প্রত্যক্ষদর্শীর চোখে পিলখানায় গণহত্যা পরবর্তী চিত্র

(যাদের হার্টের সমস্যা আছে বা দুর্বল হার্ট তাদেরকে ছবিগুলো না দেখার অনুরোধ করছি)

১। ২০০৯ এর ২৫ই ফেব্রুয়ারীতে বিডিআর এর ঘটনায় আমি হারিয়েছি আমার আপন চাচাত ভাই (লেঃ কর্নেল), ২জন ক্লোজ ফ্রেন্ড (মেজর), ২ জন প্রিয় প্রতিবেশীকে (১জন লেঃ কর্নেল, ১ জন মেজর,)। এদের কারোই আমি বিস্তারিত পরিচয় দিতে ইচ্ছুক নই।
২। কর্নেল গুলজারের ছবি এবং আমর চাচাত ভাই ও ফ্রেন্ড ছাড়া বেশ কিছু অপ্রাকাশিত ছবি প্রকাশ করা হবে। যাদের ছবি প্রকাশ করছি সেইসব হতভাগাদের লাশ তাদের সন্তান, স্ত্রী ও আত্মীয়দের দেখতে দেওয়া হয়নি তখন। যারা শেষ বারের মত তাদের প্রিয়জনকে দেখতে পায়নি ৫ বছর পর তারা এখন সেই প্রিয়জনের ছবিগুলো দেখবে।

২৫ তারিখ সকাল ৮:৪৫ মিনিটে সেনাবাহিনীর এক ফ্রেন্ড আমাকে প্রথম ফোন করে ঘটনা জানায়। সংক্ষেপে ঘটনা বলে জিজ্ঞাসা করে ***** স্যার (আমার চাচাতো ভাই) কোথায়? জানালাম, উনিতো ভোরেই পিলখানার উদ্দশ্যে বেরিয়ে গেছে। সে আর কিছু না বলে শুধু বলল তুই এখুনি পিলখানায় চলে আয়।
আমার চাচাত ভাই ঢাকার বাইরে থেকে এসেছিলেন অনুষ্ঠানে যোগ দিতে এবং আমাদের বাসায় উঠেছিলেন। ওইদিন সকালে শুধু এক কাপ চা খেয়েই বেরিয়ে যান উনার ব্যাক্তিগত গাড়ি নিয়ে। দরবার হলের অনুষ্ঠানের বিশেষ এক দায়িত্ব ছিলো তার উপর। তাড়াহুড়া করে সকালের নাস্তাটাও করেনি।
ভাইকে আমি ফোন করছি তো করছি, রিং বেজেই চলেছে…………… বাসার কাউকে তখনও কিছু বলিনি। আমি তাড়াহুড়ো করে বাসা থেকে বেরুচ্ছি, এমন সময় আরেক ফ্রেন্ড ফোন করে জানায় পিলখানার দরবার হলে ৫০ জনের মত সিনিয়র অফিসার শুট ডাউন। শুনে আমার সারা শরীর হিম শীতল হয়ে গেল। তাকে জানালাম, আমি পিলখানার উদ্দেশ্যে রওনা হচ্ছি। নিউ মার্কেটের সামনে পৌছেই এক র‍্যাবের গাড়ির দিকে তাকাতেই দেখি আমার মহল্লার এক র‍্যাব অফিসার, সিনিয়র মেজর, (ওরও এক আত্মীয় মারা গেছে ঐ ঘটনায়)। ওকে দেখেই ট্যাক্সি থেকে নেমে ওকে ইশারা দিতেই দৌড়ে আসে। তাকে জানালাম ভাইয়ের মোবাইলের এতক্ষণ রিং বাজছিলো কিন্তু এখন ফোন অফ। সে নির্বিকার আমাকে জানালো ****** স্যার (আমার চাচাতো ভাই) এর আশা ছেড়ে দেন। প্রথম তার কাছে জানতে পারি আমাদের পরিচিত কারা কারা ভিতরে আছে। এর মধ্যে আমার আরও কয়েকজন আর্মি ফ্রেন্ড এর সাথে দেখা হয়। ঘটনা কি ঘটেছে বুঝতে আর বাকি রইলো না।
এর ভিতর কিভাবে যেন আমার পরিচিত কয়েকজন জেনে যায় আমি পিলখানায় আছি। একটার পর একটা ফোন আসা শুরু হয়। যাদেরকে বলা প্রয়োজন মনে করেছি তাদেরকে সত্য কথা বলছি। কিন্তু কাঊকে কাঊকে এড়িয়ে গেছি। ঐ সময় আমিও কেমন যেন অনুভতিহীন হয়ে গিয়েছিলাম। আমি জানি, তাদের কাছের লোকটি নেই কিন্তু নির্বিকারে তাদের স্ত্রী, সন্তান, ভাই বোনদের বলে যাচ্ছি উনি ভালো আছেন/আছে, একটু আগে আমার সাথে কথা হয়েছে………… এমন মিথ্যা কথা বলে যাচ্ছিলাম নির্বিকারে।
টিভিতে লাইভে আপনারা যেভাবে সাংবাদিকদের মিথ্যাচার দেখছিলেন, আমিও ঠিক একিভাবে মিথ্যা বলে যাচ্ছিলাম আমার পরিচিত জনদের। কিছুক্ষণের ভিতর আমার মোবাইলে অপরিচিত নাম্বার থেকে কল আশা শুরু করলো। কল করে বলে “অমুক আপনার ফ্রেন্ড হয় না? আমি তার , চাচা, মামা, খালাতো বোন, মামাতো বোন…………… আমার হাসবেন্ডের নাম লেঃ কর্নেল ****** আমার ছেলে/ভাই/ভাতিজা মেজর *****, ক্যাপ্টেন ***** আমিতো ওকে ফোনে পাচ্ছি না……… আপনিতো পিলখানায় আছেন………… একটু দেখবেন ও কোথায় আছে, কেমন আছে? একটু খোজ নিয়ে জানাবেন, প্লিস।“
আর আমি শূয়রের বাচ্চা, ইতর, হিজড়া নামক মানুষটি সবাইকে মিথ্যা বলে যাচ্ছিলাম। আমি এমন ভিরু, কাপুরুষ হয়ে গিয়েছিলাম যে কাউকে বলতে পারিনি যে আপনার স্বামী, ভাই, ছেলে আর জীবিত নাই। যে কোন ভাবেই হোক আমি প্রতি মিনিটে নিহতদের আপডেট নামের তালিকা দেখছিলাম। পিলখানার ভিতর থেকে কেউ একজন প্রতিনিয়ত নিহতদের নাম প্রকাশ করে যাচ্ছিল সরকারের একটি বিশেষ সংস্থার কাছে। আমার সামনেই নামগুলো নোট করে নিচ্ছিলো সেই সংস্থার একজন। পিলখানার এই গেইট থেকে ঐ গেটে দৌড়াদৌড়ির মধ্যে দুই টিভি সাংবাদিকের খপ্পরে পড়ি। আমি তাদের একটিও প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে মাইক্রফোন সরিয়ে দিয়ে আমি আমার পথে যেতে থাকি। টিভিতে লাইভে ঐ দৃশ্য আমার পরিচিতজন কয়েকজন আমার চেহারার অভিব্যাক্তি দেখে বুঝে ফেলে, বিশেষ করে আমার স্ত্রী নিশ্চিত বুঝে ফেলে। সে ঘরে কান্নাকাটি শুরু করে, এতে ঘরের সবাই বুঝে ফেলে আমার ভাই আর নেই। ওদিকে চাচা, চাচী আমার বাসায় ফোনের পর ফোন করতেছে। আমার ঘর থেকে কেউ সদুত্তর দিতে পারছে না, সুধু উত্তর দিচ্ছে ‘জাতির নানা’ পিলখানায় আছে। ওর সাথে কথা হয়েছে, সব ঠিক আছে।

পিলখানায় উদ্ধার কাজ শুরু হওয়ার মুহূর্তে যে কয়জন পিলখানার ভিতরে যাওয়ার সুজুগ পেয়েছিলো আমি তাদের একজন। যে কোন উপায়ই হোক আমি ভিতরে ঢুকেছিলাম। তার অনেক আগেই জেনে গিয়েছিলাম/বুঝেছিলাম আমি কাদেরকে হারিয়ে ফেলেছি। আমি ঢুকেছিলাম শুধু আমার হারিয়ে যাওয়া প্রিয়জনদের লাশ খুজতে। লাশ খুজতে খুজতে পাগলপ্রায় অবস্তা আমার। এর মধ্যে খবর পাই কিছু লাশ মিটফোর্ডে মর্গে নিয়ে গেছে। ছুটে যাই সেখানে। মর্গে গিয়ে দেখি সরকারী বাহিনীর বিশেষ কিছু লোকজন ছাড়া অন্যদের প্রবেশ নিষেদ। এক পরিচিত অফিসারের সহায়তায় আমি মর্গে ঢুকি। জীবনের প্রথম মর্গে ঢুকি। লাশগুলো কিছু উপড় হয়ে আছে কিছু কাত হয়ে আছে। ৬-৭টা লাশ উলটিয়ে দেখতে গিয়ে প্রথম পাই আমার প্রতিবেশী সিনিয়র ভাইয়ের (লেঃ কর্নেল)। তার চেহারা দেখে মাথাটা চক্কর দিয়ে উঠে। সাথে সাথে মর্গে থেকে বেরিয়ে পড়ি।
পিলখানায় ও হাস্পাতালে দৌডাদৌডিতে অনেক হতভাগা নিহতের আত্মীয় সজনের কাছে চেনা মুখ হয়ে যাই। তখন এক হতভাগা নিহতের আত্মীয় এসে একটা ছবি দিয়ে বলে লাশটা আইডিন্টিফাই করার অনুরোধ করে। এর মধ্যে আরো কয়েকজন ছবি, নাম ও রেঙ্ক লিখে চিরকুট দেয়। আবার ঢুকে ভাইয়ের লাশ খোজা শুরু করি, একপর্যায়ে পেয়েও যাই। ভাইয়ের লাশ পেয়েও আমি কিভাবে যেন নির্বিকার ছিলাম। অনুভুতিহীন হয়ে গিয়েছিলাম। তারপর পকেট থেকে কয়েকটা ছবি ও নাম দেখে কিছু লাশ আইডিন্টিফাই করার চেষ্টা করলাম। বেশিরভাগ লাশের নেমপ্লেট ছিল না। হঠাৎ মাথায় এলো মোবাইল দিয়ে কিছু ছবি তুলে বাইরে আত্মীয় স্বজনদের দেখালে হয়তো চিনতে পারবে, আমিতো ছবির সাথে লাশের কোন মিল খুজে পাচ্ছিলাম না। বেশ কিছু ছবি তুললাম সরকারী বিশেষ সংস্থার লোকদের চোখ ফাকি দিয়ে। আবার বাহির হয়ে দুজনকে ছবিগুলো দেখাচ্ছিলাম, পাশ থেকে এক মহিলাও ছবিগুলো দেখছিলো যা আমি খেয়াল করিনি। হঠাৎ ধুপ করে আওয়াজ শুনে পাশে ফিরে দেখি এক মহিলা মাটিতে পড়ে আছে। তার সাথের লোকটি জানালো আমার ঐ ছবিগুলোর মধ্যে ঐ মহিলার স্বামীর ছবি ছিলো।
২৬শে ফেব্রুয়ারি মাঝ রাতে বাসায় ফিরি। এই দুই দিন খেয়েছিলাম ২টা কলা আর ২ পিস ব্রেড। তার পর মাসখানেক কিছু খেতে পারিনি। আগামী ফেব্রুয়ারির ২৫ ও ২৬ তারিখে অনেকের বাসায় আমাকে দাওয়াত দিবে মৃত্যু বার্ষিকীর মিলাদ মাহফিলে। গত ৪ বছরও যাইনি, আগামীতেও যাব না। যে সব অফিসারদের স্ত্রী কন্যা, পুত্রদের ২৫ তারিখ সন্ধ্যায়ও বলেছিলাম উনি জীবিত আছে তারা জানে যাদের প্রিয় মানুষটির মৃত্যু হয়েছে ২৬ তারিখে। আমার মিথ্যা কথার উপর ভিত্তি করে তারা ২৬তারিখ মৃত্যু বার্ষিকী পালন করে। সেইসব পরিবারের মুখোমুখি হওয়ার সাহস আমার আজ হয়নি। আমার নিজের চোখের সামনে ঘটে যাওয়া সেই বিভীষিকাময় ‘ঘটনা’ এবং ‘ঘটনার পিছনের ঘটনা’ হয়তো একদিন কেউ না কেউ প্রকাশ করবে।
সেদিন একটা কথা অনুধাবন করতে পেরেছিলাম যে ঘরের মালিক যদি নিজের ঘর জ্বালিয়ে দিতে চায় তাইলে প্রতিবেশী সেই আগুন নেভাতে পারে না। সেদিন র‍্যাব-১ এর দুই পিকআপে ১৬ জন ছিলো। তাদের কমান্ডিং অফিসার বার বার তার মহাপচালিকের কাছে অনুমতি চাইছিলো একশানে যাওয়ার। কিন্তু হায় অনুমতি মিলেনি। ঐ অফিসারকে দেখেছি দাঁত কিড়মিড় করে বার বার তার মহাপরিচালকের কাছে বলছে, “স্যার, পারমিট মি পারমিট মি।” যদি অনুমতি মিলতো তাইলে এত অফিসারের প্রাণহানি হত না। অধিকাংশ গুলিবিদ্ধ অফিসারকে উদ্ধার করে বাঁচানো সম্ভব ছিলো। অনেক অফিসার গুলিবিদ্ধ হয়েও রাত পর্যন্ত জীবিত ছিলো। জীবিত অবস্থায়ই তাদের মাটি চাপা দেওয়া হয়েছিলো। র‍্যাব নিজস্ব সোরচে আগেই খবর পেয়েছিলো এবং প্রস্তুতি নিয়েই পিলখানা গেইটে অবস্থান নিয়েছিলো সকাল সাড়ে আটটায়। গেইটের বাইরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এসএমজি’র গুলির আওয়াজ শুনেছে। র‍্যাবের ঐ দুটা টিমই যথেস্ট ছিলো ভিনদেশী ১২ জন হায়েনাকে প্রতিহত করার। এত ট্যাঙ্ক, কামান আর হেলিকাপ্টারের দরকার ছিলো না। সেদিন র‍্যাব-১ যদি একশানে যেতে পারতো সারা দুনিয়ার সামনে ভিন্ন কিছু উম্মচিত হত।
আপনারা বিভিন্ন মিডিয়ায় যে সব ঘটনা, পৈচাশিক ঘটনার কথা শুনেছেন তা আমার দেখার সাথে মিলে না। ছবিগুলো দেখে কি আপনারা বলতে পারেন, যাদেরকে মারা হয়েছে তারা পাগল পশু ছিলো নাকি যারা এভাবে মেরেছে তারা পাগল পশু ছিলো???

উপরের ছবিটি ডিজি শাকিলের। যাকে জীবিত অবস্তায় মাটি চাপা দেওয়া হয়েছিলো, যার কারনে উনার চোখ দুটি বের হয়ে আসছিলো (সি এম এইছ এর এক ডাক্তারের অভিমত) গুলি খাওয়ার পর অনেকে জীবিত ছিলো যারা শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে মাটি চাপা দেওয়ার পর। শ্বাস বন্ধ হয়ে মারা গেলে মানুসের চোখ বেরিয়ে আসে।
ছবিটা দেখুন; পৈচাশিকতা এবং নৃশংসতার সংজ্ঞা নতুন করে শিখুন।

২৬ ফেব্রুয়ারী ২০০৯। বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার পিলখানায় নারকীয় হত্যাযজ্ঞ ইতিহাসে নজিরবিহীন। বাংলাদেশ রাইফেলস এর মহাপরিচালক মেজর জেনারেল শাকিল আহমেদ সহ ৫৭ জন বিভিন্ন পদবির চৌকশ সেনা অফিসারকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। হত্যাকারীরা মহাপরিচালক শাকিলের বাসস্থানে তাঁর স্ত্রীর উপর নারকীয় পৈশাচিক নির্যাতনের পর তাঁকে হত্যা করে। কতিপয় দেশদ্রোহীর সহায়তায় পিলখানার দরবার হল থেকে সেনা অফিসারদের বাসস্থান পর্যন্ত অকাতরে গুলি চালিয়ে হত্যা, স্ত্রী সন্তান্দের উপর পৈশাচিক নির্যাতন, হত্যার পর লাশ ড্রেনে ফেলে দেয়া, মাটি চাপা দেয়া এবং পুড়ে ফেলার মত ধ্বংস যজ্ঞ চালায়। জাতির প্রতিটি মানুষ সে দিন এই আকস্মিক অভাবনীয় হত্যাযজ্ঞের শোকে কষ্টে স্তম্ভিত হয়ে যায়।
নিয়তির কি নির্মম পরিহাস। সে ঘটনায় মারা যায় তৎকালীন পুলিশের আইজি নুর মোহাম্মদের সদ্য বিবাহিত একমাত্র মেয়ের জামাতা (ক্যাপ্টেন)। বিপদের সময় মানুষ কতটা অসহায় হয়ে যায়, হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলে যে, তিন বাহিনীর প্রধানের সামনে তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পা ধরে আকুতি জানিয়েছিলো তার একমাত্র মেয়ের জামাই ও মেয়েকে উদ্ধারের। প্রধানমন্ত্রী তাকে ধমক দিয়ে বলেছিলেন, “তোমার পদবীর সাথে এমন ইমোশান মানায় না। তোমার মেয়ে ও জামাইর কিছু হবে না।“ তার মেয়ে নির্যাতিত হয়ে জীবিত বের হতে পেরেছিলো কিন্তু মেয়ের জামাই নৃশংসভাবে মৃত্যু বরন করেছিলো।
শোকাহত পরিবাররের মানুষ গুলোর হৃদয়ে এখনও রক্ত ক্ষরণ হচ্ছে। এ ঘটনার পর আজও বিবেকবান সকলের মনে প্রশ্ন বিশেষ করে দেশ প্রেমিক চিন্তাবিদ ও সমরিক বিশেষজ্ঞদের প্রশ্ন –এই হত্যা যজ্ঞ কি মিউটিনি নাকি আভ্যন্তরীণ এবং বহিঃ ষড়যন্ত্রের অংশ? ঘটনার প্রেক্ষাপট, স্থান, ঘটনার গভীরতা, জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন, ঘটনা পরবর্তী সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম এবং মিডিয়ার প্রভাব অনেক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
এই লেখায় আমি সুধু সেই সময়ের নিজের দেখা ঘটনার একটা খুদ্র অংশ প্রকাশ করলাম। ঘটনা সামনে থেকে দেখে নিজের কিছু প্রশ্নের উত্তর খুজছি।
আচ্ছা, আমাদের দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনী দ্বারা কারা কারা ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছিলো?
১। শেখ হাসিনা ?
২। শেখ সেলিম ?
৩। তাপস ?
৪। প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারত ?
উপরের চারটা প্রশ্নের উত্তর ‘হাঁ’
এই ঘটনায় প্রথম তিন বাংলাদেশীর কথা পরে আলোচনা করি। ৪র্থ ক্ষতিগ্রস্থ ভারত। আপনাদের নিশ্চয় রৌমারীর ঘটনা মনে আছে?? ২০০১ সালের ১৮ই এপ্রিল রাতে বিএসএফ বাংলাদেশের বেশ কিছু ভুখন্ড দখলের উদ্দেশ্যে রাতের আধারে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে রৌমারীর বড়াইবাডি গ্রামে প্রবেশ করেছিলো দশ প্লাটুন বিএসএফ। তৎকালীন বিডিআর এর বিডিআর মহাপরিচালক আ ল ম ফজলুর তাৎখনাত আদেশ দিয়েছিলেন কাউন্টার অ্যাটাকে যেতে। সেই রাতে মাত্র বিডিআর দুই প্লাটুন সৈন্য গ্রামবাসীদের সাথে নিয়ে বিএসএফ উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। দুদিন যুদ্ধ চলে। ফলাফল???
আপনারা পত্রিকায় দেখেছে বিএসএফ এর ২২জন, কোন পত্রিকায় ৪০ কোন পত্রিকায় ৭০জন, ৮০ জন এমন বিভিন্ন রকমের তথ্য পেয়েছেন। বিএসএফ নিহতের সঠিক সংখ্যা ভারত সরকারও গোপন করেছে তেমনি বাংলাদেশ সরকারও গোপন করেছে। ঐ ঘটনার পরের দিন অফিসিয়াল কাজে বুড়িমারী গিয়েছিলাম। কাজ সেরে দুপুরের পরে স্থানীয় এক ছেলেকে সাথে নিয়ে রৌমারী বিডিয়ার ব্যারাকে যাই। সেনাবাহিনীর যে দুজন অফসারের নেত্রিত্তে কাউন্টার অ্যাটাক হয়েছিলো তাদের মুখে ঐ রাতের কথা শুনি। তাদের কথার সারসংক্ষেপ হল এই বিজয়ের ফুল ক্রেডিট বড়াইবাডি গ্রামবাসীর। গ্রামবাসীরা বিডিয়ার এর সাথে কাধে কাধ মিলিয়ে বিএসএফ কচুকাটা করে। বড়াইবাড়ির বিডিআর এর সাথে সেই রাতে যুক্ত হয়েছিলো জামালপুর থেকে কর্নেল শায়রুজ্জামানের নেতৃত্বে অতিরিক্ত ফোর্স। ঐ দুই অফিসারের ভাষ্য অনুযায়ী দুই ট্রাক বিএসএফ এর মৃতদেহ বাংলাদেশ ভূখণ্ড থেকে খুজে খুজে সরিয়ে নেয়। ঐ গ্রামের কয়েকজনের ভাষ্য অনুযায়ী তিন ট্রাক বিএসএফ এর মৃতদেহ সরানো হয়েছিলো। আসা করি বিএসএফ এর লাশের সংখ্যা অনুমান করতে পারছেন। রাতের আধারে অপরিচিত টেরিটোরিতে ঢুকে বিএসএফ বিডিয়ার এর অতর্কিত অ্যামবুশে পড়ে ছত্রভঙ্গ হয়ে গিয়েছিলো। সেইসাথে গ্রামবাসীর দা কুড়ালের আক্রমনের শিকার হয়েছিলো। দুদিনের যুদ্ধে বেশকিছু গ্রামবাসী ও কয়েকজন বিডিআর আহত হয়েছিলো। বেশ কিছু ঘর বাড়ি জ্বালিয়ে দিয়েছিলো বিএসএফ। চারজন দেশপ্রেমিক বিডিআর শহীদ হয়েছিলো সেদিন। সেই ঘটনার জের ধরে তৎকালীন বিডিআর মহাপরিচালক আ ল ম ফজলুর চাকরী হারিয়েছিলেন। সেই সময়ের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেখানে গেলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে আসে। শেখ হাসিনা বিডিআর সদস্যদের ধন্যবাদের বদলে শাসিয়েছিলেন বলে গ্রামবাসিরা অভিযোগ করে।
এই ঘটনা বলার পিছনে কারন আছে। পরের পর্বগুলোতে এর ব্যাখ্যা দিব। যদিও আপনারা এর নেপথ্য জানেন।
এর বাইরেও মনের ভিত কিছু প্রশ্ন ঘুরপাক খায় যার উত্তরগুলো এখনো আমার অজানা। এই ঘটনার পুনঃতদন্ত হলে এইসব প্রশ্নগুলো সামনে আসবেঃ
১। আমার মত একজন সাধারন নাগরিক যখন সকাল ৯টার এর মধ্যে জেনে যায় ৩৭ জন অফিসার মারা গেছে সেখানে সকাল ১১টায় প্রধান মন্ত্রী কি করে সাংবাদিকদের বলেন, পিলখানার অভ্যন্তরে হতাহতের কোন খবর জানেন না!!!!!!
২। পিলখানায় মুল হত্যাকাণ্ডে অংশ নেয় মাত্র ১২ জন। যারা ৯:১৫ মিনিটের মধ্যে পোশাক পরিবর্তন করে বের দেয়াল টপকিয়ে হাজারীবাগ এলাকা দিয়ে বের হয়ে যায়। তাদেরকে ২টি এম্বুল্যান্সে এয়ারপোর্টে পৌছে দেওয়া হয়। দুইটা পুলিশের গাড়ি এস্করট করে তাদের বিমান বন্দরের ভিয়াইপি গেইট দিয়ে ধুকানো হয়। কার নির্দেশে সেই দিন বিমানে ফ্লাইট ৩০ মিনিট দেরি করে? কারা ঐ দিন বিমান বন্দরের নিরাপত্তায় ছিলো?
৩। সকাল ৭টায় রংপুর থেকে এক ডিজিএফাই এর এক মেজর পিলখানায় তার বন্ধুকে ফোন করে বলে, “বাচতে চাইলে পিলখানা থেকে এখনই বের হয়ে যা।” পিলখানার অফিসারটি তাৎক্ষনাত বের হতে না পারলেও ঘটনার পরে জীবিত অবস্থায় বের হয়!!!- এই কথা বলছি এই কারনে যে ডিজিএফাই এর একটা অংশ এই ঘটনার সাথে সম্পৃক্ত ছিলো???
৪। ঘটনার পরের দুমাসের ভিতর কতজন অফিসার ক্যান্টমেন্টের অভ্যন্তরে অপঘাতে বা দুর্ঘটনায় মারা যায়??? একজন মারা যায় হেলিকাপ্টার এক্সিডেন্টে। এদের অধিকাংশই সারভাইবাল বা পিলখানা থেকে জীবিত ফেরত এসেছিলো। CMH এ চিকিৎসারত অবস্থায় কয়জন অফিসারের স্মৃতিভ্রম হয়েছে??? সেনাকুঞ্জে সেসব অফিসার শেখ হাসিনার সাথে উদ্যত আচরন করেছিলো তাদের ভাগ্যে কি ঘটেছিলো???
৫। সারা দেশ থেকে আগত কয়েক হাজার বিডিআর জওয়ানকে আটক করার পর ৬০ জনের মত জওয়ান হার্ট অ্যাটাকে বা গলায় গামছা পেচিয়ে মারা যায়!!! এরা কি ঘটনার পিছনের আসল ঘটনা জানতো???
৬। কর্মরত ডিবি, র‍্যাব, পুলিশ বা ডিজিএফআই কে ইনভল্ব না করে কি কারনে আবসরে যাওয়া ডিবির আবুল কাহার আকন্দকে ডেকে এনে এর তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিলো??? এই ফরমায়েশি তদন্তকারী কি হত্যার আলামতগুলো হেফাজত করেছেন নাকি চিরতরে শেষ করে দিয়েছেন?? সিসি টিভির ফুটেজগুলো কি সংরক্ষণে রেখেছেন নাকি আগুনে জ্বালিয়ে দিয়েছেন???
৭। সারভাইবালদের থেকে কাকে কাকে পুরুস্কিত করা হয়েছিলো??? এমনও দেখা গেছে মেজর পদমরর্যদার কাউকে ইউএন মিশনে দৈনিক ১৮০ ডলার বেতনের লোভনীয় পদে পোস্টিং দেওয়া হয়েছিলো!!!!! সচারাচর এধরনের বেতনে পাঠানো হয় কর্নেল/ব্রিগেডিয়ার পদমরর্যদার কাউকে!!! এমনভাবে পুরস্কৃত করার পিছনে বিশেষ কোন কারন নাই তো???

Comments

comments