অভিবাসী ইসলামের আদলে নয়া উপনিবেশি ইবাদত

মুহাম্মাদ আসাদুজ্জামান: প্রাচ্যবাদী ওয়ায়েজিনরা একটা মন্ত্র ফুঁকে দিয়েছিলো পৃথিবীতে: “বর্তমান বিশ্বে ইসলামই সবচে বেশি ক্রমপ্রসারমান ধার্মিক অস্তিত্ব”। অসংখ্য মুসলিম-ই ফুঁকিত হয় এই ওয়াজের রোশনাইয়ে; ইতিহাস স্বাক্ষী। সমস্যা হচ্ছে, প্রাচ্যবাদীরা এটি কোন সমাজতাত্ত্বিক তথ্য হিসেবে পেশ করেনি; এটি নিতান্তই উপনিবেশি প্রচারকৌশলের অংশ হিসেবে ব্যাবহৃত হয়েছে। ‘ইসলাম সবচে দ্রুত ছড়িয়ে যাচ্ছে’ মানে হচ্ছে, দুনিয়া যেন এদিকে নজর দেয় নিয়ন্ত্রনী পদক্ষেপ নিতে। এছাড়াও আরেকটি জঘন্য বর্ণবাদী “পর্যবেক্ষন” প্রচার হয়ে গেল যে, মুসলিমদের নাকি জন্মাহার বেশি। জন্মাহার বেশি, তাই এটাকে উপনিবেশি ক্ষমতা কাঠামোর নিরবচ্ছিন্ন হামদর্দ থেরাপি দিতে হবে যাতে বৈশ্বিক ‘সুস্থতা’ বজায় থাকে। সুতরাং আফ্রিকা ও ইন্ডিয়ায় গিয়ে পোয়াতিরোধন বড়ি/বেলুন ব্যাবসা, কালো-বাদামীদের উপর বিভিন্ন ড্রাগ-টেস্ট ও ক্লিনিকাল ট্রায়াল, প্রজনন নাশক টিকা প্রদান ইত্যাদি ব্যাপারগুলো যেমন করে ‘সুন্দর পৃথিবী’ বিনির্মানকল্পে জায়েজ হয়েছিলো, সেগুলোই আবার নুতন মোড়কে মুসলিম-প্রধান জাতিরাষ্ট্রগুলোতে ‘কাছে আসার গল্প’ হয়ে গেলো।

এই যে প্রাচ্যের বিভিন্ন ব্যাপার নিয়ে, বিশেষ করে মুসলিমদের নিয়ে, যেই তাড়না পশ্চিম অনুভব করে, এখান থেকেই রাজনৈতিক-হেজ্যামনিক ইসলামোফোবিয়ার যাত্রা শুরু। ইসলামোফোবিয়া হচ্ছে ‘কোল্ড-ওয়র’ পরবর্তী পশ্চিমের “উত্তর”-উপনিবেশী উদ্বেগের জন্মগোত্রীয়তা। এই প্রকল্পের অন্যতম সুবেদার বার্নার্ড লুইস ইসলামোফোবিয়াকে একাডিমিয়ায় শাস্ত্রকথন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। আর তার শাগরেদ ড্যানিয়েল পাইপস লুইসের অপ্রাতিষ্ঠানিক ও ‘রাজনৈতিকভাবে অ-শ্লীল’ কথাগুলো ওয়াজ করে বেড়িয়েছে। আবুল ফাদল লুইসের ছাত্র ছিলেন। উনি বলছিলেন যে, কোন এক পার্টিতে মাতাল অবস্থায় লুইস বলে উঠেন যে তার ‘স্লেইভারি ইন দ্য মিডল ইস্ট’ লেখা হয়েছে শুধু এই আতংকেই যে আফ্রো-আমেরিকান জনপদে ইসলাম অনেক গ্রহনযোগ্যতা পাচ্ছিলো; আর ‘সেমাইটস এন্ড এন্টাই-সেমাইটস’ লিখেছিলেন যখন দেখা গেলো পশ্চিম জাতিরাষ্ট্রগুলোতে ইসলাম বাজার পেয়ে যাচ্ছে। লুইস একাডেমিক ভদ্র বয়ান বানান, আর তার শাগরেদরা সেগুলোর সফল রাজনৈতিকরণ করে বেড়ায়।

যখন পশ্চিম ইসলামোফোবিয়ার শিল্পপ্রকল্প তৈয়ারে মনোনিবেশ করছে, তখন মুসলিমরা পশ্চিমের সেই ‘মানসিক অস্থিরতার’ পরিচর্যা করে যাচ্ছে এটা প্রমাণ করতে যে “তারা এই সেক্যুলার দুনিয়ায় কোন হুমকি” নন। পশ্চিম বারবার মুসলিমদের নিকট প্রতি-ইসলামপন্থী একটি পরিচয় দাবী করে এসেছে ‘তাদের’ সেক্যুলার দুনিয়ায় সমীভূত হতে, যাতে তারা বিশ্বজনীন সমজাতীয় সভ্যতায় ঠাই করে নিতে পারে। ‘ইসলাম সবচে দ্রুত ছড়িয়ে যাচ্ছে’ এই মঞ্চ নাটকের পেছনপর্দায় ধারাবাহিকভাবে এবং একনিষ্ঠভাবে দুনিয়ায় ‘খৃষ্ঠীয়করণের’ প্রকল্প চালানো হয়েছে। আমাদেরকে বলা হয় আমরা নাকি ‘ধর্ম-উওর’ এক জামানায় আছি; হিপ্সটার মুসলিমরা বুক ফুলিয়ে বলে আমরা পোস্ট-রিলিজান সভ্যতায় আছি। যদিও আমরা ‘ধর্ম-উত্তর’ যুগে আছি, কিন্তু কেন যেন মিশনারি প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যাঙ্গের ছাতার মতো বাড়তে থাকে। আমেরিকা ‘সেক্যুলার রাষ্ট্র’, এটা তাদের সংবিধান ও পররাষ্ট্রনীতির মৌলিক উপপাদ্য। অথচ এই ‘সেক্যুলার’ রাষ্ট্রই ফিলিপাইনে গিয়ে ব্যাপক হারে মিশনারি প্রোজেক্ট বাস্তবায়নে প্রত্যক্ষ ভূমিকা রাখে। একি ব্যাপার ঘটিয়েছে জাপান, তাইওয়ান, দক্ষিন কোরিয়া, ও চীনের সাথে। চীনের তো এমন অবস্থা যে, সেখানে দিনরাত উইঘুরদেরকে জবাই করা হলেও, খৃষ্টীয় কোন মিশনারি প্রতিষ্ঠানের কার্যকলাপ বিঘ্ন করার এক ছটাক স্পর্ধাও প্রকাশ করা হয়না। আফ্রিকার দিকে নাইবা গেলাম। মুসলিমদের অভ্যাস হয়ে দাড়িয়েছে ‘অন্যের’ ঐতিহাসিক বিবরণকে নিজের করে নেয়াতে। পশ্চিমের হাটুর নিচে বসে কৈফিয়তমূলক ধর্মচারীতার বাইরে গিয়ে ‘নিজস্ব’ কোন রাজনৈতিক, সমাজতাত্ত্বিক, ও ঐতিহাসিক জিজ্ঞাসা করার কোন ‘ইচ্ছা-শক্তি’ জাগ্রত হতে চায়না। বিশ্বায়ন প্রকল্পের নামে যে ‘খৃষ্টিয়করণ’ হচ্ছে, এবং ডোনাল্ড ট্রাম্প যে ক্ষমতায় আছে – এগুলো কোন বিক্ষিপ্ত ব্যাপার না। ট্রাম্প খৃষ্টান না হতে পারে, এমনকি ধার্মিকও না হতে পারে; তার মানে এই নয় যে, সারা বিশ্বে পশ্চিম তার প্রভাব বিস্তারের লক্ষ্যে এক প্রকারের খৃষ্টীয়তাকে পুঁজি করছেনা। মিশনারিদের ক্রমাগত ইভাঞ্জেলিকাল প্রচারনায় আমরাও তাদের মতো করে মিশনারি স্টাইলে ওয়াজ-মিলাদ-কিয়াম করে দ্বিন কায়েম করতে চাই, দা’ওয়া করতে চাই।

আমাদের এই ইসলাম অভিবাসী ইসলাম। আমরা এখন নৃতাত্ত্বিক মসজিদ (সাংস্কৃতিক কেন্দ্র) বানাই – হিন্দি মসজিদ, পাকিস্তানী মসজিদ, তাবলিগি মসজিদ, ব্রেলভি মসজিদ, ইত্যাদি ইত্যাদি। আমাদের নুতন প্রজন্ম মানুষের কাছে ‘পরম সত্যের দাওয়াত’ দিতে লজ্জা পায়; কারণ, এই ‘ধর্ম-উত্তর’ যুগে নিজের বিশ্বাস-ব্যাবস্থা ছড়িয়ে দেয়াটা এক ধরণের ‘অভদ্রতা’। অথচ সমাজতত্ত্ব আমাদের বলে দিচ্ছে আমরা কার্যকরীভাবে কেবল হিজ্যামনিক তাফসিরের আওতায় মধ্য দিয়েই নিজেদেরকে অর্থপূর্ণ করতে পারছি। আমরা যখন ব্যাস্ত আছি ‘সেক্যুলার বিধি’ মোতাবেক নিজেদের অর্থপূর্ণ করতে, তখন পশ্চিম নিজেই এইসব নীতিমালা মেনে চলেনা যাতে করে আমরা ‘শাদা পুরুষের’ প্রতি কোন ‘প্রতিরোধ’ না দেখাই। নিয়ম না মেনেই তারা কোটি কোটি টাকা ঢালছে মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার ক্যাথলিক ও প্রোটেস্ট্যান্ট মন্দিরগুলোতে যাতে ঐসব অঞ্চলে ইসলাম কেবল একটি আরব পরিচয় হিসেবে হাজির থাকে। আর আরব প্রমাণ হলেই খুব সহজেই ইসলামকে বর্নবাদীয় বয়ানে আনা যায় এবং পৃথিবীর কাছে মুসলিমদের ড্রাকুলা বর্বর প্রমাণ করা যায়।

যারা য়্যোরোপের ইসলামায়ণ করতে চান, আর কতো? আপনি যতোই বলবেন আপনি ‘হুমকি’ না, কোনদিন এতটুকুন প্রতিশ্রুতি যথেষ্ট হবে না। আপনাকে শেষাবধি বলা হবে আপনি তাকিয়্যা করছেন (অর্থাৎ আপনি প্রকৃতিগতভাবে মিথ্যুক)। দাসরা যতোই মনীবের মতো হতে চায়, কোনদিন তা হয়ে উঠতে দেয়া হয়না। এই ‘উঠতে না দেয়ার’ জন্য মনীব কিছু নেইটিভ ইনফর্মেন্ট তৈরি করে যারা আমাদেরকে বোঝাবে ‘প্রতিরোধ’ খারাপ জিনিস, এবং মনীবের বশ্যতাই মুক্তির পয়গাম। জুহদি জাসের, শিরিন কুদসি, তাউফিক হামিদ, সালিম মানসুর প্রমুখ এই প্রজাতির। খৃষ্টানরা ‘সেক্যুলারাইযেশানের’ দোহাইয়ে নিজেদেরকে এগিয়ে নিচ্ছে, ইহুদীরা পুরাণ যুগের ঐতিহাসিকতাকে পুঁজি করে নিজেদের এগিয়ে যাচ্ছে, আর আমরা রোহিঙ্গাদের গণহত্যার সময় নিজেদের মাঝে তাকফির ও গীবত করে বেড়াচ্ছি। অভিবাসী ইসলামে এসাইলাম নিচ্ছি।

মূল: আবুল ফাদল

Comments

comments