গুন্ডামি : প্রক্টর মাহবুব দেখালেন, শেখালেন…

নাঈম আব্দুল্লাহ

মাত্র ক’মাস আগেই ইবির প্রক্টর মাহবুবর রহমান পত্রিকার শিরোনাম হয়েছিলেন। পত্রিকার শিরোনাম ছিল ‘কাল সকালে লাশ পাওয়া যাবে।’ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের দোকানদার ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের এভাবেই সেদিন হুমকি দিয়েছিলেন প্রক্টর ড. মাহবুবর রহমান। নামের আগে শুধু ড. নয়, তিনি ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং (ইইই) বিভাগের একজন প্রফেসরও বটে। কিন্তু প্রফেসর হলেও তিনি শিক্ষতার চেয়ে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে গুন্ডামিতেই অনেক বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। তার বিরুদ্ধে রয়েছে নিয়োগ বাণিজ্যের অভিযোগও। গত বছরের অক্টোবর মাসে প্রক্টর মাহবুবর রহমানের বিরুদ্ধে দুদকেও লিখিত অভিযোগ জানিয়েছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রগতিশীল শিক্ষক সমাজ। অর্থ আত্মসাৎ ও নিয়োগ বাণিজ্যের দুর্নীতি দমনে দুদক চেয়ারম্যানের হস্তক্ষেপ কামনা করে তারা লিখিত অভিযোগপত্র দাখিল করেছিলেন। কিন্তু প্রক্টর মাহবুব এর অদৃশ্য ক্ষমতায় দুদককে এখনও পর্যন্ত কোন পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি।

ছাত্রলীগ নেতাদের সাথে প্রক্টর মাহবুব

গত ৯ বছরে বহুবার খবরের শিরোনাম হয়েছেন প্রক্টর মাহবুব। যার অধিকাংশই নেতিবাচক শিরোনাম। ক্যাম্পাসে অরাজকতা সৃষ্টিকারী ছাত্রলীগ সন্ত্রাসীরা তার ছত্রছায়ায়ই বিভিন্ন সময় বিভিন্ন অপকর্মে জড়াচ্ছে বলে মনে করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়র শিক্ষকরা। ছাত্রলীগকে ব্যবহার করে ভিসি, প্রো-ভিসি থেকে শুরু করে প্রবীণ শিক্ষকদেরও তিনি নিয়মিত হুমকি ধামকি দিয়ে থাকেন। দীর্ঘদিন পর্যন্ত ক্যাম্পাসে সহাবস্থানের ইতিহাস থাকলেও দলীয় প্রভাব খাটিয়ে এখন ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছেন তিনি। ছাত্রলীগের অছাত্র ও বহিরাগত সন্ত্রাসীদের হলে আশ্রয় দেয়ার মাধ্যমে পড়াশুনার পরিবেশ ধ্বংস করার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। হলে আশ্রয় নেয়া এসব সন্ত্রাসীরা হলে মাদকের হাট খুলে বসেছে বলে জানা যায়। অবশ্য মিডিয়া কর্মীদের আইওয়াশ করতে এরই মধ্যে হলে আশ্রয় নেয়া এক মাদকব্যবসায়ী ছাত্রলীগ নেতাকে পুলিশের হাতে তুলে দেন তিনি। এসব মাদকব্যবসায়ী ও মাদকসেবীরা মাঝে মধ্যেই উত্যক্ত করছে বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত ছাত্রীদের। বরাবরের মতই গত দু’দিন আগে তিনি ফের সংবাদের শিরোনামে এসেছেন প্রক্টর মাহবুব। কিন্তু এবার আসলেন ভিন্ন চেহারায়, ভিন্ন ভঙ্গিতে।

‘ক্যাম্পাসে ডিবি পুলিশ এসেছে দেখেছ? এক্ষুণি ধরিয়ে দেব কিন্তু। কাল সকালে লাশ পাওয়া যাবে’ এমন হুমকি দিয়ে খবরের পাতায় জায়গা করে নিলেও এবার বাস্তবে পুলিশকে কাজে লাগিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীকে তুলে নিয়ে গিয়ে নির্মম নির্যাতন চালিয়েছেন প্রক্টর মাহবুব। টানা ৫ দিন থানায় বন্দী করে রেখে মানসিক নির্যাতন চালানো হয় আরবি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের মেধাবী ছাত্র আহমাদ শাহ মাসউদের ওপর। এমন অমানবিক কাজ করে তিনি শিক্ষকতার মত মহান পেশাকে কলঙ্কিত করেছেন বলেই মনে করি। গুম-খুনের রাজনীতিতে বর্তমান সরকার বাকশালের ভয়াবহতাকে হার মানিয়েছে ঠিক। তবে শিক্ষক হয়ে শিক্ষার্থীকে জিম্মী বা গুম করার মত ঘটনা শুধু বাংলাদেশ নয় বিশ্বে বিরল।

গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ থেকে জানা যায়, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাম্বুলেন্সে হামলা ও ডাকাতির ঘটনায় চালক ও ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীদেরকে প্রক্টর প্রফেসর ড. মাহবুবর রহমান তার অফিসে ডেকে পাঠান। প্রক্টর চালক ও শিক্ষার্থীদের থানায় পাঠান। সেখানে ঘটনার বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে একজন (মাসউদ) বাদে সবাইকে ছেড়ে দেয়া হয়। মাসুদকে ছাড়া অন্যরা আসতে না চাইলে পুলিশের সাথে শিক্ষার্থীদের বাকবিতণ্ডা হয়। তাকে কেন রাখা হচ্ছে জানতে চাইলে, শৌলকূপা থানা কর্তৃপক্ষ জানায়- বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরের নির্দেশনায় তাকে রাখা হচ্ছে। অথচ আটক মাসউদ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের নির্দেশেই ভূক্তভোগী একজন হিসেবেই থানায় গিয়েছিল। টানা চারদিন থানায় আটকে রেখে তাকে বিভিন্ন ভাবে নির্যাতন করা হয়। দেয়া হয় প্রাণ নাশের হুমকিও। গভীর রাতে গাড়িতে করে ঘুরিয়ে ছাত্রশিবিরের নেতাদের ধরিয়ে দেয়ার জন্য চাপ প্রয়োগ করা হয়। অন্যথায় হত্যার ইঙ্গিত দেয়া হয়। আর পুলিশের ভাষ্যমতে, এসব কিছুই হয় প্রক্টর মাহবুবের প্রত্যক্ষ নির্দেশে।

এদিকে ঘটনার দিন আরবি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হলে প্রক্টর আশ্বস্ত করে বলেন, মাসউদের কোনো সমস্যা নেই। অধিক জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তাকে রাখা হয়েছে। বিষয়টি আমার নজরেও আছে। আপনারা টেনশন করবেন না। সে তো আমারও শিক্ষার্থী।’ এদিকে ঘটনার চার দিনের মাথায় শনিবার মাসউদের পরীক্ষা থাকায়, প্রশাসনের দায়িত্বে তাকে ক্যাম্পাসে আনা হয়। এ সময় কথা হয় ক্যাম্পাসে কর্মরত এক সাংবাদিকের সাথে। অবস্থা জানতে চাইলে মাসউদ প্রথমে কেঁদে ফেলে। তারপর ওই সাংবাদিককে জানায়, ‘আমাকে চোখ বেঁধে পুলিশ বিভিন্ন স্থানে নিয়ে গেছে।’ মাসউদ জানায়, ‘প্রথম থেকেই পুলিশ তার কাছে অ্যাম্বুলেন্সে হামলার বিষয়ে স্বীকারোক্তি আদায়ের জন্য বিভিন্নভাবে চাপ দিচ্ছে। তাছাড়া স্বীকারোক্তি দিলে ছেড়ে দেয়ার আশ্বাস দিয়েছে তারা।’

বেআইনীভাবে পুলিশের হাতে
৫ দিন আটক থাকা ইবি ছাত্র আহমাদ শাহ মাসুদ

মাসউদের ভাষ্য মতে, ‘পুলিশ জোর করে স্বীকারোক্তি দিতে বলছে যে, অ্যাম্বুলেন্সে হামলার ঘটনায় হাদি ও শাহজালাল জড়িত। তুই বলবি যে, হামলার সময় অ্যাম্বুলেন্সের আলোতে তাদের দুইজনকে দেখা গেছে। পুলিশ আমাকে বলে, ‘শনিবার তোকে পরীক্ষা দিতে সুযোগ দেবো। তবে তুই পরীক্ষা দিয়ে এসে হামলার সাথে হাদি ও শাহজালাল জড়িত এটা স্বীকার করবি।’ তারা বলেছে, ‘তোরে আমরা বাঁচিয়ে দেবো, শুধু যা বলবো তা স্বীকার করবি।’

হাদি ও শাহজালাল যথাক্রমে ইবি শিবিরের সভাপতি ও সেক্রেটারি। বিরোধী মতের শিক্ষার্থীদের কোন প্রকার উস্কানি ছাড়াই হলছাড়া করেই ক্ষান্ত হননি প্রক্টর মাহবুব। তাদের নামে মিথ্যা মামলা সাজাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন মেধাবী শিক্ষার্থীকে কৌশলে অপহরণ ও গুম করে জোরপূর্বক স্বীকারোক্তি আদায়ের চেষ্টা করে সত্যিই তিনি নজির স্থাপন করেছেন। তিনি শেখালেন দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠের শিক্ষক হয়েও কিভাবে অপরাজনীতি করা যায়। কিভাবে ভিন্নমত দমনে একের পর এক নাটক মঞ্চায়ন করতে হয়। কিভাবে ঘুম কেড়ে নিতে হয় শিক্ষার্থীর পরিবারের! দেখালেন তিনি, শেখালেনও বটে।

প্রক্টর মাহবুবের এ ঘৃণ্য আচরণ শিক্ষক সমাজকে, জাতিকে কতটুকু লজ্জিত করেছে তা সময় বলে দেবে। কিন্তু এমন গুন্ডা ধরণের একজন মানুষ কিভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হতে পারলেন, কারা এমন মানবতাবিরোধীকে নিয়োগ দিলেন তা অবশ্যই খতিয়ে দেখা দরকার। (অবশ্য এর আগে ইবির আওয়ামী পন্থী শিক্ষকদের ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদকের কাছে অস্ত্র প্রশিক্ষণ নিতেও দেখা গেছে।) সেই সাথে দুর্নীতির সাথে সরাসরি জড়িত থাকার প্রমাণ থাকার পরেও দুদক তাকে শাস্তি না দিলেও অন্তত দেশপ্রেমিক ঘোষণা তো করতেই পারে। এতে বিলম্ব করা এমন মহান(!) শিক্ষকের সাথে অন্যায় করা হবে বলে মনে করি।

Comments

comments