ঘুষের হাট শিক্ষা মন্ত্রণালয় : দুর্নীতিবাজদের পদায়ন মন্ত্রী নাহিদের দপ্তরে

প্রশ্নফাঁস ও পাঠ্যবই কেলেঙ্কারিতে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদের দক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ হলেও সবাই তাকে ক্লিন ইমেজের লোক বলেই জানেন। কিন্তু মন্ত্রীর মন্ত্রণালয়ের ভেতরে দুর্নীতির মুখরোচক গল্প সবার মুখে মুখে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এমন কোনো কাজ নেই যা ঘুষ ছাড়া করা যায়। এজন্য অনেকেই মন্ত্রী নাহিদও ভীষণ সমালোচিত। এ কারণে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগও দাবি করেছেন অনেকে। বলেছেন, দপ্তর সামলাতে না পারলে পদত্যাগ করে তার বাড়ি চলে যাওয়া উচিত।

অভিযোগ রয়েছে শিক্ষক নিয়োগ, পদায়ন, বদলি, কর্মচারী বদলি ও সংযুক্তিকরণ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শাখা খোলার অনুমতি, জাতীয়করণ, এমপিওভুক্তি, সার্টিফিকেট সত্যায়ন, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাবর্তনের অনুমতিসহ নানা কাজে সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা। এই সিন্ডিকেটের বাইরে গিয়ে সেবাপ্রার্থীরা মন্ত্রণালয় থেকে কোনো কাজ করতে পারেন না। সব মিলিয়ে ঘুষের আখড়ায় পরিণত হয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে দিনের পর দিন এসব চললেও মন্ত্রী নাহিদ এসব অপকর্ম থামাতে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নিতে পারেননি। অভিযোগ রয়েছে, মন্ত্রী নাহিদকে যারা তোষামোদি করেছে তাদের জন্য তিনি ‘দিলদরিয়া’ হয়ে যেতেন। যারা তোষামোদি করত না তাদের এড়িয়ে চলেন মন্ত্রী।

সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, শিক্ষামন্ত্রী নিজেকে ‘ক্লিন ইমেজে’ রেখেছেন। কিন্তু তার ডানবামে ঘুষের হাট বসানোর জন্য মন্ত্রীর পার্ষদরা যে সা¤্রাজ্য গড়ে তুলেছেন সে বিষয়ে মন্ত্রী দেখেও অনেকটা না দেখার ভান করেছেন। অথচ ইচ্ছে করলেই এসব সিন্ডিকেট ভেঙে চুরমার করে দিতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা না করে উল্টো অভিযুক্ত কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের নিজের দপ্তরেই পদায়ন করেছেন। এরফলে মন্ত্রীর দপ্তরে পদায়ন পেয়ে দুর্নীতিবাজরা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।

শিক্ষামন্ত্রীর ব্যক্তিগত কর্মকর্তা (পিও) মোতালেব হোসেন এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের গ্রহণ ও বিতরণ শাখার উচ্চমান সহকারী নাসির উদ্দিন নিখোঁজ হওয়ার পর পুলিশ গত রবিবার জানায় ওই দুজন তাদের হেফাজতে আছে। পুলিশ তাদের কব্জায় নেয়ার আগে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ বলছিলেন, মোতালেব ও নাসির দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত কি না সে বিষয়ে তিনি জানেন না। কিন্তু দুর্নীতিবাজরা ধরা পড়ার পর মন্ত্রণালয় বলছে, কারো ব্যক্তিগত দুর্নীতির দায় নেবে না শিক্ষা মন্ত্রণালয় কিংবা অধিদপ্তর। দুর্নীতির দায়ে দুই কর্মচারী গ্রেপ্তার হওয়ার পর শীর্ষ কর্মকর্তারা বলছেন, যারা দুর্নীতি করেছে কলেঙ্কারীর দায় তাদেরই বহন করতে হবে। নিম্নপদস্থ কর্মচারি হয়েও তাদের অবৈধ সম্পদের পাহাড়ে বিব্রত মন্ত্রণালয়।

মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক মাহবুবুর রহমান বলেছেন, দুর্নীতির দায়ে যারা আটক হয়েছে, আইন অনুযায়ী তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। তিনি বলেন, নাসির উদ্দিন মাউশির উচ্চমান সহকারী ছিলেন। তাকে একবছর আগে সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া সরকারি আকবর আলী কলেজে বদলি করা হয়েছিল। কিন্তু নাসির সেখানে যোগ না দিয়ে মন্ত্রণালয় থেকে নতুন আদেশ জারি করান। তাতে নাসিরকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করা হয়।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০১৩ সালে এমপিও জালিয়াতির দায়ে নাসিরের বিরুদ্ধে তদন্ত করে দুদক। সেসময় তাকে ঢাকার বাইরে বদলি করা হয়। কিন্তু নাসির বদলি হওয়া কর্মস্থলে যাননি। তিনি মাউশিতেই থেকে যান। এরপরে নাসিরকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করা হয়েছিল। অভিযোগ রয়েছে, উচ্চমান সহকারী নাসিরকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করতে মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর দপ্তরের সিন্ডিকেটটি জড়িত ছিল। এদের মধ্যে একজন হলেন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সরকারি মাধ্যমিক শাখার প্রশাসনিক কর্মকর্তা মীর আনছার আলী। নাসিরকে সিরাজগঞ্জ জেলার উল্লাপাড়া সরকারি কলেজে বদলি করা হয় ২০১৬ সালের মার্চ মাসে। কিন্তু একদিনের জন্যও সেখানে যাননি তিনি। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক কর্মকর্তা আনছারের উদ্যোগে নাছিরকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত হওয়ার নথি উত্থাপন করা হয়। এরপরে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরে চিঠি পাঠানো হয়। মন্ত্রণালয় থেকে অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে পাঠানো চিঠিতে বলা হয়, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগে জনবল সংকট থাকায় দাপ্তরিক প্রয়োজনে নাসিরকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে। এরপরে ২০১৭ সালের ২৪ জুলাই মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (সাবেক) অধ্যাপক ড. এস এম ওয়াহিদুজ্জামান স্বাক্ষরিত আদেশে নাসিরকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রশাসন ও সংস্থাপন শাখায় সংযুক্তির আদেশ করা হয়। নাসিরকে তার মূল কর্মস্থল আকবর আলী সরকারি কলেজ থেকে বেতনভাতা তোলার কথা বলা হয়।

অভিযোগ রয়েছে, শিক্ষামন্ত্রীর গাড়িচালক মো. বশীরকে নিয়েও। বছর কয়েক আগে বশির মন্ত্রীকে নিয়ে গাড়ি চালিয়ে সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে যান। সেখানে যাওয়ার পর একজন অধ্যাপকের কাছ থেকে গাড়ির জ্বালানি নেন বশীর। কিন্তু ওই অধ্যাপক গাড়ির জ্বালানি দেয়ার বিষয়টি মন্ত্রীকে বলে দেন। এ ঘটনার পর থেকে বশিরকে নিয়ে মন্ত্রী ঢাকার বাইরে যাওয়া বন্ধ করে দিলেও বশিরের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। তিনি এখনো মন্ত্রীর গাড়িচালক। অভিযোগ রয়েছে মন্ত্রীকে সচিবালয়ে নামিয়ে দিয়ে বশীর সারাদিন মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরে পড়ে থাকেন। দিনভর সেখানেই নানা তদবিরে ব্যস্ত থাকেন। অভিযোগ রয়েছে, ঢাকার যাত্রাবাড়ীতে মন্ত্রীর ড্রাইভার বশীরের কোটি টাকা দামের একটি কারখানা রয়েছে। তবে ড্রাইভার বশীর এই কারাখানাটি তার নিজের নয় দাবি করে বলেছেন, এটি তার এক আত্মীয়ের।

দুর্নীতির অভিযোগে ২০১২ সালের অক্টোবরে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদের দপ্তরের এমএলএস (পিয়ন) ও সরকারি চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী সমিতির একাংশের নেতা মোহাম্মদ আলীকে ঘুষের অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়েছিলেন। পরে অবশ্য তিনি ছাড়া পান। কিন্তু শিক্ষামন্ত্রী এই দুর্নীতিবাজকেই তার দপ্তরে পদায়ন করেন। তিনি এখনো শিক্ষামন্ত্রীর দপ্তরে।

টাইপিস্ট (তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী) হিসেবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে নিয়োগ পান মোতালেব। কিন্তু নিজেকে কর্মকর্তা হিসেবে পরিচয় দিতেন। ২০০৯ সালে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদের ব্যক্তিগত কর্মকর্তা (টেলিফোন রিসিভসহ টুকিটাকি কাজ করার জন্য) হন। মোতালেবের গ্রামের বাড়ি ঝালকাঠি জেলার নলছিটি উপজেলার মোল্লার হাট ইউনিয়নে। হতদরিদ্র কৃষকের ছেলে মোতালেব শিক্ষামন্ত্রীর ব্যক্তিগত কর্মকর্তা নিযুক্ত হওয়ার তিন বছরের মধ্যে কোটি কোটি টাকার মালিক বনে যান। ২০১৪-১৫ সালেও মোতালেবের বিরুদ্ধে ঘুষ দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। সেসময় মোতালেবকে মন্ত্রীর ব্যক্তিগত পদ থেকে মন্ত্রণালয়ের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় শাখায় প্রশাসনিক কর্মকর্তা পদে বদলি করে পাঠানো হয়। কিন্তু ছয় মাস যেতে না যেতেই মোতালেব মন্ত্রীর ব্যক্তিগত পদে ফিরে আসেন। কিভাবে তাকে ফের মন্ত্রীর ব্যক্তিগত কর্মকর্তা পদে ফিরিয়ে আনা হলো তার কোনো ব্যাখা দেননি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা। কিন্তু এখনো তিনি মন্ত্রীর ব্যক্তিগত কর্মকর্তা পদে কর্মরত।

মো. আলমগীর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মচারী সমিতি নেতা। বছরখানেক আগেও তিনি মন্ত্রণালয়ের গুরুত্বহীন একটি শাখায় কর্মরত ছিলেন। কিন্তু এখন তিনি মন্ত্রণালয়ের বেসরকারি কলেজ শাখায় কর্মরত। এই শাখা থেকে কলেজ জাতীয়করণের কাজ হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, এই শাখায় এসেই তিনি দুহাত ভরে ঘুষ নেয়া শুরু করেছেন। জানতে চাইলে মো. আলমগীর বলেন, ঘুষ নেয়ার অভিযোগ কেউ প্রমাণ করতে পারলে উপযুক্ত বিচার মাথা পেতে নেব। একইভাবে মাধ্যমিক শাখায় কর্মরত মীর আনছার আলীর বিরুদ্ধেও ঘুষ নেয়ার অভিযোগ রয়েছে। ঘুষ নেয়ার অভিযোগ রয়েছে মন্ত্রণালয়ের বেসরকারি মাধ্যমিক শাখার প্রশাসনিক কর্মকর্তা আবু আলম খানের বিরুদ্ধেও। জঙ্গিবাদে সন্দেভাজন লেকহেড স্কুলের যাবতীয় নথির কার্যক্রম এই শাখা থেকেই নিষ্পত্তি হয়েছিল। এ ছাড়া সারাদেশে স্কুলের শাখা খোলার কার্যক্রমও এই শাখা থেকে নিষ্পত্তি হয়। আবু আলম কোনো ধরনের দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত নয় বলে দাবি করেছেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা ও কর্মচারী বলেছেন, মোতালেব-নাসির-আনসার-মোহাম্মদ আলীর মতো মাত্র চার-পাঁচজনের একটি সিন্ডিকেট মন্ত্রণালয়ের মান-সম্মান ধ্বংস করেছে। এদের কারণে পুরো শিক্ষা মন্ত্রণালয় আজ সমালোচনার মুখে। এতকিছুর পরেও মন্ত্রণালয়ের ওই সিন্ডিকেট ভাঙার কোনো উদ্যোগ নেননি শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ। মোতালেব ও নাসির গ্রেপ্তার হলেও তাদের বরখাস্ত করেনি শিক্ষা মন্ত্রণালয়। অথচ সরকারি কর্মচারী বিধিমালা ১৯৮৫ অনুযায়ী বরখাস্তের বিধান থাকলেও গতকাল সোমবার সন্ধ্যা পর্যন্ত দুর্নীতিবাজ দুই কর্মচারীকে বরখাস্তের কোনো আদেশ জারি করেনি শিক্ষা মন্ত্রণালয়।

তবে গতকাল সোমবার দুপুরে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ সচিবালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, সরকারি চাকরিবিধি অনুযায়ী কোনো চাকরিজীবী ফৌজদারি অপরাধে গ্রেপ্তার হলে তিনি চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত হবেন। মন্ত্রী বলেন, এটা চিন্তা করার দরকার নেই, এটা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারীদের ব্যাপার। যদি তারা কোনো ঘুষ নিয়ে থাকেন তাহলে সরকার ব্যবস্থা নেবে। মন্ত্রণালয়ের ওপর যতটুকু দায়িত্ব পড়বে ততটুকু নেবে। শিক্ষামন্ত্রী আরো বলেন, আমরা কখনো কোনো অন্যায়কারী, কোনো ঘুষ খাওয়া, দুর্নীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত, বেআইনি কাজ করে এমন কোনো লোককে প্রশ্রয় দেব না। তার বিরুদ্ধে আমরা ব্যবস্থা নেব।

Comments

comments