বিচার বিভাগে পচন থেকে ছড়িয়ে পড়েছে ক্যান্সার

অলিউল্লাহ নোমান
গত ১৪ মার্চ আমি একটি আর্টিক্যাল লিখেছিলাম। লেখাটির শিরোনাম ছিল-‘বেগম জিয়ার কারাদন্ড, সরকারের টার্গেট ও সুপ্রিমকোর্টের বিচার।’ লেখাটি যারা পড়েছেন তারা হয়ত: খেয়াল করেছেন শেষাংশে কি বলার চেষ্টা করা হয়েছে। সেখানে আমি বলেছিলাম, সরকার খুব দ্রুত আপিল নিষ্পত্তি করার চেষ্টা করবে। সরকার এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের পক্ষ থেকে কারাদন্ড বৃদ্ধির আবেদন জানানো হবে। ইতোমধ্যে গত সপ্তাহে সুপ্রিমকোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে সেই আবেদন করা হয়েছে। দুদকের পক্ষ থেকে দায়ের করা আবেদন গ্রহন করেছে হাইকোর্ট বিভাগের সংশ্লিষ্ট বেঞ্চ। তারা রুল জারি করেছে, কেন কারাদন্ড বৃদ্ধি করা হবে না সেটা জানতে চেয়ে। বেগম খালেদা জিয়ার পক্ষ থেকে দায়ের করা আপিল ও দুদকের পক্ষ থেকে দায়ের করা আপিল এক সঙ্গে শুনানী হবে। তাঁর আগেই বেগম খালেদা জিয়ার পক্ষ থেকে লিখিত জবাব দিতে হবে কেন কারাদন্ড বৃদ্ধি করা হবে না।

আমার সেদিনের খেলায় আরো বলেছিলাম, হাইকোর্ট বিভাগের বেঞ্চ শুনানী শেষে সরকার এবং দুদকের আবেদন নাকচও করে দিতে পারেন। বিচারটাকে সুষ্ঠু হিসাবে প্রচারের সুযোগ করে দেয়ার নিমিত্তে হাইকোর্ট বিভাগ এটা করতে পারে। দুদক ও সরকারের আবেদন নাকচ করে দেখানোর চেষ্টা হবে বিচার খুবই সুষ্ঠু হয়েছে। এমনকি বয়স, স্বাস্থ্য ও সামাজিক মর্যাদা বিবেচনায় কারাদন্ড আরো এক বছর কমিয়ে দেওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। তখন ফলাও করে প্রচারের সুযোগ হবে এটা ন্যায় বিচার হয়েছে। ন্যায় বিচার না হলে কি আর সরকার ও দুদকের আবেদন নাকচ হয়! তখন এসবের জবাবে বিএনপি কি বলবে সেটা তাদের বিষয়। তাদের সেই প্রস্তুতি নিশ্চয়ই রয়েছে।

যেদিন দুর্নীতি দমন কমিশনের আবেদনে প্রেক্ষিতে সুপ্রিমকোর্ট সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সাজা বৃদ্ধির জন্য রুল ইস্যু করেছে, সেদিনই কুড়িগ্রামের জুডিশিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট গ্রেফতারি পরোয়ানা ইস্যু করেছে আমার পরম শ্রদ্ধেয় সম্পাদক মাহমুদুর রহমানের বিরুদ্ধে। একই প্রকৃতির মামলায় অন্য আরো প্রায় ১৮টি কোর্টে তিনি হাজিরা দিয়েছেন। হাইকোর্ট বিভাগের জামিনের কপি পেশ করেছেন। কিন্তু কুড়িগ্রামের আদালত জামিন শুনানীর জন্য ২৭ মার্চ দিন ধার্য করে দেয়। ওইদিনই মামলাটি স্থগিতের আবেদন শুনানীর দিন ধার্য্য ছিল হাইকোর্ট বিভাগে। ২৭ মার্চ সকালেই সুপ্রিমকোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের প্রকাশিত মামলার কজলিষ্ট পেশ করে কুড়িগ্রামের আদালতকে জানানো হয়েছে বিষয়টি হাইকোর্ট বিভাগের বিবেচনাধীন। আজকেই শুনানী হওয়ার জন্য দিন ধার্য রয়েছে। সুতরাং হাইকোর্ট বিভাগের আদেশ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করার আবেদন জানানো হয়। কুড়িগ্রামের চীপ জুডিশিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট হাইকোর্টকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখালেন। তিনি হাইকোর্টে শুনানীর প্রসঙ্গটির তোয়াক্কা না করে ওইদিন বিকালেই গ্রেফতারি পরোয়ানা ইস্যু করলেন। অথচ হাইকোর্ট বিভাগে শুনানী শেষে মামলাটির কার্যক্রম স্থগিত করে দেয়। এতে কুড়িগ্রামের জুডিশিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেটের আর সেই মামলা নিয়ে আদেশ দেওয়ার কোন সুযোগই নাই। হাইকোর্ট বিভাগে শুনানীর জন্য দিন ধার্য্য থাকার প্রমানপত্র পাওয়ার পরও জুডিশিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট সেটাকে তোয়াক্কা করেনি। এতেই অনুমান করা যায় বিচার বিভাগ কোথায় গিয়ে দাড়িয়েছে! সাধারণত এধরনের ক্ষেত্রে নিম্ন আদালত হাইকোর্ট বিভাগের শুনানী এবং আদেশ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করেন। অথবা আরেকটি তারিখ নির্ধারণ করে বলা হয়, সেদিন যেন হাইকোর্টের আদেশ নিয়ে আসা হয়। সেই প্রথা ভেঙ্গে জুডিশিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট গ্রেফতারি পরোয়না দিলেন।

জুডিশিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট আদালত যদি হাইকোর্ট বিভাগকে পাত্তা দিতেন তাইলে এমনটা হওয়ার কথা নয়। একই দিতে ঘটা এই দুইটি ঘটনা অতি সাম্প্রতিক।

আমার প্রশ্ন হচ্ছে বিচার বিভাগের পচন নিয়ে। বিচার বিভাগের এমন পচন নতুন শুরু হয়নি। পচন থেকে দুর্গন্ধ বের হওয়ার কথা দৈনিক আমার দেশ আরো ৮ বছর আগে লিখেছে। দৈনিক আমার দেশ পত্রিকায় ২০১০ সালের এপ্রিলের দু’টি সংবাদ ও লেখার প্রসঙ্গ এখানে উল্লেখ করাই যথেষ্ট বলে মনে করি। ওই বছর এপ্রিলে প্রধান সংবাদ হিসাবে প্রকাশিত হয়েছিল আমার একটি অনুসন্ধানি রিপোর্ট। শিরোনাম ছিল ‘চেম্বার মানেই সরকার পক্ষে স্টে’। সেখানে প্রমান দিয়ে দেখিয়ে দেওয়া হয়েছিল কিভাবে দেশের সর্বোচ্চ আদালত সরকারের এজেন্ডা বাস্তবায়নে কাজ করছে। এই রিপোর্ট প্রকাশের এক সপ্তাহের মধ্যেই শ্রদ্ধেয় সম্পাদক মাহমুদুর রহমান একটি মন্তব্য প্রতিবেদন লিখেছিলেন। শিরোনাম ছিল ‘স্বাধীন বিচারের নামে তামাশা’। দু‘টি লেখার বিরুদ্ধেই আদালত অবমানার অভিযোগ আনা হয়েছিল সুপ্রিমকোর্টে। এ প্রসঙ্গে একটু পরে আসছি।

সম্পাদক মহোদয়ের লেখাটিতে পচন ও পচন থেকে দুর্গন্ধ বের হওয়ার প্রসঙ্গটি এনেছিলেন। দেখিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন বিচার বিভাগে কিভাবে পচন শুরু হয়েছে। সেখানে থেকে কিভাবে দুর্গন্ধ বের হচ্ছে। এই পচন নিরাময়ের উপায় কি সেটাও তিনি বলার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু কেউ তাঁর কথায় কান দিয়েছে এমন কোন উদ্যোগ চোখে পড়েনি।

সবচেয়ে মজার ব্যাপার হচ্ছে, প্রথম রিপোর্টটি নিয়ে আদালত অবমননার রুল জারি করে সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগ। সেই রুলের শুনানীতে আমাদের বিরুদ্ধে প্রমাণ আরো জোরদার করতে শ্রদ্ধেয় সম্পাদকের লেখটি সম্পুরক হিসাবে অ্যাটর্নি জেনারেলের অফিস থেকে আদালতে পেশ করা হয়। তখন ছয় বিচারপতির মধ্যে আবদুল মতিন চরম ক্ষেপে গেলেন। তিনি বললেন, এটা এই মামলার সম্পুরক নয়। এটাকে নতুন করে আরেকটা আদালত অবমাননার পিটিশন বানিয়ে নিয়ে আসেন। শুধু এটাই পৃথক আরেকটি আদালত অবমাননার মামলা হতে পারে। এ যেন সাপে বর। মেঘ না চাইতেই বৃষ্টি। অ্যাটর্নি জেনারেলের আফিস তাই করলেন। পরের দিন আরেকটি আদালত অবমাননার মামলা করলেন। সুপ্রিমকোর্ট রুল জারি করে দিল। পরে পৃথকভাবে শুনানী হল এই রুলের।

প্রসঙ্গটি টানলাম এই জন্য যে, দেশের বিচার বিভাগ আজকে নতুন করে এই জায়গায় যায়নি। সেটা গিয়েছে ধাপে ধাপে, অত্যন্ত নির্বিঘ্নে, বিনা প্রতিবাদ ও কোন রকমের প্রতিরোধ ছাড়াই। আমাদেরকে দন্ড দেওয়ার মাধ্যমে গণমাধ্যমকেও সতর্ক করেছিল সুপ্রিমকোর্ট। কেউ যেন তাদের দলীয় এজেন্ডা বাস্তাবয়নে বাধা সৃষ্টি না করে। যদিও দলদাস গণমাধ্যম গুলো নিজে থেকেই দলীয় এজেন্ডা বাস্তায়নে সুপ্রিমকোর্ট থেকে সেশি সক্রিয়।

মজার ব্যাপর হচ্ছে, এখন শুধু দুই/একটা পৃথক মামলা নিয়ে কেউ কেউ বলেন, বিচার বিভাগের উপর থেকে মানুষ আস্থা হারাবে। শুনতে বরং ভালই লাগে! বিচার বিভাগের পচন থেকে ক্যান্সার আক্রান্ত হওয়ার পরও যখন বলা হয়, বিচার বিভাগের উপর থেকে মানুষ আস্থা হারাবে, তখন আর আমাদের বলার কিছু থাকে না।

বাংলাদেশের বিচার বিভাগ সরকারের অনুগত বললে ভুল হবে। বিচার বিভাগ সরকারি এজেন্ডা বাস্তবায়নে স্ব-উদ্যোগে সক্রিয়। যদি বলা হয়, বিচার বিভাগকে কেউ চাপে রাখছে। সেটা আসলে সঠিক বলে মনে হয় না। বিচার বিভাগের প্রতিটি স্থরে দলীয় ক্যাডারদের যেভাবে বসানো হয়েছে। এমন অবস্থায় দলীয় এজেন্ডা বাস্তবায়নে বাইরের কেউ চাপ সৃষ্টি করার প্রয়োজন হবে, এমনটা বিশ্বাসযোগ্য নয়। দলীয় ক্যাডাররা স্ব-উদ্যোগেই তাদের কর্তব্য যথাযথ পালন করে যাচ্ছেন।

বিচার বিভাগের দলীয় এজেন্ডা বাস্তাবয়নের উদাহরণ দিতে গিয়ে আমি আগেও অনেক লেখায় কয়েকটি উদাহরণ দিতাম। আজো সে গুলোর কয়েকটা শুধু মনে করিয়ে দিচ্ছি।

(ক) বেগম খালেদা জিয়ার বাড়ির মামলা। হাইকোর্ট বিভাগে যখন মামলাটি করতে যাওয়া হয় তখন পরপর ৪টি বেঞ্চ বিব্রতবোধ করেছিল। সর্বশেষ একটি বেঞ্চ থেকে রুল জারি করা হয় এবং ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডের চিঠির কার্যক্রম স্থগিত করা হয়েছিল। তখন বিএনপি’র অনেক আইনজীবীর মুখে শুনেছি মামলাটির নিষ্পত্তি করা হবে নিজেরা ক্ষমতায় এসে। বাড়ি থেকে আর সরাতে পারবে না কেউ।

সরকারকি বসেছিল! সেই পর্যন্ত অপেক্ষার সুযোগ দিয়েছে সরকার? সরকারি উদ্যোগে মামলাটি নিষ্পত্তির জন্য তালিকায় আসে। তখনো অনেক বেঞ্চ নিয়ে নাটক হয় । সর্বশেষ একটি বেঞ্চে শুনানী হয়েছে। সবাই তখন বলেছিলেন, এখান থেকে ন্যায় বিচার পাওয়া যাবে! কিন্তু যা হওয়ার তাই হল। এটা সরকারি এজেন্ডা। সুতরাং সরকারি এজেন্ডা বাস্তবায়নে একধাপ এগিয়ে দিল হাইকোর্ট বিভাগ।

গেল আপিল বিভাগে। মনে করা হয়েছিল ওখানে কয়েক বছর ঝুলয়ে রাখা সম্ভব হবে। নিজেরা ক্ষমতায় এসে এটা নিষ্পত্তি করবে। তখন হাইকোর্ট বিভাগের রায় উল্টে যাবে। কারন হাইকোর্ট বিভাগ ন্যায় বিচার করেনি। ন্যায় বিচার তো অবশ্যই না। যে বাড়ি রেজিষ্টি দলীলে হস্তান্তর করা হয়, দললি ভুমি রেকর্ডভুক্ত হয় সেই দলীল এভাবে বাতিল হতে পারে না। সুতরাং এটা ন্যায় বিচার নয়, এজেন্ডা বাস্তবয়ন হয়েছে। যাক সেটা ভিন্ন ব্যাপার। বলছিলাম সুপ্রিমকোর্ট নিয়ে।

আপিল বিভাগে মামলাটি লিভ টু আপিল, অর্থাৎ আপিল করার জন্য অনুমতির আবেদন করা হল। লিভ টু আপিল শুনানীর দিনে আদালতে প্রধান বিচারপতির আসনে ছিলেন খায়রুল হক। তাঁর দুই পাশে ছিলেন সুরেন্দ্র কুমার সিনহা ও মোজাম্মেল হোসেন। দুঃখিত আমি তাদের নামের আগে বিচারপতি শব্দ ব্যবহার করতে লজ্জা পাই। মনে করি বিচারপতি শব্দটির অবমাননা হয়। তারা লিভ টু আপিল শুনানীরই সুযোগ দিলেন না। সেটা খারিজ করে দিলেন। লিভ টু আপিল শুনানীর দিনে আদালতে উপস্থিত হওয়ার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল। দেখিলাম বিচারপতি নামে যারা আসনে বসে আছেন তাদের ভুমিকা।

বিচারের নিয়ম হচ্ছে আবেদনকারীর সবকিছু শুনে আদেশ দেওয়া। কিন্তু ওইদিন একটি পৃথক পিটিশন বেগম খালেদা জিয়ার পক্ষ থেকে উত্থাপনের জন্য তৈরি ছিল। ব্যারিষ্টার রফিক উল হক দাড়িয়ে বললেন, মওদুদ সাহেব এ মামলা সংশ্লিষ্ট একটি পিটিশন উত্থাপন করবেন। তারপর শুনানী শুরু করব। মওদুদ সাহেব দাড়ানোর পরই বিচারপতির আসন থেকে বলা হয় নতুন পিটিশন নয়, শুনানী শুরু করুন। এভাবে আধা ঘন্টার মত মওদুদ সাহেব দাড়িয়েছিলেন। তাঁকে বিচারপতিদের আসন থেকে বলা হচ্ছিল আপনি বসুন। তিনি শুধু পিটিশনটা হাতে উঠিয়ে দেখাচ্ছিলেন এটা পেশ করতে চাই। সুযোগ না দিয়ে বিচারপতির আসন থেকে রফিক উল হককে শুধু বলা হয় আপনি শুনানী শুরু করুন। এক পর্যায়ে হঠাৎ করে খায়রুল হক সাহেব বলেন, আমরা তাইলে আদেশ দিচ্ছি। শুনানী ছাড়াই আদেশে লিভু টু আপিলের আবেদন খারিজ করে দেওয়া হল। খেলা ফাইনাল।

(খ) এরও আগে ৫ম সংশোধনী অবৈধ ঘোষণা করেছিল খায়রুল হক। তখন অবশ্য চার দলীয় জোট সরকার ক্ষমতায়। নানা জঠিলতার কারনে তখন ৫ম সংশোধনী বাতিলের বিরুদ্ধে আপিল শুনানী করা সম্ভব হয়নি। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসেই সেই আপিল শুনানীর উদ্যোগ নেয়। তখনো দেখেছি আপিল বিভাগের ভুমিকা। তখন প্রধান বিচারপতি ছিলেন তাফাজ্জাল ইসলাম। সরকারি এজেন্ডা বাস্তবায়ন করে তারা খায়রুল হকের রায় বহাল রাখলেন।

(গ) ত্রয়োদশ সংশোধনী চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রীট আবেদন হয়েছিল। এতে বৃহত্তর বেঞ্চ অর্থাৎ সিনিয়র ৩জন বিচারপতির সমন্বয়ে আদালত গঠন করে শুনানী হয়। কারন মামলাটির সাথে বাংলাদেশের সংবিধান ও মানুষের আবেগ জড়িত। ত্রয়োদশ সংশোধনী অর্থাৎ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকে বাংলাদেশের গণতন্ত্রের অলঙ্কার হিসাবে উল্লেখ করে রায় দেয় বৃহত্তর বেঞ্চ। হাইকোর্টের রায়ে সেটাকে শুধু বৈধই বলা হয়নি, বলা হয়েছে এটি গণতন্ত্রের অলঙ্কার। সে রায়টি অবশ্য দেয়া হয়েছিল ৪ দলীয় জোট সরকারের সময়। তখনো এ রায়ের বিরুদ্ধে বাদী পক্ষে আপিল করা হয়। এই আপিল শুনানীর উদ্যোগ নেয়নি চার দলীয় জোট সরকার। ২০১১ সালে খায়রুল হক প্রধান বিচারপতি পদ থেকে অবসরে যাওয়ার আগে এ মামলার আপিলটি নিজের উদ্যোগে খুজে বের করেন। তিনি ইচ্ছা প্রকাশ করেন অবসরে যাওয়ার আগে সেটা শেষ করতে চান। সরকারি এজেন্ডা বাস্তাবয়নে তিনি সেটা শেষ করে দিয়ে গেলেন। হাইকোর্টের রায় বাতিল করলেন। একই সাথে শেষ করলেন দেশের গণতন্ত্রকে।

(ঘ) বিএনপি’র বর্তমান ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে টাকা পাচারের অভিযোগে দুদকের মামলা ছিল। সেই মামলায় ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে জেলাজজ আদালত তাঁকে খালাস দিল। আপিল করল দুদক। ছাত্র লীগের সাবেক সভাপতি ইনায়েতুর রহিমের বেঞ্চে জেলাজজ আদালতের রায় বাতিল সংশোধন করা হল। তারেক রহমানকে ৭ বছরের কারাদন্ড দেওয়া হয়। সঙ্গে জরিমানা কোটি টাকা। তাঁর বেঞ্চেই অবশ্য বেগম খালেদা জিয়ার আপিল শুনানীর জন্য আছে। জামিন নিয়ে কি করা হয়েছে সেটা সবারই ষ্মরণ থাকার কথা। কারন এটি অতি সম্প্রতি। একটু পুরাতন হলেই কিন্তু আমরা সব ভুলে যাই।

এরকম উদাহরণ দিয়ে শেষ করা যাবে না। এগুলো হচ্ছে সুপ্রিমকোর্টে বসা দলীয় ক্যাডারদের ভুমিকার উদাহরণ।

(ঙ) এবার দেখি একটু নাড়াছাড়া করলে কি হয় সেই বিষয়ে। সুরেন্দ্র কুমার সিনহা আগা গোড়াই আওয়ামী। সরকারি এজেন্ডা বাস্তাবায়নে প্রতিটি পদক্ষেপে ছিল তাঁর ভুমিকা। নিজের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে কিছু দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছিল অভ্যন্তরে। এতে তিনি একটি মাত্র মামলায় সরকারের বিরুদ্ধে রায় দিলেন। তাও তিনি দেননি। বিচারপতিদের অপসারনের বিষয়ে সংবিধানের সংশোধনী বাতিল করে রায় দেয় হাইকোর্ট বিভাগ। সেটাকে এস কে সিনহার নেতৃত্বে আপিল বিভাগ শুধু বহাল রাখে। রায়ে কিছুটা সমালোচনা করা হয় প্রাসঙ্গিকভাবে। এতেই রক্ষা নাই। তাঁকে রীতিমত গলা ধাক্কা দিয়ে বের করে দেওয়া হয়েছে। শেষ পর্যন্ত দেশেই থাকতে দেওয়া হয়নি। এটাও সাম্প্রতিক ঘটনা। ভুলার কথা নয়।

(চ) আবদুল ওয়াহাব মিঞা। আগাগোড়া আওয়ামী লীগের লোক। তাঁরপরও তাঁকে বিশ্বাস করা হয়নি। ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি হিসাবেও তিনি সরকারি এজেন্ডা বাস্তাবয়ন করে আরো আস্থা ভাজন হওয়ার চেষ্টা করেছেন। নি¤œ আদালতের বিচারপতিদের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সরকার এবং সুপ্রিমকোর্টের লড়াইয়ে সরকারের পক্ষে রায় দিয়ে গেছেন। এটি নিয়েও সুরেন্দ্র কুমারের সাথে সরকারের কিছুটা টানাপোড়েন ছিল। তারপরও আবদুল ওয়াহাব মিঞার শেষ রক্ষা হয়নি। কারন তিনি কিন্তু, এর আগে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পক্ষে রায় দিয়েছেন। রায় দিয়েছেন আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে বেকসুর খালাস দিয়ে। রায় দিয়েছেন আবদুল কাদের মোল্লার যাবজ্জীবন কারাদন্ড দিয়ে। এরকম কয়েকটি বিষয়ে সরকারি এজেন্ডায় তাঁর কিছুটা দ্বিমত ছিল। তাই নিজেদের লোক হওয়া সত্ত্বেও সরকার তাঁকে বিশ্বাস করতে পারেনি। তাই প্রধান বিচারপতি পদটি তাঁর কপালে জুটেনি।
স্ব-উদ্যোগে দলীয় এজেন্ডা বাস্তবায়নে কেউ গড়িমসি করলে কি দাড়ায় সেটার জ্বলন্ত উদাহরণ সুরেন্দ্র কুমার এবং আবদুল ওয়াহাব মিঞা। এরপরও কিন্তু বিরোধী জোটের পক্ষ থেকে বলা হয় আদালতের উপর মানুষের আস্থা কমে যাবে। তাঁর মানে এখনো কমেনি।

ক্যান্সার সরাতে হলে কঠিন চিকিৎসা লাগে। বিচার বিভাগের পচন থেকে শুরু হওয়া ক্যান্সার দূর করতেও কঠিন সংগ্রাম লাগবে। আবেদন, নিবেদন আর পিটিশন দিয়ে মনে হয় বিচার বিভাগের পচন থেকে শুরু হওয়া ক্যান্সার দূর করা আদৌ সম্ভব হবে না।

লেখক: দৈনিক আমার দেশ-এর বিশেষ প্রতিনিধি, যুক্তরাজ্যে নির্বাসিত।

Comments

comments