কোটায় বন্দী তারুণ্যের স্বপ্ন, মুক্ত করবে কে?

শফিউল ইসলাম জুয়েল

স্বাধীনতা অর্জনের ৪৭ বছরে পা দিয়েছে প্রিয় জন্মভূমি বাংলাদেশ, প্রায় সব ইস্পাত কঠিন বাধা পেরিয়ে বাংলাদেশ যখন বিভিন্ন সূচকে বিশ্বের বুকে মাথা উচু করে দাঁড়াচ্ছে, তখন দেশের তরুণ মেধাবীরা যেনো নিজের দেশের প্রচলিত কিছু নিয়মের দ্বারা কোণঠাসা হয়ে পড়েছে। তার মধ্যে সবচেয়ে যে বিষয়টি এখন দেশব্যাপী আলোচিত হচ্ছে তা হলো ‘চাকরিতে প্রচলিত কোটা পদ্ধতি’।

সকল ধরনের বৈষম্য অবসানের দৃঢ় সংকল্প নিয়ে জন্ম নেওয়া স্বাধীন দেশটি আজ তাদের সন্তানদেরকে চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রে বৈষম্যর নিয়মে আবদ্ধ করেছে। নির্দিষ্ট কিছু স্বল্প জনগোষ্ঠীর জন্য ৫৬% কোটা দিয়ে মেধাবীদের সুযোগকে সীমিত করেছে, যা স্বাধীনতার মূলমন্ত্র ও সংবিধান পরিপন্থী। কোটার প্রাধান্য দিয়ে মেধাবীদের কোণঠাসা করে দেয়ার এই উদ্ভট নিয়মের সংস্কার এখন সময়োচিত যৌক্তিক দাবী। যদি মেধার লালনের মাধ্যমে রাষ্ট্রকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হয় তাহলে কোটা প্রথার যৌক্তিক সংস্কারের দ্বারা মেধাবী তরুণদের সুযোগ কে প্রসারিত করার বিকল্প পথ আর একটিও নেই। কারন আজকের মেধাবীরাই আগামীর স্বনির্ভর উন্নত বাংলাদেশ গড়ার মূল কারিগর। অদূর ভবিষ্যতে রাষ্ট্রকে যারা নেতৃত্ব দিবে তাদেরকে অবশ্যই চৌকস মেধাবী হতে হবে এবং সর্বোচ্চ প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহন করে কোন বিশেষ সুবিধা ছাড়াই মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ পেতে হবে। তাহলেই ২০৪১ সালের উন্নত বাংলাদেশ নেতৃত্ব দেবে বিশ্বের অন্যান্য প্রভাবশালী রাষ্ট্রের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে। এমন স্বপ্ন সত্যি করতেই এগিয়ে যাচ্ছে সোনার বাংলাদেশ। তাই স্বপ্ন পূরণে দরকার শুধু সঠিক পদক্ষেপ ও বৈষম্যহীন নীতিমালার।

বাংলাদেশে কোটা ব্যবস্থা চালুর ইতিহাস:

১৯৭২ সালে এক নির্বাহী আদেশে সরকারি, বেসরকারি, প্রতিরক্ষা, আধা সরকারি এবং জাতীয়করণ করা প্রতিষ্ঠানে জেলা ও জনসংখ্যার ভিত্তিতে ৩০ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা ও ১০ শতাংশ ক্ষতিগ্রস্ত নারীদের জন্য কোটা প্রবর্তন করা হয়। পরবর্তীতে বিভিন্ন সময়ে কোটায় সংস্কার ও পরিবর্তন করা হয়। বর্তমানে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির সরকারি নিয়োগে কোটা যেমন, প্রতিবন্ধী এক শতাংশ, মুক্তিযোদ্ধার সন্তান-নাতি-নাতনি ৩০ শতাংশ, নারী ১০ শতাংশ, জেলা কোটা ১০ শতাংশ, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ৫ শতাংশ কোটা। সব মিলিয়ে ৫৬ শতাংশ কোটা বিদ্যমান। ফলে এর কোনো শ্রেণিতে যারা পড়েন না, তাদের প্রতিযোগিতা করতে হচ্ছে বাকি ৪৪ শতাংশের জন্য।

সংস্কারের সুপারিশের কী হলো:

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও মন্ত্রিপরিষদ সচিব আকবর আলি খান এবং সাবেক সচিব কাজী রকিব উদ্দীন আহমদ (সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার) বাংলাদেশের সিভিল সার্ভিসে বিদ্যমান কোটা ব্যবস্থার ওপর ২০০৮ সালের মার্চে একটি গবেষণা করেছেন। ৬১ পৃষ্ঠার এই গবেষণা প্রতিবেদনটি পিএসসিতে আছে। এই প্রতিবেদনে কোটা কমিয়ে আনার সুপারিশ করা হলেও সেটি বাস্তবায়িত হয়নি।

ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৯৭৭ সালে এক বৈঠকে তৎকালীন পে ও সার্ভিস কমিশনের প্রায় সব সদস্য সরকারি নিয়োগে কোটা ব্যবস্থার বিরোধিতা করেন। কমিশনের সদস্যদের মধ্যে একমাত্র এম এম জামান ছিলেন কোটার পক্ষে। তবে কোটার পক্ষে সেদিন জামানের অবস্থান থাকলেও তিনি শুধু একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত ব্যবস্থাটি চালু রাখার পক্ষে ছিলেন। তবে ১৯৮৭ থেকে পরবর্তী ১০ বছরে কোটার হার ধীরে ধীরে কমিয়ে দশম বছরে তা বিলুপ্ত করার কথা বলেছিলেন তিনি। ওই সুপারিশ অনুযায়ী, ১৯৯৭ সালের পর দেশের সরকারি চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে কোনো কোটা থাকার কথা নয়। তবে ওই প্রতিবেদন বাস্তবায়নের কোনো উদ্যোগ সরকার নেয়নি।

জনসংখ্যার হার অনুযায়ী কোটা ব্যবস্থার বণ্টন:

পঞ্চম আদমশুমারি ও গৃহগণনা অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের জনসংখ্যা ১৫ কোটি ২৫ লাখ ১৮ হাজার ১৫ জন। এর মধ্যে ১৫ লাখ ৮৬ হাজার ১৪১ জন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী এবং ২০ লাখ ১৬ হাজার ৬১২ জন প্রতিবন্ধী। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী, দেশে মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা প্রায় দুই লাখ। এই হিসাবে মোট জনসংখ্যার ১ দশমিক ১০ শতাংশ নৃ-গোষ্ঠীর জন্য কোটা সংরক্ষিত থাকছে পাঁচ শতাংশ, ১ দশমিক ৪০ শতাংশ প্রতিবন্ধীর জন্য এক শতাংশ এবং শূন্য দশমিক ১৩ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের জন্য ৩০ শতাংশ ।

বর্তমানে প্রায় ২৫৮ ধরনের কোটা প্রয়োগ হয় যা সত্যিই অবিশ্বাস্য।

বর্তমানে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে ৩০% মেধায় ও ৭০% কোটায় নিয়োগ হয়।

অন্যদিকে, বাংলাদেশ সামরিক বাহিনীতে অফিসার নিয়োগে মেধাই আসল মানদণ্ড। কোটার কোন প্রয়োগ নেই। যা আমাদের সামরিক বাহিনীকে শক্তিশালী করেছে। কিন্তু সামরিক বাহিনীর সৈনিক পদের নিয়োগে কোটার প্রয়োগ হয়।

বিসিএস পরীক্ষায় কোটা প্রয়োগের চিত্র:

২৮তম বিসিএসে ৮২১টি, ২৯তম বিসিএসে ৮১৬টি, ৩০তম বিসিএসে ৮০৩টি, ৩১তম বিসিএসে ৮১১টি পদে বিভিন্ন কোটায় প্রার্থী না পাওয়ার ফলে শূন্য ছিল। কোটার শূন্য পদগুলো পূরণ করতে মুক্তিযোদ্ধা, আদিবাসী ও নারীদের জন্য ৩২তম বিশেষ বিসিএস নেয়ার সিদ্ধান্ত নেয় পিএসসি। ওই বিসিএসেও এক হাজার ১৩০টি পদ শূন্য রাখতে হয়। শেষপর্যন্ত ৩৩তম বিসিএসের মাধ্যমে তা পূরণের সিদ্ধান্ত হয়। অথচ ৩২তম বিসিএসে উত্তীর্ণ ৯১২ জনই চাকরির সুযোগ পাননি। কারণ এক কোটা থেকে আরেক কোটায় নিয়োগ দেয়া যায় না। এছাড়া ৩৩তম বিসিএসে ৫০২টি, ৩৪তম বিসিএসে ৭২৩টি শূন্য রয়েছে। ৩৫ তম বিসিএস এ ৩৩৮ টি, ৩৬ তম বিসিএস এ ৩৬৬ টি কোটার পদ পূরণ হয়নি।

প্রতি বিসিএসে সাধারণ ক্যাডারে গড়ে ৫০০ জন কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয়। কিন্তু অংশ নেন দুই থেকে সাড়ে তিন লাখ পরীক্ষার্থী। কোটাপদ্ধতির কারণে কেউ যদি সাড়ে তিন লাখ পরীক্ষার্থীর মধ্যে ২২৬তম হন, তাহলে তিনি চাকরি না-ও পেতে পারেন। কারণ, ৫০০ পদের মধ্যে মেধা কোটায় ২২৫ জনকে দেওয়া যাবে। কাজেই ২২৬তম হয়ে তিনি চাকরি পাবেন না। আবার কোটা থাকলে কেউ সাত হাজারতম হয়েও চাকরি পেতে পারেন। এই হলো কোটার ম্যাজিক, তাদেরকে নিয়োগ না দিয়ে উপায় নেই। কোটায় উপযুক্ত প্রার্থী না পেলে পদগুলো সংরক্ষণ করা হয়। মেধা তালিকায় থেকেও অনেকে চাকরি পায় না।

কোটা ব্যবস্থা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও সংবিধান পরিপন্থী:

বাংলাদেশের প্রচলিত বর্তমান কোটা প্রথা সরকারি চাকরি প্রাপ্তির ক্ষেত্রে বৈষম্য তৈরি করছে। ওই বৈষম্য অনেকটা স্পার্টা, উমাইয়া খিলাফত, দক্ষিণ আফ্রিকার শ্বেতাঙ্গ শাসন, বঙ্গের প্রাচীন সেন, ব্রিটিশ ও পাকিস্তানি শাসনের সঙ্গে তুলনীয়। পাকিস্তানি নব্য ঔপনিবেশিক যুগেও যোগ্যতা ও মেধা থাকা সত্ত্বেও বাঙালিরা ছিল সব ধরনের সরকারি চাকরিতে উপেক্ষিত। ড. মো. মাহবুবুর রহমানের মতে, `কেবল সিভিল সার্ভিসেই নয়, ফরেন সার্ভিস, বিভিন্ন স্বায়ত্তশাসিত ও আধাস্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের চাকরিতেও পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে বৈষম্য বিরাজমান ছিল` (বাংলাদেশের ইতিহাস : ১৯৪৭-৭১, পৃ. ৩৪১)। এই বৈষ্যম্যর বিরুদ্ধেই বাঙালিরা মুক্তিসংগ্রামে অবতীর্ণ হয়েছিল।

প্রকৃতপক্ষে যোগ্যতা-মেধার ভিত্তিতে সবার জন্যই সরকারি চাকরির দ্বার উন্মুক্ত করাও মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল। স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে যা স্পষ্ট হয়েছে : `…বাংলাদেশের জনগণের জন্য সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা আমাদের পবিত্র কর্তব্য বিবেচনা করে আমরা বাংলাদেশকে সার্বভৌম গণপ্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রূপান্তরিত করার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করছি…`। কোটা ব্যবস্থার ফলে এ দেশের মানুষের জন্য সেই সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার আদৌ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে কি?

বর্তমান প্রচলিত কোটা পদ্ধতি মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরুদ্ধ, কথাটি বিলকুল সত্য। সংবিধানের চেতনাবিরুদ্ধও বটে। সংবিধানের ১৯(১) ও ২৮(১) অনুচ্ছেদে যথাক্রমে বলা হয়েছে যে `সকল নাগরিকের জন্য সুযোগের সমতা নিশ্চিত করিতে রাষ্ট্র সচেষ্ট হইবেন` ও ‘কেবল ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী-পুরুষভেদে বা জন্মস্থানের কারণে কোন নাগরিকের প্রতি রাষ্ট্র বৈষম্য প্রদর্শন করিবেন না।’ যদিও সংবিধানের ২৯(৩) অনুচ্ছেদে নাগরিকদের `অনগ্রসর অংশের` জন্য চাকরিতে বিশেষ কোটা প্রদান অনুমোদন করেছে। কিন্তু বর্তমান প্রচলিত কোটাব্যবস্থায় অনগ্রসর ও অগ্রসর সবাই একটি বিশেষ শ্রেণিভুক্ত হলেই কোটা ভোগ করছে। ফলে এই সুযোগ কুক্ষিগত করতে প্রতিবছর বাড়ছে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা।

কোটা ব্যবস্থার সংস্কারে কিছু প্রস্তাবনা:-

মুক্তিযোদ্ধা কোটা:

বর্তমানে রয়েছে ৩০ শতাংশ। এটাকে কমিয়ে ৭% এ আনতে হবে। কারন গত কয়েকটি বিসিএস সহ সরকারী চাকরির পরীক্ষায় মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের ৬% এর বেশি পাওয়া যায়নি। বাকি পদগুলো শূণ্য থেকেছে। তাই তাদের বর্তমান সংখ্যার সঙ্গে মিল রেখে এটা ৭% করলে তারা শতভাগ সুযোগ পাবে। কোটার প্রার্থী না পাওয়া গেলে তা সাধারন মেধাবীদের দ্বারা পূরণ করতে হবে। পদ শূণ্য রাখা যাবেনা।

পাশাপাশি বীর মুক্তিযোদ্ধাদেরকে প্রথম শ্রেণীর নাগরিক হিসেবে ভাতা বৃদ্ধি করাসহ সকল ধরনের সহযোগিতা করা হলে তা সব মহলে প্রশংসিত হবে।

নাতি -নাতনী কোটা:

এই ধরনের উদ্ভট কোটা বাতিল করতে হবে। মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের সুযোগ দেয়ার অন্যতম কারন হলো তারা যেনো বৃদ্ধ বয়সে তাদের পিতামাতার ভরণপোষণের সমস্ত দায়ভার বহন করতে সক্ষম হন। সন্তানেরা সেই সুবিধা পেলে নাতি নাতনী কেনো পাবে? তাদের কোন নৈতিক ও যৌক্তিক অধিকার নেই। মেধাবী প্রজন্মের জন্য নাতি নাতনী কোটা গোদের উপর বিষফোঁড়া।

জেলা কোটা:

বর্তমানের উন্নয়নের দিক দিয়ে কোন জোলা পিছিয়ে নেই। মেধাবীদের মূল্যায়ন হলে তা সারাদেশব্যপী সকল জেলার মানুষের সুযোগের সমতা নিশ্চিত করবে। তাই জেলা কোটা তুলে দেয়া উচিত।

প্রতিবন্ধী কোটা:

প্রতিবন্ধী কোটা বর্তমানে আছে ১ শতাংশ। যা বৃদ্ধি করে ২ শতাংশ করা হোক। কারন তারা জন্মগতভাবে শারীরিক সক্ষমতায় পিছিয়ে আছে। তাদের সুযোগ নিশ্চিত করা ছাড়া মানবিক বাংলাদেশ নির্মাণ করা যায় না।

উপজাতি কোটা:

বর্তমানে আছে ৫ শতাংশ। যা কমিয়ে ১ শতাংশে আনা খুবই যুক্তিযুক্ত। রাষ্ট্রীয় কাজে যারা নেতৃত্ব দিবে তাদের মেধার পরীক্ষায় অবশ্যই অন্যান্যদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে টিকতে হবে। এখন পার্বত্য অঞ্চলের মানুষের সুযোগ সুবিধা বৃদ্ধি পেয়েছে। তাদের উন্নয়নের জন্য বিশেষ মন্ত্রণালয় আছে। পার্বত্য এলাকায় স্থানীয় সকল নিয়োগে তারা শতভাগ সুবিধা পেয়ে থাকেন।

নারী কোটা:

নারীদের জন্য যে ১০% কোটা পদ্ধতির ব্যবস্থা রাখা হয়েছে, তা তাদের মানবিক মর্যাদাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। নারীরা আজ পুরুষের চেয়ে নানা দিকে এগিয়ে। নারীর ক্ষমতায়নে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান ৬ষ্ঠ স্থানে। সংবিধান অনুযায়ী তারা কর্মক্ষেত্রে সমান অধিকার ও সুযোগ পাচ্ছে। মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক, বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিক্যাল, ইঞ্জিনিয়ারিংসহ নানা পরীক্ষায় তাঁরা ছেলেদের টপকে শীর্ষস্থান অধিকার করছেন। নারী শিক্ষায় আমরা আর পিছিয়ে নেই। বিসিএস পরীক্ষায় প্রথম হওয়ার কৃতিত্বও তাঁদের রয়েছে। অন্যান্য কোটা কমিয়ে দিলে মেধার দ্বারাই নিয়োগের সমান সুযোগ পাবে নারীরা। তাই অনগ্রসর শ্রেণি হিসেবে বিবেচনা করে তাঁদের জন্য বিশেষ কোটার যৌক্তিকতা এখন আর নেই।

উত্তর-আধুনিক বাংলাদেশে কোটা পদ্ধতির যৌক্তিকতা পুনর্মূল্যায়ন করা যেতে পারে। প্রচলিত কোটা প্রথার সংস্কার সময়ের দাবি। অনগ্রসর জনগোষ্ঠীকে কোটা প্রদানে আমাদের আপত্তি নেই। তবে, সকল নিয়োগে মুক্তিযোদ্ধা, উপজাতি ও প্রতিবন্ধী মিলিয়ে মোট ১০ শতাংশের বেশি কোটা থাকা বর্তমান পরিস্থিতিতে কোনভাবেই যৌক্তিক নয়।

কোটায় নিয়োগপ্রাপ্তদের বর্তমান মানসিক অবস্থা:

সত্যিকারের বীর মুক্তিযোদ্ধাদের দেখেছি তারা নিজেদের কে সবার সামনে বুক ফুলিয়ে গর্বের সঙ্গে পরিচয় দেন। কিন্তু তাদের সন্তান বা নাতি নাতনীরা কোটা সুবিধার কারনে চাকরি পেয়ে তা স্বীকার পর্যন্ত করেনা। তাদের নিয়োগ পত্র ও গেজেট না দেখা পর্যন্ত বোঝার উপায় নেই যে তারা কোটাধারী। এ কেমন আচরণ তাদের, মুক্তিযোদ্ধার সন্তান হয়ে তাদের গর্বিত পিতার পরিচয় সবার সামনে দিতে লুকোচুরি করে। কোটায় চাকরি পেয়ে তাদের অনেকেই মেধায় পেয়েছে বলে দাবী করে। কোটায় চাকরি পেয়ে তা স্বীকার করতে হীনমন্যতায় ভোগে। যারা মুক্তিযোদ্ধার সন্তান হিসেবে নিজেকে পরিচয় দিতে লজ্জা পায় জাতি তাদের দ্বারা কি উপকার লাভ করবে তা বোধগম্য নয়। এটাতো তাদের গর্বের সঙ্গে বলা উচিত, কারন মুক্তিযোদ্ধাদের অকৃত্রিম সাহস ও জীবনের বিনিময়ে আজকের স্বাধীন বাংলাদেশ। স্যালুট জানাই প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের। তবে তাদের সন্তানদের ভূমিকা সন্তোষজনক নয়।

বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ার জন্য যাদের পিতামাতা যুদ্ধ করেছিলেন ও জীবন দিয়েছিলেন। তাদের সন্তানেরাই আজ আবার মুক্তিযোদ্ধা সন্তান কমান্ড গঠন করে ৩০% কোটা সংরক্ষণের জন্য মাঠে নেমেছে। পরিবার থেকে বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই করার বিষয়টা হয়তো তারা আয়ত্ত্ব করতে চায় না বা করেনি। বীর মুক্তিযোদ্ধাদের অবদান স্বীকার করে, তাদের নানা ধরনের সুযোগ সুবিধা প্রদান করলে কেউ অখুশি হবেনা। কিন্তু আপনারা যারা মুক্তিযোদ্ধার সন্তান হিসেবে পরিচয় দেয়ার সুযোগ পাচ্ছেন, সেই সন্তানদের অবদান টা কি??

এসব যৌক্তিক প্রশ্ন করলে সে আবার হয় জঙ্গি শিবির, দেশপ্রেমীক নয় বলে তাকে স্বীকৃতি দেয়া হয়। কিন্তু এটা তো বাস্তবসত্য যে দেশপ্রেমিক ও দেশদ্রোহী হতে গেলে কোন নির্দিষ্ট পরিবার লাগেনা। কারন অনেক মুক্তিযোদ্ধার সন্তানকে দেখেছি রাজাকারদের দল করতে। দেশের ৯৯.৮৭ শতাংশ জনগণের দাবী এটা, তাই কোটা সংস্কার চাইলেই দেশপ্রেম কমে না। এসব সস্তা দোষ দিয়ে এই যুগে আর টিকতে পারবেন না, মানুষ আর এসব সস্তা কথার মূল্য দেয় না। টিকতে হলে মেধা দিয়ে টিকে থাকতে হবে, কোন বিশেষ সুযোগের মাধ্যমে নয়।

কোটায় কোণঠাসা মেধাবীদের মনের কষ্ট:

সাধারন প্রার্থী অনেকেই ৪/৫ বার বিসিএস ভাইভা দিয়েও ক্যাডার হতে পারেনি, কিন্তু একবার ভাইভা দিয়ে তুলনামূলক কম নম্বর পেয়েও কোটায় ক্যাডার হয়ে যায়। তুলনামূলক কম নম্বর পেয়ে কোটার কারনে এমন সুযোগ পেয়ে নিয়োগ পাওয়ার নজীর স্থাপন হয় তাদের সামনে। বিষয়টা মেধাবীদের জন্য খুবই কষ্টের ও হতাশার। এভাবে নিয়মিত বঞ্চিত হয়ে যে চাকরি তারা পায় তাতে তার হয়তো জীবিকার চাহিদা মেটে কিন্তু সেই বৈষম্যের কারণে বাদ পরার বিষয়টা সারাজীবন ভুলতে পারেনা। ফলে চাকরি প্রাপ্তিতে পরিস্কার বৈষম্যর শিকার হয়ে তার বর্তমান দায়িত্ব পালনে অনেকটা অনীহা দেখায়। কিন্তু সুযোগের সমতা থাকার পর যদি তারা পছন্দমত চাকরি না পেতো তাহলে তারা রাষ্ট্রকে দোষারোপ করতে পারতোনা, নিজের মেধার সীমাবদ্ধতা বুঝতে পারতো। তখন চাকরি ও ব্যক্তি জীবনে সন্তুষ্টি অর্জনের মাধ্যমে রাষ্ট্রের সেবায় নিয়োজিত হতে পারবে। সুযোগ না পাওয়ার চাপা ক্ষোভে সারাজীবন পুড়বে না। তাই প্রতিযোগিতায় সমান সুযোগ নিশ্চিত করার জন্য কোটার সংস্কার আবশ্যক।। এটা সকল মেধাবীর প্রাণের দাবী। প্রায় ৯৯ শতাংশ জনগণের দাবীকে মূল্যায়ন করার এখনি সঠিক সময়।

সবদিক দিয়ে বিবেচনা করলে একটা কথাই স্পষ্ট যে, আগামীর উন্নত বাংলাদেশ গঠনে তরুণরাই মূল ভূমিকা পালন করবে। সুতরাং যত দ্রুত সম্ভব কোটা সংস্কার করে মেধাভিত্তিক নিয়োগের মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনাসহ সকল ক্ষেত্রে মেধাবীদের সর্বোচ্চ অংশগ্রহন নিশ্চিত করাই হবে সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত। আগামীর উন্নত বাংলাদেশে মেধাবীরাই থাকবে চালকের আসনে, মেধা দিয়েই জয় করবে বিশ্বসেরা স্বীকৃতি। কোটার সংস্কার হোক, মেধা মুক্তি পাক।

(সংক্ষেপিত)

Comments

comments