মাহিকে একা করে আবিদের পাশে আফসানা

বাবা-মার সঙ্গে মাহি, এই ছবি এখন শুধুই স্মৃতি

সন্তান-সংসার ফেলে স্বামী আবিদ সুলতানের কাছে চলে গেছেন আফসানা খানম। শুক্রবার বিকেলে রাজধানীর বনানী সামরিক কবরস্থানে স্বামীর পাশে অন্তিম শয্যায় শায়িত হয়েছেন তিনি।

তাদের ১৫ বছর বয়েসী ছেলে তানজিদ সুলতান মাহি মাত্র ১১ দিনের ব্যবধানে বাবা ও মাকে হারিয়ে স্তব্ধ-নিরব। শোকে পাথর মাহির চোখে নেই অশ্রুও।

গত ১২ মার্চ নেপালের কাঠমান্ডুতে বিধ্বস্ত ইউএস-বাংলার উড়োজাহাজের প্রধান পাইলট ছিলেন ক্যাপ্টেন আবিদ সুলতান। পরের দিন চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয় বিমানবাহিনীর সাবেক এই বৈমানিকের।

স্বামী হারানোর শোক সইতে না পেরে গত শনিবার অসুস্থ হয়ে পড়েন আফসানা খানম। এরপর সোমবার থেকে লাইফ সাপোর্টে বাঁচিয়ে রাখা হয়েছিল তাকে। শুক্রবার ভোরে ‘কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট’ বাঁচার সম্ভাবনাকেও শেষ করে দেয়। মৃত্যু হয় স্বামী অন্তঃপ্রাণ আফসানার।

ফেসবুকের পাতায় এখনও রয়েছে আবিদ-আফসানা দম্পতির ছবি। পারিবারিক আয়োজনে তাদের বিয়ে হয়েছিল ১৭ বছর আগে। তাদের স্বজনরা জানান, দুজনের পারস্পরিক ভালোবাসা ছিল বাকি দম্পতির জন্য উদাহরণ। পাইলটের চাকরি বলে, আবিদকে দেশে-বিদেশে থাকতে হতো। সংসারকে নিজের হাতে সাজান আফসানা। আবিদও স্ত্রীর প্রতি ছিলেন খুবই যত্নশীল। স্বামীর মৃত্যু তাই কিছুতেই মানতে পারেননি আফসানা।

আবিদের মরদেহ দেশে ফেরার দু’দিন আগে গুরতর অসুস্থ হয়ে পড়েন তার স্ত্রী। গত ছয় দিন ঢাকার ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরো সায়েন্সেস অ্যান্ড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন আফসানা।

হাসপাতালের যুগ্ম পরিচালক অধ্যাপক বদরুল আলম সাংবাদিকদের বলেন, চিকিৎসকরা সম্ভাব্য সকল চেষ্টা করেছেন আফসানাকে সারিয়ে তোলার। দুই দফা মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণের (স্ট্রোক) পর শুক্রবার ভোরে তার কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হয়। এরপর আর কিছু করার ছিল না।

সকাল সাড়ে ৯টার দিকে আফসানাকে মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসকরা। তারা জানিয়েছেন, আফসানার মস্তিষ্কে প্রথমে মাইনর (মৃদু) পরে সিভিয়ার (গুরতর) স্ট্রোক হয়। দু’দফা তার মস্তিষ্কে অস্ত্রোপচারও করা হয়েছিল।

আফসানার মৃত্যুর খবরে স্বজনরা হাসপাতালে ছুটে আসেন। সেখানে সৃষ্টি হয় আবেগঘন পরিবেশ।

আফসানার চাচা ইয়াদ আলী সাংবাদিকদের জানান, ভোরেই তারা খবর পান তার ভাতিজির অবস্থা ভালো নয়। মায়ের অন্তিম মুহূর্তে মাহিও ছিল হাসপাতালে। পরিবারের অন্য সদস্যরা শোকে মাতম করলেও মাহি ছিল নিরব। শোকস্তব্ধ এ কিশোরের চোখে অশ্রু নয়, ছিল বিহ্বলতার ছায়া।

আফসানার ফুফাতো ভাই খন্দকার রেজাউল করিম বলেন, ‘মাহি একেবারেই চুপচাপ। তাই তাকে নিয়ে ভয়। কাঁদলে মন হালকা হতো। কিন্তু কথাই বলছে না ক’দিন আগের প্রাণচঞ্চল কিশোর মাহি।’

আফসানার মৃত্যুতে হাসপাতালে সাংবাদিকদের ভিড় তৈরি হয়। অনেকেই মাহির বক্তব্য জানার চেষ্টা করেন। আবিদ সুলতানের ভাই খুরশিদ মাহমুদ পরিবারের এ কঠিন সময়ে তাদের প্রচারের আলো থেকে দূরে রাখতে গণমাধ্যমকে অনুরোধ করেন।

এদিকে, মাহির পাশে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে ইউএস-বাংলা কর্তৃপক্ষ।

হাসপাতাল থেকে আফসানার মরদেহ উত্তরার ১৩ নম্বর সেক্টরের ১৮ নম্বর রোডের ৩৮ নম্বর ভবনের বাসায় নেওয়া হয়। এ ভবনের তৃতীয় তলায় স্বামী, সন্তানকে নিয়ে সুখের সংসার ছিল তার। বাদ আসর জানাজা শেষে বনানীতে স্বামীর কবরের পাশে তাকে দাফন করা হয়।

Comments

comments