ইউএনওর ফেসবুকে ‘হাওর রক্ষা বাঁধ নির্মাণে ভয়ঙ্কর খেলা’র অভিযোগ

নেত্রকোনার খালিয়াজুরীতে ‘হাওর রক্ষা বাঁধ নির্মাণে ভয়ঙ্কর খেলা’র অভিযোগ করেছেন স্বয়ং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও)। তিনি তার পরিচালিত ‘উপজেলা প্রশাসন খালিয়াজুরী নেত্রকোণা’ নামের ফেসবুক আইডিতে একটি পোস্টের মাধ্যমে এ অভিযোগ করেন।

বাঁধ নির্মাণ কাজে অসন্তোষ প্রকাশ করে ইউএনও সরকার আব্দুল্লাহ আল-মামুন বাবু ১০ ফেব্রুয়ারি লিখেছেন- ‘কীর্তনখোলা বেড়ি বাঁধ নিয়ে পিআইসি সভাপতি সদর ইউনিয়নের মেম্বার অজিত ভয়ঙ্কর খেলায় মেতেছে। গত ১০/১/১৮ তারিখে কীর্তনখোলা বেড়িবাঁধে তার অংশ আমি নিজে উদ্বোধন করি। কাল এক মাস পর গিয়ে দেখি নামকা ওয়াস্তে কিছু মাটি ফেলে একটা ভাঙা অংশ বন্ধ করেছে। মাত্র ৫ ভাগ কাজ করেছে। তার বরাদ্দ ২৪ লক্ষ টাকা। এতদিনে শ্রমিক দিয়ে মাটি ফেললে তার কাজ ৭০ ভাগ হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু লাভের আশায় গত ১ মাস ধরে সে ভেকু আর গাড়ি খুঁজে বেড়াচ্ছে। সবাই মেশিন পেলেও সে পায় না। কিভাবে কাকে ধরতে হবে প্রশাসনের জানা আছে।’

ফেসবুকে পোস্ট দেয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ইউএনও সরকার আব্দুল্লাহ আল-মামুন বাবু।

তিনি আরো বলেন, ৩০ নভেম্বর এখানে যোগদানের দিনেই আমাকে স্বাক্ষর করতে হয়েছে পিআইসি কমিটি অনুমোদনে। বাঁধের কাজকে তরান্বিত করতেই তেমন যাচাই বাচাই না করে খুব দ্রুত পিআইসি অনুমোদন দেয়া হয়েছে।

সম্প্রতি, অভিযোগের প্রেক্ষিতে কয়েকটি পিআইসি’র সভাপতি ও সদস্যদের বাতিল করে অন্যদের নিয়োগ করা হয়েছে।

খালিয়াজুরী সদর সংলগ্ন ফসল রক্ষা বাঁধ কীর্তনখোলা। চলতি অর্থ বছরের প্রায় ১১ কোটি টাকার কাজ চলছে উপজেলায় ৪৫ টি প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির (পিআইসি) মাধ্যমে।

এর মধ্যে ২৪ লক্ষ টাকা বরাদ্দে বাঁধের একটি অংশে কাজ করছেন পিআইসি সভাপতি সদর ইউনিয়নের মেম্বার অজিত।

নেত্রকোনা পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) কাজের বিনিময়ে টাকা (কাবিটা) কর্মসূচির আওতায় এ বাঁধ মেরামত কাজ ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে শেষ হবার কথা রয়েছে। সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে বর্তমানে নির্মাণ কাজ অসমাপ্ত রয়েছে প্রায় ৯৫ ভাগ।

নির্দিষ্ট সময়ে এ বাঁধ হলে বন্যার কবল থেকে বাঁচবে হাওরের হাজার হাজার হেক্টর ফসল, নচেৎ নয়। অথচ, শুধুমাত্র নিজেদের লাভের আশায় এ বাঁধের কাজ না করে সময় পার করছে ওই প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (পিআইসি)।

এব্যাপারে পিআইসি সভাপতি সদর ইউনিয়নের মেম্বার অজিত সরকার পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, প্রকল্পের অর্থ হাতে পেয়েছি বিলম্বে। ৪ ফেব্রুয়ারি টাকা পাওয়ায় কাজে বিঘ্ন ঘটেছে।

এ মূহুর্তে হাওরে ফসল রক্ষার অন্যান্য বাঁধ নির্মাণ কাজ নিয়ে স্থানীয় কৃষকরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তারা বলেন, উপজেলায় শুধুমাত্র কীর্তনখোলা বাঁধ নয় চাকুয়া ইউনিয়নের বাগানবাড়ি ও রানিচাপুরের পাশে দুটি নদীর বাঁধসহ বেশ কয়েকটি বাঁধের কাজের গতি খুবই কম। যথা সময়ে বাঁধ নির্মাণ না হবার সম্ভাবাই বেশি।

এমনটি হলে গত বছরের মতো এবারো হয়ত আগাম বন্যার হাত থেকে বোরো ফসলের শেষ রক্ষা হবে না।

এখানকার কাজে রয়েছে হ-য-ব-র-ল অবস্থা। রয়েছে ব্যাপক অনিয়ম। কেউ কেউ বলছেন, দুর্নীতিও হচ্ছে।

খালিয়াজুরী উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও পাউবো’র উপজেলা কাবিটা বাস্তবায়ন কমিটির সদস্য গোলাম কিবরিয়া জব্বার জানান, খালিয়াজুরীর ইউএনও ও কাবিটা বাস্তবায়ন কমিটির সভাপতি শুধুমাত্র ইউপি চেয়ারম্যানদের গুরুত্ব দিয়ে নিয়ম বহির্ভূত ভাবে এখানকার অধিকাংশ পিআইসি করেছেন।

নীতিমালায় রয়েছে বাঁধ সংশ্লিষ্ট হাওরের প্রকৃত কৃষকদের নিয়ে গঠন করতে হবে পিআইসি। এ নিয়ম না মেনে প্রায় ১১ কোটি টাকার কাজে উপজেলায় ৪৫ টি পিআইসির প্রায় সবকটাতেই সভাপতি রাখা হয়েছে ইউপি চেয়ারম্যান-মেম্বারদের। আর সদস্য করা হয়েছে তাদের আত্মীয়-স্বজন ও বাড়ির কামলা-কাজলাদের (শ্রমিকদের)।

এ ধরনের পকেট কমিটিতে বাঁধের কাজ না হয়ে টাকা লুটপাট হবার সম্ভাবনাই বেশি। কারণ, ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণে বিগত বছরগুলোর পকেট কমিটিতে কাজ না হয়ে অর্থ লুটপাটই বেশি হয়েছে।

তিনি আরো বলেন, অনেক বাঁধে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত টাকা। আবার প্রয়োজনীয় অনেক স্থানকে রাখা হয়েছে প্রকল্প আওতার বাইরে।

উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক সুমন চক্রবর্তী জানান, এখানে গত বছরের ফসল মার খাওয়া মানুষের ফসল এবার যেন মার না যায় এবং এলাকার প্রত্যেক শ্রমিক প্রতিদিন বাঁধ মেরামত কাজের বিনিময়ে যেন কমপক্ষে পাঁচশ টাকা পায় সে উদ্দেশ্যে সরকার বাস্তবায়ন করছে হাওরে বাঁধ নির্মাণ প্রকল্প। অথচ, সরকারের মহৎ এ উদ্দেশ্যটি প্রায় ভেস্তে যাচ্ছে। উপজেলার প্রকল্পসমূহে সিংহ ভাগ কাজ হচ্ছে নিয়মের বাইরে ভ্যাকু মেশিন দিয়ে।

এতে শ্রমিকরা বঞ্চিত হচ্ছে কাজের বিনিময়ে টাকা থেকে। অন্যদিকে, ওই মেশিন দিয়ে বাঁধের একেবারে নিকটবর্তী স্থান থেকে (৮/১০ ফুটের মধ্যে) গর্ত করে মাটি তুলে বাঁধ মেরামত করায় বাঁধের গোড়া খুবই দুর্বল হচ্ছে। এতে সামান্য পানির ধাক্কায়ই বাঁধ ভেঙ্গে ফসল তলিয়ে যাবে।

Comments

comments