আলিশান ফ্ল্যাট-গাড়ির মালিক নাসির, আছে একাধিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানও

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উচ্চমান সহকারী নাসির উদ্দিন পরিবার নিয়ে থাকেন খিলক্ষেতের কনকর্ড লেকসিটির বৈকালী ভবনের ৬/বি/১/৩ নম্বর ফ্ল্যাটে। ফ্ল্যাটটির সাইজ ১ হাজার ৬৫ স্কয়ার ফুট। এই ভবনের বাসিন্দারা জানান, এই আবাসিক এলাকায় নাসিরের আরও একটি ফ্ল্যাট রয়েছে, যেটি ভাড়া দেওয়া। তার একটি প্রাইভেট কারও রয়েছে। শুধু তাই নয়, কনকর্ড লেকসিটি শপিং কমপ্লেক্সে ৪টি টেইলার্স ও একটি বুটিক শপও রয়েছেন তার।

মঙ্গলবার দুপুরে খিলক্ষেতের কনকর্ড লেকসিটিতে সরেজমিনে খোঁজ নিতে গিয়ে জানা গেছে, ২০০৭ সালে নাসির উদ্দিন কনকর্ডে আনুমানিক ৫০ লাখ টাকা দিয়ে দু’টি ফ্ল্যাট কিনেছিলেন। ওইসময় প্রতিটি ফ্ল্যাটের দাম ছিল ২৫ লাখ টাকা। বর্তমানে দু’টি ফ্ল্যাটের দাম অন্তত ১ কোটি টাকা। অন্যদিকে, তিনি ২০১২ সালের দিকে ব্যবহৃত একটি প্রাইভেট কার কেনেন, যেটির দাম প্রায় ৫ লাখ।

ভবনটির রিসিপশনিস্ট আবদুল জব্বার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘গত নভেম্বর থেকে লেকসিটি কনকর্ডের সামনের রাস্তা মেরামতের কাজ শুরু হওয়ায় তার গাড়িটি আর দেখা যায় না।’

নাসিরের এক প্রতিবেশী জানান, ‘নাসির তার গ্রামের বাড়ি কুষ্টিয়ার মিরপুরে প্রায় ৩০ থেকে ৪০ বিঘা জায়গা কিনেছেন। তিনি প্রায়ই আমাদের সঙ্গে এ নিয়ে গল্প করেন। যার আনুমানিক মূল্য ৬০ থেকে ৭০ লাখ।’

খিলক্ষেতের কনকর্ড লেকসিটির বৈকালী ভবনের ৬/বি/১/৩ নম্বর ফ্ল্যাট নাসির উদ্দিনের

অন্য প্রতিবেশীরা জানান, শপিং মলের ৩ তলায় ৩৩৫, ৩৪০, ৩৪২, ৩৪৬ ও ৩৮৪ নম্বরের পাঁচটি দোকানের মালিক এই নাসির উদ্দিন। এরমধ্যে দু’টি কাপড়ের, দু’টি টেইলার্স (একটির নাম নিশাত টেইলার্স) ও একটি বুটিকের দোকান। দোকানগুলো গত একবছর আগে চালু করেছে বলে জানিয়েছেন শপিং মলটির অন্য দোকান মালিক-কর্মচারীরা। তারা জানান, এই পাঁচ দোকানে নাসির উদ্দিন আনুমানিক ১৫ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেছেন। এসব দোকানে অন্তত ২০ জন কর্মচারী রয়েছেন। যাদের বেতন ৮ হাজার থেকে শুরু করে ২০ হাজার পর্যন্ত দেওয়া হয় বলেও জানান তারা।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে নিশাত টেইলার্সের একজন কর্মচারী বলেন, ‘আমাদের এসব দোকানের এমডি (ম্যানেজিং ডিরেক্টর) নাসির উদ্দিন। শুনেছি, গত তিন দিন ধরে তিনি নিখোঁজ। তাকে পাওয়া যাচ্ছে না। আমরা বিশ্বাসই করতে পারছি না, তার মতো একজন মানুষকে গুম করা হতে পারে!’

শপিং মলটির অভ্যর্থনা বিভাগে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, নাসির উদ্দিনের নামেই দোকানগুলোর বিদ্যুৎবিলসহ সব সার্ভিস চার্জ আসে নাসির উদ্দিনের নামে। আর তার এই ব্যবসা প্রতিষ্ঠান দেখাশোনা করতে দায়িত্ব দিয়ে রেখেছেন তার শ্বশুরকে।

নাসির উদ্দিনের মালিকানাধীন নিশাত টেইলার্সের সামনের অংশ

মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ১০ হাজার ২০০ টাকা বেতন স্কেলে তিনি মোট বেতন পান ১৫ হাজার ২৮০ টাকা। ‘সরকারি কর্মচারী আপিল ও শৃঙ্খলা বিধিমালা-১৯৮৫’ অনুযায়ী প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির কর্মকর্তা কোনও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মালিক হতে পারবেন না। তবে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীরা সংশ্লিষ্ট দফতরের অনুমতি নিয়ে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খুলতে পারবেন। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উচ্চমান সহকারী নাসির উদ্দিন তৃতীয় শ্রেণির কর্মকর্তা হলেও তিনি তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছেন কিনা, তা জানা সম্ভব হয়নি।

শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০০৫ সালে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একটি প্রকল্পে অফিস সহায়ক হিসেবে চাকরি নেন নাসির উদ্দিন। পরে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতরের (মাউশি) অফিস সহকারী পদে দেন। এরপর মাউশির এমপিও শাখার দায়িত্ব পান তিনি। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, এখানে তাকে খুশি না করলে বৈধ কাগজপত্র থাকলেও এমপিও (মান্থলি পেমেন্ট অর্ডার)ভুক্ত হতে পারতেন না শিক্ষক-কর্মচারীরা। এমপিও দুর্নীতির দায়ে মাউশি থেকে সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া আকবর আলী খান কলেজে বদলি করা হয় তাকে। কিন্তু সেখানে যোগ না দিয়ে বিপুল পরিমাণ ঘুষ দিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে প্রেষণে যোগ দেন নাসির। এতে সহায়তা করেন শিক্ষামন্ত্রীর সাবেক এপিএস।

অভিযোগ রয়েছে, নাসির উদ্দিন মন্ত্রণালয়ে যোগ দেওয়ার পর আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠেন। টাকা না দিলে কোনও কাগজপত্র জমা নিতেন না তিনি। প্রায় সময়ই তিনি ডেস্কে থাকতেন না। মন্ত্রণালয়ে ঘুরে ঘুরে তদবির করতেন। এর মাধ্যমেই তিনি কোটিপতি বনে যান।

নাসির উদ্দিন প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘যেহেতু তিনি সরকারি কর্মকর্তা, সেহেতু তার সম্পদের বিষয়ে ভালো করে তদন্ত করতে হবে। মন্ত্রণালয়কেই এ বিষয়ে কাজ করতে হবে। এছাড়া একজন দুর্নীতিবাজ কখনোই এককভাবে দুর্নীতি করতে পারে না। তার সঙ্গে আরও অনেকেই জড়িত থাকতে পারে। এটা তদন্ত করে দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।’

নাসির উদ্দিনের নামে এলসিসি শপিং কমপ্লেক্সের দোকানের সার্ভিস চার্জের বিল

রসঙ্গত, জঙ্গি সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে লেকহেড স্কুল বন্ধ রাখার নির্দেশ দেন আদালত। কিন্তু আদালতের ওই নির্দেশ অমান্য করে ওই স্কুলের এমডি খালেক হোসেন মতিনের সঙ্গে ৪ লাখ ৩০ হাজার টাকার ঘুষের চুক্তি করেন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উচ্চমান সহকারী নাসির উদ্দিন ও শিক্ষামন্ত্রীর ব্যক্তিগত কর্মকর্তা মোতালেব হোসেন। গত ১৬ ডিসেম্বর করা ওই চুক্তি অনুযায়ী বিভিন্ন ধাপে টাকা নেওয়ার পর গত ২১ জানুয়ারি বাকি ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা আনতে গিয়ে বনানীতে ডিবি পুলিশের পাতা জালে ধরা পড়েন তারা। এরপর থেকেই তাদের নানা আর্থিক কেলেঙ্কারি প্রকাশ পেতে থাকে।

এদিকে, ঘুষ নিতে গিয়ে হাতেনাতে ধরাপড়া মো. মোতালেব হোসেন ও নাসির উদ্দিনকে সাময়িক বরাখাস্তের সিদ্ধান্ত নিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এ প্রসঙ্গে মঙ্গলবার দুপুরে সচিবালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ বলেন, ‘মোতালেবসহ গ্রেফতার হওয়াদের সাময়িক বরখাস্তের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আদালতে মামলা চলার সময় তারা সাময়িক বরখাস্ত থাকবেন। মামলার রায়ের পর এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।’

সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক কর্মকর্তা (এও) আবু আলমের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে কিনা. এমন প্রশ্নের জবাবে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ‘কে অনুপস্থিত, ছুটিতে আছে কিনা, সেসব খবর প্রতিদিন নেওয়া সম্ভব নয়। তবে জেনে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

Comments

comments