মাওলানা শাহ আহমাদুল্লাহ আশরাফ এর সংগ্রামী জীবন

বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের প্রধান পৃষ্ঠপোষক, হাফেজ্জী হুজুরের জ্যেষ্ঠ পুত্র ও জামিয়া নূরিয়া ইসলামিয়ার মহাপরিচালক মাওলানা শাহ আহমাদুল্লাহ আশরাফ। তিনি বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের সাবেক আমির শরীয়ত।

জন্ম: মাওলানা শাহ আহমদ উল্লাহ আশরাফ ১৯৪২ সালে রাজধানীর লালবাগের কিল্লারমোড়স্থ বাসভবনে জন্মগ্রহণ করেন।

শিক্ষা: মাওলানা শাহ আহমদ উল্লাহ আশরাফ প্রথম সবক বা প্রাথমিক শিক্ষা পিতা হযরত হাফেজ্জী হুজুর (রহঃ) এর কাছেই গ্রহণ করেন। পরে নিজ পিতা এবং আল্লামা সামসুল হক ফরিদপুরী (রহঃ) তথা সদর সাহেবের তত্ত্বাবধানে
বড়কাটারা, লালবাগ, মোস্তফাগঞ্জ মাদ্রাসায় ইলমে দ্বীন শিক্ষা লাভ করেন। অতঃপর ইলমে নববীর উচ্চতর শিক্ষা অর্জনে করাচীর জামিয়া ইসলামিয়া বিন নূরী টাউন মাদ্রাসায় ভর্তি হন। এছাড়াও অনেক প্রতিথযশা আলেমের নিকট থেকে সরাসরি তিনি দ্বীনি ইলমের উচ্চতর বিষয়সমূহ অধ্যয়ন করেছেন।

কর্মজীবন: পাকিস্তান থেকে ঢাকায় ফেরার পর ১৯৬৩ সালে জাতীয় মসজিদ বাইতুল মুকাররমে প্রধান মুয়াজ্জিনের দায়িত্ব নেন। তিনি ঢাকার ঐতিহ্যবাহী জামিয়া নূরিয়া ইসলামিয়া, আমীনবাজারস্থ মদিনাতুল উলুম মাদ্রাসা ও লক্ষীপুরের লুধুয়া এশাআতুল উলুম মাদ্রাসার একই সাথে প্রিন্সিপালের দায়িত্ব পালন করেন। এ ছাড়া দেশের অসংখ্য মাদ্রাসার মুরুব্বী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

মুক্তিযুদ্ধে অবদান: ১৯৭১ সালে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর জুলুম-নির্যাতন থেকে রেহাই পায়নি জাতীয় মসজিদ বাইতুল মুকাররম এলাকাও। ক্ষুদ্র ও অসহায় ব্যবসায়ীদের ওপর পাক হানাদার বাহিনী যখন জুলম-নির্যাতন করছিল তখন মাওলানা আশরাফ নির্যাতিত ব্যবসায়ীদের পক্ষালম্বন করে বীরবিক্রমের মত হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেন। এই ঘটনার পর পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী মাওলানা আশরাফকে গ্রেফতার করে যাত্রাবাড়ী ক্যাম্পে নিয়ে যায় এবং হত্যার উদ্দেশ্যে বন্দুক তাক করে তাঁকে দাঁড় করানো হয়। ঘটনার খবর পেয়ে পিতা হযরত হাফেজ্জী হুজুর (রহঃ) আল্লাহর কাছে তাঁর প্রাণ রক্ষার জন্য ফরিয়াদে লিপ্ত হয়ে পড়েন। হাফেজ্জী হুজুরের দোয়ার বরকতে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন সেদিন তাঁকে প্রাণে রক্ষা করেন।

রাজনৈতিক জীবন: বিশ্ব বরেণ্য আলেম এবং বুজুর্গ ও আধ্যাত্মিক পথপ্রদর্শক বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা আমীরে শরীয়ত হযরত হাফেজ মাওলানা মুহাম্মদুল্লাহ হাফেজ্জী হুজুর (রঃ) এর বড় সাহেবজাদা ১৯৮১ সালে হাফেজ্জী হুজুর (রহঃ) রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রার্থী হলে এবং ১৯৮৬ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে খেলাফত আন্দোলনের পক্ষে বলিষ্ঠ ভুমিকা পালন করেন। ১৯৮৭ সালের ৭ মে হাফেজ্জী হুজুরের ইন্তেকালের পর খেলাফত আন্দোলনের দায়িত্ব ভার গ্রহণ করেন মাওলানা ক্বারী শাহ আহমাদুল্লাহ আশরাফ। একটানা ২৭ বছর আমিরের দায়িত্ব পালন করেন । পরে তিনি পর পর কয়েক বার স্ট্রোকে আক্রান্ত হলে খেলাফত আন্দোলনের দায়িত্ব ভার তার ছোট ভাই ক্বারী আল্লামা শাহ আতাউল্লাহকে বুঝিয়ে দেন।

তিনি এরশাদ সরকারের জারি করা জরুরী অবস্থা ভঙ্গ করে হাজার হাজার মানুষের বিশাল মিছিলের নেতৃত্ব দেন। ২০০১ সালে ফতোয়া বিরোধী হাইকোর্টের দেওয়া রায়ের বিরুদ্ধে এবং ২০০৭ সালে কোরআন বিরোধী নারী নীতিমালা বাতিলের দাবীতে ওলামায়ে কেরামদের সাথে নিয়ে ঐক্যবদ্ধ ভাবে আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েন। দৈনিক প্রথম আলো পত্রিকায় মহানী (সঃ) কে ব্যঙ্গ করে কার্টুন ছাপার প্রতিবাদে সর্ব প্রকার মিছিল-মিটিং নিষিদ্ধ থাকার পরেও জীবন বাজি রেখে সকল প্রকার ভয়-ভীতি উপেক্ষা করে দলীয় নেতা-কর্মীদের সাথে নিয়ে সর্বপ্রথম তিনি বাইতুল মুকাররমের উত্তর গেইটে বিক্ষোভ-সমাবেশের নেতৃত্ব দেন যা পরবর্তী সময়ে সারা দেশে আন্দোলনের ঢেউ ছড়িয়ে পড়ে। কোরআন বিরোধী শিক্ষানীতি বাস্তবায়নের গভীর ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে মাওলানা আশরাফ জোরদার ভূমিকা পালন করেন।

রাজপথে আল্লামা শাহ আহমাদুল্লাহ আশরাফ

মাওলানা শাহ আহমাদুল্লাহ আশরাফ ঈমান-আক্বিদা সংরক্ষণ কমিটির সভাপতি, সমমনা ইসলামী দলসমূহ ও ইসলামী সমমনা ১২ দলের সংগঠক, ইসলামী ঐক্যজোটের প্রতিষ্ঠকালীন এক সময়ের চেয়ারম্যান, হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের সিনিয়র নায়েবে আমীরসহ বিভিন্ন ইস্যুভিত্তিক আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছেন। ইসলাম বিরোধী তৎপরতা এবং ইসলামের দুশমনদের বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে গিয়ে ২০১২ সালের ২২ সেপ্টেম্বর গ্রেফতার হন মাওলানা আহমদ উল্লাহ আশরাফ। ২৩ সেপ্টেম্বর তাঁর মুক্তির দাবীতে সারা দেশে হরতাল পালিত হয়। নাস্তিক ব্লগারদের শাস্তিসহ ১৩ দফা দাবিতে হেফাজতে ইসলাম ঘোষিত লংমার্চ ও সারাদেশে বিভিন্ন কর্মসূচীতে শাহ আহমাদুল্লাহ আশরাফ অত্যন্ত জোরালো ভূমিকা পালন করেন। নাস্তিকদের প্রতিরোধে সর্বাত্মক আন্দোলনের ঘোষণাও দিয়েছিলেন তিনি। ২০১৩ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পক্ষে জোরালো অবস্থান নেন।

পরিবার: মাওলানা আহমদ উল্লাহ আশরাফ ২ স্ত্রী, ৯ ছেলে ও ১০ মেয়ে রেখে গেছেন।

ইন্তেকাল: ২৩ ফেব্রুয়ারী ২০১৮ শুক্রবার সকাল সাড়ে ৭ টায় রাজধানীর ইবনে সিনা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান।

বিভিন্ন সংগঠনের শোক

মাওলানা আহমাদুল্লাহ আশরাফের ইন্তেকালে গভীর শোক প্রকাশ করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ভারপ্রাপ্ত আমীর ও সাবেক এমপি অধ্যাপক মুজিবুর রহমান এক শোকবাণী প্রদান করেছেন। শোকবাণীতে তিনি বলেন, মাওলানা আহমাদুল্লাহ আশরাফের ইন্তেকালে জাতি একজন বিশিষ্ট আলেমে দ্বীন ও জাতীয় নেতাকে হারালো। তিনি একজন উদার গণতন্ত্রমনা, দেশপ্রেমিক ইসলামী ব্যক্তিত্ব ছিলেন। তার ইন্তেকালে যে শূন্যতার সৃষ্টি হলো তা সহজে পূরণ হওয়ার নয়। তার অবদানের জন্য তিনি দেশবাসীর নিকট স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।

তার ইন্তেকালে খেলাফত মজলিসের আমীর অধ্যক্ষ মাওলানা মোহাম্মদ ইসহাক ও মহাসচিব ড. আহমদ আবদুল কাদের বলেছেন, মাওলানা শাহ আমাদুল্লাহ আশরাফ একজন সংগ্রামী আলেম হিসেবে বাতিলের বিরুদ্ধে আজীবন আন্দোলন-সংগ্রাম করে গেছেন। একসময় তাঁর সুলতিত কণ্ঠের আজান এদশের মানুষকে মোহিত করত। এ দেশের ইসলামী আন্দোলনের ইতিহাসে তাঁর অবদান অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবে।

গভীর শোক প্রকাশ করেছেন দেশের শীর্ষ দুই আলেম আমীরে হেফাজত, শায়খুল ইসলাম আল্লামা শাহ আহমদ শফী ও হেফাজতে ইসলামের কেন্দ্রীয় মহাসচিব আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী। তাঁরা এক যৌথ বিবৃতিতে পরপারে পাড়ি জমানো এই মনীষীর জন্যে গভীর শোক প্রকাশ করেন।

Comments

comments