ঢাবিতে যেভাবে কাটলো ছাত্রীর পায়ের রগ : এক প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ

কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনরত ছাত্রীদের মারধর ও এক ছাত্রীর পায়ের ‘রগ কাটার’ অ‌ভি‌যোগ উঠে‌ছে কবি সুফিয়া কামাল হল শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি ইফফাত জাহান ইশার বিরু‌দ্ধে। এ ঘটনার পরপরই ‌গোটা ক্যাম্পাস উত্তেজনা ছ‌ড়ি‌য়ে প‌ড়ে। মঙ্গলবার দিবাগত রা‌তে ঢাকা বিশ্ব‌বিদ্যাল‌য়ের (ঢা‌বি) ক‌বি সু‌ফিয়া কামাল হ‌লে এ ঘটনা ঘ‌টে।

সাফিয়া শারমিন এ ঘটনা প্রত্যক্ষ করে তার ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছেন। তার ওই স্ট্যাটাস এখানে তুলে ধরা হলো

সুফিয়া কামাল হল থেকে বলছি…

ঘটনার সূত্রপাত আনুমানিক ১২ টার দিকে, সারাদিনের ক্লান্তিতে ঘুমিয়ে গেছিলাম। এক ফ্রেন্ডের ফোনে ঘুম ভাঙ্গছে, লাফিয়ে উঠে নিচে দৌড় দিলাম। ৯ তলা থেকে নামতে নামতে দেখলাম ৩-৪ তলায় সিড়িতে রক্ত, ফ্লোরে রক্ত। ভিড় ঠেলে নিচে নামলাম, আপুদের কাছে জিজ্ঞাসা করার বলল তিনদিন ধরেই অত্যাচার চলতেছিল নিরবে, যারা পলিটিকালি হলে উঠেছে তাদের উপর, এখন এক মেয়ের পা কেটে দিয়েছে। কেউ ভয়ে মুখ খুলে নাই। প্রত্যয় প্রদীপ্ত দুটো মুখোমুখি ভবন। এশা প্রত্যেয়ে মেয়েদের মারার সময় প্রতীপ্তর কিছু মেয়ে দেখে চিৎকার করছে। কিছু মেয়ে নিচে নেমে আসলে তাদেরকে বলছে “ত্যাঁলাপোকা দেখে চিৎকার দিছে, কিছু হয় নাই।” কিন্তু ফ্লোরে সিড়িতে রক্ত দেখে হলের মেয়েরা একত্রিত হইছে।

এর মধ্যে এশা ঐ মেয়েদের কে নিয়ে দরজা বন্ধ করে দিছে। তারপর হলের হাউজ টিউটর ম্যামরা এসে মেয়েটাকে হাসপাতালে পাঠাইছে, এবং হলের মাঠে সব মেয়েরা তখন ক্ষ্যাঁপা। এশার বহিষ্কার স্লোগান দিচ্ছিল, এর মধ্যে এশাকে কিছু মেয়ে মাঠে নিয়ে আসছে, তখন কিছু মাইরও খাইছে। এর মধ্যে ভাইয়ারাও চলে আসছে হলের সামনে। ম্যামরা জানতে চাইলো আমরা কি চাই? বললাম এশাকে আজীবনের জন্য বহিষ্কার, ওকে জুতার মালা পরাবো আমরা। যেহেতু কোটা সংস্কার আন্দোলন অহিংস আন্দোলন, তাই মারবো না । এর মধ্যে গোলাম চলে আসলো তার কইন্যাকে উদ্ধার করতে। সামনের দিকেই ছিলাম, আস্তে করে বললাম “ভুয়া” সাথে সাথে শুরু হয়ে গেল প্রক্টর তুই দুর হ, ভুয়া।

অনেক কথাবার্তার পর এশাকে নিয়ে আসা হলো সবার সামনে মাফ চাওয়ার জন্য, জুতার মালা পড়ানোর জন্য। কিন্তু গোলাম বাবাজি জুতার মালা পরাতে দিবেন না। মেয়েরা ক্ষেপে গেল, তারপর শুরু হল ধাক্কাধাক্কি। এদিকে গোলাম ও তার সাথের লোকজন এশাকে ঘিরে বাঁচাতে চাইছেন প্রাণপণে। মেয়েদের মাইর খেলেন গোলাম তার কন্যা ও আশেপাশের লোকজন।

এদিকে দুই ভবনের গেটে তালা ঝুলিয়ে দেওয়ায় আমরা ক্যান্টিনের পিছনের গেট দিয়ে হলে মেইন গেটে চলে আসলাম, যাতে কেউ পালাতে না পারে। ভাইয়ারা তখন বাইরে অবস্থান করছেন, স্লোগান দিচ্ছেন। এদিকে ধ্বস্তাধ্বস্তির এক পর্যায়ে এশাকে জুতার মালা পড়ানো হলো, হাউস টিউটর ও গোলামের কাছ থেকে মৌখিক বিবৃতি নেওয়া হলো। এরপর ম্যামরা ধ্বস্তাধ্বস্তির এক পর্যায়ে প্রক্টর এবং এশাকে হাউস টিউটর ভবনের ভিতরে ঢুকিয়ে কলাপসিপল গেট বন্ধ করে দিল। তখন মেয়েরা হাউস টিউটর ভবনের সামনে অবস্থান নিল, তারপর আমরা আমাদের দাবি এবং স্লোগান সমানতালে চলতে থাকলো। ভিতরে আমরা বাইরে ভাইয়ারা। সুফিয়া কামাল হল থেকে তিনটি দাবি দেওয়া হয়েছে যে হলে কোন আনুষ্ঠানিক রাজনীতি থাকবে না, ছাত্রীদের উপর অত্যাচারের বিচার এবং আমাদের ভাইবোনদের উপর অত্যাচারের বিচার করতে হবে। রাত ৪ টার দিকে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়েছে, ভাইয়ারা ফিরে গেছেন। মেয়েরা তাদের দাবি আদায়ে গণস্বাক্ষর করছে।

যে আপুটা আহত হয়েছে, তিনি নিরাপদে আছেন। আমরা নিরাপদে আছি। আর একটা গুজব ছড়ানো হচ্ছে যে মেয়েটা পা নিজে কেটেছে, এটা পুরাটাই বানোয়াট। এমন একটা রাতে সাক্ষী হতে পেরে ভালো লাগলো। ভাইবোনেরা যারা আহত হয়েছেন তারা সুস্থ হোন দোয়া করি। আমরা কোন অন্যায় মেনে নিবো না। এখন আর ভয় নাই, যেখানে হামলা হবে সাহস করে এগিয়ে যাবেন সবাই, যেভাবে আমরা গিয়েছি। আপুরাও অনেক কিছু পারে সেটা অনুপ্রেরণা হিসেবে নিন। ভয়ে কেউ চুপ করে থাকবেন না।

Comments

comments