বিরতিহীন প্রশ্নফাঁস ঠেকাতে অপারগ মন্ত্রণালয়

বিরতিহীনভাবে ফাঁস হচ্ছে পাবলিক পরীক্ষাসহ বিভিন্ন নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্ন। শিক্ষা মন্ত্রণালয় বলছে প্রশ্নফাঁস ঠেকাতে সব পদক্ষেপই নেয়া হচ্ছে। কাজ করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। কিন্তু সব চেষ্টাকে ব্যর্থ প্রমাণ করে একের পর এক প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা ঘটেছে। সর্বশেষ চলমান এসএসসি পরীক্ষা শুরুর আগে থেকেই বলা হচ্ছিল প্রশ্ন ফাঁসের প্রমাণ পেলেই পরীক্ষা বাতিল করা হবে। পরে প্রশ্ন ফাঁসকারীদের ধরিয়ে দিতে পুরস্কার ঘোষণা করেন শিক্ষামন্ত্রী।
তবে কিছুতেই থামেনি প্রশ্নফাঁস। এ পর্যন্ত প্রত্যেকটি পরীক্ষার প্রশ্নই পরীক্ষা শুরুর আগে ফাঁস হয়েছে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। ইতিমধ্যে ফাঁসের সঙ্গে জড়িত কয়েকজনকে আটক করা হয়েছে। গ্রেপ্তার করা হয়েছে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদেরও। তবে এখন পর্যন্ত প্রশ্ন ফাঁসের হোতাদের ধরতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এমন অবস্থায় গতকাল প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা তদন্তে বিচার বিভাগীয় কমিটি গঠন করে দিয়েছেন হাইকোর্ট। গতকাল শিক্ষা সচিব প্রশ্নফাঁস ঠেকাতে মন্ত্রণালয়ের অপারগতার বিষয়টি প্রকাশ করে বলেছেন, প্রচলিত ব্যবস্থায় প্রশ্নফাঁস ঠেকানো সম্ভব নয়। ফাঁস ঠেকাতে নতুন পদ্ধতির চিন্তাভাবনা হচ্ছে বলে তিনি জানিয়েছেন। তার মতে, প্রশ্ন আগেও ফাঁস হতো, কিন্তু এখন তা বিস্তৃত হচ্ছে ইন্টারনেটকে মাধ্যম করে। এখন প্রশ্নফাঁস হওয়ার পর ইন্টারনেটের মাধ্যমে মুহূর্তের মধ্যে সব জায়গায় ছড়িয়ে পড়ছে। নৈতিক অবক্ষয়কেও প্রশ্ন ফাঁসের জন্য দায়ী করেন তিনি। প্রশ্নফাঁস প্রতিরোধে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো আপ্রাণ চেষ্টা করছে জানিয়ে সচিব বলেন, মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি ব্যক্তিগতভাবেও তিনি চেষ্টা করছেন। আমাদের যারা গুণী ব্যক্তি আছেন, তাদের নিয়ে বসে নতুন কোনো পথ যদি উদ্ভাবন করা সম্ভব হয়, তাহলে পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁস রোধ করা সম্ভব। প্রশ্নফাঁস হলে পরীক্ষা বাতিল করা হবে বলে আগের ঘোষণার বিষয়ে সচিব বলেন, এ বিষয়ে একটি কমিটি করা হয়েছে তাদের সুপারিশ অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। আদালত যে আদেশ দেবে অবশ্যই পরিপূর্ণভাবে তা প্রতিপালন করা হবে। আমাদের কোনো নিষ্ক্রিয়তা থাকলে সেই বিষয়ে আমাদের বক্তব্য অবশ্যই আদালতের কাছে উপস্থাপন করবো।
অন্যদিকে অনেকটা অসহায়ত্ব প্রকাশ করে প্রশ্নফাঁস ঠেকানোর অপারগতা প্রকাশ করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের গঠিত তদন্ত কমিটি। তারা বলছেন, প্রশ্নফাঁস হচ্ছে এটা সত্য। তবে পরীক্ষা বাতিল করার কোনো যৌক্তিকতা দেখছে না তারা। তবে প্রশ্নফাঁস ঠেকাতে সরকারি অন্যান্য সংস্থার আরো জোরালো ভূমিকা চান কমিটি। কিন্তু পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো বলছে প্রশ্ন ফাঁসের সঙ্গে বোর্ডের একটি সিন্ডিকেট যুক্ত। তারা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে ভালো ফলাফল করিয়ে দেয়ার সহায়তা করতে গিয়ে এ ধরনের অনৈতিক কাজে জড়িয়ে যাচ্ছে। আটক হওয়া ব্যক্তিদের তথ্যের ভিত্তিতে এই হোতাদের ধরার কাজও চলছে বলে জানা গেছে। প্রশ্নপত্র ফাঁসের মূল হোতাদের শনাক্ত করতে রাঘব বোয়ালদের নাম পাচ্ছেন গোয়েন্দারা। ইতিমধ্যে এই চক্রের মূল হোতাদের সম্পর্কে বেশ তথ্য মিললেও কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এমিরেটাস প্রফেসর সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী মানবজমিনকে বলেন, প্রশ্নফাঁস এখন মহামারি আকার ধারণ করেছে। পুরো শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য প্রশ্নফাঁস হুমকি হয়ে গেছে। এজন্য পরীক্ষা নির্ভয় শিক্ষা ব্যবস্থাকে দায়ী করছেন তিনি। তারা মতে, পরীক্ষা কমিয়ে আনলেই প্রশ্নফাঁস রোধ সম্ভব। প্রশ্নফাঁস বাণিজ্যিক আকার ধারণ করেছে। এটি নষ্ট করতে হবে। বাজারে চাহিদা নষ্ট করতে হবে। এটি শুধু পরীক্ষা কমিয়ে করা সম্ভব। তিনি বলেন, দেশে গোয়েন্দারা জঙ্গিসহ রাজনৈতিক ইস্যুতে দক্ষতা দেখালেও এখানে কেন পারছেন না এটিও দেখার দরকার।
মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র বলেছে, মন্ত্রণালয় ও শিক্ষা বোর্ডগুলোতে দীর্ঘদিন চাকরি করছেন এমন কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর দিকে নজরদারি রাখছে গোয়েন্দারা। তাদের মধ্যেই প্রশ্নপত্র ফাঁস চক্রের মূল হোতা রয়েছে বলে ইতিমধ্যেই তথ্য মিলেছে। রাজধানীর উত্তরায় মাইলস্টোন ও ট্রাস্ট কলেজ থেকে প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগ উঠার পর তা তদন্ত করছে গোয়েন্দারা। এই দুই স্কুলের সঙ্গে ঢাকা শিক্ষাবোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক ও সচিবের সরাসরি সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠেছে। এছাড়াও শিক্ষামন্ত্রীর পিও মোতালেব এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মচারী নাসির গ্রেপ্তার হলেও শিক্ষাবোর্ডগুলোর সিন্ডিকেট ভাঙ্গা হয়নি। যাদের অনেকেই এই প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে জড়িত রয়েছেন।
বোর্ডের কর্মকর্তারা জানান, বোর্ডের একটি সিন্ডিকেট তাদের পছন্দের স্কুলের ভালো ফলাফল করানো দায়িত্ব নেন। এরপর ওই প্রতিষ্ঠানের কেন্দ্র তাদের পছন্দের প্রতিষ্ঠানের দেয়া হয়। ওই স্কুলের শিক্ষকদের দিয়ে প্রশ্নফাঁস করিয়ে নৈর্ব্যক্তিক প্রশ্নগুলো উত্তরসহ স্লাপাই দেয়া হয়। সম্প্রতি রাজধানীর উত্তরায় ট্রাস্ট কলেজে সিট পড়া একটি কলেজের শিক্ষার্থীর এই সুযোগ দেয়ার পর তা ধরা পড়ে গোয়েন্দাদের হাতে। এই প্রতিষ্ঠানটি সম্পর্কে তদন্ত করছে পুলিশ ও গোয়েন্দাদের। এর সঙ্গে বোর্ডের কারা জড়িত তাও খতিয়ে দেখছে তদন্ত কমিটি।
এদিকে পুলিশ ও গোয়েন্দা সূত্র জানিয়েছে ফাঁসের হোতাদের খোঁজে নেমেছেন তারা। এর আগে কোনো বারই মূল হোতাদের খুঁজে বের করা যায়নি। ঢাকা মহানগর পুলিশের ডিসি মাসুদুর রহমান বলেছেন, যাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। তাদের কাছ থেকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মিলেছে। অনেকের সম্পৃক্ত থাকারও তথ্য মিলেছে। তাদের গ্রেপ্তারে চেষ্টা চলছে। তিনি বলেন, যারা গ্রেপ্তার হয়েছে তারা সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতেই গ্রেপ্তার হয়েছেন।

প্রশ্নফাঁস: দুটি তদন্ত কমিটি করে দিয়েছেন হাইকোর্ট
চলতি বছরের এসএসসি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা তদন্ত ও তা রোধে দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করে দিয়েছেন হাইকোর্ট। প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনার প্রতিকার চেয়ে করা এক রিট আবেদনের শুনানি শেষে গতকাল বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী ও বিচারপতি মো. ইকবাল কবিরের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এই কমিটি গঠন করে দেন এবং রুল জারি করেন। দুটি কমিটির মধ্যে প্রশাসনিক কমিটির নেতৃত্বে থাকবেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক মোহাম্মদ কায়কোবাদ। আর ঢাকা জেলা ও দায়রা জজের নেতৃত্বে একটি বিচারিক কমিটি গঠন করে দেয়া হয়েছে। প্রতিটি কমিটির সদস্য সংখ্যা পাঁচজন করে। ৩০ দিনের মধ্যে দুটি কমিটিকে প্রতিবেদন জমা দিতে হবে। এর আগে রিট আবেদনের শুনানি শেষে প্রশ্নফাঁস ঠেকাতে ব্যর্থতাকে কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না- তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেন হাইকোর্ট। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব, আইন মন্ত্রণালয়ের সচিব, আইন মন্ত্রণালয়ের ড্রাফটিং উইংয়ের সচিব, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব, তথ্য প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব, বিটিআরসি’র সচিব-চেয়ারম্যান, বিটিসিএল প্রধান, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, চেয়ারম্যান, ঢাকা-রাজশাহী, কুমিল্লা, যশোর, চট্টগ্রাম, বরিশাল, সিলেট ও দিনাজপুর উচ্চমাধ্যমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড ও মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান এবং পুলিশের মহাপরিদর্শককে আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে রুলের জবাব দিতে বলা হয় আদেশে।
একের পর এক প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় চলতি এসএসসি পরীক্ষা বাতিল করে নতুন প্রশ্নপত্র দিয়ে পুনরায় পরীক্ষা নেয়া, প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনায় বিচারিক ও প্রশাসনিক তদন্ত কমিটি গঠন এবং প্রশ্ন ফাঁসের অপরাধ দমনে আইন প্রণয়নের নির্দেশনা চেয়ে বুধবার এই রিট আবেদনটি করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী আইনুন্নাহার সিদ্দিকা, সিকদার মাহমুদুর রাজি, মো. রাজু মিয়া ও নূর মোহাম্মদ আজমী। রিটকারীদের আইনজীবী জ্যোতির্ময় বড়ুয়া সাংবাদিকদের বলেন, প্রশ্ন ফাঁসের সঙ্গে কারা জড়িত তা খুঁজে বের করবেন বিচারিক তদন্ত কমিটি। আর প্রশাসনিক কমিটি প্রশ্নফাঁস প্রতিরোধে কী ব্যবস্থা নেয়া যায়, তা নির্ধারণ করবেন। তিনি বলেন, প্রতিবেদন দিতে দুটি কমিটিকে ৩০ দিন সময় দেয়া হয়েছে।

Comments

comments