নেসলে কোম্পানি ও পানি : পানি চাও? তো কিনে খাও

ফরহাদ মজহার

পানি কারো ব্যাক্তিগত সম্পত্তি না। এই কথাটার অর্থ এখন কমবয়েসিদের বোঝানো খুবই মুশকিল। এখন সকলে প্লাস্টিকের বোতলে পানি কেনে, পানি খায় এবং খালি বোতল কোন দায় বোধে পীড়িত না হয়ে যেখানে সেখানে ছুঁড়ে ফেলে ‘আধুনিক’ হয়েছে। পানি বেচাবিক্রি করা যায়, এই অস্বাভাবিক ব্যাপারকেও স্বাভাবিক করে তোলা হয়েছে।

কিন্তু পুরানাদের স্মৃতিতে বাজার থেকে পানির বোতল কিনে পানি খেতে হচ্ছে, এই চিন্তাটাই ছিল অবিশ্বাস্য ব্যাপার। ছেলেবেলায় দেখেছি ধর্মপ্রাণ গৃহস্থ পরিবার বলতে বোঝাতো যাদের বাড়ীর সামনে বাঁশের বেঞ্চির পাশে কিম্বা বৈঠক খানায় মাটির সরাতে পানি রাখা পরিবার; যে কেউই খেতে পারত। পানি খাওয়ানো ছিল সোয়াবের কাজ। পুণ্যবানের কর্তব্য। যখন সুপেয় পানির জন্য টিউব ওয়েলের চল হোল, তখন এলাকার মানুষ সাধারণত চাঁদা দিয়ে কল বসাতো মসজিদে। পানি আল্লার নেয়ামত, যার ওপর জাতপাত নির্বিশেষে প্রতিটি মানুষ শুধু নয়, বরং প্রতিটি সৃষ্টিরই হক রয়েছে। ধর্মীয় কাণ্ডজ্ঞানেই মানুষ বুঝতো আল্লার প্রতিটি সৃষ্টি এক একটি ‘দান’।

এই ‘মুসলমান’ এখন প্রায় বিলুপ্ত। সকলেই ‘আধুনিক’ হতে চায়। মুখে আল্লাহ বলি বটে, কিন্তু গোলামি করি পুঁজির। প্লাস্টিকের বোতলে পানি খাওয়া এখন রীতি হয়ে দাঁড়িয়েছে। পানি প্রসঙ্গে ইসলাম টেনে আনছি এ কারনে যে আল্লার দানকে চোখের সামনে পুঁজির পণ্যে পর্যবসিত হতে দেখেও পানির ওপর জীবের হক আমাদের আলেম ওলেমাদের ইমান-আকিদার তর্কের বিষয়ে পরিণত হোলনা; সেটা এক বিস্ময় বটে। এভাবে প্রশ্ন করা যায় যে ইসলাম যদি আসলেই পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থা হয়, তাহলে জীবকে পানি থেকে বঞ্চিত করা তো হারাম বা গুনাহগারির কাজ হবার কথা। তাই না? তাহলে জীবন ধারণের এই অতি আবশ্যিক নেয়ামত সংক্রান্ত জিজ্ঞাসা ও তর্ক অনুপস্থিত কেন?

পুঁজিতান্ত্রিক বিশ্বব্যবস্থায় পানির ওপর ব্যাক্তিগত মালিকানা কায়েম হচ্ছে, কিন্তু বাংলাদেশে তার আগেই আমরা পানির ওপর সকল প্রাণের অধিকার নিজেরাই বোতলে পানি খাবার অভ্যাস দিয়ে বিনষ্ট করেছি। এখন আমরা পানি কোম্পানির গোলামে পরিণত হয়েছি। পানির জন্য আমরা কোম্পানির ওপর নির্ভরশীল, আল্লার দানের ওপর নয়। শুধু তাই নয় রাষ্ট্র পুরা নদি লিজ দিয়ে দিচ্ছে বহুজাতিক কম্পানিকে।

বাংলাদেশ মিষ্টি পানির দেশ। মিষ্টি পানির দাম মদ, দুধ এবং তেলের চেয়ে বেশি। পরিকল্পনাহীন শিল্পায়ন এবং ভয়ানক ও বিষাক্ত বর্জ্য ত্যাগকারী ইন্ড্রাস্ট্রিগুলো প্রশ্রয় দিয়ে প্রতিটি সরকারই পানি সম্পদ নষ্ট করেছে। মাটির তলা থেকে শুকনা মৌসুমে বোরো ধান চাষের নামে পানি তুলে আর্সেনিকের বিষে লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন দুর্বিসহ করে তোলা হয়েছে। আর এরই মধ্যে নেসলে কোম্পানির সাবেক চিফ এক্সিকিউটিভ অফিসার পিটার ব্রাবেক লেথমাঠেরের (Peter Brabeck-Letmathe) নতুন গান বাজছে: ‘দাম না দিয়ে পানি পাবার কোন অধিকারই মানুষের নাই’। এটা আজ না, বহু আগেই বলেছেন। এর মর্মার্থ হোল, পানির ওপর বহুজাতিক কোম্পানির ব্যক্তিগত মালিকানা কায়েম করতে হবে, তারা পানি বেচবে আর আমরা দাম দিয়ে কিনে পানি খাবো। আর বিপরীতে পানির ওপর মানুষ সহ সকল মানুষের অধিকার উচ্ছেদ করতে হবে।

পানি চাও তো কিনে খাও। অর্থাৎ টাকা না থাকলে যতোই পিপাসা লাগুক পানি পাওয়ার অধিকার তোমার নাই। পানির ওপর অধিকার কায়েম হবে নেসলের মতো বহুজাতিক কম্পানির। মানুষের না। মানুষের যদি অধিকার নাই তো কীটপতঙ্গ পশুপাখির পানির ওপর হকের কথা বলা আর মরা মানুষকে কথা বলতে বলা এক কথা।

এখন বাজার থেকে পানি কিনে নির্বিবাদে পানি খাচ্ছি আমরা। কিভাবে আমরা এই অবস্থায় পৌঁছালাম বুঝি কি? এর পরিণতি কী দাঁড়াবে, কেউ কি ভাবি?

ভিডিওটি দেখে রাখুন। বুঝতে চেষ্টা করুন কিভাবে অল্প কিছু কোম্পানি খাদ্য ও পানির ওপর তাদের মালিকানা ও কর্তৃত্ব কায়েম করতে চাইছে।

Comments

comments