্চলও। তিনি বলেন, সরকারকে দ্রুত এই অবৈধ ব্যবসা থামাতে হবে। তা না হলে রাজস্ব ফাঁকি থামানো যাবে না। দেশও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

সূত্র: আরটিভি অনলাইন

Comments

comments