কথিত ‘বন্দুকযুদ্ধে’ আরও নয় ‘মাদক বিক্রেতা’ নিহত, তুলে নিয়ে হত্যার অভিযোগ পরিবারের

মাদক নির্মূলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাঁড়াশি অভিযানের অংশ হিসেবে রবিবার দিবাগত রাতেও সাত জেলায় কথিত বন্দুকযুদ্ধে নয়জন নিহত হয়েছেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দাবি তারা সবাই মাদক বিক্রির সঙ্গে জড়িত।

এর মধ্যে যশোরে মাদকের সঙ্গে জড়িত তিনজন নিজেদের মধ্যে গোলাগুলিতে মারা গেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। এছাড়া রাজশাহীতে র‌্যাবের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে একজন, নরসিংদীতে একজন, ঝিনাইদহে একজন, টাঙ্গাইলে একজন; চুয়াডাঙ্গায় পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ একজন এবং গাজীপুরের টঙ্গীতে একজন মারা যায়।

গত কয়েক মাস ধরেই মাদকের বিরুদ্ধে সাঁড়াশি অভিযানে নামে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। গত ৩ মে ঢাকায় র‌্যাবের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আবারও জঙ্গিবিরোধী অভিযানের মতো মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিতে বাহিনীটিকে নির্দেশ দেন। ১৪ মে এক সংবাদ সম্মেলনে র‌্যাব প্রধান বেনজীর আহমদও মাদক চোরাকারবারিদের প্রতি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন। র‌্যাব অফিসের সামনে মাদক ফেলে না গেলে পরিণতি ভালো হবে না বলে তিনি হুঁশিয়ারি দেন। এরপর থেকে মাদক নির্মূলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান আরও জোরদার হয়।

গত কয়েক দিনে দেশের বিভিন্ন স্থানে ২০ জনের বেশি মাদক বিক্রেতা কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছে।

গতকাল র‌্যাবের মহাপরিচালক বেনজীর আহমদ আবারও হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, মাদকের সঙ্গে জড়িতরা ফিরে না এলে তাদের শেকড়-বাকড়সহ উপড়ে ফেলা হবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও গতকাল একটি অনুষ্ঠানে মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু হয়ে যাওয়ার কথা জানিয়েছেন।

যশোরে তিন ‘মাদক বিক্রেতা’ নিহত

যশোরে রবিবার দিবাগত রাতে তিনটি অজ্ঞাত লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। তারা গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হয়েছেন।

পুলিশের ভাষ্য, মাদক বিক্রেতাদের মধ্যে গোলাগুলিতে এই তিনজন নিহত হন। ঘটনাস্থল সদর উপজেলার খোলাডাঙ্গা ও মণ্ডলগাতির মাঝামাঝি স্থান এবং তরফনওয়াপাড়া।

কোতয়ালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) একেএম আজমল হুদা, এসআই অরুণকুমার দাস এবং উপশহর ক্যাম্পের ইনচার্জ আবদুর রহিম দাবি করেছেন, গভীর রাতে সদর উপজেলার খোলাডাঙ্গা ও মণ্ডলগাতির মাঝামাঝি ফাঁকা জায়গায় দুই দল মাদক বিক্রেতার মধ্যে বন্দুকযুদ্ধের খবর পায় পুলিশ। ঘটনাস্থলে পুলিশ ফোর্স গেলে অস্ত্রধারীরা পালিয়ে যায়। সেখান থেকে উদ্ধার করা হয় অজ্ঞাত এক ব্যক্তির মরদেহ আর দুটি শাটারগান ও দুই রাউন্ড গুলির খোসা।

অন্যদিকে, একই ধরনের কাহিনি ঘটে সদর উপজেলার তরফনওয়াপাড়া গ্রামের জনৈক নওয়াব আলীর মেহগনিবাগানে। সেখানে হাজির হয়ে পুলিশ দুটি মরদেহ, দুটি পিস্তল, দুই রাউন্ড তাজা গুলি, গুলির খোসা এবং ৪০০ পিস ইয়াবা উদ্ধার করে।

মরদেহ তিনটি সোমবার ভোর চারটা থেকে সাড়ে চারটার মধ্যে জেনারেল হাসপাতালে আনা হয়।

হাসপাতালের জরুরি বিভাগে দায়িত্বরত ডাক্তার কল্লোলকুমার সাহা বলেন, হাসপাতালে আনার আগেই তিনজনেরই মৃত্যু হয়েছে। তাদের সবার মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়।

হাসপাতালের কর্মচারীরা জানিয়েছেন, গুলিতে নিহত তিন ব্যক্তির বয়সই ৩৫ থেকে ৪০ বছরের মধ্যে। এদের একজনের গায়ে লাল স্যান্ডো গেঞ্জি ও চেক লুঙ্গি, একজনের গায়ে জাম রঙের হাফ হাতা গেঞ্জি ও সাদা থ্রি-কোয়ার্টার প্যান্ট এবং অন্যজনের খালি গা ও পরনে চেক লুঙ্গি রয়েছে।

এর আগে গত শুক্রবার দিবাগত রাতে যশোরের অভয়নগরে র‌্যাবের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন তিনজন৷ শনিবার দিবাগত রাতে মাদক বিক্রেতাদের কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন এক যুবক।

রাজশাহীতে র‌্যাবের সঙ্গে কথিত ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত ১

রাজশাহীতে র‌্যাবের সঙ্গে কথিত ‘বন্দুকযুদ্ধে’ এক ব্যক্তি নিহত হয়েছেন। রবিবার দিবাগত রাত সাড়ে ১২টার দিকে জেলার পুঠিয়া উপজেলার বেলপুকুর এলাকায় এই ঘটনা ঘটে। র‌্যাব-৫ এর উপ-অধিনায়ক মেজর এএম আশরাফুল ইসলাম এ দাবি করেছেন।

র‌্যাব কর্মকর্তা দাবি করেন, নিহত ব্যক্তির নাম লিয়াকত আলী বলে তারা প্রাথমিকভাবে জানতে পেরেছেন। তার বাড়ি পুঠিয়ায়। লিয়াকত পুঠিয়ার একজন শীর্ষ মাদক বিক্রেতা ছিলেন।

র‌্যাবের এই কর্মকর্তা জানান, তারা থানায় খোঁজ নিয়ে জেনেছেন- লিয়াকতের বিরুদ্ধে আটটি মামলা রয়েছে। বন্দুকযুদ্ধের পর ঘটনাস্থল থেকে একটি পিস্তল, এক রাউন্ড তাজা গুলি ও একটি গুলি খোসা জব্দ করা হয়েছে।

মেজর আশরাফুল ইসলাম বলেন, রাতে পুঠিয়ার বেলপুকুর এলাকায় মাদকবিরোধী অভিযানে গেলে মাদক বিক্রেতারা র‌্যাবকে লক্ষ্য করে গুলি ছোঁড়ে। আত্মরক্ষায় র‌্যাবও তখন পাল্টা গুলি ছোঁড়ে। গোলাগুলি থেমে গেলে ঘটনাস্থলে লিয়াকত আলীকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখা যায়।

এ সময় লিয়াকতকে উদ্ধার করে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। পরে তার মরদেহ রামেকের মর্গে রাখা হয়। ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হবে।

এ নিয়ে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান র‌্যাবের এই কর্মকর্তা।

এর আগে গত বৃহস্পতিবার রাজশাহী মহানগরীর উপকণ্ঠ নবগঙ্গা এলাকায় র‌্যাবের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ আবুল হাসান ওরফে হাসান ঘাটিয়াল নামে এক ব্যক্তি নিহত হন। পবা উপজেলার সোনাইকান্দী গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন তিনি। তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় মাদকের ১৬টি মামলা ছিল।

চুয়াডাঙ্গায় পুলিশের সঙ্গে কথিত ‘বন্দুকযুদ্ধে’ মাদক বিক্রেতা নিহত

চুয়াডাঙ্গার জীবননগরে পুলিশের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে জনাব আলী (৩২) নামে এক চিহ্নিত মাদক বিক্রেতা নিহত হয়েছে।

রবিবার দিনগত রাত পৌনে ১টার দিকে উপজেলার উথলী গ্রামের সন্যাসীতলা মাঠের মধ্যে এই বন্দুকযুদ্ধের ঘটনা ঘটে। এসময় পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে একটি শর্টগান, দু’টি কার্তুজ, তিনটি রামদা এবং এক বস্তা ভারতীয় ফেনসিডিল উদ্ধার করেছে। বন্দুকযুদ্ধের সময় জীবননগর থানার তিন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছে বলে দাবি করছে পুলিশ।

নিহত জনাব আলী উথলী গ্রামের আমতলা পাড়ার জামাত আলীর ছেলে।

বন্দুকযুদ্ধে নিহত মৃত যুবক এলাকার চিহ্নিত মাদক বিক্রেতা উথলী গ্রামের জনাব আলীর লাশ বলে জানা যায়।

জীবননগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাহমুদ রহমান জানান, বন্দুকযুদ্ধে নিহত জনাব আলীর বিরুদ্ধে জীবননগর থানাসহ বিভিন্ন থানায় অন্তত ১১টি মাদক মামলা রয়েছে।

নরসিংদীতে কথিত ‘বন্দুকযুদ্ধে’ ‘মাদক বিক্রেতা’ নিহত

নরসিংদী থেকে আমাদের নিজস্ব প্রতিবেদক বেনজির আহমেদ বেনু জানান, নরসিংদীতে র‌্যাবের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে মাদক সম্রাট খ্যাত ইমান আলী (৩০) নিহত হয়েছেন। এ সময় ঘটনাস্থল থেকে একটি বিদেশি পিস্তল, দুই রাউন্ড গুলি এবং এক হাজার ইয়াবা ট্যাবলেট উদ্ধার করা হয়েছে।

এই ঘটনায় র‌্যাবের ডিএডি আবুল বাশার ও সাব ইন্সপেক্টর নির্মল চন্দ্র দে আহত হয়েছেন বলে দাবি করেছে র‌্যাব।

পলাশ উপজেলার ঘোড়াশালের খালিশকারটেক নামক স্থানে সোমবার ভোর সাড়ে ৬টায় এ ঘটনা ঘটে।

এ ব্যাপারে পলাশ থানায় মামলা দায়ের হয়েছে। থানার ওসি সাইদুর রহমান জানান, নিহত ইমান আলীর বিরুদ্ধে পলাশ থানায় একটি হত্যা মামলা রয়েছে। বছর দুয়েক আগে একই স্থান খালিশকারটেকে দ্বীন ইসলাম দ্বীনি নামে এক যুবককে গুলি করে ও কুপিয়ে হত্যা করেন তিনি।

নিহত ইমান আলীর মামা ইসমাইল মিয়া জানান, এক ছেলে ও এক মেয়ের জনক ইমান আলী নরসিংদী শহরের নাগরিয়াকান্দি এলাকায় থাকতেন। তার মা তাজমহল ও ভাই বাদশা পলাশ উপজেলার টানঘোড়াশালের বাড়িতে থাকেন। ঘটনার দিন ভোররাতে তিনি নাগরিয়াকান্দি থেকে বের হয়ে যান।

ঝিনাইদহে র‌্যাবের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত ১

ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার নরেন্দ্রপুর এলাকায় র‌্যাবের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে সব্দুল মন্ডল (৪৫) নামে এক মাদক বিক্রেতা নিহত হয়েছেন। সব্দুল নরেন্দ্রপুর গ্রামের মোহাম্মদ আলীর ছেলে।

এসময় ঘটনাস্থল থেকে একটি বিদেশি নাইন এমএম পিস্তল, দুই রাউন্ড গুলি, ১০০ বোতল ফেনসিডিল, ১৫০ পিস ইয়াবা ও একটি হেলমেট উদ্ধার করা হয়েছে বলে দাবি করেঝে র‌্যাব।

টাঙ্গাইলে র‌্যাবের সঙ্গে কথিত ‘বন্দুকযুদ্ধে’ ‘মাদক বিক্রেতা’ নিহত

টাঙ্গাইল জেলার ঘাটাইল উপজেলার দেউলাবাড়ি এলাকায় র‌্যাবের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে আবুল কালাম আজাদ নামে এক মাদক বিক্রেতা নিহত হয়েছে। এসময় দুই র‌্যাব সদস্য আহত হয়েছেন বলেও দাবি করেছে সংস্থাটি।

এসময় একটি বিদেশি পিস্তল, তিন রাউন্ড গুলি, ১০০ পিস ফেনসিডিল ও পনেরশ’ পিস ইয়াবা উদ্ধার করেছে বলে দাবি করেছে র‌্যাব-১২।

নিহত মাদক বিক্রেতার বাড়ি ঘাটাইল উপজেলার দেউলাবাড়ি এলাকা।

টঙ্গীতে কথিত ‘বন্দুকযুদ্ধে’ ‘মাদক বিক্রেতা’ নিহত

গাজীপুরের টঙ্গীতে পুলিশের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে এক মাদক বিক্রেতা নিহত হয়েছেন। এসময় পুলিশের দুই সহকারী উপপরিদর্শক আহত হয়েছে বলে দাবি করেছে পুলিশ।

নিহত মাদক বিক্রেতা রেজাউল ইসলাম ওরফে বেসতি রনি টঙ্গীর এরশাদনগর এলাকার হাফিজুল ইসলামের ছেলে। তার বিরুদ্ধে ১৪-১৫টি মামলা রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

সূত্র: ঢাকা টাইমস

Comments

comments