গোপন সুড়ঙ্গ যেভাবে একটি জনপদকে বাঁচিয়ে রেখেছে

মিসর-ইসরাইল শান্তিচুক্তির মাধ্যমে ১৯৭৯ সালে দু’ভাগ হয়ে যায় গাজার রাফাহ শহর। এক ভাগ থাকে গাজায়, অপর অংশ মিসরে। সীমান্তে ইসরাইলি সৈন্যদের সতর্ক প্রহরা। তবুও যোগাযোগ হয় দুই অংশের; মাটির তলা দিয়ে। অবরুদ্ধ শহরে মিসর থেকে আসে ভোগ্যপণ্য, অস্ত্র, জীবন্ত পশু সবই। ইসরাইলি অবরোধকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে শহরবাসী গড়ে তোলে আন্ডারগ্রাউন্ড ইকোনমি। মিসরে জেনারেল সিসি ক্ষমতা দখলের পর অনেক টানেল বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। ফলে গাজাবাসীর দুর্ভোগ আরো বেড়েছে। এরমধ্যে গাজায় চলছে ইসরাইলের বর্বর হামলা। প্রতিদিন নিহত হচ্ছে নারী ও শিশুরা। বিদেশী সাময়িকী অবলম্বনে গাজার টানেলের কাহিনী জানাচ্ছেন হুমায়ুন সাদেক চৌধুরী

সামির ও ইউসুফ দুই ভাই যখন থেকে গাজার চোরাচালান সুড়ঙ্গে কাজ শুরু করেছে, তখন থেকেই তাদের মনে ভয়, এক দিন এই সুড়ঙ্গপথেই বুঝি তাদের মরণ হবে। হলোও তাই। ২০১১ সালের এক শীতের রাতে টানেলের ভেতর একটি বড় পাথর ভেঙে পড়ল। আর তার নিচে চাপা পড়ে প্রাণ হারাল ইউসুফ।

দুর্ঘটনাটি ঘটে যখন, তখন রাত প্রায় ৯টা। সামির ও ইউসুফ তখন টানেলের মেরামত কাজ করছিল। তাদের সাথে ছিল আরো দু’জন কারিম ও খামিস। এখানে বলে রাখি, গাজা থেকে মিসরের সিনাই উপদ্বীপ পর্যন্ত এ রকম কয়েক শ’ সুড়ঙ্গ বা টানেল আছে (কেন, সে কথায় পরে আসছি)। এগুলোর বেশির ভাগই যেনতেনভাবে নির্মিত, ফলে প্রাণঘাতী। আমরা যে সুড়ঙ্গপথ বা টানেলটির কথা বলছি, সেটি গাজার সর্বদক্ষিণের শহর রাফায় অবস্থিত। ভূপৃষ্ঠের শ’খানেক ফুট নিচ দিয়ে এটি চলে গেছে মিসরের সিনাইয়ে।

যে দিনের কথা বলছি, সে দিন সামির কাজ করছিল টানেলের প্রবেশমুখে, আর দুই সহযোগীকে নিয়ে ইউসুফ ছিল মাঝামাঝি এক জায়গায়। টানেলের দেয়ালের একটা অংশ ভেঙে পড়বে পড়বে করছিল, ওটা ঠেকাতে তারা ফাটলে একটা প্লাইউড গুঁজে দেয়ার চেষ্টা করছিল। ঠিক এ সময় দেয়ালের ওই অংশটি হুড়মুড় করে ভেঙে পড়তে থাকে। খামিসকে জোরে এক টান দিয়ে সরিয়ে নেয় কারিম, আর ওপাশে লাফ দিয়ে দূরে সরে যায় ইউসুফ। এক মুহূর্তের জন্য বন্ধ হয় দেয়ালের কাঁপুনি। ইউসুফ ওপাশ থেকে, সবাই নিরাপদ আছে দেখে, বলে, ‘আলহামদুলিল্লাহ্!’

এরপর আবার ভেঙে পড়ে পাথরের দেয়াল। ইউসুফকে আর দেখতে পায় না কারিম ও খামিস। এ দিকে রেডিও সিস্টেমের মাধ্যমে টানেলের প্রবেশমুখে বসেই দেয়াল ভাঙার শব্দ শুনতে পায় সামির। সে দ্রুত দৌড়ে টানেলে ঢুকে পড়ে। চার দিক ধুলোয় ভরা। তার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসতে চায়। কিন্তু ভাই কোথায়? ভেঙে পড়া পাথরের ওপাশে? সামির দেখে, ওপাশে যাওয়ার পথটি নিচু ও সরু। একপর্যায়ে সে দেখে, কারিম ও খামিস পাগলের মতো দু’হাত দিয়ে পথটি বড় করার চেষ্টা করছে। তা দেখে সামিরও হাত লাগায়। এ সময় টানেলটি আবার ভাঙতে থাকে। কংক্রিট ব্লকে তৈরি একটি খুঁটি এসে পড়ে কারিমের বাহুতে। বাহুটি পিষে যায়।

তিন ঘণ্টা চেষ্টার পর কারিম ও খামিস নীল ট্র্যাকস্যুট পরা একটি পায়ের দেখা পায়। তারা চেষ্টা করে বিষয়টি সামিরকে বুঝতে না দিতে। কারণ ওই পা তো তারই ভাই ইউসুফের এবং ইউসুফ আর এ জগতে নেই। কারিম ও খামিস দু’জনই সামিরকে বলে, ‘তুমি যাও, আমরা দেখছি।’ কিন্তু সামির নাছোড়বান্দা। সে তার ভাইয়ের খোঁজ না নিয়ে যাবেই না। একপর্যায়ে সে মৃত ভাইয়ের লাশ খুঁজে বের করে ফেলে। দেখে, তার বুক, মাথা ছিন্নভিন্ন। নাক-মুখ দিয়ে বেরিয়ে এসেছে রক্ত। ততক্ষণে অন্যরাও এসে গেছে। সবাই মিলে টানেল থেকে টেনে বের করে আনে ইউসুফকে। লাশ নিয়ে একটি গাড়ি দ্রুত ছুটে যায় রাফাহ শহরের একমাত্র হাসপাতালের দিকে। সেই গাড়িতে সামিরের জায়গা হয় না। সেও একটা বাইসাইকেলে চড়ে ছুটতে থাকে হাসপাতাল অভিমুখে। জানে, তার ভাই আর তার কথা বলবে না। তবুও।

সামিররা থাকে জাবালিয়া শরণার্থী শিবিরে; একটি অসমাপ্ত অ্যাপার্টমেন্ট ব্লকের নিচতলায়। এখানেই তাদের জন্ম ও বেড়ে ওঠা। অদূরে সরু গলিতে একটা ক্যানভাসের তাঁবুর নিচে অনেক লোক। তারা এসেছে ইউসুফের মৃত্যুতে শোক জানাতে। কংক্রিটের দেয়ালে ইসরাইলি গোলার আঘাতের চিহ্ন জ্বলজ্বল করছে। রান্নাঘরের চামচ দিয়ে শিশুরা মাটি খুঁড়ে খুঁড়ে কী যেন একটা খেলা খেলছে। বিদ্যুৎ নেই, চলছে জেনারেটর। তার ভট ভট শব্দ ও ধোঁয়ায় চার দিক আচ্ছন্ন।

সামির ও ইউসুফ টানেলে কাজ নেয় ২০০৮ সালে। সামির কিছুতেই এ কাজ করতে রাজি ছিল না। কিন্তু না করেই বা উপায় কী? শীর্ণদেহী, চেইনস্মোকার সামিরকে মনে হচ্ছিল উদভ্রান্ত। তার মতে, এ কাজে যেকোনো সময় মৃত্যু হতে পারে। হ্যাঁ, অল্প কিছু টানেল আছে যেগুলো ভালোভাবে বানানো, ভ্যান্টিলেশনের ব্যবস্থা আছে। কিন্তু সে রকম আর ক’টা, বেশির ভাগই জীর্ণশীর্ণ। ফলে প্রায়ই ভেঙে পড়ে বিস্ফোরণ, বিমান হামলা কিংবা আগুন ধরে গেলে তো কথাই নেই।

এ ছাড়া টানেলে যারা কাজ করে, তাদের একটা-না-একটা অসুখ-বিসুখ লেগেই থাকে। যেমন ইউসুফের ছিল শ্বাসকষ্ট। একবার দেয়াল ভেঙে খামিসের পা ভেঙে যায়। তার সহকর্মী সুহাইল গায়ের জামা খুলে দেখায় তার মেরুদণ্ড বরাবর কয়েক ইঞ্চি লম্বা ক্ষতচিহ্ন। নিচু টানেলে হামাগুঁড়ি দিয়ে কাজ করতে করতে ছাদের সাথে পিঠ লেগে লেগে এটার সৃষ্টি। সামির বলে, ‘মনে হয় একটা অশুভ কিছু যেন পিছু লেগেই আছে। ভাবি, এই বুঝি খারাপ কিছু একটা ঘটল।’

এভাবে টানেলে যাদের মৃত্যু হয়, গাজায় তারাও এখন বীরের মর্যাদা পান। এক সময় এ মর্যাদা পেতেন শুধু পিএলও নেতা ইয়াসির আরাফাত কিংবা হামাসের প্রতিষ্ঠাতা আহমেদ ইয়াসিনের মতো ব্যক্তিত্বরা। এখন একই মর্যাদা পাচ্ছেন ইউসুফের মতো টানেল ভিকটিমরাও। কারণ অবরুদ্ধ গাজার জনজীবন ও অর্থনীতিকে টিকিয়ে রেখেছে এসব টানেলই।

ইউসুফের মৃত্যুতে শোক জানাতে আসা মানুষজনকে বসতে দেয়ার জন্য যে তাঁবুটি করা হয়েছিল, সেখানে অনেক পোস্টার। পোস্টারে উৎকীর্ণ পবিত্র কুরআনের আয়াত এবং ইউসুফের মৃত্যুতে শোক ও পরিবারকে সান্তনা। ইউসুফ যে স্কুলে লেখাপড়া করেছে সেই স্কুল, তাদের মসজিদের ইমাম এবং পরস্পরবিরোধী দুই রাজনৈতিক দল ফাতাহ ও হামাসের স্থানীয় নেতৃবৃন্দ সবাই শোক প্রকাশ করেছেন। সবচেয়ে আকর্ষণীয় পোস্টারটি এসেছে স্থানীয় মুখতারের (প্রথাগত আরব নেতা) কাছ থেকে। পোস্টারে ইউসুফের বিয়ের দিনের ছবি। তার পরনে সাদা শার্ট, গোলাপি টাই। চুল ছোট করে ছাঁটা। দু’চোখে নম্রতা। পোস্টারে লেখা : ‘বীর ইউসুফের শাহাদত বরণে তার পরিবারের সাথে মুখতারের সন্তানেরাও শোকার্ত’।

কিন্তু কেন এই টানেল? এটা হচ্ছে ১৯৭৯ সালে সম্পাদিত মিসর-ইসরাইল শান্তিচুক্তির ফল বা কুফল। এই চুক্তির মাধ্যমে গাজার রাফা শহরটির একাংশ চলে যায় মিসরের অধীনে। এরপরই ১৯৮২ সাল থেকে মিসর থেকে পণ্য আনার সুবিধার্থে গড়ে উঠতে থাকে সুড়ঙ্গপথ। প্রথম প্রথম টানেল খোঁড়া হতো কোনো বাড়ির বেসমেন্টে। একপর্যায়ে ইসরাইলি বাহিনী বিষয়টা টের পেয়ে যায়। তারা জানতে পারে, এর মধ্য দিয়ে অস্ত্রও আসছে। তখন তারা যে বাড়ির বেসমেন্টে টানেলের মুখ, সেই বাড়িই গুঁড়িয়ে দিতে শুরু করে। ‘টানেল ইকোনমিকে’ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে একশ্রেণীর ফিলিস্তিনিও এ কাজে ইসরাইলি বাহিনীকে সহযোগিতা করে। কিন্তু এতেও চোরাচালান বন্ধ করা সম্ভব হয় না। একপর্যায়ে ইসরাইলি বাহিনী সীমান্ত ও শহরের মাঝখানে ‘বাফার জোন’ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ধ্বংসযজ্ঞ আরো বাড়িয়ে দেয়। মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচের হিসাব মতে, ২০০০ সাল থেকে ২০০৪ এই সময় তারা ১৭০০ বাড়ি গুঁড়িয়ে দিয়েছে।

২০০৬ সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে জয়ী হয় ইসলামি প্রতিরোধ আন্দোলন; যা হামাস। এরপর হামাস ও ফাতাহ গৃহযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। পরের বছর সেই যুদ্ধে জয়ী হয় হামাস এবং তারা গাজার শাসনভার গ্রহণ করে। আর তখনই গাজার ওপর অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ এবং ক্রমশ তা কঠোর করতে থাকে ইসরাইল। তারা গাজার বিভিন্ন প্রবেশদ্বার বন্ধ করে দেয় এবং জীবনধারণের জন্য প্রয়োজনীয় প্রায় সব কিছুর আমদানি নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। আর এতে ইসরাইলকে সহযোগিতা দেয় হোসনি মোবারকের মিসর।

এই অবরোধের পর গাজার সামনে চোরাচালান ছাড়া বিকল্প থাকে না। সেই চোরাচালানের মাধ্যম হয় রাফা শহরের তলদেশ দিয়ে খনন করা কয়েক শ’ টানেল। এসব টানেল দিয়ে মিসর থেকে আসতে থাকে সব কিছু নির্মাণসামগ্রী, খাদ্য, ওষুধ, কাপড়চোপড়, জ্বালানি তেল, কম্পিউটার, গবাদিপশু, এমনকি গাড়ি পর্যন্ত। পাশাপাশি হামাস আনতে থাকে অস্ত্র। টানেল বাণিজ্যের রমরমা দেখে প্রত্যেক দিনই নতুন নতুন টানেল খোঁড়া হতে থাকে। টানেল মানেই সৌভাগ্য। অনেকে টানেলের জন্য জায়গার পজেশন বিক্রি করেও দু’পয়সা কামিয়ে নেয়। দেখা গেছে, পিক আওয়ারে টানেলে কাজ করে প্রায় ১৫ হাজার লোক। আর তাদের কারণে আরো কয়েক লাখ লোকের (যেমন প্রকৌশলী ও ট্রাকচালক থেকে শুরু করে দোকানদার পর্যন্ত) কাজের সুযোগ তৈরি হয়। বর্তমানে গাজার ‘টানেল ইকোনমি’ সেখানকার ভোগ্যপণ্য ব্যবসার এক-তৃতীয়াংশের নিয়ন্ত্রক।

এ দিকে ২০১১ সালের গোড়ার দিকে মিসরে পতন ঘটে হোসনি মোবারকের। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ছোট রাফাহ বর্ডার ক্রসিংটি খুলে দেয় মিসর, যদিও কিছু গাজাবাসীর সীমান্ত অতিক্রমের ওপর নিষেধাজ্ঞা বহাল থেকে যায়। মিসরের নতুন প্রেসিডেন্ট হন মোহাম্মদ মুরসি। তিনি গাজাকে যে রকম সাহায্য-সহায়তা করবেন বলে ভেবেছিল গাজাবাসী, বাস্তবে তেমনটা হয় না; বরং তিনি কেন যেন হামাসের সাথে এক ধরনের দূরত্ব রেখে চলতে থাকেন। গত আগস্টে সিনাই উপদ্বীপের উত্তরাঞ্চলে দুর্বৃত্তদের গুলিতে নিহত হয় ১৬ জন মিসরীয় সৈন্য। এর প্রতিক্রিয়ায় মিসর সাময়িকভাবে রাফাহ ক্রসিং বন্ধ করে দেয়। গুঁড়িয়ে দেয় কমপক্ষে ৩৫টি টানেলও।

গাজার একজন সরকারি প্রকৌশলী বলেন, ‘আমরা টানেল ব্যবহার করতে চাই না। কিন্তু অবরোধের সময় এটা ছাড়া আমাদের বেঁচে থাকাই কষ্টকর। তখন যুদ্ধ আর দারিদ্র্য ছাড়া আমার সামনে কী-ই বা থাকে!’ তবে প্রকৌশলী যা-ই বলুন, বেশির ভাগ গাজাবাসীর কাছে এসব টানেল প্রাণঘাতী হলেও আপন ভূমির ওপর অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রতীক। যদিও সেই অধিকার মাটির ওপর নয়, নিচ দিয়েই প্রতিষ্ঠিত।

গাজার ওপর সেই প্রাগৈতিহাসিককাল থেকেই অধিকার কায়েম করেছে নানা নৃপতি ও জাতি। কিন্তু এখন ইসরাইল গাজার চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে পশ্চিম তীরকে। ইসরাইল এখন বাইবেলে বর্ণিত ‘ইহুদিদের জন্য ঈশ্বরের প্রতিশ্রুত ভূমি’ মনে করছে পশ্চিম তীরকে। অপর দিকে গাজা এখন ফিলিস্তিনি মুক্তিসংগ্রামের প্রাণকেন্দ্র। এখান থেকেই হামাসকর্মীরা ইসরাইলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে, ইসরাইলের ওপর মর্টার ও রকেট ছোঁড়ে। এসব অস্ত্র আসে মাটির নিচের সুড়ঙ্গ দিয়েই।

সরকারি প্রকল্পে ব্যবহৃত সব সরঞ্জামের জোগানও আসে এই সুড়ঙ্গপথ দিয়েই। আর এ পথ দিয়ে যত জিনিস আসে, তার সব কিছুর ওপর কর বসিয়ে রেখেছে হামাস। কেউ কর দিতে না চাইলে তার টানেল বন্ধ করে দেয়া হয়। কর বাবদ হামাস বছরে আনুমানিক ৭৫ কোটি মার্কিন ডলার আয় করে থাকে। এ ছাড়া টানেলপথ দিয়ে সংগঠনের নির্বাসিত নেতা ও পৃষ্ঠপোষকদের কাছ থেকে নগদ অর্থও পায় হামাস। সিরিয়া, ইরান ও কাতার থেকে এসব অর্থ এসে থাকে।

সামির জানায়, টানেল অপারেটরদের সাথে হামাস নেতা ও স্থানীয় সরকারি কর্মকর্তাদের ‘ব্যবসায়’ রয়েছে। এই যেমন ইউসুফের মতো কেউ যদি টানেল দুর্ঘটনায় মারা যায়, তখন টানেল অপারেটরকে থানা পুলিশ মামলা-আদালত এসব থেকে বাঁচাতে এগিয়ে আসে তারা। সামিরের মতে, দুর্নীতি ও ঘুষ এখানে লাগামছাড়া। সামিরের এ কথায় দ্বিমত নেই তার বন্ধুদেরও।

২০১০ সালে গাজাবাসীর জন্য ত্রাণসামগ্রী বহনকারী একটি তুর্কি নৌযানের ওপর হামলা চালায় ইসরাইলি নৌ-কমান্ডোরা। এ ঘটনায় সারা বিশ্ব ইসরাইলকে ধিক্কার দেয়। এরপর মুখ বাঁচাতে ইসরাইল বলে যে, তারা অবরোধ কিছুটা শিথিল করেছে। এই তথাকথিত ‘শিথিল’ করার নমুনা হলো এই যে, গাজায় মাত্র একটি পথ দিয়ে পণ্যসামগ্রী ঢুকতে পারছে। অথচ পশ্চিম তীরে এ রকম অনেক পথ খোলা। এভাবেই ইসরাইল এক কোটি ৬০ লাখ গাজাবাসীর জীবনকে কঠিন ও ব্যয়সাধ্য করে রেখেছে। সেখানে জাতিসঙ্ঘের কোনো ত্রাণসংস্থা কিংবা অন্য কোনো সংগঠন ত্রাণসামগ্রী নিয়ে ঢুকতে পারে না। বেঁচে থাকার এবং নির্মাণকাজ চালানোর কোনো জিনিসই বৈধভাবে আমদানি করতে পারে না গাজা। ওই একটিমাত্র খোলা পথ দিয়ে এবং টানেল দিয়ে যা আসে তারও বেশির ভাগ ব্যবহারযোগ্য নয়। যেমন পুরনো কাপড় ও যন্ত্রপাতি, জাঙ্কফুড ইত্যাদি। এ দিয়ে মৌলিক চাহিদা মেটানো অসম্ভব। এভাবেই ইসরাইলি ‘হেসার’ (অবরোধ) গাজাবাসীকে পঙ্গু করে ফেলেছে। বিষয়টি এত স্পষ্ট যে, ইসরাইলের অনেক পুরনো সমর্থকও এ কথায় দ্বিমত করেন না। ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন পর্যন্ত দুঃখ করে বলেন, ‘অবরোধ গাজাকে বন্দিশিবিরে পরিণত করেছে।’

তবে অবস্থা সব সময় এরকম ছিল না। সেই ১৯৬০ সাল থেকে ১৯৮০ দশকের গোড়ার দিক পর্যন্ত গাজা ও ইসরাইলের মধ্যে পারস্পরিক ব্যবসায়িক সম্পর্ক ছিল। গাজার শ্রমজীবী মানুষ প্রতিদিন সীমান্ত অতিক্রম করে তেলআবিব ও জেরুসালেম যেত কাজের সন্ধানে। অপর দিকে ইসরাইলিরাও আসত গাজা সিটি, খান ইউনিস এবং বিশেষ করে রাফাহর শুল্কমুক্ত বাজারগুলোতে। গাজার প্রবীণেরা এখনো যাকে বলেন সুক আল বাহরাইন বা ‘দুই দরিয়ার বাজার’। ফিলিস্তিনের প্রথম ইন্তিফাদা বা গণবিপ্লব (১৯৮৭-৯৩) এই সম্পর্কের ইতি ঘটায়।

তবে তাই বলে এতে গাজার জীবনযাত্রা স্তব্ধ হয়ে যায়নি; কঠিন হয়েছে যদিও। রাফা মার্কেটে ঢুকলেই গাজার অর্থনৈতিক জীবনের প্রাণস্পন্দনটি টের পাওয়া যায়। জেনারেটরের ধোঁয়া ও শব্দ, দোকানিদের হাঁকডাক, গাধার চিৎকার এবং শর্মার (হুঁকা) মৃদু সৌরভ সব মিলিয়ে চার দিক মাতোয়ারা। সারি সারি দোকান, তাতে সব রকম ভোগ্যপণ্য বিক্রির জন্য সাজিয়ে রাখা। এর বেশির ভাগই এসেছে সুড়ঙ্গপথ ধরে।

রাফাহ মার্কেট থেকে কিছু দূর গেলেই চোখে পড়বে সারি সারি তাঁবু। এই তাঁবুর নিচেই এক-একটা টানেলের আসা-যাওয়ার পথ। সব তাঁবুই তথাকথিত ফিলাডেলফি রুটের ধার ঘেঁষে। ১৯৭৯ সালে মিসরের সাথে শান্তিচুক্তির পর সেনা টহলের এই রুটটি তৈরি করে ইসরাইল সেনাবাহিনী। এই তাঁবুর সারি আর ইসরাইলি সেনা টহল সবই দেখা যায় ওপারে মিসর থেকে। এপারেও প্রতি কয়েক শ’ গজ পরপর একে-৪৭ রাইফেল হাতে পাহারা দিচ্ছে ফিলিস্তিনি রক্ষীরা। সেখানে সাংবাদিকদের প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করেছে হামাস।

এখানে একটি টানেলের মালিক মাহমুদ। বয়স পঞ্চাশের কোঠায়। আগে ইসরাইলের একটি খামারে কাজ করতেন। দ্বিতীয় ইন্তিফাদা শুরু হলে গাজা সীমান্ত বন্ধ করে দেয় ইসরাইল। ফলে মাহমুদ আর ওপারে যেতে পারেন না। আরো কয়েকজনকে জুটিয়ে ২০০৬ সালে এক দিন খোঁড়াখুঁড়ি শুরু করে দেন। এক বছর পর কাজ শেষ হলে তারা একটি টানেলের মালিক হয়ে যান।

মাহমুদের টানেলটি দেখার মতো। প্রথমেই বিরাট এক গর্ত। পণ্য ও শ্রমিক ওঠানামার জন্য রয়েছে একটি কপিকল। সেটা দিয়েই ৬০ ফুটের মতো নিচের দিকে টানেলের মুখে নামে শ্রমিকেরা, ওঠায় ওপর থেকে আসা পণ্য। এই টানেলটি লম্বায় চার শ’ গজের মতো, তবে আধ মাইল লম্বা টানেলও আছে। এসব টানেল দিয়ে আসে গম, চিনি, কাপড়চোপড়, মোবাইল ফোন, ডিটারজেন্ট সবই। পণ্যভেদে প্রতি চালানে তার আয় হয় কয়েক শ’ থেকে কয়েক হাজার ডলার পর্যন্ত। তবে এই আয়ের একটা বিরাট অংশ চলে যায় টানেল চালু রাখতে। সব খরচ বাদ দিয়ে পরিবারের জন্য যা থাকে, তাকে যথেষ্ট বলা যায় না।

মাহমুদের টানেলে রাত ও দিন এই দুই পালায় ১২ জন শ্রমিক সপ্তাহে ছয় দিন কাজ কাজ করে। মাহমুদ একটি টু-ওয়ে রেডিওর সাহায্যে তাদের সাথে যোগাযোগ রাখেন। টানেলের ভেতর এর কয়েকটি রিসিভার লাগানো আছে। শ্রমিকদের প্রতি শিফটের মজুরি জনপ্রতি ৫০ মার্কিন ডলার। তবে কখনো কখনো তা পেতে তাদের সপ্তাহ, এমনকি মাসও পেরিয়ে যায়। কাজের ফাঁকে অথবা কাজ শেষে তারা তাঁবুতে এসে বিশ্রাম নেয়। বিশ্রামই বা এমনকি, নোংরা মেঝের ওপর অপরিচ্ছন্ন ক’টি তাকিয়া, তাতে হেলান দেয়া। একটি নামাজের জায়গা। পানির কয়েকটি জেরিকেন। চা বানানোর একটি কেটলি এই তো।

এখানেই ‘বিশ্রাম’ নেয় টানেলকর্মীরা। তারপর আবার ঢুকে পড়ে সুড়ঙ্গে, যে সুড়ঙ্গ ভূপৃষ্ঠ থেকে ছয়তলা ভবনের সমান ভেতরে। টিম টিম করে জ্বলে বাল্ব। ধুলায় ভর্তি চার দিক। এখানে মৃত্যু যেন সর্বক্ষণ ওঁৎ পেতে থাকে। এক টানেল অপারেটর একবার গাজা চিড়িয়াখানার জন্য একটি সিংহ পাচার করে আনছিলেন। টানেলের মাঝামাঝি আসতেই সিংহটি কী করে যেন তার বাঁধন খুলে ফেলতে পারে। আর যায় কোথায়। অমনি এক শ্রমিকের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তাকে টুকরো টুকরো করে ফেলল ওটি।

এ ছাড়া ইসরাইল যখন চোরাচালান বন্ধ করতে মিসরকে চাপ দেয়, মিসর তখন টানেলে বিষাক্ত গ্যাস ছড়িয়ে দেয়। এতেও অনেক শ্রমিকের মৃত্যু হয় এ অভিযোগ অনেক ফিলিস্তিনির। তবে মিসর কখনো অভিযোগটি স্বীকার করে না।

এখানেই দেখা মেলে আবু জামিলের। প্রবীণ এই মানুষটির মাথার সব চুল সাদা হয়ে গেছে, কিন্তু মুখে ভারি মিষ্টি হাসি। তিনি ফিলাডেলফি করিডোরের অঘোষিত মুখতারও বটে। তবে এটাই তার বড় পরিচয় নয়। তার সবচেয়ে বড় কৃতিত্বটি হচ্ছে, তিনিই এই টানেল পদ্ধতির প্রবর্তক। তার দেখাদেখি একে একে অনেকেই টানেল খনন ও চালু করেন। প্রথমটির সাফল্য দেখে আবু জামিল নিজেও আরো কয়েকটি টানেল চালু করেন। এসব টানেলে কাজ করে তার ছেলেরা, নাতিরা, ভাতিজারা এবং জ্ঞাতিভাইয়ের দল। আবু জামিল সব সময় বলেন, শুধু টাকার জন্য টানেল করেছি, তা নয়। পরিস্থিতির (অবরোধ) চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতেই এ কাজে নেমেছি। তাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, এই ক’বছরে আপনার টানেল দিয়ে কী কী জিনিস এসেছে? জবাবে মৃদু হাসলেন আবু জামিল, ‘কী এনেছি মানে? সব কিছু।’ জানা গেল, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যসামগ্রীর পাশাপাশি ওষুধ, গরু এমনকি চিড়িয়াখানার জন্য একবার একটা গোখরা সাপ পর্যন্ত এনেছেন।

আসলেই এসব টানেল ধরে আসে না এমন জিনিস নেই। কাছেই একটি টানেলে দেখা গেছে, পটেটো চিপসের একটি চালান এসেছে। আরেকটি থেকে বেরোচ্ছে ম্যাঙ্গো জুস। আরেকটি থেকে রান্নার গ্যাসের ক্যানিস্টার। আরেক টানেল থেকে বেরোতে দেখা গেল বরফ দেয়া মাছের বাক্স। বেরিয়েই এগুলো দ্রুত উঠে যাচ্ছে বিভিন্ন রেস্তোরাঁর গাড়িতে। অনেক গৃহবধূকেও দেখা গেল মাছের পেটি ডেলিভারি নিতে। টানেলের পরিচালক জানালেন, গাজায় মাছ ছিল সস্তা। কিন্তু ইসরাইলি নৌবাহিনী এখন গাজার জেলেদের সমুদ্রে বেশিদূর যেতে দেয় না। এ কারণেই মিসর থেকে মাছ আসছে এবং দামও বেড়ে গেছে।

একটু পরে একজন এসে টানেল পরিচালকের সাথে ফিসফিস করে কী যেন বলল। না, সে পাচার হয়ে আসা সার্ডিন মাছ কিনতে চায় না, বরং টানেল ধরে নিজেই ওপারে পাচার হতে চায়। জানা গেল, মানুষ পারাপারও এখানে নতুন নয়। প্রধানত চিকিৎসার জন্য অনেক গাজাবাসী ওপারে, অর্থাৎ রাফাহ শহরের মিসরীয় অংশে যায় এবং অবশ্যই এই গমনাগমন সম্পন্ন হয় টানেল ধরে। তবে কেউ কেউ গভীর রাতে ওপর দিয়েই সীমান্ত পার হয়ে যায়। আর যারা ধনাঢ্য, তাদের জন্য রয়েছে বিশেষ ধরনের কিছু টানেলও। এসব ‘ভিআইপি টানেলে’ এয়ারকন্ডিশনিং এবং সেলফোন নেটওয়ার্কের ব্যবস্থা পর্যন্ত আছে।

তবে শুধু টানেল পরিচালনা কিংবা টানেল দিয়ে চোরাচালান করাই গাজার একমাত্র ব্যবসায় এমনটা ভাবা ভুল হবে। বরং বলা চলে, ব্যাপক বেকারত্ব (৩০%-এর বেশি) সত্ত্বেও গাজায় রয়েছে বিপুলসংখ্যক সম্ভাবনাময় উদ্যোক্তা। গাজার এদিক-ওদিক একটু চোখ মেলে তাকালেই বিষয়টি পরিষ্কার হয়। যেমন গাজা সিটির দক্ষিণ উপকূলে, আগে ছিল অনেকগুলো ক্যাফে। ইসরাইলের বোমা হামলায় সেগুলো ধ্বংস হওয়ার পর এখন সেগুলোর ছাদে গড়া হচ্ছে সবজিক্ষেত। এসব চারা বেড়ে উঠতে মাটি লাগবে না, পানিই যথেষ্ট। গড়া হচ্ছে মাছের খামারও। এভাবেই ধ্বংসস্তূপের ওপর গড়ে উঠছে নতুন কিছু, যা ভাবী উদ্যোক্তা শ্রেণীর সৃজনশীল দূরদৃষ্টিরই পরিচায়ক।

অবশ্য এত কিছুর পরও গাজার বেশির ভাগ মানুষের লাইফলাইন হয়ে আছে টানেলগুলোই। যেমন এক দিন রাফাহ শহরে এক ব্যক্তিকে দেখা গেল টানেল বানানোর জন্য নিজের দুই ছেলেকে নিয়ে গর্ত খুঁড়ছেন। তার কাছে কোনো কপিকল নেই, আছে একটি ঘোড়া। সেটি দিয়েই কপিকলের কাজ সারছে। তাকে জিজ্ঞেস করা হলো, ‘ছেলেদের কোনো বিপদ হতে পারে, ভয় লাগে না?’ লোকটির জবাব, ‘অবশ্যই লাগে।’ কিন্তু তারপরও অনন্যোপায় তিনি। নিজে কোনো চাকরি পাবেন, সে উপায় নেই। কেননা, চাকরিই নেই। ছেলেদের লেখাপড়ার খরচ জোগানোও সম্ভব হচ্ছে না। কাজেই এ ছাড়া আর কী করা! এটুকু বলেই বললেন তিনি : ‘ইনসা’ এই তো জীবন!

হ্যাঁ, আসলেই তাই। নইলে টানেল অর্থনীতির পাশাপাশি ইসরাইলের বোমা হামলার ফলে সৃষ্ট ধ্বংসস্তূপ থেকে নতুনতর অর্থনৈতিক সম্ভাবনা প্রস্ফুটিত হবে কেন? জাতিসঙ্ঘের এক হিসাব মতে, ইসরাইলের ঘৃণ্য ‘অপারেশন কাস্ট লিড’-এর সময় যে বোমা হামলা চালানো হয়, তাতে পাঁচ লাখ টনেরও বেশি ইট-পাথরের টুকরা তৈরি হয়েছে। এগুলোই এখন গাজাবাসীর কাছে ‘টাকায়’ পরিণত হয়েছে। সবখানে দেখা যাচ্ছে ইট-পাথর সংগ্রহকারীর দল, যাদের একটা বিরাট অংশ শিশু-কিশোর। তারা হাতুড়ি দিয়ে ইট ভাঙছে, ছোট চালুনি দিয়ে সেগুলো ছেঁকে নিচ্ছে, গাধার পিঠে তুলে নিয়ে যাচ্ছে কোনো-না-কোনো কংক্রিট ব্লক বানানোর কারখানায়। এসব কারখানাও ‘নতুন উদ্যোক্তাদের’ সৃজনশীল দূরদৃষ্টির ফল। বোমা হামলার ধ্বংসস্তূপকে কাজে লাগানোর চিন্তা থেকেই গড়ে উঠেছে এসব কারখানা। এভাবেই চলছে বিধ্বস্ত গাজার পুনর্গঠনযজ্ঞ। একজন সরকারি অর্থনীতিবিদ জানান, ২০১০ সালে শুধু ইট-পাথর কুড়ানোর ফলেই বেকারত্ব কমেছে ছয় শতাংশ।

এ দিকে গাজাবাসী এখনো আশাবাদী যে, ‘আরব বসন্ত’ বর্তমান পরিস্থিতির একটা পরিবর্তন ঘটাবে, যদিও তার কোনো লক্ষণ এখন অবধি দেখা যাচ্ছে না। মিসরের সাথে সীমান্ত খুলে যাবে এমন কথাও অহরহ শোনা যায়। কিন্তু তা কবে হবে কিংবা আদৌ হবে কি না তা স্পষ্ট নয়।

তবে ‘আরব বসন্ত’ পরিবর্তন আনুক অথবা নয়, বিদ্যমান পরিস্থিতি গাজাবাসীর অর্থনৈতিক বিন্যাস বদলে দিয়েছে, এটা আর নতুন কী। শুধু বদলেই দেয়নি, বলা চলে খানিকটা কুৎসিৎ রূপও নিয়েছে। একটি ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের রিপোর্টের কিছু অংশ শোনা যাক : ‘ইসরাইলি অবরোধ উঠে গেলে গাজার অনেক ব্যবসায়ীর মুনাফা কমে যায়। তাই তারা চায় না, অবরোধ উঠে যাক। তারাই তরুণ জঙ্গিদের ভাড়া করে, তাদের হাতে তুলে দেয় দু-চারটা রকেট, যা ওই জঙ্গিরা ইসরাইলের দিকে ছুড়ে দেয়।’

অবশ্য ওপরের কথাটি কতটা বিশ্বাসযোগ্য, তাও গবেষণাসাপেক্ষ। তবে তরুণ জঙ্গিরা অনেক বেশি উদ্যোক্তা-মনোভাবাপন্ন ও শান্তিকামী। এক বিকেলে বেইট হেনুনের কাছে দেখা মেলে এক তরুণ হামাসকর্মীর। তার আপাদমস্তক ছদ্মবেশ, হাতে একে-৪৭ রাইফেল, নাইন এমএম পিস্তল ঝোলানো বুকে। তাকে দেখে যুদ্ধবাজ ছাড়া আর কী ভাবা যায়। অথচ কথা বলে জানা গেল, সে বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যবসায় প্রশাসনের শিক্ষার্থী। তার কথা : ‘জিহাদ তো কোনো চাকরি নয়’। অর্থাৎ ভবিষ্যতে চাকরি কিংবা ব্যবসায় করার জন্যই নিজেকে প্রস্তুত করছে সে।

পাঠক, আমাদের ‘গল্প’ শেষ হয়ে এলো। এবার তবে চলুন ফিরে যাই জাবালিয়ায়, যাদের কথা দিয়ে শুরু করেছিলাম, সেই ইউসুফ ও তার ভাই সামিরের কাছে।

ইউসুফ তো টানেল দুর্ঘটনায় মারা গেল, সামির এখন কী করবে? সামিরের এক কথা : ‘না, আর টানেলে নয়।’ সামিরের পরিকল্পনা আছে ভাই ইউসুফের একটি স্বপ্ন বাস্তবায়নের। তেমন কোনো বড় স্বপ্ন নয়। ইউসুফ ভেবেছিল, টানেলের কাজ আর বেশি দিন করবে না। তাই সে কাজের ফাঁকে মৌমাছি পালন শিখছিল। একটা রুমও ভাড়া নিয়েছিল, মধুর দোকান দেবে বলে। সামির ভাইয়ের এই ছোট স্বপ্নটি বাস্তবায়ন করতে চায়।

গত সেপ্টেম্বরে খবর পাওয়া গেছে, সামিরের দোকানটি চালু হয়ে গেছে। ইউসুফ যখন মারা যায়, তখন তার স্ত্রী তিন মাসের গর্ভবতী। স্বামীর করুণ পরিণতির খবর শুনে তার অকাল গর্ভপাত হয়ে যায়। তাকে এখন বিয়ে করেছে ইউসুফের সবচেয়ে ছোট ভাইটি খালেদ। সামির ও খালেদ দুই ভাই মিলে মধুর দোকানটি চালায়। দোকানের দেয়ালে তারা ঝুলিয়ে রেখেছে ইউসুফের ছবি।

© অন্য দিগন্ত

Comments

comments