ইউরোপের এখনই সময় ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেওয়ার

সু্ইডেনের দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে ইউরোপীয় দেশগুলোর উচিত এখনই ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের ধারণাকে সমর্থন করা। ইউরোপের দেশগুলো বরাবর এর পক্ষে থাকলেও সুইডেন ও হাতে গোনা কয়েকটি দেশ ছাড়া অন্যদের জোরালো ভূমিকায় দেখা যায়নি। গত বছর ৬ ডিসেম্বর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জেরুসালেমকে ইসরাইলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার পর এ বিষয়ে ইউরোপের কোন দেশই তাতে মেলায়নি।

বহির্বিশ্বে ইইউকে কূটনৈতিকভাবে তুলে ধরার ক্ষেত্রে ফ্রান্স এখন অগ্রণী অবস্থানে। গত মাসে দেশটির তরুণ প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোন জানিয়ে ছিলেন যে, তার দেশ এখনই ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেবে না। এ থেকে ধারণা করা যায়, ফিলিস্তিনিদের পক্ষে ইউরোপে আপাতত কোন জোয়ার সৃষ্টি হচ্ছে না। অন্তত নিকট ভবিষ্যতে সেরকম সম্ভাবনা নেই। সুইডেন ২০১৪ সালে ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দিয়েছিল। এরপর দ্বিতীয় দেশ হিসেবে স্লোভেনিয়ার নাম শোনা গেলেও সেদেশের প্রেসিডেন্ট সম্প্রতি বলেছেন, ওই স্বীকৃতি দেয়ার সময় এখনও আসেনি। ইউরোপের কয়েকটি দেশ অনেক আগে এ ব্যাপারে এগিয়ে এসেছিল। যেমন সাইপ্রাস ও মালটার কথা বলা যায়। দেশ দুটো ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগ দেয়ার আগে ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দিয়েছিল। স্বীকৃতি দিয়েছিল চেক রিপাবলিকও। মধ্য ইউরোপীয় দেশটি তখন সোভিয়েত ব্লকে ছিল। বর্তমানে চেক রিপাবলিক ইউরোপে ইসরাইলের অন্যতম ঘনিষ্ঠ মিত্র। এ তালিকায় আইসল্যান্ড, আলবেনিয়া, সার্বিয়া, মন্টেনিগ্রো, ইউক্রেন ও ভ্যাটিকানের নামগুলো উল্লেখ করা যায়। এরা ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিয়েছে, যদিও দেশগুলো ইইউর সদস্য নয়।

বর্তমান প্রেক্ষাপটে সুইডেনের স্বীকৃতি বিশেষ গুরুত্ববহ। চার বছর আগে দেশটি এই সাহসী পদক্ষেপ গ্রহণের পর ইসরাইল আশঙ্কা করেছিল ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড নিজেদের জবর দখলে রাখার তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হতে পারে। বাস্তবে সে রকম কিছু ঘটেনি। তবে সুইডেনের ওই স্বীকৃতি ইউরোপের বুকে ফিলিস্তিনিদের আত্ম নিয়ন্ত্রণের অধিকার ইস্যু একটি অবস্থান তৈরি করতে পেরেছে। যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, আয়ারল্যান্ড, স্পেন, পর্তুগাল, বেলজিয়াম ও ইতালির মতো ইইউর গুরুত্বপূর্ণ সদস্যগুলোর পার্লামেন্ট পর্যন্ত বিষয়টি গড়িয়েছে। ফিলিস্তিনিদের প্রতি সমর্থন অব্যাহত রাখা এবং নিজ নিজ সরকারকে তাদের রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেয়ার আহ্বান জানিয়ে পার্লামেন্টগুলোতে প্রস্তাব পাস হয়েছে। বিষয়টি প্রতীকী হলেও ফিলিস্তিনি অধিকার আন্দোলনের প্রতি তা ইতিবাচক হওয়ায় কঠোর প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে ইসরাইল। ইইউর উদ্দেশ্য পাঠানো কূটনৈতিক বার্তায় দেশটি বলেছে, এই স্বীকৃতি অসময়োচিত, এর পরিণাম হতে পারে হিতে বিপরীত এবং শান্তি প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখতে হলে ইউরোপের দেশগুলোর উচিত হবে না এতে নাক গলানো। ইসরাইলের উদ্দেশ্য ছিল ইউরোপের অন্য দেশগুলো যেন সুইডেনের উদাহরণ অনুসরণ করে ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিয়ে না বসে, এ ব্যাপারে তারা সফল হয়েছে বলা যায়। সুইডেনের বিরুদ্ধে তারা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়ার কথা চিন্তাভাবনা করছেন বলে জেরুসালেমে ইসরাইলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলেছেন। তেল আবিব ইতোমধ্যেই সুইডিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্গোট ওয়ালস্ট্রমের বিভিন্ন বিবৃতি নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টির চেষ্টা করেছে। এর মাধ্যমে ইইউর অন্য দেশগুলোকে একটি কড়া বার্তা দিয়েছে। ২০১৫ সালের নভেম্বরে প্যারিসে সন্ত্রাসী হামলার পর ওয়ালস্ট্রম মন্তব্য করেছিলেন, ইসরাইল-ফিলিস্তিন সংকট দীর্ঘদিন জিইয়ে রাখা মুসলিম তরুণদের চরমপন্থায় দীক্ষিত হওয়ার অন্যতম কারণ। এর পরের মাসে তিনি ফিলিস্তিনিদের বিচার বহির্ভূত হত্যা না করার জন্য ইসরাইলের প্রতি আহ্বান জানান। ইসরাইল তাত্ক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় তাকে ‘অবাঞ্ছিত’ ঘোষণা করে। যে কোন নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষকই একথা বলবেন যে, ইসরাইলের প্রতি বিদ্বেষের বশবর্তী হয়ে ওয়ালস্ট্রম ওই মন্তব্য করেননি বরং বাস্তবতার আলোকেই তিনি ওই কথা বলেছেন। ইউরোপের অনেক নেতৃবৃন্দ বিভিন্ন সময়ে এ ধরনের মন্তব্য করেছেন। কিন্তু ইসরাইল ওয়ালস্ট্রমকে টার্গেট করে কূটনৈতিক লড়াই শুরু করে। ওয়ালস্ট্রমের ওই মন্তব্যের দিন কয়েক পরই রুশ পররাষ্ট্র উপমন্ত্রী মিখাইল বোগদানভ বলেন যে, হামাস ও হিযবুল্লাহ সন্ত্রাসী সংগঠন নয় বরং এরা মধ্যপ্রাচ্যের বৈধ আর্থ-সামাজিক শক্তি। ইসরাইল তার এই মন্তব্যের কোন প্রতিক্রিয়া দেখায়নি।

ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ ১৯৯০ এর দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির দাবিতে একটু একটু করে অগ্রসর হয়েছে। উল্টোদিকে ঠিক এই সময়টিতে ইউরোপ এ থেকে নিজেদের একটু একটু করে গুটিয়ে নিয়েছে। ৯৩ সালে অসলো শান্তি চুক্তির পর এ নিয়ে তাদের যথেষ্ট সরব থাকতে দেখা যায়নি। ইইউর দেখা দেখি জাতিসংঘ, বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ একই রকম গা ছাড়া ভাব দেখিয়েছে। ১৯৯৯ সালে ইইউর বার্লিন ঘোষণায় বলা হয়েছিল, ‘যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে পর্যায়ক্রমে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেয়া হবে।’ ১১ বছর পর ২০১০ সালে প্রায় একই কথার পুনরাবৃত্তি করে বলে যে ‘যথাসময়ে’ কাজটি করা হবে। সম্প্রতি ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস ব্রাসেলসে বিষয়টি উত্থাপন করলে ইইউ কূটনীতিকরা তাকে বলেন, ‘ফিলিস্তিনিকে স্বীকৃতির বিষয়টি প্রত্যেকটি দেশের সরকারের পৃথক সিদ্ধান্তের বিষয়, ইইউ সামগ্রিকভাবে কিছু করতে পারে না।’ ধারণা করা হচ্ছে সুইডেনের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে ইউরোপের অন্য দেশগুলো ফিলিস্তিনিদের পক্ষে এগিয়ে আসছে না। বিষয়টি আরও কঠিন হতে পারে কারণ ট্রাম্প প্রশাসন ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের ধারণা থেকে সরে এসেছে। ওয়াশিংটন এখন দুই রাষ্ট্র সমাধানের কথাও বলছে না। ট্রাম্প প্রশাসনের কথা ফিলিস্তিনিরা কিছু পেতে চাইলে ইসরাইলের সঙ্গে আলোচনা করেই তা আদায় করে নিতে হবে। অথচ যুক্তরাষ্ট্র দশকের পর দশক ধরে ইসরাইল-ফিলিস্তিন বিবাদ বাহ্যত নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করে এসেছিল।

Comments

comments