মাদক গিলে ফেলছে দেশ ও জাতির ভবিষ্যৎ

ইসমাঈল হোসেন দিনাজী

গত ২২ জানুয়ারি সোমবার ইত্তেফাকের প্রথম পৃষ্ঠায় তিন কলামজুড়ে ধূমপানরত দুই শিশুর ছবি ছাপা হয়েছে। বাচ্চা দুটো ধুমসে সিগারেট টানছে। হাওয়ায় উড়ছে সাদা ধোঁয়া। ওরা হয়তো সিগারেটের ধোঁয়া ওড়াতে ওড়াতে রঙিন স্বপ্নের জাল বুনে চলেছে। কিন্তু ছবিটি দেখে আমার মনে হয়েছে সিগারেটের আগুনে পুড়ে ছাই হচ্ছে আমাদের স্বপ্ন, কপাল, দেশ এবং জাতির ভবিষ্যৎ।

ক্লাস সেভেনে পড়ুয়া শাওন। বয়স মাত্র ১৪। ছোট থেকেই চটপটে স্বভাবের। মা ও বড়বোনের সঙ্গে যাত্রাবাড়িতে বাসা ভাড়া নিয়ে থাকে। ৮ বছর আগে মা-বাবার মধ্যে ছাড়াছাড়ি হয়। সেই থেকে শাওন মা-বোনকে নিয়ে থাকে। মা-বোন দু’জনই এফডিসিতে এক্সট্রা হিসেবে কাজ করেন। মা-বোন চেষ্টা করেন শাওন লেখাপড়া করে মানুষ হোক। কিন্তু ওর মনোযোগ নেই পড়ালেখায়। ১০ বছর বয়স থেকেই স্কুলফাঁকি মারে শাওন। স্কুল ফেলে বাইরে আড্ডা দেয়া শুরু করে। যখন-তখন মার কাছে থেকে এটাওটা বলে টাকা নেয়। টাকা না পেলে চেঁচামেচি, গালমন্দ ও ভাঙচুর চালায়। শুধু কী তাই? মা-বোনকে অশ্লীল ভাষায় বকাঝকা করে। মারধর করতেও দ্বিধা করে না। নিজের শরীরে ব্লেড চালিয়ে দেয়। মা খোঁজখবর নিয়ে জানতে পারেন শাওন পাড়ার খারাপ ছেলেদের সঙ্গে ওঠবোস করে। নেশা খায়। মহানগরীর একটি মাদকনিরাময় কেন্দ্রে ভর্তি করা ছেলে সম্পর্কে এভাবেই মা ওর অন্ধকার জগতে পা বাড়াবার কাহিনী বর্ণনা করেন।

শাওন একসময় বাসা থেকে পালিয়ে টেম্পুর হেলপারি করে। বেশ টাকা হতো সে সময়। তবে সেটাকার সিংহভাগই খরচ হতো নেশার পেছনে। রোজ ৫ থেকে ৬ শ’ টাকা চলে যেতো ইয়াবা কিনতেই। টেম্পুর ড্রাইভার-হেলপারই ইয়াবা সেবন করতে শেখায় বলে শাওন জানায়। এর ব্যবসায়েও জড়িয়ে ফেলে তারা ওকে। সব পথঘাট শাওনের জানা। সে আশঙ্কা করছে মাদকনিরাময় কেন্দ্র থেকে বেরুলে তাকে আবার ওই কাজে জড়ানো হতে পারে। ওরা তাকে ধরেও নিয়ে যেতে পারে বলে ভয় পায় শাওন।

টেম্পুর সামান্য হেলপার শাওনের কী দোষ? একই পত্রিকায় ২১ জানুয়ারির রিপোর্টে প্রকাশ, ইয়াবাসক্ত একজন বিমানের পাইলটও নেশায় বুদ হয়ে থাকেন। ওই পাইলট জানান, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর একশ্রেণির সদস্যের নিয়ন্ত্রণে চলে ইয়াবা ব্যবসা। শুধু কি এক বিমান পাইলটই ইয়াবাসক্ত? খোঁজ নিলে আরও পাইলট পাওয়া যাবে যারা নিজেরা এর ব্যবসা করেন এবং খানও। তারপর কোনও কোনও পুলিশ সদস্যতো ইয়াবাসহ গ্রেফতারও হয়েছেন। এমনকি ডাক্তারদের বিরুদ্ধেও ইয়াবা, ফেনসিডিল, হেরোইন সেবনের অভিযোগ রয়েছে এন্তার। এ কারণে অনেক ডাক্তার ভুল চিকিৎসা করে রোগীর বারোটা বাজিয়ে ছাড়েন। ইয়াবার কারণে ডাক্তার দম্পতির সুখের সংসার ভেঙে ছারখার হবার খবরও ছাপা হয়েছে পত্রিকায়। কলেজ-ভার্সিটির ছাত্রছাত্রীদের অনেকই এসব নিয়ে মেতে থাকেন। শিক্ষকদেরও অনেকে কম যান না ইয়াবাসহ বিভিন্ন দামি দামি নেশাদ্রব্য সেবনের মতো সর্বনাশা কর্মের দিক থেকে। এমন অভিযোগ প্রায়শ মিডিয়াতে উঠে আসে।

এক গুণধর ছেলে ইয়াবাসক্ত। এনিয়ে সংসারে ঝামেলা হয় প্রায়শ। ইয়াবা কেনার টাকা না পেলে মা-বাবাকে মারপিট করে। সামলাতে না পেরে অসহায় বাবা অন্য ছেলেমেয়েদের নিয়ে বাসা ছেড়ে চলে গেছেন অন্যত্র। মা যেতে পারেননি ছেলেকে ফেলে। এজন্য খেসারত দিতে হয় প্রচুর। বাড়ি বাড়ি গিয়ে টিউশনি করেন। কুরআন শেখান। এজন্য যা সামান্য পারিশ্রমিক পান তাও জোর করে নিয়ে নেয় ইয়াবাসক্ত ছেলে। এমন অভিশাপ এখন বাসা বেঁধেছে অনেক পরিবারে বলে পত্রিকায় রিপোর্ট বেরিয়েছে।

গত ১৯ জানুয়ারি একই বিষয়ে ইত্তেফাকে ভয়বহ রিপোর্ট ছাপা হয়েছে। চুয়াডাঙ্গা জেলার গ্রামে গ্রামে মাদকব্যবসা। এমন গ্রাম বা এলাকা পাওয়া ভার যেখানে মাদক পাওয়া যায় না। ছোটছোট ব্যবসায়ীরা অধিক মুনাফার আশায় মাদকব্যবসায় জড়াচ্ছে। অনেক শিক্ষিত বেকার চাকরিবাকরির চেষ্টা না করে ইয়াবাসহ বিভিন্ন মাদকের ব্যবসায় নামছে। স্কুলকলেজের ছাত্ররাও জড়িয়ে পড়ছে এ ব্যবসায়। জেলার আলমডাঙ্গা উপজেলায় একই পরিবারের স্বামী-স্ত্রী, ছেলেমেয়েসহ ১২ জনই মাদক ব্যবসায়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। এরাই গ্রাম পর্যন্ত ছড়িয়ে দিচ্ছে ইয়াবাসহ নানা মাদক। এখানেও একশ্রেণির রাজনৈতিক নেতাকর্মী মাদকব্যবসায় জড়িত বলে প্রকাশ। এদের মধ্যে রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও মাদকব্যবসায় সবাই এক এবং অভিন্ন।

আমাকে প্রায়শ কারওয়ানবাজারের রেলওয়ে বস্তি দিয়ে যাতায়াত করতে হয়। অবশ্যই দিনেদুপুরে। কারণ রাতে আরও ভয়ঙ্কর অবস্থা বিরাজ করে সেখানে। তাই রাতে আমি ওপথে হাঁটি না কখনও। হ্যাঁ এই রেলওয়ে বস্তিতে প্রকাশ্যে দিনেদুপুরে গাঁজা বেচাকেনা হয়। প্রত্যেকটা ঝুপড়ির সামনে কুলো কিংবা ঝুড়িতে মেলে ধরে রাখে গাঁজা। মেয়েরাই পশরা সাজিয়ে রাখে। তরুণরাসহ নানা বয়সের ক্রেতা এসে পশরা থেকে গাঁজা কিনে নিয়ে যায়। কেউ কিচ্ছু বলে না। পুলিশ যেন এ সম্পর্কে কিচ্ছু জানে না। এখানকার মাদকবাণিজ্য নিয়ে অনেকবার লেখালেখি হয়েছে। টিভিতেও নিউজ হয়েছে কয়েকবার। কিন্তু যেইসেই। কোনও পরিবর্তন নেই এখানকার গাঁজাবাণিজ্যের।

মেয়েরা অর্থাৎ তরুণীদের অনেকেই নাকি স্লিম হবার জন্য ইয়াবা সেবন করছে। এরকম রিপোর্টইতো ছাপা হয়েছে পত্রিকায়। নাদুসনুদুস, থলথলে শরীর বিশিষ্টাদের নাকি বিয়েথা সহজে হয় না। তাই তাদের পাতলা ও ফিনফিনে চিকনা শরীর দরকার। এজন্য তারা ইয়াবা সেবন করে। কিন্তু এতে যে তাদের জীবনীশক্তি শেষ হয়ে যায়, স্বামী-সংসার করবার যোগ্যতা খতম হয়ে যায় ধীরেধীরে তাদের। সেদিকে খেয়াল নেই। এমনকি সন্তান জন্মদানের ক্ষমতাও হারিয়ে যেতে পারে মাদকসেবী তরুণীদের বলে বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন বহুবার। এটা কেবল মেয়েদের জন্য হুমকি নয়। ছেলে মাদকসেবীদেরও একই অবস্থা হতে পারে। এছাড়া মাদকসেবীরা লেখাপড়ায় অমনোযোগী এবং মেধাহীন হয়। শুধু তাই নয়, আরও নানারকম শারীরিক সমস্যার সৃষ্টি হয়ে থাকে।

মূল্যবোধের কতটা অবক্ষয় হলে বড়ভাই তার ছোটভাইকে সর্বনাশা ইয়াবায় আসক্ত করে তুলতে পারে! নিজে ধ্বংস হয় হোক, ভাই তার ভাইকে সেপথে নিতে চায় না সাধারণত। কিন্তু আজকাল তাও ঘটছে। তার মানে মাদকাসক্তদের হিতাহিত জ্ঞান বলতে কিছু থাকে না। তারা চায়, নিজেরা খেয়ে ধ্বংস হচ্ছে, ওরাও খাক। খেয়ে ধ্বংস হোক।

মাদকের নেশা অনেক সংসার ভেঙে ফেলছে। পারিবারিক বন্ধন করছে ছিন্নভিন্ন। তারুণ্য হচ্ছে ধ্বংস। সন্তান চলে যাচ্ছে মা-বাবাকে ফেলে। অনেক মা-বাবাও চলে যাচ্ছেন প্রিয় সন্তান ফেলে। কোথাও কোথাও আরও হচ্ছে সর্বনাশ। মাদকাসক্ত সন্তান টিপে ধরছে বাবার কণ্ঠনালি। এমনকি ইয়াবা ইত্যাদি নেশাদ্রব্য কেনার টাকা না পেয়ে মা-বাবাকে হত্যা করে ফেলছে। ঘরে বন্দী করে রেখে আগুন লাগিয়ে দেবার ভয়ঙ্কর কাণ্ড ঘটিয়ে দিচ্ছে সন্তান। নেশা হচ্ছে এমনই ভয়াল এবং সর্বনাশা। এজন্যই মাদকগ্রহণ ইসলামের দৃষ্টিতে নিষিদ্ধ। তবে কোনও মাদক বা নেশা যদি কারুর জীবনরক্ষার্থে চিকিৎসার জন্য ওষুধ হিসেবে সীমিত পরিমাণে ব্যবহৃত হয় তাহলে সেকথা ভিন্ন।

যাই হোক, ইয়াবা, ফেনসিডিল, গাঁজা এসব মাদক মানুষ খায় না বা সেবন করে না। এখন এমন মাদকই মানুষকে খেয়ে ফেলছে। ধ্বংস করছে মানুষের মেধা, মনন ও জীবনীশক্তি। যে তারুণরা আগামীতে সমাজ পরিচালনা করবে, দেশ ও জাতিকে নেতৃত্ব দেবে তারাই যদি মাদকের করাল গ্রাসে নিঃশেষ হয় তাহলে আমাদের গন্তব্য কোথায়? তাই সর্বনাশা মাদকের ছোবল রুখতে না পারলে আমাদের ভবিষ্যৎ ফকফকা ছাড়া আর কী!

Comments

comments