মুসলিম উম্মাহ’র বিজয়ের মাস রমজান

সাজ্জাদ আকবর

বছর ঘুরে আসে রমজানের চাঁদ। ফালি ফালি আলোর ঝলক নিয়ে রমজানের চাঁদ ওঠে আমাদের আকাশে। ওঠে রহমত আর মাগফিরাতের মহিমা নিয়ে। মঙ্গল ও কল্যাণের বরকতময় আবহ নিয়ে। মুমিন বান্দার দুয়ারে দুয়ারে এসে ডাক দিয়ে যায় রমজান। ডাক দিয়ে যায় পুণ্যমাসে ধন্য হবার। বিসর্জন আহবে ঝলসে ওঠার। সংযম ও ত্যাগের মহিমায় ভাস্বর হবার।

ফিরে ফিরে এই রমজান আমাদের দুয়ারে আসে স্মৃতির ডালি নিয়ে। রমজানের আগমনে আমাদের হৃদয়- আকাশে জ্বলজ্বল করে সেইসব স্মৃতিতারকা। বড় মধুর সেইসব স্মৃতি। সবচেয়ে মধুর স্মৃতিটি হলো কুরআন নাজিলের স্মৃতি। এই রমজানেই তো নাজিল হয়েছিল কুরআন। বিশ্বমানবতার মুক্তির বার্তা নিয়ে। এই রমজানের মহিমা সে তো কুরআনেরই দান। কুরআন না হলে কি রমজানের এত মূল্য হতো? রমজানের পরিচয়ই তো আসে কুরআন দিয়ে। কেউ যদি প্রশ্ন করে-রমজান মাস কী? তাহলে সে প্রশ্নের উত্তর আমাদের দিতে হবে না। কুরআন নিজেই দিয়েছে তার উত্তর। কুরআন বলেছে-
‘রমজান সেই মাস, যাতে নাজিল হয়েছে কুরআন। মানুষের জন্য পথপ্রদর্শক, সৎ পথের সুস্পষ্ট নিদর্শন এবং সত্য – মিথ্যার মাঝে পার্থক্য নির্ণয়কারী হিসাবে।’

হ্যাঁ,কুরআন নাজিলের স্মৃতিই হলো রমজানের সবচে মধুর স্মৃতি। চিরন্তন স্মৃতি। রমজানের যে দিনগুলোতে নাজিল হয়ছিল কুরআন, সে দিনগুলো কি আমাদের স্মৃতির ডালি থেকে মুছে যাবে কখনো? বছর ঘুরে ঘুরে যখনই আসে রমজান, তখন মানবতার মুক্তিসনদ এই কুরআনের অবতরণ- ইতিহাস আমাদের হৃদয় মনকে আনন্দে আপ্লুত করে দেয়। ভালোবাসা আর কৃতজ্ঞতায় করে দেয় আচ্ছন্ন।

এই রমজানে আরো অনেক স্মৃতি আছে আমাদের। তেমনই একটি স্মৃতি হলো আমাদের বিজয়ের স্মৃতি। ইসলামের ইতিহাসে অব্যাহত বিজয়ধারার শুভসূচনার স্মৃতি। মিথ্যা,অহঙ্কার আর খোদাদ্রোহিতার প্রাসাদ গুঁড়িয়ে সত্য, ন্যায় আর একত্ববাদের প্রতিষ্ঠিত হওয়ার স্মৃতি। কী সেই স্মৃতি? কুরআনের ভাষায়-
‘এবং বদরের যুদ্ধে যখন তোমরা হীনবল ছিলে, তখন আল্লাহ তোমাদেরকে সাহায্য করেছিলেন। সুতরাং তোমরা আল্লাহর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো। (সূরা আলে ইমরান,আয়াত-১২৩)

হ্যাঁ, রমজানেই ইসলাম বাতিলকে পরাভূত করেছিল। রমজানেই লা- ইলাহা ইল্লাল্লাহ -এর পতাকা সমুন্নত হয়েছিল। এই রমজানেই কুফুরি ও আল্লাহদ্রোহিতা মাটির সাথে মিশে গিয়েছিল। এই রমজানেই লড়াই হয়েছিল দুটি দলের। যার একটির নেতৃত্বে ছিলেন মহান আল্লাহর দূত মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। আর অন্যটির নেতৃত্বে ছিল মিথ্যার ধ্বজাধারী দাম্ভিক আবু জেহেল। সম্বলহীন রিক্তহস্ত মহানবীর ক্ষুদ্র দলটি মিটিয়ে দিয়েছিল প্রাচুর্যে ভরা খোদাদ্রোহীদের সব অহঙ্কার। হ্যাঁ, এক হাজারের বিরুদ্ধে তিনশতের বিজয়ের এই পবিত্র স্মৃতি নিয়ে আসে রমজান। তারিখটা ছিল ১৭ রমজান। যখনই আসবে ফিরে ফিরে এই ১৭ রমজান, তখন বদরের স্মৃতি আমাদের হৃদয়মনকে প্রবলভাবে নাড়া দেবে। স্পন্দন জাগাবে আমাদের অনুভবে, চেতনায় এবং প্রেরণার কোষে কোষে।

রমজান সাক্ষী- আরেকটি মহান বিজয়ের। মক্কা বিজয়ের। ইসলামের ফিরে আসার তার মাতুলালয়ে-সগৌরবে সমহিমায়। আল্লাহর প্রথম ঘর কাবাকে মূর্তিমুক্ত করার বিজয়। শিরকের নাপাক থেকে বায়তুল্লাহকে তাওহিদের শুচিশুভ্র জলরাশিতে স্নাত করার বিজয়। রক্তপাতহীন ন্যায়যুদ্ধে শত সহস্র বদ্ধ হৃদয়ের কপাট ভেঙে ইসলামের জায়গা করে নেবার বিজয়। যে বিজয়কে ঘোষণা করা হয়েছে ‘ফাতহে মুবীন’ বলে। ইরশাদ হয়েছে-
‘আমি আপনাকে দান করলাম সুস্পষ্ট বিজয়।'(সূরা ফাতহ,আয়াত-১)

নবীজি মানুষের হৃদয় জয় করেছেন কুরআনের আলো দিয়ে এই রমজানে। মক্কা জয় করেছেন তাওহিদের নিশান উড়িয়ে এই রমজানে। ইসলামের বড় বড় যুদ্ধগুলো হয়েছে এ রমজানে। অন্য বড় বড় বিজয়গুলোও এসেছে এই রমজানে। ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে এই রমজানই ছিল মুসলিম উম্মাহর প্রাপ্তির মাস। বিজয়ের মাস।

চিরভাস্বর চিরমহিমান্বিত রমজানের এইসব পুণ্যস্মৃতি বুকে আগলে আমরাও যেন কাটাতে পারি রমজান। ইবাদতের এ বসন্ত মাসে আমাদেরও হৃদয়ে যেন ছড়ায় আল্লাহপ্রেমের পরাগ। স্মৃতিভরা এ পুণ্যমাসে এই হোক আমাদের অঙ্গীকার।

লেখক : শিক্ষার্থী,বাংলাদেশ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়

Comments

comments