চাপের মুখে কেন্দ্রীয় ব্যাংক

বেসরকারি ব্যাংক মালিকরা বাংলাদেশ ব্যাংকের ওপর চাপ প্রয়োগ করে যেভাবে ১০ হাজার কোটি টাকা বের করে নিচ্ছেন এবং বিধিবদ্ধ নগদ জমার হার (সিআরআর) ১ শতাংশ কমিয়ে নিচ্ছেন তা নজিরবিহীন। এ ধরনের সিদ্ধান্ত মূলত ব্যাপক আলোচনা, গবেষণা ও বিচার-বিশ্লেষণের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিয়ে থাকে। অথচ দেশে এ সিদ্ধান্তটি নেয়া হল রাজধানীর একটি হোটেলে বসে ব্যাংক মালিকদের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে। স্পষ্টতই বাংলাদেশ ব্যাংক এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে চাপের মুখে। বাংলাদেশ ব্যাংককে এক ধরনের জিম্মি করে সিআরআর থেকে ১ শতাংশ অর্থ বের করে নেয়া হচ্ছে। এটি উদ্বেগের বিষয়। অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ সিদ্ধান্তের বাস্তবায়নে দেশে মূল্যস্ফীতি বাড়বে, ঋণের যথাযথ মান বজায় রাখা সম্ভব হবে না। চাপিয়ে দেয়া সিদ্ধান্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংককে দুর্বল করে ফেলবে। এতে আর্থিক খাতে বিশৃঙ্খলা বাড়বে। বিশেষজ্ঞরা আরও মনে করছেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরসহ অন্যদের ডেকে এনে অর্থমন্ত্রীর উপস্থিতিতে সিআরআর কমিয়ে আনার ঘটনা অত্যন্ত খারাপ নজির হয়ে থাকবে। এভাবে একের পর এক ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাংকিং খাতকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।

দেশে ব্যাংকিং খাতের অবস্থা খারাপ। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো যে তারল্য সংকটে ভুগছে, তা কাটিয়ে ওঠার জন্য নেয়া হয়েছে সবশেষ সিদ্ধান্ত। কিন্তু এতে আদৌ কাজ হবে কিনা তা নিয়ে রয়েছে প্রশ্ন। অর্থমন্ত্রী বলেছেন, এর ফলে ঋণের সুদের হার শিগগিরই সিঙ্গেল ডিজিটে নেমে আসবে। এটি হলে ভালো। তবে বিশেষজ্ঞরা এ নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন। বস্তুত ব্যাংকগুলোর এ অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে নিয়মের বাইরে যাওয়ার কারণে। যারা নিয়মের বাইরে গেছে তারাই তারল্য সংকটে পড়েছে। মূলত অতিমাত্রায় খেলাপি ঋণ এবং সবকিছু খতিয়ে না দেখে বেপরোয়া ঋণ বিতরণের কারণে এমনটি হয়েছে। সেক্ষেত্রে সমস্যার মূলে হাত না দিয়ে জোড়াতালি দিয়ে সমাধান করতে গেলে সমস্যা আরও বাড়বে বৈ কমবে না। এটি অনুধাবন করতে হবে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংককে।

এটা স্পষ্ট, ব্যাংকিং খাত অর্থ সংকটে পড়ার অন্যতম কারণ খেলাপি ঋণের ব্যাপকতা। অভিযোগ আছে, আমানতের টাকা ব্যাংক পরিচালকরা নিজেরাই নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করে নেন! আবার সেই ঋণ পরিশোধ না করে খেলাপি হয়ে একপর্যায়ে তা অবলোপনও করেন! অনেকে সেই টাকা বিদেশে পাচার করে সেখানে বাড়ি কিনে রাখেন, যাতে অবস্থা বেগতিক দেখলে সটকে পড়া যায়। সম্প্রতি অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্যরা প্রাক-বাজেট আলোচনায় বলেছেন, ব্যাংকিং খাত থেকে বিপুল অঙ্কের অর্থ সরিয়ে ফেলার কারণে ঋণে সুদের হার বাড়ছে। আর কম টাকায় বিনিয়োগ করে লাভের বড় অংশ হাতিয়ে নিচ্ছে ব্যাংক মালিকরা। বস্তুত তাদের এসব বক্তব্যের মধ্য দিয়ে ব্যাংকিং খাতের প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে এসেছে। বস্তুত এ ধরনের মালিকদের কারণেই ব্যাংকগুলোতে বাড়ছে খেলাপি ঋণের পরিমাণ। ঋণের সুদ যৌক্তিক পর্যায়ে কমিয়ে না আনার এটি একটি বড় কারণ। এ ব্যাপারে অর্থ মন্ত্রণালয় ও কেন্দ্রীয় ব্যাংককে কঠোর হতে হবে। প্রয়োজন হলে পরিবর্তন করতে হবে সংশ্লিষ্ট আইন। অবিবেচনাপ্রসূত সিদ্ধান্ত থেকে বেরিয়ে আসতে হবে তাদের।

Comments

comments