ফ্যাসিবাদ ও আধিপত্যবাদ বিরোধী মুক্তিসংগ্রাম

– মাহমুদুর রহমান
দ্বিতীয় কিস্তি
উপরোক্ত শিরোনামের লেখাটির দ্বিতীয় কিস্তির জন্য কলম ধরতে বেশ দেরী হয়ে গেল। দিনের হিসেবে এক মাস পর লিখতে বসেছি। দৈনন্দিন ধরা-বাধা কোন দায়িত্ব না থাকলেও নানা রকম ঝক্কি-ঝামেলায় একেবারেই ফুরসত পাইনি। এর মধ্যে জেলখানায় বসে ইংরেজীতে লেখা আমার বইটি প্রকাশের উপযোগী সজ্জা ও বিন্যাস ঠিক করতে বেশ সময় লেগেছে। এ ছাড়া সপ্তাহে অন্তত: তিনটে দিন জেলায় জেলায় মামলার হাজিরায় ছুটতে হয়েছে। আমার কোন চাকরী কিংবা ব্যবসা না থাকলেও ১১৮টি মামলায় হাজিরা দেয়াই অনেকটা পেশায় দাঁড়িয়ে গেছে। অবশ্য এ পেশায় কোন আয় নেই, পুরোটা ব্যায়। এ নিয়ে বাংলাদেশের ফ্যাসিবাদী সরকারের বিরুদ্ধে আমার ব্যক্তিগত ভাবে কোন অভিযোগও নেই। আমার মত এক অতি নগন্য ব্যক্তি প্রবল ক্ষমতাধর দখলদার প্রধানমন্ত্রী আর তার দিল্লির প্রভুদের সমালোচনা করে যাবে, আর সেই প্রধানমন্ত্রী ক্ষমতার যথেচ্ছ প্রযোগ করবেন না তা কী হতে পারে? আমি একগুঁয়ে হতে পারি, তবে যুক্তিবিবর্জিত নই। বিলম্বের কৈফিয়ত শেষ করে এবার প্রসঙ্গে আসি।

গত এক মাসের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সহ রাজধানী এবং বাইরের প্রায় শ’খানেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্র-ছাত্রীদের সরকারী চাকরীতে ‘কোটা-সংস্কার’ আন্দোলন ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারীর নির্বাচনী তামাশার পর প্রথম বারের মত অবৈধ সরকারকে কার্যকরভাবে চ্যালেঞ্জ করতে পেরেছে। আন্দোলন প্রক্রিয়ার শুরু থেকে বর্তমান পর্যায় পর্যন্ত ধারাবাহিক ঘটনাবলী থেকে বিরোধী রাজনৈতিক দলসমূহ, সমাজে ভিন্ন মত পোষণকারী শ্রেণি এবং এমনকি আন্দোলকারীদেরও শিক্ষা গ্রহণের অনেক উপাদান রয়েছে। আমি বিশ্বাস করি ফ্যাসিবাদ ও আধিপত্যবাদবিরোধী মুক্তিসংগ্রামে এই শিক্ষা কাজে লাগবে।

বেগম খালেদা জিয়াকে সম্পূর্ন ভিত্তিহীন মামলায় অন্যায়ভাবে সাজা দিয়ে কারাগারে পাঠানোর পর আমার প্রথম লেখায় মন্তব্য করেছিলাম, আদালত কিংবা আইনের মাধ্যমে তার মুক্তি মিলবে না। বিএনপি যদি কঠিন ও কার্যকর আন্দোলন গড়ে তুলতে পারে তাহলেই কেবল সরকার বেগম জিয়াকে মুক্তি দিতে বাধ্য হবে। অন্যথায় যেদিন শেখ হাসিনা এবং দিল্লি মনে করবে যে, বাংলাদেশে জনপ্রিতায় অপ্রতিদ্বন্দী এই রাজনৈতিক নেত্রীকে আর জেলখানায় আটকে রাখার প্রয়োজন নেই সেদিন তিনি ছাড়া পাবেন। বেগম জিয়াকে সাজা দিয়ে কারাগারে পাঠানোর পর আমরা বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে দেখলাম যে, বিএনপির নীতি নির্ধারকবৃন্দ এবং আইনজীবীরা সমস্বরে বলছেন, তারা নাকি আইনী প্রক্রিয়াতেই বেগম খালেদা জিয়াকে মুক্ত করে আনবেন। এখানেই তারা থেমে থাকেননি। বিভিন্ন টকশো এবং সভা-সেমিনারে প্রদত্ত বক্তব্যে বন্দীত্বের প্রথম দিকে তারা মুক্তির দিন-ক্ষণও ঠিক করে দিতেন। প্রথমে তিন দিন, তারপর সাতদিন, এরপরে এক মাস এবং সর্বশেষ ঘোষণা অনুযায়ী ৮ মে। নেতৃবৃন্দের মধ্যে অধিকাংশ আইনের প্রতি অগাধ শ্রদ্ধার বয়ান শেষ পর্যন্ত বন্ধ করলেও, অতি আশাবাদী দুই-একজন এখনও আইনী প্রক্রিয়ার জাবর কাটছেন। এই সব জাতীয়তাবাদী নেতাদের কন্ঠে ৮ ফেব্রুয়ারী পরবর্তী মাসখানেক ‘ফাঁদে পা না দেয়া’ তত্ত্ব প্রায় প্রতিদিন শুনেছি। একটি দলের কৌশলের মধ্যে অহিংস নীতি থাকতেই পারে। কিন্তু প্রতি নেতার প্রতিটি বক্তৃতায় ভাঙ্গা রেকর্ডের মত শান্তিপূর্ণ, শান্তিপূর্ণ মন্ত্র কেন জপতে হবে সেটা বুঝতে পারিনি। বেগম খালেদা জিয়ার প্রতি সরকার এবং আদালতের অব্যাহত অন্যায় আচরন দেখে আমার মত কোন নির্বোধের মনে যদি আজ প্রশ্ন জাগে যে, ফাঁদ আসলে কোনটা ছিল তাহলে বিএনপির নেতৃবৃন্দ কী তেড়ে মারতে আসবেন? অবশ্য একটি ভরসা আছে। তারা তো অহিংসা নীতি এখনও পরিত্যাগ করেননি। কাজেই সমালোচনাকারীরা পার পেয়ে যেতেও পারে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, কোটা সংস্কারের দাবীতে আন্দোলনরত ছাত্র-ছাত্রীদের কাছ থেকে বিএনপি নেতা-কর্মীরা শিক্ষা এবং অনুপ্রেরনা গ্রহন করবেন কি না?

আমার দৃষ্টিতে বিংশ শতকের শ্রেষ্ঠ রাজনীতিবিদ নেলসন ম্যান্ডেলা বলেছেন, আন্দোলন অহিংস হবে নাকি সহিংস হবে সেটা সম্পূর্নভাবে ক্ষমতাসীনদের নীতির ওপরই নির্ভর করে। জনগনের স্বত:স্ফূর্ত এবং যোক্তিক আন্দোলনকে স্বৈরতান্ত্রিক সরকার যখন রাষ্ট্রযন্ত্রের নিপীড়নের মাধ্যমে স্তব্ধ করতে চায় তখনই সহিংসতার সৃষ্টি হয়। দক্ষিন আফ্রিকার বর্ণ-বাদী সরকারের জুলুমের প্রসঙ্গক্রমে নেলসন ম্যান্ডেলা কথাগুলো বললেও সারা বিশ্বেও সকল গনতান্ত্রিক আন্দোলনের জন্যেই সেটি অকাট্য। আজকের বাংলাদেশ সম্পর্কেও কী এই মহান রাষ্ট্রনেতার বিশ্লেষণ সঠিক নয়? এই জন্যেই তিনি, নেলসন ম্যান্ডেলা।

বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তির আন্দোলনের শুরুতে বিএনপি নেতৃবৃন্দের মুখে বার বার শান্তিপূর্ন আন্দোলনের কথা উচ্চারিত হওয়ায় আন্দোলনের মূল লক্ষ্যের চেয়ে তার ধরন নিয়ে বিতর্ক অপ্রয়োজনীয়ভাবে সামনে চলে আসে। ফলে সেই কথিত শান্তিপূর্ন আন্দোলনেও আশাপ্রদ গতি আনা সম্ভব হয়নি। গাজীপুর এবং খুলনার সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন এখন মিডিয়ায় অধিক প্রাধান্য পাচ্ছে। সেই নির্বাচন শেষ হতেই পবিত্র রমজান মাস শুরু হবে। রোজার মাসে রাজনৈতিক কর্মসূচি প্রধানত: ইফতার অনুষ্ঠানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। সার্বিক অবস্থা বিবেচনায় আন্তর্জাতিকভাবে স্বৈরাচারের খেতাবপ্রাপ্ত আওয়ামী লীগ নেত্রী শেখ হাসিনা যদি নিদেনপক্ষে ঈদুল ফিত্র পর্যন্ত বেগম খালেদা জিয়াকে জেলেই রাখতে চান সেক্ষেত্রে বিএনপির নীতি নির্ধারকদের আস্তিনে কোন বিকল্প কৌশল আদো কী আছে? আমাদের মহানবী (সা.) রমজান মাসেই বদরের যুদ্ধে নেতৃত্ব দিলেও বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি বিবেচনায় ওই মাসে কোন কঠোর আন্দোলনের সুযোগ নেই। কাজেই আগামী ঈদ পর্যন্ত খালেদা জিয়াকে জেলে রেখে দখলদার প্রধানমন্ত্রী নিরাপদেই থাকছেন। এই অবস্থায় দু’টো প্রশ্ন উত্থাপন করা যেতে পারে। এক, বিএনপি কী রোজার ঈদের পর থেকেই আন্দোলন শুরু করার সিদ্ধান্ত কিংবা প্রস্তুতি নিয়েছে. এবং দুই, যদি আন্দোলন তারা করেও তাহলে এবারও কী গান্ধীবাদী অহিংসার নীতিতেই তারা অটল থাকছে?

বিএনপির নেতা-কর্মীদের সাথে কথা-বার্তা বলে আমার কাছে মনে হয়েছে যে, দুই কারনে দলের নীতিনির্ধারকরা অহিংসা নীতির প্রতি এতটা গুরুত্ব দিয়েছেন। গনতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় পরিচালিত ২০১৫ সালের ব্যর্থ আন্দোলনের পর বাংলাদেশ এবং ভারত সরকার আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যৌথভাবে বিএনপির বিরুদ্ধে সহিংসতার জোর প্রচারনা চালায়। ঢাকায় নিযুক্ত পশ্চিমা কূটনীতিকরাও ক্ষমতাসীন বেআইনী এবং অসাংবিধানিক সরকারকে সংবিধানের দোহাই দিয়েই সমর্থন জোগায়। তারা আন্দোলনের ন্যায্যতাকে সম্পূর্ন উপেক্ষা কওে এবং সহিংস ঘটনার পেছনে সরকার দলীয় নেতৃবৃন্দ এবং বিশেষ এজেন্সীর হাত থাকলেও এ সকল কূটনীতিবিদ সহিংসতার জন্যে বিএনপিকে ঢালাও এবং একতরফা ভাবে দোষারোপ করে। পশ্চিমা রাষ্ট্রসমূহের এই দ্বিমুখী আচরন ইসলাম ভীতি (Islamophobia) এবং ভারততোষণ নীতি হতে সৃষ্ট। একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপির পক্ষে পশ্চিমা রাষ্ট্রসমূহকে উপেক্ষা করা সম্ভব নয়। ফলে তারা এবার সহিংসতার কোন দায় নিতে চায়নি।

এদিকে ২০১৫ সালের আন্দোলন ব্যর্থ হওয়া মাত্র ক্ষমতাসীন মহল পুলিশ এবং আদালতকে ব্যবহার করে বিরোধী দল ও মতকে নিশ্চিহ্ন করবার যাবতীয় পদক্ষেপ নেয়। বিএনপি জামাতের নেতা-কর্মী এবং ভিন্নমতের বিরুদ্ধে লক্ষাধিক ভুয়া মামলায় প্রায় ২০ লাখ মানুষকে আসামী করা হয়। এদের মধ্যে অধিকাংশই এখন বাড়ী ছাড়া, এলাকাছাড়া হয়ে পলাতক জীবন যাপনে বাধ্য হচ্ছে। বিচার বহির্ভূত হত্যা এবং গুম খুনের সংখ্যা হাজার ছাড়িয়ে গেছে। পুলিশ হেফাজতে বর্বর নির্যাতনে পঙ্গু হয়েছে আরও কয়েক হাজার। এমতাবস্থায় নতুন করে মামলা-হামলার ঝুঁকি এড়াতেও বিএনপি নেতৃবৃন্দ অহিংসার নীতি প্রচারে বাধ্য হয়েছে। চলমান লক্ষাধিক মামলার খরচ চালিয়ে পুনরায় মামলার বোঝা কাঁধে নেয়া তাদের পক্ষে সম্ভব হয়নি। বাংলাদেশের গনতান্ত্রিক আন্দোলনে পুলিশ এবং আদালত আজ সবচাইতে বড় বাধা। যে দূর্বিষহ পরিস্থিতির সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দিলাম তার সঙ্গে দ্বিমত করবেন বাংলাদেশে এমন মানুষের সংখ্যা আমার ধারনা খুব কমই পাওয়া যাবে। তাহলে মুক্তির উপায় কি? সেই মুক্তি প্রক্রিয়া আলোচনার আগে কোটা সংস্কার আন্দোলনের কথা সেরে নেয়া দরকার। কারন জাতির মুক্তির সঙ্গেই তো আমাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ জড়িয়ে আছে।

দীর্ঘদিন পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলে-মেয়েরা সেই পাকিস্তানী আমল থেকে গড়ে ওঠা গৌরবদীপ্ত শিক্ষায়তনের লড়াকু ঐতিহ্যের ইতিহাস আমাদের স্মরন করিয়ে দিয়েছে। মহান ভাষা আন্দোলনের সূতিকাগার ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ১৯৬৯ সালে সামরিক স্বৈরশাসক আইয়ুব খানের পতন ঘটেছিল যে গণ আন্দোলনে তারও নেতৃত্বে ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ১৯৯০ সালে বেহায়া স্বৈরাচার এরশাদের পতনে প্রধান ভূমিকা পালন করেছিল ঢাকসুর নেতৃত্বাধীন সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্য। সর্বশেষ ২০০৭ সালে এক এগারোর ভারতীয় দালাল সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুনরাই সর্বপ্রথম প্রতিবাদ জানিয়েছিল। ভারতের কাছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা বিসর্জনের কুশীলবদের একজন, ডিজিএফআই এর এক বড় কর্তা সেদিন এক সাংবাদিকের মোটর সাইকেলের পেছনে বসে আন্দোলনে উত্তাল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পালিয়ে আত্মরক্ষা করেছিল। তৎকালিন সেই ডাকসাইটে সামরিক কর্মকর্তা এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রবাসী জীবন যাপন করছেন। বর্তমান স্বৈরাচারেরও ক্ষমতায় দীর্ঘ ৯ বছর পার হয়েছে। এর মধ্যে বেশ কয়েকবার গন আন্দোলনের মত পরিস্থিতি সৃষ্টি হলেও রাষ্ট্রযন্ত্রের ব্যাপক এবং বেপরোয়া প্রয়োগের মাধ্যমে সরকার সামলে উঠেছে। ফ্যাসিস্ট শাসকগোষ্ঠীর এই চরম মানবাধিকার লঙ্ঘনকে দিল্লি প্রত্যক্ষভাবে এবং পশ্চিমা রাষ্ট্রসমূহ পরোক্ষভাবে সহায়তা জুগিয়েছে।

বাংলাদেশে কথিত ইসলামী জঙ্গীবাদ নিয়ন্ত্রনের জন্যে শেখ হাসিনা অপরিহার্য, এই ভ্রান্ত নীতি দ্বারা পরিচালিত হওয়ার কারনেই পশ্চিমা রাষ্ট্রসমূহ বাংলাদেশে দিল্লির তাবেদার গোষ্ঠীকে অব্যাহতভাবে সমর্থন দিয়েছে। এবারের ছাত্র আন্দোলনেও জঙ্গী কার্ড ব্যবহার করার অসৎ উদ্দেশ্যে সরকারের নীতিনির্ধারক মহল চিহ্নিত দালাল মিডিয়াদের লেলিয়ে দিয়েছে। স্বত:স্ফূর্ত এবং ন্যায্য আন্দোলনকে প্রশ্নবিদ্ধ করার লক্ষ্যে এই সকল মিডিয়া সাধারন ছাত্রনেতাদের শিবির কর্মী বানানোর অপচেষ্টা করে যাচ্ছে। তবে এই অপকর্মে এখন পর্যন্ত এরা সফল হতে পারেনি। আমার এই নিবন্ধটি লেখার সময় শেখ হাসিনা বিদেশে অবস্থান করছেন। ছাত্র আন্দোলন ব্যাপকভাবে দ্রুত জনসমর্থন লাভ করায় ভীত হয়ে শেখ হাসিনা সম্পূর্ন ভাবে কোটা বাতিলের অসাংবিধানিক ঘোষণা দিলেও দেশে ফিরে তার ভূমিকা কি হবে তা নিয়ে আমার যথেষ্ট সংশয় রয়েছে। কোটা বাতিল ঘোষণা পরবর্তী সময়ে পুলিশ এবং ছাত্রলীগের সন্ত্রাসী আচরনকে স্বৈরাচারী সরকারের ফ্যাসিস্ট প্রধানমন্ত্রীর প্রতিহিংসার বহি:প্রকাশ বলেই আমি ধারনা করছি। তিনি এখানেই থেমে থাকবেন বলে আমার বিশ্বাস হচ্ছে না। ছাত্রদের দাবী মেনে নেয়ার কথা বলে শেখ হাসিনা সময় ক্ষেপন করছেন মাত্র। পরিস্থিতি সরকারের অনুকূলে এলেই তার আসল চেহারা দেখা যাবে।

আন্দোলনে এখন পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীরা প্রবল সাহস যে দেখাতে পেরেছে এতে কোন সন্দেহ নেই। তবে তাদের আন্দোলন প্রক্রিয়ার মধ্যে স্ববিরোধিতা রয়েছে। অবৈধ প্রধানমন্ত্রীর পিতার ছবি বুকে ধারন করা, আন্দোলনের মাঝপথেই স্বৈরাচারের আন্তর্জাতিক মেডেলপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে ‘মাদার অব এডুকেশন’ উপাধি প্রদান- এ সকল কর্মকান্ড ইতিহাস সম্পর্কে অসচেতনতা, অনভিজ্ঞতা এবং স্ববিরোধিতার পরিচায় বহন করে। বিগত নয় বছর নব্য বাকশালের যে শাসনে বাংলাদেশের জনগন নিস্পেসিত হচ্ছে, মানবাধিকার প্রতিনিয়ত পদদলিত হচ্ছে সেই শাসন ব্যবস্থা জন্ম নিয়েছিল ক্ষমতাসীন প্রধানমন্ত্রীর পিতার খাঁটি বাকশাল জামানায়। সেই আমলেও হাজার হাজার তরুন মুক্তিযোদ্ধাকে নির্মম ভাবে গুম-খুন এবং বিচার বহির্ভূত ভাবে হত্যা করা হয়েছে। ভিন্নমত দলন ছিল নিত্য দিনের ঘটনা। চারটি সরকারী প্রচারযন্ত্র রেখে দেশের সকল মিডিয়া বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল। রক্ষীবাহিনীর কর্মকান্ড কোন অংশে র্যাব এর চাইতে কম নিন্দনীয় ছিল না। এ সবই ইতিহাসের অংশ। ফ্যাসিবাদের পদলেহী মিডিয়ায় অব্যাহত প্রচারের কল্যানে আবেগতাড়িত তরুন-তরুনীদের হয়ত সাময়িকভাবে বিভ্রান্ত করা যায়, কিন্তু ইতিহাস তার জায়গায় অপরিবর্তনীয়ভাবে স্থির থাকে। আন্দোলনকারীদের জন্য অপর গুরুত্বপূর্ন বিষয় হলো প্রতিপক্ষের চরিত্র সঠিকভাবে অনুধাবন করা। তারা কোটা সংস্কারের দাবী জানাচ্ছেন এমন এক ব্যাক্তির কাছে যিনি জনগণের ভোটে নির্বাচিত নন। অতএব ক্ষমতাসীন মহলের জনগনের যৌক্তিক কিংবা অযৌক্তিক কোন দাবী পুরনেরই দায় ক্ষমতাসীন অবৈধ সরকারের নেই। এই জন্যেই একদিকে তারা ছাত্র-ছাত্রীদের দাবী মেনে নেয়ার অভিনয় করে, অন্যদিকে লাঠিয়াল পুলিশকে দিয়ে রাজপথ থেকে আন্দোলনের নেতাদের চোখ বেঁধে তুলে নিয়ে যায়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের অধিকাংশ মধ্যবিত্ত শ্রেনি থেকে আসার কারনে ফ্যাসিস্ট সরকারের বেপরোয়া পুলিশ বাহিনী এখনও তাদের ওপর নির্বিচারে গুলিবর্ষণ করে গণহত্যা চালায়নি। এরা দরিদ্র পরিবারের সন্তান হলে ৫ মে ২০১৩ সালের মধ্যরাতে পুলিশ-র্যাব-বিজিবি দ্বারা পরিচালিত হেফাজতের গণহত্যার পূনরাবৃত্তি আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দেখতে পেতাম। ইসলামী জঙ্গী দমনের নামে মাদ্রাসার বালক-কিশোর-তরুনদের যত সহজে হত্যা করে পার পাওয়া যায়, তথাকথিত সেক্যুলার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে একই রকম হত্যাকান্ড চালানো সম্ভব নয়। যে পশ্চিমা সা¤্রাজ্যবাদ ইসলাম বিদ্বেষের কারনে হেফাজত নিধনকে বাহবা দেবে তারাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে সম্পূর্ন উল্টো অবস্থান নেবে। শেখ হাসিনা এবং তার দিল্লির পরামর্শকরা এ বিষয়টি ভালই বোঝেন। তবে স্মরনে রাখতে হবে ফ্যাসিবাদী শাসকের ভিন্নমতের প্রতি বিদ্বেষে কিন্তু, কোন তারতম্য থাকে না। পরিস্থিতি অনুকূল হলে বাংলাদেশের ফ্যাসিবাদী শাসকগোষ্ঠী শুধু গুলি চালানো নয় প্রতিবাদী ছাত্র-ছাত্রীদের ওপর ট্যাংক চালিয়ে দিতেও কিছুমাত্র দ্বিধা করবে না। আন্দোলন চলাকালে একজন পুলিশ কর্মকর্তার ‘খাইয়া ফালামু’ বক্তব্য রীতিমত ভাইরাল হয়ে গেছে। সেই ঘটনা নিয়ে নিন্দাবাদের ডামাডোলে আমরা ফ্যাসিবাদের মূল কেন্দ্র থেকে দৃষ্টি সরিয়ে ফেলেছি। এই নির্বোধ পুলিশ কর্মকর্তা উত্তেজনার বসে যে হুমকি দিয়েছেন সেটি তার কথা নয়। তিনি ‘মাদার অব ফ্যাসিজ্ম্’ এর মনের কথাটি নিজের ভাষায় প্রকাশ করেছেন মাত্র। ইতিহাস এবং রাষ্ট্রবিজ্ঞান অধ্যয়ন কিংবা চর্চা করেন এমন প্রত্যেকেরই জানার কথা যে ফ্যাসিজ্মের চরিত্রই হচ্ছে সকল প্রতিবাদ ও ভিন্নমতকে ‘খাইয়া ফালানো’।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীরা কোটা সংস্কারের দাবীতে আন্দোলন করছেন। অর্থাৎ তাদের লক্ষ্য এখানে কেবল সরকারী চাকরী কারন বেসরকারী খাতের নিয়োগ প্রক্রিয়ায় সাধারনত: কোন কোটা থাকে না। অথচ আন্দোলনকারীদের বেসরকারী খাত নিয়েও চিন্তা-ভাবনা করা উচিৎ ছিল। সম্ভবত: অনভিজ্ঞতার কারনে কর্মসংস্থানের প্রধান খাতটিই তাদের দৃষ্টি এড়িয়ে গেছে এ সম্পর্কে খানিকটা আলোকপাত করা প্রয়োজন। বেসরকারী খাত দেশীয় এবং বিদেশেী বিনিয়োগে প্রতিষ্ঠিত হয়ে থাকে। বিদেশী বিনিয়োগে প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানসমূহের উচ্চ পদগুলোতে আদৌ কোন বাংলাদেশী নাগরিক চাকরী করেন কিনা এ নিয়ে আমার যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। আর করলেও তাদের সংখ্যা হাতে গোনা। উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে সাম্প্রতিক সময়ে দেশীয় বেসরকারী প্রতিষ্ঠানেও বিদেশী নাগরিকরা অধিক সংখ্যায় ঢুকে পড়ছেন। তাহলে আমাদের সন্তানরা কি কেবল সরকারী চাকরী করেই সন্তুষ্ট থাকবে? বেসরকারী খাতে চাকরী করবার যোগ্যতা কী তাদের নেই? বেসরকারী খাতের কর্মসংস্থান নিয়ে আরো একটি গুরুত্বপূর্ন প্রশ্ন রয়েছে। যে সকল বিদেশী বাংলাদেশে বৈধ অথবা অবৈধভাবে চাকরী করছেন তারা কোন দেশের নাগরিক? প্রশাসনের সকল কর্তাব্যক্তি আমার এই প্রশ্নের উত্তর জানেন। কিন্তু, তথ্যটি স্পর্শকাতর হওয়ার কারনে তারা প্রকাশ্যে বলবেন না। বাংলাদেশে বৈধ এবং অবৈধভাবে কর্মরত বিদেশীদের মধ্যে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ বর্তমানে ভারতীয় নাগরিক। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশ অবৈধভাবে কর্মরত হওয়ায় বাংলাদেশ থেকে ভারতে বছরে কি পরিমান বৈদেশিক মূদ্রা চলে যাচ্ছে তার প্রকৃত তথ্য পাওয়া কঠিন। প্রতি বছর হুন্ডির মাধ্যমে কত টাকা ভারতে পাচার হচ্ছে সেই পরিসংখ্যানও বাংলাদেশ ব্যাংক কিংবা জাতীয় রাজস্ব বোর্ড কখনও প্রকাশ করেনি। হয় তারা তথ্য জানে না অথবা জানলেও দিল্লি এবং তাবেদার সরকারের চাপে প্রকাশ করা থেকে বিরত থাকে।

আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন পিউ রিসার্চ সেন্টারের গবেষণা অনুযায়ী ২০১২ সালে বাংলাদেশ থেকে ৪.০৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ভারতে প্রেরণ করা হয়েছে। ওই বছর ভারতে বিদেশ থেকে প্রেরিত অর্থের (Remittance) অর্থের পরিমানে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল পঞ্চম। বেসরকারী ব্যাংকে কর্মরত এক উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা আমাকে সম্প্রতি জানিয়েছে যে, বিগত অর্থবছরে বাংলাদেশে নাকি ভারতের তৃতীয় বৃহত্তম বৈদেশিক মূদ্রা সরবরাহকারী দেশে উন্নীত হয়েছে। এদেশ থেকে ভারতে মুদ্রা প্রেরণের পরিমান ২০১২ সালের ৪.০৮ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে এখন কোথায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে সেটা অনুমান করাও আমাদের সাধ্যাতীত। অর্থাৎ ১৯৪৭ সালের পূর্বে তৎকালিন পূর্ব বঙ্গ ভারতের সম্পদ বৃদ্ধির জন্যে পশ্চাদভূমির (Hinterland) যে ভূমিকা পালন করতো, স্বাধীনতার দীর্ঘ ৪৭ বছর শেষে দূর্ভাগ্যজনক ভাবে সেই ভূমিকাতেই বাংলাদেশ ফেরত গেছে। সুতরাং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দোলনকারী ছাত্র-ছাত্রীদের কোটা সংস্কারের পাশাপাশি বাংলাদেশের বেসরকারী খাতে ঢালাওভাবে বিদেশী নাগরিক নিয়োগ বন্ধেরও দাবী জানাতে হবে। যে সকল পদে বাংলাদেশী তরুন-তরুনীরা যোগ্য সেগুলোতে বিদেশী নাগরিক নিয়োগে বিধি নিষেধ জারি করার দাবী না তুললে এদেশের কর্পোরেট সেক্টর এক সময় সম্পূর্নভাবে ভারতীয়করন হয়ে যাবে। জেনারেল মইন এবং শেখ হাসিনার ১১ বছরের শাসনকালে বাংলাদেশ সর্বক্ষেত্রে প্রবল প্রতিবেশীর চারনভূমিতে পরিনত হয়েছে। দেরিতে হলেও আমাদের সন্তানেরা যেহেতু জেগেছে, তাই আমার এই প্রবীনত্বে দেশের অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক সার্বভৌমত্ব পুনরুদ্ধারের স্বপ্ন নতুন করে দেখছি। আমার বিরুদ্ধে শেখ হাসিনার নতুন নতুন মামলা দেয়ার ফলে আমার সারা দেশ ঘুরে বেড়ানোর সুযোগ হচ্ছে। আমি যেখানেই যাই, তরুনদের সাথে কথা বলার চেষ্টা করি। ভারতীয় আধিপত্যবাদ এবং বাংলাদেশী ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করবার আকাঙ্খা দেখতে পাই ওদের প্রত্যেকের চোখে।

গতকাল হবিগঞ্জ থেকে ফিরেছি। সেখানে কত তরুন বুকে-পিঠে অসংখ্য গুলির চিহ্ন নিয় বেঁচে আছে। একজনকে দেখলাম বা চোখটা গুলিতে নষ্ট হয়ে গেছে। রাবার বুলেটের অংশ বাসা বেধে আছে চোখের ভিতরের দিকে। অপর চোখের দৃষ্টিশক্তিও ক্রমেই কমে আসছে। শেখ হাসিনার বর্বর পুলিশ বাহিনী ভরা তারুন্যে ছেলেটির জীবনে অন্ধকার নিয়ে এসেছে। এমন ঘটনা একটি, দুটি নয়। সারা দেশে হাজার হাজার তরুনকে ফ্যাসিবাদ এভাবেই পঙ্গু করে দিয়েছে। চোখে পানি নিয়ে অবাক হয়ে লক্ষ্য করলাম যে, এত অত্যাচারও আমাদের সন্তানদের মনোবল ভাঙতে পারেনি। তারা সবাই এখনই লড়াই এর ময়দানে ফিরতে প্রস্তুত। কার্যকর ডাকের জন্যে অপেক্ষা করছে বাংলাদেশের লক্ষ লক্ষ স্বাধীনতাকামী তরুন। যুগপৎ বিষাদ এবং আশা নিয়েই লেখার দ্বিতীয় কিস্তি শেষ করলাম। লেখাটির সমাপ্তি টানবো তৃতীয় কিস্তিতে। এবার পাঠকের অপেক্ষা দীর্ঘ হবে না ইনশাআল্লাহ।

সম্পাদক, দৈনিক আমার দেশ।

Comments

comments