ফ্যাসিবাদ ও আধিপত্যবাদ বিরোধী মুক্তিসংগ্রাম

– মাহমুদুর রহমান

প্রথম কিস্তি
ভারতবর্ষ একদা ব্রিটিশ সা¤্রাজ্যের অধীনে একটি উপনিবেশ ছিল। সাত সমুদ্র ওপারের লন্ডন থেকে সেই সময় একজন শ্বেতাঙ্গ বড়লাট আসতেন নেটিভদের শাসন করতে। সেই নেটিভদের মধ্যেই সুবিধাভোগী একটি ক্ষুদ্র দালাল গোষ্ঠী উপমহাদেশের তেত্রিশ কোটি সাধারন জনগনকে পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ রাখার কাজে বিদেশী দখলদার শাসকদের সর্ব উপায়ে সহযোগীতা দিত। বিনিময়ে বিপুল সম্পদের মালিক হওয়ার পাশাপাশি তারা সমাজে ক্ষমতাধর এলিট রূপে গন্য হতেন। ব্রিটিশ ভারতের সেনাবাহিনীর পোষাকী নাম ছিল, ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান আর্মি। সেই বাহিনীর অফিসারদের ইংল্যান্ড, স্কটল্যান্ড অথবা আয়ারল্যন্ড থেকে আমদানী করা হলেও সিপাহীরা জাতে সব ভারতীয়ই ছিল। বৃটিশ সম্রাটের উপনিবেশ রক্ষা করাই ছিল ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান আর্মিও অন্যতম দায়িত্ব। সেই দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে সেনাবাহিনীর সদস্যরা স্বদেশীদের উপর অকাতরে গুলি চালাতো, নিজের ভাই-বোনদের হত্যা করতো। ইতিহাস কুখ্যাত জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকান্ডে গুলির নির্দেশ দিয়েছিলেন ব্রিটিশ জেনারেল ডায়ার, কিন্তু নিরস্ত্র আন্দোলনরত ভারতবাসীর ওপর গুলি বর্ষন করেছিল ভারতীয় বংশোদ্ভূত সিপাহীকূল। ঔপনিবেশিক প্রশাসন চালানোর জন্যে ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান আর্মির সাথে ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিস প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। সিভিল সার্ভিসের আমলাদের মধ্যে অধিকাংশ ব্রিটিশ হলেও, স্বল্পসংখ্যক ভারতীয়রাও সেখানে নিয়োগ পেতেন। এই সব গুরুত্বপূর্ণ পদে বেছে বেছে কেবল হিন্দুদেরই নিয়োগ দেয়া হতো। ব্রিটিশ রাজ মুসলমানদের ঠিক বিশ্বাস করতে পারতো না। একশ নব্বই বছরের ভারত শাসনকালে ইংরেজরা কখনও ভুলে যায়নি যে তারা মুসলমান শাসকদের কাছ থেকেই ক্ষমতা দখল করেছিল। ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিসে প্রথম যে বাঙ্গালী নিয়োগ পেয়েছিলেন তার নাম সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর। পাঠকদের অনেকেই হয়ত জানেন যে, ব্রিটিশ সা¤্রাজ্যবাদের সহযোগী এই বাঙালী হিন্দু ভদ্রলোক নোবেল বিজয়ী কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বড় ভাই। স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীতের ¯্রষ্টাও কবি রবীন্দ্রনাথ। অবশ্য ১৯০৬ সালে লিখিত ‘আমার সোনার বাংলা’ গানটি রচনার প্রেক্ষাপট একেবারেই ভিন্ন ছিল। তবে সেই আলোচনা আজকের বিষয় নয়। যাই হোক, বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থা নিয়ে লেখার আগে এটুকু ইতিহাস চর্চার প্রয়োজন ছিল।

একদার উপনিবেশ ভারত আজ দক্ষিন এশিয়ার অন্যতম আঞ্চলিক শক্তি। দেশটির রাজনৈতিক নেতৃত্বের মধ্যে পরাশক্তি হয়ে ওঠার বাসনাও প্রবল। ভারতের প্রতিটি প্রতিবেশী রাষ্ট্র তার দাদাগিরিতে অতিষ্ঠ। বিশেষ করে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধকালীন সহায়তা দানের পরিনতিতে বাংলাদেশকে দিল্লি আশ্রিত রাজ্যের অধিক মর্যাদা দিতে বরাবরই কুন্ঠিত বোধ করে। সম্প্রতি ভারতের আসার রাজ্যের একজন বিধায়ক শিলাদিত্য দেব বলেছেন যে ১৯৭১ সালে ভারতের বাংলাদেশকে দখল করে নেয়া উচিৎ ছিল। প্রসঙ্গত এই শিলাদিত্য ভারতের ক্ষমতাসীন দল হিন্দুত্ববাদী বিজেপির সদস্য। বাংলাদেশের জন্ম থেকেই ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ভারতের এই প্রভূত্ব সানন্দ চিত্তে মেনে নিয়েছে। দলটির প্রধান শেখ হাসিনা ১৯৭৫ সাল থেকে ১৯৮১ সাল পর্যন্ত রাজনৈতিক আশ্রয়ে দিল্লিতে সপরিবারে থেকেছেন। সঙ্গত করনেই ভারতের প্রতি তার গভীর কৃতজ্ঞতাবোধ রয়েছে। তাছাড়া তার মরহুম পিতার সঙ্গে ভারতের একসময়ের ক্ষমতাধর প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর যথেষ্ট প্রীতিপূর্ন সম্পর্ক ছিল। সেই সুবাদে দুই দেশের দুই প্রভাবশালী পরিবারের মধ্যে বিশেষ হৃদ্যতা বিদ্যমান। অধিকন্তু, বাংলাদেশের সেক্যুলার সুশীল গোষ্ঠীও ভারত প্রেমে সম্পূর্নভাবে সমর্পিত। এদেশের মিডিয়ার নব্বই শতাংশ সেই সব ভারত প্রেমীদের অধিকারে রয়েছে। পাকিস্তানি আমল থেকেই বাংলাদেশে সীমান্তের ওপাড়ের যে সাংস্কৃতিক আগ্রাসন চলমান ছিল, স্বাধীনতাত্তোর ৪৭ বছরে সেই আগ্রাসনের ব্যাপকতা এবং তীব্রতা দুইই বেড়েছে। বাংলাদেশে প্রশাসনের মধ্যেও ভারত প্রীতি এবং ভীতি উভয়েই প্রবল। এমন প্রতিকূল পরিস্থিতিতে কেবল দুটি কারনে বাংলাদেশ এখনও খানিকটা স্বাতন্ত্র নিয়ে আংশিক স্বাধীনতা ধরে রাখতে পেরেছে। প্রথম কারন, বাংলাদেশের জনগনের মধ্যে নব্বই শতাংশই ইসলাম ধর্মাবলম্বী এবং তাদের একটি গৌরবজ্জ্বল অতীত ও নিজস্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রয়েছে। আর দ্বিতীয়টি হলো, স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনীতিতে একজন প্রকৃত দেশপ্রেমিক এবং সাহসী রাষ্ট্রনায়কের আবির্ভাব।

১৯৪৬ সালে তৎকালিন পূর্ব বাংলার দরিদ্র মুসলমান কৃষক সমাজ পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পক্ষে একচেটিয়া ভোট দিয়েছিল। বৃটিশ শাসনামলের ঊনবিংশ শতকে তথাকথিত বাঙালী রেনেসা কেবল বাঙালী হিন্দুদের লাভবান করেছিল। ওই রেনেসার ফলে বাঙালী মুসলমানের ভাগ্যের কোন পরিবর্তন হয় নাই। পূর্ব বাংলার অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের লক্ষ্যে ১৯০৫ সালে বড় লাট, লর্ড কার্জন বাংলা ভাগ করলে শিক্ষিত বাঙালী হিন্দু সমাজের প্রবল বিক্ষোভের মুখে বৃটিশ ঔপনিবেশিক সরকার ১৯১১ সালে সেটি রদ করে। এমনকি অবহেলিত ও পশ্চাৎপদ জনগনের উচ্চ শিক্ষার জন্য প্রস্তাবিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠাতেও একই সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী বাধা নিয়ে দীর্ঘ দশ বছর তার বাস্তবায়ন বিলম্বিত করে রেখেছিল । ফলে বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানরা অনুধাবন করে যে, তাদের জন্য একটি স্বাধীন রাস্ট্র গঠিত না হলে ভারতীয় মুসলামনদের ভাগ্যে কোন অগ্রগতি সাধিত হবে না। যে উচ্চ বর্ণের তথাকথিত শিক্ষিত বাঙালী হিন্দু ভদ্রলোক শ্রেনি ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ করবার জন্য সশস্ত্র সংগ্রামের পথ বেছে নিয়েছিল, তারাই আবার ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা লগ্নে বাংলা ভাগ করার আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিল। বাংলার সংখ্যাগুরু মুসলমানদের শাসনতান্ত্রিক অধিকার মানতে তারা অস্বীকার করে। সোহরাওয়ার্দি, শেরে বাংলা ফজলুল হক এবং শরৎ বোসের বাংলাকে অবিভক্ত রাখার ঐকান্তিক চেষ্টা প্রধানত: বর্ণ হিন্দুদের আন্দোলনের কারনেই ব্যর্থ হয়। বাংলা ভাগ হলে পরে পূর্ব বঙ্গ, পূর্ব পাকিস্তানে পরিনত হয় এবং বাংলার পশ্চিম ভাগ ভারতভূক্ত হয়ে পশ্চিম বঙ্গ নাম ধারন করে। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর পশ্চিম পাকিস্তানের পাঞ্জাবী শাসকশ্রেণি সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালীদের প্রাপ্য মর্যাদা এবং দেশ শাসনে অংশীদারিত্ব দিতে অস্বীকার করলে যে বিভাজন সৃষ্টি হয় তারই অবধারিত পরিনাম পর্যায়ক্রমে ভাষা আন্দোলন এবং মুক্তিযুদ্ধ। কিন্তু ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে পশ্চিম পাকিস্তানী মুসলমানদের পরাজিত করার মাধ্যমে স্বাধীন, স্বার্বভৌম বাংলাদেশ নামে যে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা লাভ করে তার সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠী ধর্মে মুসলমানই থেকে যায়। দূর্ভাগ্যবশত: ভারতীয় সাম্রাজ্যবাদ এবং তাদের এই দেশীয় দালাল শ্রেনি স্বাধীনতার পর থেকেই বাংলাদেশের জনগনের স্বতন্ত্র ধর্ম এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে উপেক্ষা করে তাদের উপর ব্রাহ্মন্যবাদী সংস্কৃতি চাপিয়ে দেয়ার অপচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। উনিবংশ শতকের হিন্দু রেনেসা থেকে উদ্ভূত কলকাতার বাবু সংস্কৃতির প্রবল আগাসন সত্ত্বেও বাংলাদেশের নিজস্ব বাঙালি মুসলমান সংস্কৃতি এখনও প্রতিরোধ চালিয়ে যাচ্ছে। সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠির ভিতর যতদিন ইসলাম ধর্মের প্রতি এই বিশ্বাস এবং নিজস্ব সংস্কৃতির প্রতি মর্যাদাবোধ অবিচল থাকবে, অন্তত: ততদিন দিল্লি এ দেশকে সম্পূর্ন ভাবে করায়ত্ত করতে সক্ষম হবে না। আমাদের দেশের ইসলাম বিদ্বেষী সেক্যুলার গোষ্ঠী রাত্রিদিন দুই বাংলার জন্যে আহাজারি করে থাকেন, অশ্রুপাত করেন। বাংলা ভাগের জন্যে তারা সর্বদা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহকে দায়ী করে থাকেন। ভারতের এই দালাল শ্রেনী হয় বাংলা ভাগের ইতহাস জানেন না, অথবা জেনেশুনে উদ্দেশ্যপ্রনোদিতভাবে ইতিহাস বিকৃত করছেন।

ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায় যে, গুজরাটি মুসলমান জিন্নাহসহ তদানিন্তন অবাঙালী মুসলিম লীগ কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের কাছে বাঙলার তেমন কোন আকর্ষন ছিল না। বরঞ্চ পশ্চিমে পাকিস্তানের অতিরিক্ত ভারত উপমহাদেশের পূর্ব অংশে অপর একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ, অবিভক্ত বাঙলা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগে জিন্নাহ যথেষ্ট উৎসাহ দেখিয়েছিলেন। কিন্তু সম্প্রদায়গত লাভ-লোকসানের হিসেবে বাঙলাকে অবিভক্ত রাখার প্রয়াস বাঙালী হিন্দুদের কাছে গ্রহনযোগ্য ছিল না। প্রখ্যাত কেম্ব্রিজ স্কলার জয়া চ্যাটার্জী তার ‘বাঙলা ভাগ হল’ (Bengal Divided)) গবেষনা গ্রন্থে লিখেছেন, “ কংগ্রেস হাই কমান্ড যখন দেশ-বিভাগের ইচ্ছা প্রকাশ করে এবং খন্ডিত পাকিস্তানের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে তখন তারা বেঙ্গল কংগ্রেসের ইচ্ছাকে পদদলিত করেনি, বরং বেঙ্গল কংগ্রেস তাদের দৃঢ় সমর্থন দিয়েছে। বাঙালি হিন্দুরা সব সময় তাদের প্রদেশকে (বাঙলা) নিজের প্রদেশ বলে গন্য করে- এ প্রদেশে স্থায়ীভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের শাসনে থাকার ধারণায় তাদের ক্রমবর্ধমান অনিচ্ছার কথা আগের অধ্যায়গুলোতে বর্ণনা করা হয়েছে। ১৯৪৬ সালের শেষ দিকে এবং ১৯৪৭ সালের প্রথম দিকে এই অস্বীকৃতি এমন দৃঢ় সংকল্পে পর্যবসিত হয় যে, বাঙলাকে অবশ্যই ভাগ করতে হবে এবং হিন্দুরা অবশ্যই নিজেদের জন্য কেটেছেঁটে হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশ সৃষ্টি করবে। এর অর্থ হল, পশ্চিম ও উত্তর বাঙলার হিন্দু-প্রধান জেলাগুলো নিয়ে নতুন এক প্রদেশ সৃষ্টি করা যেখানে হিন্দুরা হবে সংখ্যাগরিষ্ঠ। বাঙালি হিন্দু রাজনীতির অভ্যন্তরীণ গতিপ্রকৃতির থেকে এই দৃঢ় সংকল্পের উৎপত্তি ঘটে; তবু দেখা যায়, এর সফলতা কেন্দ্রের কংগ্রেসের সমর্থনের ওপর গভীরভাবে নির্ভরশীল। প্রাদেশিক ভদ্রলোক রাজনীতি ও কংগ্রেস হাই কমান্ডের অগ্রাধিকারের মধ্যে পারস্পরিক নির্ভরশীল এই প্রতীকী সম্পর্ক ১৯৪৭ সালে বাঙলা ভাগকে একটি নির্দিষ্ট রূপ দান করে। ”

অতএব, দুই বাঙলা এক করবার স্বপ্নের কারবারিদের হাতে দুটো বিকল্প রয়েছে। প্রথমটি, হলো জনগনের ম্যান্ডেটবিহীন বাংলাদেশের বর্তমান অবৈধ ও দখলদার সংসদের প্রধানমন্ত্রীকে দিয়ে সংসদে সর্বসম্মতিক্রমে ভারতভূক্তির বিল পাশ করানো। এই পন্থাতেই ১৯৭৫ সালে সিকিমের লেন্দুপ দর্জি স্বাধীনতা বিসর্জন দিয়ে ভারতীয় ইউনিয়নভূক্ত সিকিম রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রি হয়েছিলেন। এ দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান জনগোষ্ঠীর নির্লিপ্ততা এবং ভীরুতায় আমি যতই হতাশ হই না কেন, তাদের প্রতি এটুকু আস্থা আমার এখনও অটুট আছে যে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীনতা বিলুপ্ত করার অপচেষ্টাকে তারা রক্ত এবং জীবন দিয়ে অবশ্যই রুখবে। সে রকম কোন উদ্যোগ গৃহীত হলে ৭ নভেম্বর ১৯৭৫ সালের দেশপ্রেমিক সিপাহী-জনতা বিপ্লবের পুনরাবৃত্তি বাংলাদেশে ইনশাআল্লাহ ঘটবে। অপর দিকে দিল্লিও হয়ত এই ধরনের কোন পরিকল্পনায় সমর্থন দেবে না। ভারতের প্রায় ২৫ কোটি মুসলমান নাগরিকদেরই যারা সে দেশ থেকে বিতাড়িত করতে চায় তারাই নতুন করে অতিরিক্ত পনেরো কোটি মুসলমানের ঝামেলা কাঁধে নেবে এমনটা যারা স্বপ্ন দেখেন তাদের মাথার একেবারেই বারটা বেজে গেছে। বরঞ্চ দিল্লি বাংলাদেশকে অঘোষিত উপনিবেশ হিসেবে ব্যবহার করতেই অধিকতর আগ্রহী। দুই বাঙলাপ্রেমিদের সর্বশেষ একটি পথ অবশ্য খোলা আছে। পশ্চিম বঙ্গের জনগন যদি ভারতীয় ইউনিয়ন ভেঙে বাংলাদেশের সঙ্গে একীভূত হতে সম্মত হয় তাহলে তেরো এবং চোদ্দ শতকের গৌরবময় স্বাধীন সুলতানী বাংলায় প্রত্যাবর্তন করা সম্ভব হবে। তবে সেই উদ্যোগ ওপারের বাঙালীদেরই নিতে হবে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের জনগন কেবল সহযোগীতার হাত প্রসারিত করতে পারে। ১৯৭১ সালে পশ্চিমবঙ্গের বাঙালীরা আমাদের মহান স্বাধীনতা সংগ্রামে অকুন্ঠ সমর্থন দিয়ে আমাদেরকে কৃতজ্ঞতাপাশে আবদ্ধ করেছেন। আমরাই বা তাদের স্বাধীকা অর্জনের স্বপ্নকে সম্মান জানাবো না কেন?

এবার বাংলাদেশের একজন দেশপ্রেমিক রাষ্ট্রনায়ক নিয়ে আলোচনা। বাংলাদেশর মুক্তিসংগ্রামে শেখ মুজিবর রহমানের পরেই যে ব্যক্তির সবচেয়ে গৌরবজ্জ্বল অবস্থান তিনি জিয়াউর রহমান। শেখ মুজিব বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষনা না করেই যে পাকিস্তানী দখলদার সেনাবাহিনীর হাতে আটক হয়েছিলেন সেটি ইতিহাস দ্বারা প্রমানিত। বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন শাসকগোষ্ঠী এই সত্যকে যতই ঢেকে রাখার চেষ্টা করুক না কেন, মুক্তিযুদ্ধের অধিকাংশ নায়কদের আত্মজীবনীতে একই তথ্য বার বার লিখিত হয়েছে। ১৯৭১ সালে রাজনৈতিক নেতৃত্বের দোদুল্যমানতার মধ্যে শেখ হাসিনার ভাষায় এক অখ্যাত মেজর জিয়াউর রহমান ২৫ মার্চ মধ্যরাতে চট্টগ্রামে সশস্ত্র মক্তিযুদ্ধের সূচনা করেন। তার কামান্ডিং অফিসার পাকিস্তানি কর্ণেল জানজুয়াকে তিনি ওই রাতেই বাঙালী সৈন্যদের নিয়ে বন্দী করেন। কর্নেল জানজুয়াকে সম্ভবত: তাৎক্ষনিক ভাবে হত্যা করা হয়। পরবর্তীতে মেজর জিয়া কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতার আনুষ্ঠানিক ঘোষনা দেন। বেতারের প্রথম ঘোষনায় জিয়া নিজেকে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতিও (Provisional President) বলেন। পরে অবশ্য তিনিই বক্তব্য সংশোধন করে শেখ মুজিবকে বিপ্লবী সরকারের রাষ্ট্রপতি হিসেবে বর্ননা করে তার পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষনা দেন। মুক্তিযুদ্ধ শুরুর কয়েকদিনের মধ্যেই মেজর জিয়া তৎকালিন পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিদের মধ্যে কিংবদন্তীতে পরিনত হন। এ দেশের অকার্যকর বিচার বিভাগের সহায়তাক্রমে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ জিয়ার সেই মর্যাদা কেড়ে নেয়ার আপ্রান চেষ্টা করলেও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এই সাহসী সেনা কর্মকর্তার স্থান সমুজ্জ্বলই থাকবে।

১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর সংঘটিত মহান সিপাহী-জনতা বিপ্লবের মাধমে ১৯৭১ সালের মেজর জিয়ার বাংলাদেশের রাজনীতিতে আবির্ভাব ঘটে। ১৯৭৭ সালে তিনি সামরিক সরকারের রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব গ্রহন করেন। ১৯৭৮ সালে বাংলাদেশের ইতিহাসের প্রথম সরাসরি রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জেনারেল জিয়া তারই মুক্তিযুদ্ধকালিন সর্বাধিনায়ক জেনারেল ওসমানিকে বিপুল ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করেন। ১৯৭৯ সালে তিনি রাজনৈতিক দল, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) প্রতিষ্ঠা করেন। দূরদর্শী জিয়া উপলব্ধি করেন যে, আগ্রাসী ভারতীয় সম্প্রসারনবাদকে মোকাবেলা করে বাংলাদেশের স্বাধীনতা রক্ষা করতে হলে জনগনের মধ্যে স্বকীয় সংস্কৃতির ভিত্তিতে আত্মমর্যাদাবোধ জাগিয়ে তুলতে হবে। তার বাংলাদেশী জাতিয়তাবাদের দর্শন অতি দ্রুত জনগনের হৃদয় স্পর্শ করে এবং তাদেরকে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করতে সক্ষম হয়। স্বাধীনতা অর্জনের পর থেকে সাবেক পূর্ব বাংলা এবং পূর্ব পাকিস্তানের মুসলমান জনগোষ্ঠীর মধ্যে যে পরিচয়জনিত সংকট (Identity Crisis) চলছিল তার অবসান ঘটে। তিনি সংবিধান সংশোধন করে ‘বিসমিল্লাহির রাহমানুর রাহীম’ (আল্লাহর নামে শুরু করছি) সংবিধানের শীর্ষে এবং আল্লাহর প্রতি পূর্ন আস্থা ও ইমান রাষ্ট্রের মূলনীতিতে নিয়ে আসেন। এর মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট জিয়া জনগনকে আশ্বস্ত করেন যে, বাঙালী জাতীয়তাবাদের উত্থানের মাধ্যমে আমাদের মুসলমান ধর্ম পরিচয় অবলুপ্ত হয়নি। বাংলাদেশ সকল ধর্মাবলম্বীদের আবাসস্থল হলেও এদেশের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান জনগোষ্ঠী একাধারে ইসলাম ধর্মাবলম্বী এবং বাঙালী। জনগনের মধ্যে এই স্বকীয়তার উপলব্ধি যে বাংলাদেশের স্বাধীনতার রক্ষার জন্যে অপরিহার্য সেটাই রাষ্ট্রনায়ক জিয়া তার রাজনীতির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হন। পূর্ব পাকিস্তানের জনগন যদি বাঙালী না হতো তাহলে পশ্চিম পাকিস্তানের মুসলমান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে অস্ত্রধারনের প্রয়োজন হত না। আবার অন্য দিকে পূর্ব পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগন যদি মুসলমানের পরিবর্তে হিন্দু হত তাহলে, মুক্তিযুদ্ধে বিজয় লাভের পর সহজেই ‘ ভারতমাতার ’ কোলে আশ্রয় নেয়া যেত।

মুসলমান এবং বাঙালী এই দ্বৈত পরিচয় আমাদেরকে স্বতন্ত্র জাতির মর্যাদা দিয়েছে। জনগনের আত্ম পরিচয় নিয়ে উদ্দেশ্যপ্রনোদিত যে কোন সংশয় সৃষ্টি বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের স্বাধীনতা ও সার্বভ্যেমত্বকে দূর্বল করে তুলবে। প্রেসিডেন্ট জিয়ার সততা, দেশপ্রেম এবং সাহসিকতার কোন তুলনা হয় না। কিন্তু কেবল এই তিন গুনের সমন্বয় তাকে রাষ্ট্রনায়কের মর্যাদা দেয় না। বাংলাদেশের জনগনের আত্মপরিচয়ের সংকটের অবসান ঘটিয়ে তাদেরকে একটি স্বাধীন দেশের মর্যাদাপূর্ন নাগরিকে উন্নীত করতে সক্ষম হয়েছিলেন বলেই জিয়াউর রহমান একজন মহান রাষ্ট্রনায়ক। অভ্যন্তরীন এবং আন্তর্জাতিক নানা রকমের ষড়যন্ত্র সত্ত্বেও বাংলাদেশের স্বাধীনতা আজো আংশিক হলেও যে টিকে আছে তার জন্যে আমাদের ধর্মবিশ্বাসের পাশাপাশি জিয়ার রাজনৈতিক দর্শনের ভূমিকাও অনস্বীকার্য। ফ্যাসিবাদ এবং আধিপত্যবিরোধী মুক্তিসংগ্রামে তিনি বাংলাদেশের দেশপ্রেমিক জনগনের জন্য এক অনন্য আলোকবর্তিকা। মহান আল্লাহতালা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াকে জান্নাতবাসী করুন। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের বর্তমান নেতৃত্ব শহীদ জিয়ার রাজনৈতিক আদর্শ কতখানি উপলদ্ধি করেন অথবা অনুসরন করছেন তা নিয়ে এদেশের দেশপ্রেমিক জনগনের মধ্যে খানিকটা সংশয় সৃষ্টি হয়েছে। এ নিয়ে পরবর্তী কিস্তিতে লেখার ইচ্ছা রইলো।

আজ ২৩ মার্চ। আর দুদিন বাদেই আমাদের মহান স্বাধীনতা দিবস। কিন্তু, এ কেমন স্বাধীনতা ভোগ করছি আমরা? জনগনের মত প্রকাশ এবং সভা-সমাবেশ করার অধিকার নেই। সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে আমাদের ভোট প্রদানের অধিকার হরন করা হয়েছে। মানবাধিকার পরিস্থিতির এতটাই অবনতি হয়েছে যে প্রতিটি ভিন্ন মতের মানুষের জীবন এখন হুমকির সম্মুখিন। আমি জানিনা যে এই লেখাটি পাঠকের পড়া পর্যন্ত আমি জীবিত থাকবো কিনা অথবা গুমের শিকারে পরিনত হবো কিনা। সংবিধানে লেখা আছে রাষ্ট্রের মালিক নাকি জনগন। অথচ সেই মালিকানা চলে গেছে দিল্লির পদতলে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা এশিয়ান লিগাল রিসোর্স সেন্টার (এএলআরসি) কর্তৃক জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশনকে প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী দখলদার সরকার ক্ষমতাসীন হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত ৪২১ জন হতভাগ্য বাংলাদেশী নাগরিক গুম হয়েছেন, ১৪৮০ জনকে পুলিশ ও র‌্যাব বিনা বিচারে খুন করেছে এবং হেফাজতে নির্যাতন করে ১২০ জনকে মেরে ফেলা হয়েছে। বেপরোয়া খুনের প্রকৃত চিত্র আরো ভয়াবহ এবং নির্মম। স্বাধীনতার এই পৈশাচিক চেহারা দেখার জন্য নিশ্চয়ই ১৯৭১ সালে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান মুক্তিযোদ্ধারা জীবন বাজি রেখে পাাকিস্তানী সৈন্যদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র লড়াইয়ে অবতীর্ন হননি। একাত্তরের মুক্তিযোদ্ধারা তাদের মহৎ কর্তব্য সম্পাদন করে ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন। স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে আজ আমাদের জীবন দেয়ার পালা। বাংলাদেশের লড়াকু জনগনকে ২০১৮ সালের মধ্যে ফ্যাসিবাদ এবং দিল্লির আধিপত্যবাদকে পরাজিত করার শপথ গ্রহনের আহবান জানিয়ে প্রথম কিস্তি শেষ করছি।

২৩ মার্চ ২০১৮ (সম্পাদক, দৈনিক আমার দেশ)

Comments

comments