মাস্তির শাস্তি কেন শিশুরা ভোগ করবে?

উৎসবে শিশু (ফাইল ফটো)

হাসান রূহী

উৎসব উদযাপনে বাঙালি জাতির মত এত উদগ্রীব জাতি পৃথিবীতে আর কয়টি আছে তা হিসেব করে দেখার ব্যাপার। ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক, অরাজনৈতিকসহ কত কিসিমের যে উৎসব এদেশে চলে তা নির্ণয় করা বেশ কষ্টসাধ্য। উৎসবের প্রয়োজনে এ জাতি নিত্য নতুন অনুসঙ্গ যোগ করতেও সিদ্ধহস্ত। মাত্র কয়েক দশক আগের একটি শোভাযাত্রাকে হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতি বলে প্রচার করতেও তারা দ্বিধাবোধ করে না। অন্যের ধর্ম কিংবা সংস্কৃতি থেকে ধার করে সে কর্মকান্ডগুলো নিজেদের বলে চালিয়ে দিতেও এরা বদ্ধপরিকর। সে যাই হোক, উৎসবের তাগিদে তারা কি করে আর কি করে না সে বিশ্লেষণ আজ করতে চাই না। মৌজ-মাস্তি করতে গিয়ে ওনারা কি কি করেন তাও বর্ণনা করতে চাই না। আজ কথা বলতে চাই খুবই মানবিক একটি ব্যাপার নিয়ে।

পহেলা বৈশাখের দিন ছুটি থাকার পরেও একটা জরুরী কাজে বাইরে বের হতে হলো। কাজটা করতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা অতিক্রম করা প্রয়োজন ছিল। কিন্তু বিধি বাম! বাস ওই এলাকার কাছাকাছি এসে জানালো আর যাবে না। বাধ্য হয়ে কিছুদূর এগিয়ে তারপর লেগুনার শরণাপন্ন হতে হলো। কিন্তু গ্রীষ্মের প্রখর রোদে ওটুকু জায়গা হাঁটতেই বেশ ভিরমী খেতে হলো। আশ্চর্য্যজনক হলেও সত্য যে, এই অসহ্য গরমের মধ্যেও এক শ্রেণির বাবা-মা কোলের শিশুটিকে নিয়ে সেজে গুজে বেরিয়ে পড়েছেন রাস্তায়। কেউবা যোগ দিতে এসেছেন কথিত মঙ্গল শোভাযাত্রায় আর কেউবা বৈশাখী মেলায় কিংবা পান্তা-ইলিশ ভোজনে। গরম-ঠান্ডা সহ্য করার ক্ষমতা বড়দের যতটা শিশুদের ততটা নয়। কিন্তু এসব কিছুর তোয়াক্কা না করে অবুঝ শিশুদের নিয়ে এমন উৎসবে বেরিয়ে পড়া কতটুকু অন্যায় তা আজ নতুন করে দেখলাম। পুরাণ ঢাকার বাহাদুর শাহ পার্কের কাছে যেতেই দেখলাম গরমে অসুস্থ হয়ে পড়েছে এক শিশু। রাস্তার পাশেই তার মাথায় পানি ঢালছেন তার বাবা। মা অনেকটা নিরূপায় হয়ে কাঁদো কাঁদো চেহারায় ধরে আছেন শিশুটিকে। বাহাদুর শাহ পার্কের ভেতরে তখন লাউড স্পিকারে গান আর ছেলে-বুড়ো, পুরুষ-নারীদের উদ্দাম নৃত্যে ব্যস্ত থাকা মানুষদের ফিরে তাকানোরও সময় ছিল না ওই শিশু কিংবা তার অসচেতন পিতা-মাতার দিকে।

আর ভীড়ের ব্যাপার তো আছেই। কথিত মঙ্গল শোভাযাত্রায় যারা যায় তাদের মধ্যে একটা বড় সংখ্যক কুরুচীর মানুষ থাকে। যার সবচেয়ে বড় উদাহরণ দেশের মানুষ দেখেছে ২০১৫ সালের বর্ষবরণের দিনে নারীদের বস্ত্রহরণের নির্লজ্জ ঘটনায়। এমন প্রাণঘাতি ভীড়ের মধ্যে যারা নিজেদের অবুঝ শিশুকে নিয়ে যান, তারা কতটা অবিবেচক ও নির্বোধ তা বলে দেয়ার প্রয়োজন আছে বলে মনে করি না। এটাও মনে করি না যে, আমার এই লেখা পড়ার পর আপনি খুব সচেতন হয়ে যাবেন। কিন্তু বিবেকের তাড়নায় কথাগুলো লিখতেই হচ্ছে।

সন্ধ্যা আসন্ন। কাজ শেষে একজন আত্মীয়ের সাথে সাক্ষাত করে তখন ফিরছি। আসরের পর থেকেই আকাশটা গুমোট হয়ে এল। বুঝে গেলাম বৈশাখি ঝড় আসছে। দেখতে দেখতেই বৃষ্টি চলে এল। একটা দোকানের সামনে বেশ কিছুক্ষণ দাঁড়ালাম। কিছুক্ষণ পর বৃষ্টি কমলে বাস এ উঠলাম। দেখতে দেখতেই বাস মানুষে ভরপুর হয়ে গেল। এর মধ্যে একটা ভাল সংখ্যক যাত্রী কাকভেজা হয়ে আছেন। হঠাৎ হাঁচির ও গগণ বিদারী কান্নার শব্দে ফিরে তাকিয়ে দেখলাম একটা বাচ্চা তার মায়ের কোলে বসে আছে। বাচ্চাটিকে মা তার ভেজা লাল পাড়ের শাড়ী দিয়ে বারবার মোছার ব্যর্থ চেষ্টা করছিলেন। পাশেই অসহায় ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছেন পিতা। তারও পুরো শরীর ভেজা। শিশুটির হাঁচি, কাশি সমান তালে চলছে। এরই মধ্যে গাড়ীর ভীড় এতটা বেড়ে যায় যে, এর মধ্যে সুস্থ মানুষের অবস্থান করাই সেখানে দুঃসাধ্য। সে অবস্থায় ওই শিশুটির অসহায়ত্বে আমার যেমন কান্না পাচ্ছিল, তেমন মেজাজও খারাপ হচ্ছিল। অতিমাত্রায় চেতনাসক্ত বাবা-মায়ের নির্বুদ্ধিতার ফল আজ ভোগ করতে হয়েছে ওই অবুঝ শিশুটিকে।

বিভিন্ন উৎসবকে কেন্দ্র করে সেজে গুজে আপনি বেরিয়ে পড়বেন তাতে আমি আপত্তি করার কে! আর আমি আপত্তি করলেও আপনি কেন তা শুনবেন? বাঙালি সংস্কৃতিকে লালন করতে আপনি আরও কয়েক সের ফেস পাউডার মুখে মেখে বেরিয়ে পড়তেই পারেন। কিন্তু আপনার অবুঝ শিশুটিকে কোন যুক্তিতে আপনি ঝুকির মুখে ফেলতে পারেন? আপনার মাস্তির শাস্তি কেন তাকে ভোগ করতে হবে? আপনার মাস্তির জন্য আপনি যে আপনার অবুঝ শিশুটিকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিচ্ছেন তা অবশ্যই আপনার খেয়াল করা উচিত। মনে রাখবেন, একটি দুর্ঘটনা সারাজীবনের কান্না।

Comments

comments