১৫ বছর মেয়াদি চুক্তিতে ভারত থেকে ৪২ হাজার কোটি টাকার বিদ্যুৎ কিনছে অনির্বাচিত সরকার

নিজেরাই বিদ্যুৎ উৎপাদনে মনোযোগী না হয়ে বার বার ভারত থেকে কঠিন শর্তে বিদ্যুৎ আমদানীর চেষ্টা করছে ক্ষমতাসীন অনির্বাচিত সরকার। আর এরই অংশ হিসেবে বাংলাদেশের পক্ষে ১৫ বছর মেয়াদি চুক্তি করতে চলেছে জনসমর্থনহীন আওয়ামী সরকার। দেশে বিদ্যুতের ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটানোর কথা বলে স্বল্প ও মধ্যমেয়াদী সমাধান হিসেবে ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানিতে জোর দিচ্ছে সরকার। বড় প্রকল্পগুলো নির্ধারিত সময়ে বাস্তবায়িত না হওয়ার অজুহাত দেখিয়ে এ পথে এগোচ্ছে সরকার। এরই অংশ হিসেবে ভারতের দুইটি কোম্পানি থেকে নতুন করে ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানির চুক্তি করা হচ্ছে। আমদানির মেয়াদ ১৫ বছর। এ জন্য সরকারের ব্যয় হবে প্রায় ৪২ হাজার কোটি টাকা।

ভারতের খোলাবাজার থেকে বিদ্যুৎ আমদানির প্রক্রিয়া অনেক দিন ধরেই চালিয়ে যাচ্ছে সরকার। কয়েক বছর আগে টেন্ডার আহ্বান করা হলেও নানা কারণে তা বাতিল করে নতুন টেন্ডার আহ্বান করা হয়। এখন বিদ্যুৎ আমদানির বিষয়টি অনেকটাই চূড়ান্ত। এ সংক্রান্ত একটি প্রস্তাব ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিতে বিদ্যুৎ বিভাগের মাধ্যমে পাঠিয়েছে পিডিবি। অনুমোদন পেলেই চূড়ান্ত চুক্তি সই হবে বলে খবরে প্রকাশ।

বিদ্যুৎ বিভাগের এক শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, স্বল্পমেয়াদি ক্রয়চুক্তির অধীনে ২০১৮ সালের ১ জুন থেকে ২০১৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বিদ্যুৎ আমদানি করা হবে। দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির মেয়াদ হবে ২০২০ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০৩৩ সালের ১ জুন পর্যন্ত।

পিডিবি সূত্র জানায়, বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের বিদ্যুৎ কেনার দরপ্রস্তাব আহ্বানের পরিপ্রেক্ষিতে ভারতের চারটি কোম্পানি দরপ্রস্তাব দেয়। এগুলো হলো- বিতর্কিত এনটিপিসি বিদ্যুৎ ভেপার নিগাম লিমিটেড, সেম্বকর্প গেয়াটরি পাওয়ার লিমিটেড, পিটিসি ইন্ডিয়া লিমিটেড এবং আদানি এন্টারপ্রাইজ লিমিটেড। গত ২৫ ফেব্রুয়ারি দরপ্রস্তাব মূল্যায়ন কমিটি প্রতিবেদন জমা দেয়। দরপ্রস্তাবকারীদের মধ্যে বিতর্কিত এনটিপিসি বিদ্যুৎ ভেপার নিগাম লিমিটেড এবং পিটিসি ইন্ডিয়া লিমিটেডকে চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত করে মূল্যায়ন কমিটি। স্বল্প মেয়াদে এনটিপিসি ভেপার নিগাম লিমিটেড ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করার কথা রয়েছে। এর দাম পড়বে বাংলাদেশি টাকায় প্রতি ইউনিট ৪ টাকা ৭২ পয়সা। সঞ্চালন মাশুল হিসেবে খরচ পড়বে প্রতি ইউনিট ৭৯ পয়সা। স্বল্পমেয়াদি বাকি ২০০ মেগাওয়াট সরবরাহের জন্য নির্বাচিত হয়েছে পিটিসি ইন্ডিয়া লিমিটেড। তাদের প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম পড়বে ৪ টাকা ৮৬ পয়সা। সঞ্চালন মাশুল প্রতি ইউনিটে পড়বে ৫৪ পয়সা। দীর্ঘমেয়াদে বিতর্কিত কোম্পানী এনটিপিসি থেকে কেনা বিদ্যুতের দাম পড়বে ৬ টাকা ৪৯ পয়সা। সঞ্চালন মাশুল ৭৯ পয়সা। পিটিসি থেকে আমদানিতব্য বিদ্যুতের দাম পড়বে ৬ টাকা ৫৫ পয়সা। সঞ্চালন মাসুল প্রতি ইউনিটে ১ টাকা ২০ পয়সা।

প্রসঙ্গত, ২০১৩ সালের ৫ অক্টোবর ভারত থেকে সরকারি উদ্যোগে বিদ্যুৎ আমদানি শুরু হয়। এনটিপিসির মাধ্যমে এখন মোট ৬৪০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কিনছে বাংলাদেশ। চলতি বছরেই ভারতের সরকারি ও খোলাবাজার থেকে ৫০০ থেকে ৮০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানি শুরুর কথা রয়েছে।

এদিকে বাংলাদেশে দীর্ঘমেয়াদে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ সরবরাহের ব্যাপারে প্রশ্ন তুলেছে ভারতের বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদকরা। এনটিপিসির বিদ্যুৎ বিক্রি বা রপ্তানি নিয়ে আপত্তি তুলেছে দেশটির বিদ্যুত্ খাতের কয়েকটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। ভারতের অভ্যন্তরীণ কয়লা ব্যবহার করে উৎপাদিত বিদ্যুৎ বিদেশে তথা বাংলাদেশে রপ্তানির নিয়ম নেই বলে তারা দাবি করে। গত মার্চেই এ সংক্রান্ত একটি চিঠি দেশটির বিদ্যুত্ মন্ত্রণালয়ে দিয়েছে ভারতের বেসরকারি খাতের বিদ্যুৎ প্রতিষ্ঠানগুলোর জোট অ্যাসোসিয়েশন অব পাওয়ার প্রডিউসারস (এপিপি)।

তবে বিদ্যুৎ বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, ভারতে বিদ্যুৎ উৎপাদনে কয়লার ব্যবহার নিয়ে বিতর্কিত কোম্পানি এনটিপিসির সঙ্গে সে দেশের বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদকদের বিরোধ এর আগেও ঘটেছে। এনটিপিসির সঙ্গে চারটি বেসরকারি কোম্পানিও ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুত্ রপ্তানিতে অংশ নিয়েছিল। কিন্তু পিডিবি এনটিপিসির প্রস্তাব গ্রহণ করেছে। সেজন্যও বিরোধ তৈরি হতে পারে। তবে এটি তাদের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার। বাংলাদেশ ভারতের সরকারি ও বেসরকারি দুই খাত থেকেই বিদ্যুৎ আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

Comments

comments