রাখাইনে গণহত্যা, নীরব বিশ্ব

তালেব রানা

মিয়ানমারের রাখাইনে নৃশংসতার কারণে সৃষ্ট রোহিঙ্গা সংকটের ছয় মাস পেরিয়ে গেছে। সেনাবাহিনীর হত্যাযজ্ঞ ও নৃশংসতার মুখে প্রায় সাত লাখ রোহিঙ্গা পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। হাজার হাজার রোহিঙ্গা মিয়ানমারের সেনা ও স্থানীয় মিলিশিয়ার হাতে নিহত হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে ব্যাপক হারে নারী ও কিশোরীদের ধর্ষণের। সবচেয়ে বড় অভিযোগ গণহত্যার। যা সম্প্রতি সময়ে অনেকবারই উচ্চারিত হয়েছে রোহিঙ্গা ট্রাজেডির ভয়াবহতা বোঝাতে।

সম্প্রতি জাতিসংঘের মানবাধিকার প্রধান জেইদ রা’দ আল-হুসেন বলেছেন, গত আগস্টের পর মিয়ানমারের রাখাইনে সংখ্যালঘু মুসলিম রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে গণহত্যা চালানো হয়েছে। অপরাধের প্রমাণ নষ্ট করতে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে গণকবরগুলো বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দিয়েছে। এখনো রাখাইনে অব্যাহত রয়েছে নিধনযজ্ঞ। পরিকল্পিত সহিংসতার মাত্রা কমলেও এখনো পালিয়ে যাচ্ছে রোহিঙ্গারা। না খেয়ে থাকতে বাধ্য করা হচ্ছে যাতে রোহিঙ্গারা দেশ ছেড়ে পালিয়ে যায়। তিনি গণহত্যার অভিযোগ তদন্তে পর্যবেক্ষকদের প্রবেশাধিকার দিতে মিয়ানমারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, মিয়ানমার যদি রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে চালানো অপরাধ মিথ্যা প্রমাণ করতে চায় তবে আমাদের রাখাইনে যেতে দেওয়া হোক। একইসঙ্গে এই অপরাধের বিচারের জন্য বিষয়টি আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে পাঠানোর আহ্বান জানিয়েছেন।

জাতিসংঘ নিযুক্ত মিয়ানমারের মানবাধিকার বিষয়ক বিশেষ দূত ইয়াংহি লি বলেছেন, রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ওপর চালানো নিধনযজ্ঞে গণহত্যার অনেক লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। সেখানে তদন্ত হওয়া জরুরি। সম্প্রতি জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলে পেশ করা প্রতিবেদনে ইয়াংহি লি আরো বলেছেন, রাখাইনে নৃশংসতার জন্য দায়ীদের পাশাপাশি নিধনযজ্ঞ বন্ধে হস্তক্ষেপ না করা, নিন্দা না জানানোয় দেশটির সরকারে থাকা নেতৃত্বকে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে।

সম্প্রতি বাংলাদেশ সফরকালে শান্তিতে নোবেলজয়ী তিন নারী বলেছেন, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর গণহত্যা চালানোর জন্য দায়ী মিয়ানমার কর্তৃপক্ষকে অবশ্যই বিচারের মুখোমুখি করতে হবে। এই বিষয়টিতে বিশ্ব সম্প্রদায়ের নীরবতায় বিস্ময় প্রকাশ করেন নোবেল বিজয়ী আয়ারল্যান্ডের ম্যারেইড ম্যাগুয়ার, ইরানের শিরিন এবাদি ও ইয়েমেনের তাওয়াক্কল কারমান। এই নোবেল জয়ী নারীরা মনে করেন, গণহত্যার সংজ্ঞায় যা যা বলা আছে তার সবকিছুই ঘটেছে রোহিঙ্গাদের সঙ্গে। টার্গেট করে নারীদের ধর্ষণ করা হয়েছে। গুলি করে, ধারালো অস্ত্র দিয়ে, গলা টিপে হত্যা করা হয়েছে মানুষকে। গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে। পুরো জনগোষ্ঠীকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে। এগুলো গণহত্যা ছাড়া কিছু নয়।

তবে মিয়ানমার বরাবরই এই অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। গত বৃহস্পতিবার দেশটির মিয়ানমারের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা থাউং তুন বলেছেন, জাতিগত নিধনযজ্ঞ এবং গণহত্যার অভিযোগ খুবই গুরুতর এবং এটা হাল্কাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। তবে রাখাইনে সংখ্যালঘু মুসলিমদের বিরুদ্ধে জাতিগত নিধন ও গণহত্যার অভিযোগের পক্ষে সুস্পষ্ট প্রমাণ দেখতে চায় মিয়ানমার। রাখাইনে এ ধরনের অপরাধ হয়েছে কিনা সে সিদ্ধান্তে আসার আগে আমাদের উচিত বাস্তবে কি হয়েছে সেটা দেখে নেওয়া।

রোহিঙ্গা সংকটের সমাধানে কয়েকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। এর মধ্যে নৃশংসতার জন্য দায়ীদের বিচার, রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন, সেখানে দশকের পর দশক ধরে চলা জাতিগত বিরোধ নিরসনে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ। বিশেষ করে জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনানের নেতৃত্বাধীন কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন তারা।

রোহিঙ্গা মানবাধিকার কর্মী রো সায় স্যান লিন সম্প্রতি বলেছেন, গণহত্যার জন্য দায়ীদের আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে নেওয়ার বিষয়ে জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিলের এই ঘোষণা অনেক দেরিতে এসেছে। চলমান গণহত্যা বন্ধে আন্তর্জাতিক আদালতে মিয়ানমারের নেতাদের বিচার করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমরা মিয়ানমারের সেনাপ্রধান সিনিয়র জেনারেল মিন অং হ্লেয়ং এবং কার্যত সরকার প্রধান অং সান সু চিকে হেগের আদালতে দেখতে চাই। কিন্তু এখনই গণহত্যার জন্য মিয়ানমারের দায়ীদের আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে বিচার কঠিন। কারণ আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে বিচারের জন্য আন্তর্জাতিক সনদে মিয়ানমার সই করেনি। তবে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ চাইলে বিষয়টি আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে তুলতে পারে। সুদানের ক্ষেত্রে এমনটাই হয়েছিল। যদিও নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য চীন ও রাশিয়া এখনো মিয়ানমারের দিকে ঝুঁকে রয়েছে। যে কারণে সহসাই মিয়ানমারের ক্ষেত্রে এমনটা হওয়া কঠিন।

রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে ইতোমধ্যে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার চুক্তি করেছে। তবে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া এখনো শুরু হয়নি। জাতিসংঘসহ বিভিন্ন সংস্থা এবং যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশ বলছে, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের মতো উপযুক্ত পরিবেশ এখনো রাখাইনে তৈরি হয়নি। জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআর প্রত্যাবাসন শুরুর আগে রাখাইন পরিদর্শনে যাওয়ার দাবি জানিয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরুর আগে পরিবেশ পর্যবেক্ষণ জরুরি। নইলে নতুন করে সংঘাতের সম্ভাবনা থেকেই যাবে।

সম্প্রতি নিউইয়র্ক টাইমসের এক নিবন্ধে বলা হয়েছে, টালমাটাল বিশ্ব পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র তার আগের ভূমিকা থেকে পিছিয়ে গেছে। সিরিয়া, ইয়েমেনের মতো মিয়ানমারের মানবিক সংকটেও যুক্তরাষ্ট্রের কার্যকর কূটনৈতিক তত্পরতার অভাব রয়েছে। তিন দশকের বেশি সময় ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা মিয়ানমারের গণতন্ত্রের দাবিতে একজোট ছিল। রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে নিধনযজ্ঞ বন্ধে এবং এই সংকটের স্থায়ী সমাধানে যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য দেশের একই ধরনের পদক্ষেপ ও সহায়তা জরুরি। অবশ্যই যুক্তরাষ্ট্রকে গণহত্যার তদন্তের দাবিকে সমর্থন দিতে হবে। মিয়ানমারের দীর্ঘদিনের জাতিগত বিরোধ নিষ্পত্তি, আনান কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়ন, রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব প্রদানের ক্ষেত্রে অবশ্যই যুক্তরাষ্ট্রকে জোর কূটনৈতিক উদ্যোগ নিতে হবে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য রোহিঙ্গা সংকটে নীরব থাকার সময় শেষ হয়েছে।

Comments

comments