অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রে সয়লাব চট্টগ্রাম

  • এক বছরে উদ্ধার ৫৩২টি
  • জোগান আসে তিন পার্বত্য জেলা ও কক্সবাজার থেকে
  • সহজে বহনযোগ্য হওয়ায় অপরাধীদের কাছে জনপ্রিয়

চট্টগ্রামে শীর্ষ সন্ত্রাসী থেকে শুরু করে ছিনতাইকারী এমনকি কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের হাতেও ছোট ছোট আগ্নেয়াস্ত্র।

খুন, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে হল দখল ও আধিপত্য বিস্তার, বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের টেন্ডারবাজি, জমি দখল, ফুটপাতে হকার নিয়ন্ত্রণ, এলাকায় ইট-বালুর ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ, ডিশ লাইন ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ, মাদক ও জুয়ার ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ এমনকি খেলা নিয়ে বিরোধেও ব্যবহার হচ্ছে এসব অস্ত্র।

আকারে ছোট সহজে বহনযোগ্য এবং সহজ প্রাপ্য হওয়ায় আন্ডারগ্রাউন্ডে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে পিস্তল, রিভলবারের মতো ছোট অস্ত্রগুলো।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সূত্র জানায়, গত এক বছরে র‌্যাব ও পুলিশের অভিযানে ৫৩২টি বিভিন্ন ধরনের আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার হয়েছে। এর মধ্যে র‌্যাব উদ্ধার করেছে ৪২৬টি এবং নগর পুলিশ উদ্ধার করেছে ১০৬টি।

উদ্ধার হওয়া এসব আগ্নেয়াস্ত্রের মধ্যে ছোট অস্ত্রের সংখ্যাই বেশি। চলতি বছর নগরীর ১৬ থানায় জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত তিন মাসে অস্ত্র আইনে মামলা হয়েছে ৫১টি এবং একই সময়ে চট্টগ্রাম রেঞ্জের আওতাধীন বিভিন্ন থানায় মামলা হয়েছে ১২৬টি। এছাড়া ২০১৭ সালে চট্টগ্রাম নগরীতে অস্ত্র আইনে ২৩১টি এবং চট্টগ্রাম রেঞ্জে ৫৮১টি মামলা হয়।

র‌্যাব জানায়, গত এক বছরে তাদের উদ্ধার হওয়া ৪২৬টি আগ্নেয়াস্ত্র ছাড়াও ৫২টি ম্যাগাজিন এবং ৫ হাজার ৬৮৩ রাউন্ড গুলি ও কার্তুজ উদ্ধার করা হয়। একইভাবে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) উদ্ধার হওয়া ১০৬ বিভিন্ন ধরনের আগ্নেয়াস্ত্রের বাইরে ২৮৮ রাউন্ড কার্তুজ ও ৯০ রাউন্ড গুলি ছিল।

এর মধ্যে আছে ১১টি বিদেশি পিস্তল, ৬টি রিভলভার, ২টি এসএমজি, ৫২টি এলজি, ১টি পাইপগান, ১৫টি একনলা বন্দুক, ২টি কাঁটা রাইফেল, ৩টি ওয়ান শুটারগানসহ আরও ১৪টি বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের মতে, এখনও বিভিন্ন সন্ত্রাসী গ্রুপের হাতে রয়ে গেছে বিপুল পরিমাণ ছোট অস্ত্র। এ কারণে অপরাধ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। চট্টগ্রামে বেশিরভাগ ছোট অস্ত্রের জোগান আসে তিন পার্বত্য জেলা এবং কক্সবাজারের মহেশখালী এলাকা থেকে।

এসব এলাকার দুর্গম পাহাড়ি অরণ্যে গোপনে বিভিন্ন কারখানায় দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি হয় অস্ত্র।

সিএমপির কোতোয়ালি জোনের সহকারী কমিশনার জাহাঙ্গীর আলম যুগান্তরকে বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন অপরাধে ছোট অস্ত্রের ব্যবহারই বেশি হচ্ছে।

এসব অস্ত্রের মধ্যে রিভলবার, পিস্তল ও এলজি অন্যতম। আকারে ছোট সহজে বহনযোগ্য তাই অপরাধীদের কাছে এসব অস্ত্র বেশি জনপ্রিয়।

জানা গেছে, ২৭ এপ্রিল নগরীর চকবাজার এলাকায় ডিশ ব্যবসার আধিপত্য নিয়ে প্রতিপক্ষের গুলিতে খুন হন যুবলীগ নেতা ফরিদুল ইসলাম। এ হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত অস্ত্রটি পুলিশ এখনও উদ্ধার করতে পারেনি।

হত্যায় অংশ নেয়া অনেকের হাতে ছোট অস্ত্র দেখেছে বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন। এর আগে ১৬ ফেব্রুয়ারি নগরীর ষোলশহর এলাকায় চেকপোস্টে তল্লাশির সময় পুলিশকে গুলি করে পালিয়ে যান দুর্বৃত্তরা। এ সময় গুলিবিদ্ধ হন পাঁচলাইশ থানার এএসআই আবদুল মালেক। পরে পুলিশ এ ঘটনায় ব্যবহৃত পিস্তলটি উদ্ধার করেছে।

২৭ মার্চ নগরীর সদরঘাট থানার বরিশাল কলোনিতে মাদক উদ্ধার অভিযানে গিয়ে ২টি এলজিসহ চার রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়। এ সময় ওই কলোনির মাদক ব্যবসায়ী আরজু ওরফে আকাশকে গ্রেফতার করে নগর গোয়েন্দা পুলিশ।

এর কয়েক দিন আগে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের অভিযানেও বরিশাল কলোনি থেকে উদ্ধার করা হয় গুলিভর্তি একটি পিস্তল। এ সময় বেলাল হোসেন নামে এ কলোনির এক মাদক ব্যবসায়ীকে গ্রেফতার করা হয়।

১৬ জানুয়ারি নগরীর জামালখান এলাকায় কলেজিয়েট স্কুলের ছাত্র আদনান ইসফারকে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে ছুরিকাঘাতে খুন করা হয়। পুলিশ এখনও সেই অস্ত্রটি উদ্ধার করতে পারেনি।

গত বছরের ৩ ডিসেম্বর নগরীর কদমতলী শুভপুর বাসস্ট্যান্ড এলাকায় গুলি করে হত্যা করা হয় পরিবহন ব্যবসায়ী ও যুবদল নেতা হারুন অর রশীদ চৌধুরীকে। এই ঘটনায় ব্যবহৃত পিস্তলটি পুলিশ এখনও উদ্ধার করতে পারেনি।

এছাড়া চট্টগ্রাম কলেজ ও হাজী মোহাম্মদ মহসীন কলেজে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে ছাত্রলীগের বিবদমান গ্রুপগুলোর মধ্যে ঘটছে বারবার সংঘাত-সংঘর্ষের ঘটনা। একাধিক ঘটনায় প্রকাশ্যে ছোট অস্ত্র ব্যবহারের ছবিও ছাপা হয়েছিল বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে।

সিএমপির দক্ষিণ জোনের উপ- কমিশনার এসএম মোস্তাইন হোসেন বলেন, ডিশ ব্যবসার দ্বন্দ্ব নিয়ে খুনের ঘটনায় ব্যবহৃত অস্ত্রটি উদ্ধারে অভিযান চলছে। এ ছাড়াও যেসব হত্যাকাণ্ডে অস্ত্র ব্যবহার হয়েছে তাদেরও গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।

Comments

comments