বন্দি কিশোরীর স্মৃতিতে পিলখানার সেই ৩৬ ঘণ্টা (ভিডিও)

পিলখানা হত্যাকাণ্ডের সেই ঘটনা বলছেন ফাবলিহা বুশরা

২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি পিলখানায় বিদ্রোহের নামে যে নৃসংশ সেনা হত্যাযজ্ঞ হয় সেদিন পিলখানার ভেতরে আটকা পড়েছিলেন অনেকে। তখন ৯ম শ্রেণীর ছাত্রী ফাবলিহা বুশরা তাদেরই একজন। তার বাবা তৎকালীন বিডিআর হাসপাতালের মনোরোগ বিশেষজ্ঞ লেফটেন্যান্ট কর্নেল লুৎফর রহমান খানও ওই দিন জওয়ানদের হাতে খুন হন।

১৪ বছর বয়সে পিতাকে হারানো এবং নৃসংসতার মধ্যে মা ও ভাইয়ের সঙ্গে ৩৬ ঘণ্টা পিলখানা কোয়ার্টার গার্ডে বন্দি ছিলেন বুশরা। বুশরা বয়স এখন ২৩। ৯ বছর আগের ওই হৃদয় বিদারক ঘটনা ভয়াল স্মৃতি বিবিসিকে তুলে ধরেছেন ফাবলিহা বুশরা।

সেদিন যা দেখেছিলেন :

“দিনটা আসলে গোলাগুলির শব্দ দিয়ে শুরু হয়। আমি তখন ব্রেকফাস্ট করছিলাম। ওইদিন আমার ছুটি ছিল। আমাদের বাসাটা ছিল ডিজি আঙ্কেলের বাসাটার ঠিক পাশে। তো বাবা যখন কলটা দেয় তখন ফোনটা আমিই রিসিভ করেছিলাম। আমার সাথে তেমন কথা হয় নাই শুধু বলছিলেন যে তোমার আম্মুকে দাও তোমার আম্মুর সঙ্গে কথা বলবো।”

“তারপর বেশি গোলাগুলি শুরু হয়ে গেল। আমরা চারতলার উপর থাকতাম। একটা বুলেট এসে আমাদের জানালার রডটা বেঁকে ঘরে ঢুকে গেল। আমাদের বাসার নিচে তিনটা গাড়ি ছিল, গাড়িতে ওরা আগুন লাগিয়ে দিল।”

বুশরা বলছিলেন সৈনিকরা মুখে কাপড় বেধে কেউ মাস্ক পরেছিল। এতবেশি সৈনিক পিলখানায় তারা আগে কখনোই দেখেননি। তখন পর্যন্ত কোনো ধারণাও করতে পারেননি আসলে বাইরে কী ঘটছে বা তাদের জন্য কী অপেক্ষা করছে।

“দুইটা সৈনিক এসে আমাদেরকে ঘর থেকে বের করে নিয়ে যাচ্ছিল। এসময় একটা সৈনিক এসে আমার মায়ের বুকে বন্দুক ধরে বলছিল তুই শেষ, তুই শেষ। তোর জামাই কে? তোর জামাই তো শেষ। এসময় আমার মার দুই হাতে আমি ও আমার ছোট ভাই ধরা।”

বুশরা বলেন, “আমি জানতাম না কোয়ার্টার গার্ড কী জিনিস বা সেখানে কী করা হয়। আমাদের আগে পুরাতন ডিজি কোয়ার্টার থেকে ফ্যামিলি নিয়ে আসা হয়েছিল। আমাদের সামনে লাইন ধরে ধরে রুমটার মধ্যে যখন সবাইকে ঢুকাচ্ছিল। সবচেয়ে বীভৎস যেটা লাগছিল যে ওনারা বেধড়কভাবে অফিসারের মিসেস যারা, ইভেন মা এবং সন্তানদের পেটাচ্ছিল। তখন আমার পেছনে একটা লাত্থি লাগে। আমার কানের পেছনে বন্দুকের বাট দিয়ে একটা আঘাত করে।”

বুশরা জানান, একটা রুমে ৭০/৮০ জনকে গাদাগাদি করে রাখা হয়। এসময় বিডিআর জওয়ানরা উল্লাস করছিল এবং কে কয়জনকে মেরেছে সেটি জানান দিচ্ছিল। বন্দি অবস্থায় অল্প বয়সে নৃশংস ঘটনার চাক্ষুস সাক্ষী হয়েছিলেন কিশোরী বুশরা।

“একজন ধুপী ছিলেন উনি একজন অফিসারকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু উনি সৈন্যদের হাতে ধরা পড়ে যান। আমরা বাইরে বসে দেখছিলাম যে তার ওপর জাস্ট ২০-২৫ জন লোক ঝাঁপায় পড়লো। এবং তাকে যে যে জিনিসটা পারছে তাই দিয়ে পেটাচ্ছে। লোকটার চিৎকার… এটা আমি কোনোদিন ভুলবোনা। আমি অনেক রাত ঘুমাতে পারি নাই এই জিনিসটা এক্সপিরিয়েন্স করার পর।”

কোয়ার্টার গার্ডে বুশরা তার মা ও ভাইয়ের সঙ্গে একরুমে অবরুদ্ধ ছিল। সেখানে এক ঘটনা কিশোরী বুশরার জন্য মারাত্মক ভীতির সঞ্চার করেছিল।

“আমি আর আমার মা পাশাপাশি বসে ছিলাম। গরাদের দরজার ভেতর দিয়ে বন্দুক ঢুকিয়ে নল দিয়ে আমার দিকে তাক করে একজন বলছিলেন, চোখ বন্ধ কর, চোখ বন্ধ কর। হাসতেছে আর বলতেছে যে কিছু বোঝা যাবে না চোখ বন্ধ কর। দে ওয়্যার লাফিং দ্যাট ইট ওয়াজ অ্যা জোক। আমি যে ভয় পাচ্ছি আমি যে গুটায় যাচ্ছি এই জিনিসটা দেখে ওরা খুব আনন্দ পাচ্ছিল।”

“আমাদের কোনো ডাউট ছিলনা যে ওরা আমাদের মেরে ফেলবে। আমরা শুধু ওয়েট করছিলাম যে কখন মারবে।”

বুশরা জানান, ৩৬ ঘণ্টা অবরুদ্ধ থাকার সময় তারা দোয়া কলেমা পড়েছেন। শুধু পানি খেয়ে কাটিয়েছেন পুরোটা সময়। রাতে একটু ঘুমিয়েছিলেন স্যান্ডেল মাথায় দিয়ে। যখন পিলখানা থেকে বের হন তখনো আতঙ্ক কাটেনি তাদের।

“আমাদেরকে যখন বলা হয়ছিল যে তোমরা চলে যাও। ট্রাকে করে উঠায় দেয়া হচ্ছিল আমাদের। আমরা তখন যেতে চাচ্ছিলাম না। ঘটনার বিভৎসতাটা এত বেশি ছিল যে আমাদের মনে হচ্ছিল যে আমরা গাড়িতে উঠবো আর আমাদের পেছন থেকে গুলি করবে।”

ঘটনার পর মানসিক অবস্থা :

বুশরা বলেন, “আমার কাছে মনে হয় যে, এই সময়টা নিজেদের জিম্মি থাকার অভিজ্ঞতাটা যতটা কষ্টকর ছিল, তার চাইতে মনে হয় আমার বাবার জন্য অপেক্ষা করাটা আর তারপরে তার লাশ পাওয়ার অভিজ্ঞতাটা আরো কষ্টকর ছিল।”

“আমি তিনবার আইসিইউতে গিয়েছিলাম। আমার বাবার যেদিন জানাযা ছিল সেদিন আমাকে চারটা সেডিটিভ দেয়া হয়েছিল টু কাম মাই নার্ভস। আমি কাঁদতে পারতাম না। আমি চিৎকার করতাম। আমার অনেক আউটব্রাস্ট হতো। আমি এই জিনিসটা মেনেই নিতে পারিনি।”

বুশরা বলছিলেন ওই ঘটনার পর ৭ বছর পর্যন্ত টানা মানসিক চিকিৎসা আর থেরাপির মধ্য দিয়ে তাকে যেতে হয়েছে।

“এটা আইরনিক যে আমার বাবা সাইক্রিয়েটিস্ট ছিলেন আর আমারই অনেক সাইক্রিয়েটিস্টের কাছে ঘুরতে হয়েছে ফর মাই পোস্ট ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার। আমাকে অনেক ওষুধ খেতে হইছে। অনেক থেরাপি নিতে হইছে। আউটব্রাস্ট ছিল। অ্যাঙ্গার সমস্যা ছিল।”

“আমি খুবই ইমোশনালি আনস্টেবল হয়ে গিয়েছিলাম যেটা সত্যিকথা। কারণ, আমার বাবার প্রতি এত এটাচ ছিলাম আর পুরো ঘটনাটা আমি কিছুই এড়াই যেতে পারি নাই। মাইন্ড ডাইভার্ট করতে পারি নাই। আমার পড়াশোনার ক্ষতি হতো। পড়াশোনা করতে চেতাম না। আমার মানসিক অবস্থা দেখে অনেকে চিন্তা করতো যে আমি হয়তো আর পড়াশোনা আগায় যেতে পারবো না!”

৯ বছর পর এখন :

মৃত্যুবার্ষিকী এলে তিনি চেষ্টা করি তার যে শোক সেটা ব্যক্তিগতভাবে পালন করতে। সবাই চলে যাওয়ার পরে কবরস্থানে যান । একটু নিজের মতো করে যতটুকু সময় পার করা যায় এটাই চেষ্টা করেন।

পিলখানার হত্যাকাণ্ডে নিহত লেফটেন্যান্ট কর্নেল লুৎফর রহমান খানের কবরে তার পরিবার
তিনি এখন একটা মেডিকেল কলেজে পড়ছেন।

“ইনশাআল্লাহ এ বছর গ্রাজ্যুয়েশন করে যেতে পারব। কিন্তু মনের দিক থেকে কখনোই এটা থেকে আমি রিকভার করতে পারবো না।”

২০০৯ সালের ঘটনাকে বিদ্রোহ বলতে চান না বুশরা।

“আমরা যারা ভেতরে ছিলাম আমরা কোনো বিদ্রোহ দেখিনি। কোনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া দেখিনি। আমরা মানুষ মারার পর তাদের উল্লাস দেখেছি। আমরা মানুষকে নির্যাতন করা দেখেছি। ছোট ছোট বাচ্চাকে গিয়ে গালিগালাজ করা মহিলাদের গায়ে হাত দেয়া এটা কী ধরনের প্রতিবাদ?

“আমি এটাকে বিদ্রোহ বলতে চাই না, আমরা কেউই এটাকে বিদ্রোহ বলতে চাই না। আমি এটাকে কারনেজ বলতে চাই। আমি এটাকে ম্যাসাকার বলতে চাই।

বিদ্রোহ করা হয় অন্যায়ের বিরুদ্ধে আমার বাবা কী অন্যায় করেছিলেন?”

বিবিসি বাংলা

Comments

comments