রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার আল্লামা সাঈদী

সংবাদ ডেক্স: কথিত যুদ্ধাপরাধের মামলায় অভিযুক্ত আল্লামা সাঈদীকে বিনা অপরাধেই শুধুমাত্র রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে বন্দী রাখা হয়েছে বলে মনে করেন দেশের আইনজ্ঞ ও সাধারণ মানুষ। এমনকি আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে সব অভিযোগ থেকে খালাস দিয়েছিলেন সদ্য বিদায়ী ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি মো: আবদুল ওয়াহ্হাব মিঞা। আপিল আবেদনের লিখিত রায়ে বিচারপতি ওয়াহ্হাব মিঞা বলেছিলেন, ‘রাষ্ট্রপক্ষ মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে আনীত কোনো অভিযোগ প্রমাণ করতে পারেনি। আসামি পক্ষ সফলভাবে প্রমাণ করতে পেরেছে তিনি রাজাকার বাহিনী এবং শান্তি কমিটির সদস্য ছিলেন না ও কোনো অপরাধ করেননি। আসামি পক্ষ আরো প্রমাণ করতে পেরেছে যে, ঘটনার সময় তিনি পিরোজপুর ছিলেন না, যশোর ছিলেন।’

বিচারপতি আবদুল ওয়াহ্হাব মিঞা তার রায়ে আরও লিখেছেন- ‘১৯৭১ সালে তিনি রাজাকার বাহিনী ও শান্তি কমিটির সদস্য ছিলেন এবং এ হিসেবে তিনি বিভিন্ন অপরাধ করেছেন মর্মে যে অভিযোগ আনা হয়েছে তা প্রমাণের দায়িত্ব ছিল রাষ্ট্রপক্ষের। কিন্তু তারা তা প্রমাণ করতে পারেনি।’

এ রায়ে তিনি আসামি পক্ষের আপিল আবেদন গ্রহণ করে আল্লামা সাঈদীকে সব অভিযোগ থেকে বেকসুর খালাস দিয়ে নির্দোষ ঘোষণা করেন।

এছাড়াও আল্লামা সাঈদীর বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ আনা হয়েছে তা মিথ্যা, বানোয়াট এবং রীতিমত ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছেন তার আইনজীবিরা। এ কথা এখন অনেকটাই প্রমাণিত সত্য যে, নৈতিক স্খলনের কারণে দেশ থেকে পালিয়ে যাওয়া জুডিশিয়াল কিলার সুরেন্দ্র কুমার সিনহা ওরফে সিনহা বাবু ও শামসুদ্দিন চৌধুরি মানিক কোন প্রকার প্রমাণ ও সত্যতা ছাড়াই সরকারি নির্দেশে দৈব অভিযোগের ভিত্তিতে আল্লামা সাঈদীকে অন্যায়ভাবে সাজা দিয়েছে।

২০১৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি নানা বিতর্ক ও কেলেঙ্কারীর জন্মদাতা বিতর্কিত যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালে অন্যায়ভাবে আল্লামা সাঈদীর বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় দেয়া হয়। সেসময় ট্রাইব্যুনালের রায়ে বলা হয়েছিল -“১৯৭১ সালে সংঘটিত হত্যা, লুণ্ঠন, নির্যাতনসহ অন্তত ২০টি মানবতাবিরোধী অভিযোগের মধ্যে আটটি অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে।” প্রশ্ন হচ্ছে যদি সন্দেহাতীতভাবেই এসব অভিযোগ ট্রাইব্যুনালে প্রমাণিত হয়ে থাকে আর তার ভিত্তিতে মৃত্যুদণ্ডই দেয়া যায়, তবে সে সন্দেহাতীত প্রমাণিত রায় উচ্চ আদালতে বেকসুর খালাস পেল কিভাবে?

পুলিশের গাড়িতে লাশের স্তুপ

বিশ্ব বরেণ্য আলেমে দ্বীন আল্লামা সাঈদীর বিরুদ্ধে এ অন্যায় রায় সেদিন দেশের মানুষ মেনে নিতে পারেনি। তারা এ অন্যায়ের বিরুদ্ধে রাজপথে নেমে বিক্ষুব্ধ জনতার ওপর আসলে বর্বর পুলিশ বাহিনী নির্বিচারে গুলি চালায়। এতে সারাদেশে দেড় শতাধিক মানুষ নিহত হয়।

নিরস্ত্র জনতার উপর নির্বিচারে গুলি চালায় পুলিশ

আল্লামা সাঈদীর বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছিল মোট ২০ টি। ট্রাইব্যুনালের দাবি অনুযায়ী এর মধ্যে ৮ অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে। এ রায় দিয়েছিল ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি এটিএম ফজলে কবীর। অভিযোগের মধ্যে দুটি হত্যার অভিযোগে ট্রাইব্যুনাল আল্লামা সাঈদীকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। যার মধ্যে রয়েছে পিরোজপুরে ইব্রাহিম কুট্টি হত্যা এবং বিসা বালি হত্যা।

অথচ এই দুটি মামলাতেই আল্লামা সাঈদীর বিরুদ্ধে কোন প্রমাণ হাজির করতে পারেনি রাষ্ট্রপক্ষ। ইব্রাহিম কুট্টি হত্যা মামলা ইব্রাহীম কুট্টি হত্যার অভিযোগে স্ত্রী মমতাজ বেগম পিরোজপুর আদালতে একটি মামলা করেছিল ১৯৭২ সালে। সে মামলার এফআইআর ও চার্জশীটের সত্যায়িত অনুলিপি (সার্টিফাইড কপি) আদালতে উপস্থাপন করেছিল আল্লামা সাঈদীর আইনজীবিরা। যাতে আল্লামা সাঈদীর কোন নাম-গন্ধও ছিল না। ১৯৭২ সালের মামলায় আল্লামা সাঈদীর নাম না থাকলেও আশ্চার্যজনকভাবে ২০১৩ সালে তিনি কিভাবে আসামী হলেন? কিভাবে তার বিরুদ্ধে এই অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড দেয়া যায় এর কোন সদুত্তর ট্রাইব্যুনাল দিতে পারেনি।

গুম করা হয় গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী সুখরঞ্জন বালীকে

অন্যটি হলো বিশাবালী হত্যার অভিযোগ। বিশাবালীর ভাই সুখরঞ্জন বালী ছিল সরকার পক্ষের সাক্ষী। কিন্তু আল্লামা সাঈদীর বিরুদ্ধে তিনি মিথ্যা ও বানোয়াট সাক্ষী দিতে চাননি বলে সরকারপক্ষ তাকে সাক্ষী তালিকা থেকে বাদ দেয়। আইনজীবিরা এব্যাপারে ট্রাইব্যুনালকে জানিয়ে তাকে হাজির করতে বললে ট্রাইব্যুনাল বলে যে, আমরা কোনো সমন দেবনা আপনারা তাকে আনতে পালে হাজির করুন। তখন আল্লামা সাঈদীর আইনজীবিরা সুখরঞ্জন বালীকে আদালতে সাক্ষী হিসেবে নিয়ে আসে। কিন্তু আদালতে আনার পর সাদা পোশাকের আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাকে ট্রাইব্যুনাল গেট থেকে আইনজীবীর গাড়ী থেকে ছিনিয়ে নেয়। ট্রাইব্রুনালকে এ বিষয়ে জানানো হলেও তখন তারা কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। দীর্ঘদিন পরে ভারতের একটি কারাগারে সুখরঞ্জন বালীর সন্ধান পায় তার পরিবার।

অন্যদিকে ট্রাইব্যুনালে যাওয়ার আগে সুখরঞ্জন বালী দিগন্ত টেলিভিশনে একটি সাক্ষাতকার দিয়েছিল। সে সাক্ষাতকারের ভিডিও ক্যাসেট আইনজীবিরা আদালতে জমা দিয়েছিল। সাক্ষাতকারে সুখরঞ্জনবালী বলেছেন, ‘আমার ভাই হত্যার সঙ্গে সাঈদী সাহেব সম্পৃক্ত নয়। আমি সাঈদী সাহেবকে ভাল ভাবে চিনি। তিনি নির্দোষ।’

বিতর্কিত ট্রাইব্যুনালের এই রায়কে আল্লামা সাঈদীর আইনজীবি ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক অপ্রত্যাশিত বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন- ‘এই রায়টি অবিশ্বাস্য, অপ্রত্যাশিত এবং এই রায়ে আমরা স্তম্ভিত। প্রসিকিউশনের সকল স্বাক্ষ্য-প্রমাণ আমরা মিথ্যা প্রমাণ করতে সমর্থ হয়েছি। তারপরও কেমন করে মাননীয় আদালত এই রায় দিলেন তা আমাদের বোধগম্য নয়, তিনি বলেন।’

আল্লামা সাঈদীর অপর আইনজীবি খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, ‘আমরা বলেছি ট্রাইব্যুনালে যে বিচার হয়েছে তা সম্পূর্ণ আইন বহির্ভূত। এর আগে তিনি স্কাইপ কেলেঙ্কারীর অভিযোগে পদত্যাগ করেছেন, তিনি ১৭ ঘন্টা স্কাইপে কথা বলেছেন, ২১৭টি মেইল আদান প্রাদান করেছেন। এর মাধ্যমে তিনি বিদেশ থেকে এক ব্যাক্তির নির্দেশে বিচার কাজ পরিচালনা করেছেন। যে চার্জ গঠন করা হয়েছে প্রতি চার্জের সঙ্গে বিদেশ থেকে দেয়া ব্যাক্তির নির্দেশের হুবহু মিল রয়েছে। চার্জের সঙ্গে নির্দেশনার অক্ষরে অক্ষরে মিল রয়েছে। একারণে এ বিচার পক্ষপাতদুষ্ট। বিচারক নিরপেক্ষতা হারিয়েছিলেন। ’

রাষ্ট্রপক্ষের এত গোঁজামিল ও অসঙ্গতি থাকার পরেও বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক উচ্চ আদালতেও আল্লামা সাঈদীর মৃত্যুদণ্ডের পক্ষে রায় দেয়। তবে বিচারপতি মো. মোজাম্মেল হোসেন, তৎকালীন প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা ও বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকীর মতামতে সংখ্যাগরিষ্ঠতার অজুহাত দেখিয়ে আমৃত্যু কারাদণ্ডের রায় দেয়া হয়।

মিথ্যাচার, গোঁজামিল, অসঙ্গতি আর খোড়া সব যুক্তির কারণে আল্লামা সাঈদীকে কোনভাবেই দোষী সাব্যস্ত করার সুযোগ ছিল না। কিন্তু সর্বশেষ আল্লামা সাঈদীর পক্ষে করা রিভিউ খারিজের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়ে যায়- অপরাধ নয়, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও জিঘাংসার শিকার হয়েছেন তিনি। বিচারের নামে বিশ্ব বরেণ্য মুফাসসিরে কুরআন ও জননন্দিত রাজনীতিক আল্লামা সাঈদীর সাথে যে প্রহসন করা হয়েছে তা সত্যিই নির্লজ্জভাবে বিচার বিভাগকে কলঙ্কিত করেছে।

হাসান হাফিজুর রহমান সম্পাদিত বাংলাদেশ তথ্য মন্ত্রণলায় কর্তৃক প্রকাশিত বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ দলিলপত্র

উল্লেখ্য, হাসান হাফিজুর রহমান সম্পাদিত বাংলাদেশ তথ্য মন্ত্রণলায় কর্তৃক প্রকাশিত বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ দলিলপত্র বইয়ে বাংলাদেশের অন্যান্য জেলার মতো পিরোজপুর জেলার মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন ঘটনা, ক্ষতিগ্রস্তদের নাম, স্বাধীনতাবিরোধীদের নাম এবং তাদের কর্মকাণ্ডের অনেক বিবরণ রয়েছে। কিন্তু এই বইয়ের কোথাও আল্লামা সাঈদীর নাম নেই। পিরোজপুর জেলা পরিষদ কর্তৃক পিরোজপুর জেলার ইতিহাস নামক বইতে পিরোজপুর জেলার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বর্ণনার পাশপাশি মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষ শক্তি, রাজাকার, শান্তি কমিমিটির লোকজনের তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। কিন্তু এসব তালিকার কোথাও আল্লামা সাঈদীর নাম নেই। বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী বলেন, পিরোজপুর জেলার ইতিহাস বইয়ে জামায়াতের সম্পর্কেও আলোচনা রয়েছে। সেখানেও সাঈদীর নাম নেই। স্বাধীনতা বিরোধীদের তালিকায়ও সাঈদীর নাম নেই। অথচ দানেশ মোল্লা সেকেন্দার শিকদার এদের নাম বারবার এসেছে স্বাধীনতা বিরোধী হিসেবে। কিন্তু সাঈদীর নাম একবারও আসেনি।

প্রয়াত জনপ্রিয় লেখক হুমায়ূন আহমেদের ভগ্নিপতি অ্যাডভোকেট আলী হায়দার কর্তৃক বর্ণিত হুমায়ূন আহমেদের পিতা হত্যার ঘটনা, দৈনিক আজাদ পত্রিকায় প্রকাশিত ভাগিরথী হত্যার ঘটনা, মাছিমুপুর গণহত্যায় নিহত অনেক হিন্দু পরিবারের আত্মীয় স্বজন এর সাক্ষাৎকার রয়েছে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ দলিলপত্র বইটিতে। কিন্তু কেউই পিরোজপুরের কোন ঘটনার সাথে আল্লামা সাঈদীর নাম উল্লেখ করেননি।

আল্লামা সাঈদী সম্পর্কে কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধার বক্তব্য:
১.মহান মুক্তিযুদ্ধে নবম সেক্টরের সাব-সেক্টর কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর (অব:) জিয়াউদ্দীন আহমদ বলেন, ‘১৯৭১ এর মহান মুক্তিযুদ্ধে সাঈদী স্বাধীনতাবিরোধী, রাজাকার, আল বদর, আল শাম্স, শান্তি কমিটির সদস্য বা যুদ্ধাপরাধী ছিলেন না। এসবের তালিকায় কোথাও তার নাম নেই।’

২. মহান মুক্তিযুদ্ধে নবম সেক্টরের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড, বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিলের সাবেক যুগ্ম মহাসচিব বীর মুক্তিযোদ্ধা শামসুল আলম তালুকদার বলেন, ‘আমি দৃঢ়তার সাথে বলতে চাই, আল্লামা সাঈদীর বিরুদ্ধে দায়েরকৃত যুদ্ধাপরাধ তত্ত্ব-উপাত্ত ও সাক্ষী সবই মিথ্যার ওপরে প্রতিষ্ঠিত। কারণ আমরা নবম সেক্টরের সাব-সেক্টর কমান্ডার মেজর (অব:) জিয়াউদ্দিন আহমদের নেতৃত্বে পিরোজপুরে হানাদার বাহিনীর সাথে সম্মুখ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করি ও পিরোজপুরকে শত্রুমুক্ত করি। তিনি স্বাধীনতাবিরোধী কোন কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করেছেন বলে আমাদের জানা নেই। মুক্তিযুদ্ধে তার মানবতাবিরোধী, স্বাধীনতাবিরোধী কোনো ভূমিকা থাকলে তা আমাদের আগে বা আমাদের চেয়ে বেশি অন্য কারো জানার কথা নয়। সম্পূর্ণ রাজনৈতিক কারণেই তাকে যুদ্ধাপরাধী বলা হচ্ছে।’

৩. ফিরোজপুরের সাবেক সংসদ সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা গাজি নুরুজ্জামান বাবু বলেন- ‘১৯৭১ সালে আমি সুন্দর বনে মেজর (অব:) জিয়া উদ্দিন আহমদের নেতৃত্বে যুদ্ধ পরিচালনা করেছি। আমরাই পিরোজপুর শত্রু মুক্ত করেছি। ১৯৭১ সালে পাড়ের হাট-জিয়া নগরে সব রাজাকার এবং যুদ্ধাপরাধীদের ধরে নিয়ে হত্যা করা হয়েছে। মাওলানা সাঈদী যদি রাজাকার বা যুদ্ধাপরাধী হতেন তাহলে জীবিত থাকার কথা নয়।
(তথ্যসূত্র : যুদ্ধাপরাধ নয় জনপ্রিয়তাই আল্লামা সাঈদীর অপরাধ। লেখক বীর মুক্তিযোদ্ধা মোকাররম হোসেন কবির, মুক্তিযোদ্ধা নং ম ১৬৩৯)

Comments

comments