মসজিদবিহীন হাতিরঝিলে দর্শনার্থীরা নামাজ পড়েন রাস্তায়-বেঞ্চিতে

কাউসার লাবীব: আজকের চাকচিক্যময় এ হাতিরঝিল কয়েক বছর আগেও এমন ছিল না। ছিল মাটির পথ। বৃষ্টি এলে কাঁদায় পিছলে যেত বর্তমান আলো ঝলমলে এ হাতিরঝিল।

আগের সে পুরানো হাতিরঝিল আজ নতুন মাত্রায় ঢাকার মুখ উজ্জ্বল করছে। ঢাকাবাসী অবসাদ মনে প্রাণ ফিরিযে আনতে ছুটিরদিনগুলোতে চলে যায় সেখানে। তবে মনের সব আনন্দ, উচ্ছ্বাস, উল্লাস আর উৎসাহ সব থেমে যায় নামাজের সময় হলে।

কারণ নান্দনিক থানা হাতিরঝিলে নেই কোনো মসজিদ। ক’দিন আগে বায়তুল মাহফুজানের একটি ভ্রাম্যমাণ মসজিদ ভেঙে দেয়া হয়েছে। যে কারণে সেখানে দূরের আজানও তেমন শোনা যায় না। ঘড়ি, মোবাইল কিংবা আবহাওয়ার কল্যাণে মানুষ নামাজের ওয়াক্ত সম্পর্কে হতে পারলেও, প্রভুর কদমে লুটাতে পারে না ‘আপনা শির’।

শেষে নামাজের উপযুক্ত জায়গা না পেয়ে অনেকে নামাজ পড়ছেন ঘাসে, রাস্তায় কিংবা পথিকের জন্য বানানো বসার বেঞ্চিতে। অনেককে দেখা যায় ঝিলের গন্ধযুক্ত পানিতেই অজু করছেন।

হাতিরঝিলের পাশেই অবস্থিত মধ্য বাড্ডা থেকে আসা রফিকুল ইসলাম বলেন, কর্মব্যস্ততায় ছেলেমেয়েকে তেমন সময় দিতে পারি না। বাসার কাছেই যেহেতু নান্দনিক এ স্থাপনা, তাই ছুুটির দিনগুলিতে এখানে সন্তানদের নিয়ে আসি। কিন্তু নামাজের জন্য কোনো মসজিদ না থাকায় আমার বিপাকে পড়তে হয়। অনেক সময় দীর্ঘক্ষণ ঘুরার ইচ্ছে থাকলেও চলে যেতে হয় নামাজের টানে।

আফতাবনগর বনশ্রী ইমাম খতিব ওলামা পরিষদের সভাপতি মুফতি মুহাম্মদ আলীকে ৮ কিলোমিটার দীর্ঘ এ প্রকল্পে মসজিদ না থাকার বিষয়টি কীভাবে দেখছেন?

জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, ‘মুসলমানের এ দেশে কয়েক‘শ কোটি টাকা খরচ করে করা এ প্রকল্পে মসজিদ না থাকার বিষয়টি খুবই দুঃখজনক। এটি আমাদের ব্যর্থতা ও লজ্জার বিষয়।

তিনি বলেন, আমি সরকারে কাছে দাবি জানাবো, প্রকল্পের নকশায় যে মসজিদটি ছিল তা নির্মাণ করে কোটি মুসলমানের দাবি পূরণ করে হাতিরঝিলের সৌন্দর্যকে আরো মানসম্পন্ন করে তুলবেন।’

১৯৯১ সাল থেকে বনশ্রী এলাকায় বসবাস করছেন দেশের বিশিষ্ট আলেমে দীন মুফতি ইয়াইয়াহ মাহমুদ। হাতিরঝিল প্রকল্পে কোনো মসজিদ না থাকার বিষয়ে তিনি কী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন?

জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, ‘সর্বশেষ যে মসজিদটি হাতিরঝিল থেকে ভাঙ্গা হলো সে মসজিদের কমিটিকে নিয়ে আমি, ড. মুশতাক আহমদ, মুফতি মুহাম্মদ আলী, মুফতি আসাদ হুসাইনিসহ একটি টিম স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করেছি। কিন্তু প্রকল্পটি যেহেতু সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ করছে সেনাবাহিনী তাই আমরা তেমন কোনো প্রত্যাশা পাইনি।

তবে সরকার যদি হাতিরঝিলের মতো সুন্দর একটি প্রকল্পে কোনো মসজিদ না রাখে তাহলে কোটি মুসলমানের মনে কষ্ট দিবেন বলে আমি মনে করি।’

৮ দশমিক ৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ এ হাতিরঝিল প্রকল্পে থাকছে ৪৭৭ দশমিক ২৫ মিটার দীর্ঘ চারটি ব্রিজ, পথচারী ও ভ্রমণকারীদের সুবিধার্থে যথাক্রমে ৮ দশমিক ৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ ফুটপাত, ৯ দশমিক ৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ লেক সাইড ওয়াকওয়ে।

প্রকল্প এলাকা যানজটযুক্ত রাখতে ৪০০ মিটার দৈর্ঘ্যের ওভারপাস, ১০ দশমিক ৪৫ কোটি ঘনফুট বর্জ্য অপসারণ, ১০ দশমিক ৪০ কিমি মেইন ডাইভারশন স্যুয়ারেজ লাইন। কন্সার্ট স্পেস।

এছাড়াও প্রকল্পের মাস্টার প্ল্যান ভঙ্গ করে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ২৯টি খাবার দোকান। এ বিষয়ে হাতিরঝিল প্রকল্পের মূল পরিকল্পনার সঙ্গে জড়িত বুয়েটের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের প্রধান অধ্যাপক মজিবুর রহমান বলেন, ‘হাতিরঝিলের মাস্টার প্ল্যানে কোনো খাবার হোটেল বা দোকান ছিল না।

তবে ২০১৩ সালের দিকে যখন দেখা গেল মানুষের সমাগম অনেক বেশি, তখন তাদের প্রয়োজনে কিছু দোকান রবাদ্দ দেওয়া হয়েছে, তবে তা সংখ্যায় ৩-৪টির বেশি নয়।’ যদিও সরেজমিনে সেখানে দুই ডজনেরও বেশি দোকান দেখা গেছে।

মানুষের প্রয়োজনে প্রকল্পের মাস্টারপ্লান ভেঙ্গে দোকান নির্মাণ করলেও, মসজিদের শহর ঢাকার এ থানায় পরিকল্পনায় থাকা মসজিদটি এখনো জায়গা করে নিতে পারছে না, মানুষকে নামাজ পড়তে হচ্ছে রাস্তার পাশে মাটিতে।

অথচ, রাজধানীর হাতিরঝিলে রামপুরা ডিআইটি সড়ক থেকে ঢুকতে ‘গৌরাঙ্গ মহাপ্রভুর মন্দির’ নামক একটি মন্দির বাঁচাতে রাস্তাকে বিপদজনক করা হয়েছে। দেখা যাচ্ছে, রামপুরা ডিআইটি সড়ক থেকে হাতিরঝিলের প্রবেশমুখ প্রায় ৯০ ডিগ্রি এঙ্গেলে করা করা হয়েছে, যে কারণে দুর্ঘটনা ঘটার বড় আশঙ্কা রয়েছে এখানে।

রাজধানীর অন্যতম দর্শনীয় স্থান হাতিরঝিলে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন মনোমুগ্ধকর অনুষ্ঠানের আয়োজন করে মানুষকে ভেড়ানো হচ্ছে নান্দনিক এ স্থানের দিকে।

আয়োজন করা হচ্ছে নৌকা বাইচসহ অনেক প্রতিযোগিতা। পুরো প্রকল্প এলাকা আনা হচ্ছে ফ্রি ওয়াইফাই’র আওতায়। ঝিলে ভাসানো হচ্ছে ওয়াটার ট্যাক্সি। কিন্তু কোটি মুসলামানের প্রাণের এ ঢাকায় নেই কোনো মসজিদ।

Comments

comments